| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
শুনতে অবাক লাগলেও ঘটনাটি সত্যি; বিএনপি ও এনসিপির সম্পর্কের ভেতরে এখন স্পষ্ট টানাপোড়েন দৃশ্যমান। রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্রমেই বাড়ছে পারস্পরিক অস্বস্তি ও বাকযুদ্ধ। এনসিপির সাম্প্রতিক আচরণ ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন অনেকে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিএনপি নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল কটাক্ষ করে মন্তব্য করেছেন, এনসিপির নেতা-কর্মীদের আচরণ দেখে মনে হয় তারা এমন কিছু সেবন করেন যার ফলে তাদের আচরণ স্বাভাবিকতার সীমা অতিক্রম করছে। শুধু আলালই নন, পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রীও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন: এনসিপির আচরণে শিষ্টাচার, ভদ্রতা কিংবা রাজনৈতিক সৌজন্যের বালাই নেই।
আসলে বিএনপির সঙ্গে নানান ইস্যুতে এনসিপির এই বিরোধ এখন আর শুধু আলোচনার টেবিল বা সভা সমাবেশে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন পুরোপুরি প্রকাশ্য রাজনৈতিক টানাপোড়েনে রূপ নিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে গুরুতর অভিযোগ তুলে বলেছেন, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া নাকি সচিবের স্বাক্ষর ছাড়াই ফাইল পাস করানোর চেষ্টা করতেন। এই বক্তব্যের পরপরই আসিফ মাহমুদ সময় নষ্ট না করে সরাসরি ফেসবুকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন: তিনি বলেন, অভিযোগটি যদি সত্য হয় তবে তা জনসমক্ষে প্রমাণ করতে হবে। শুধু এখানেই থেমে না থেকে তিনি বিএনপিকে 'নাদান সরকার' বলেও মন্তব্য করেন, যুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন যে ক্ষমতায় আসার মাত্র তিন মাসের মধ্যেই তারা এখনো প্রশাসনিক বাস্তবতা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি।
আসিফের এই মন্তব্যে বিএনপির ভেতরে বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। কারণ, যে দলটি দুই দফায় রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, সেই দলের নেতৃত্ব নিয়ে এমন মন্তব্য আসিফ কীভাবে করতে পারেন? শুরুতে বিষয়টিকে অনেকেই রাজনৈতিক নাটক মনে করলেও ধীরে ধীরে এই সংঘাত স্পষ্ট হচ্ছে। এনসিপির ভেতরে বিএনপির প্রতি এক ধরনের চাপা অসন্তোষ কাজ করছে, আর অন্যদিকে বিএনপিও এনসিপিকে ঘিরে অস্বস্তিতে পড়েছে।
এনসিপি নেতাদের বক্তব্যের ভাষা রাজনৈতিক শিষ্টাচারের সীমা অতিক্রম করেছে। এনসিপি নেতা নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীর কথাই ধরা যাক। তিনি ক্রমাগত বিএনপিকে নিয়ে এমন সব বিতর্কিত মন্তব্য করেন যা কোনো দলের পক্ষে সহজে হজম করা কঠিন। তিনি সরাসরি বলেছেন তারেক রহমানের মেরুদণ্ড আগেরবার ভেঙেছিল ডিজিএফআই আর ছাত্র জনতা এবার তারেক রহমানের ঠিক কী কী ভাঙবে সেটা নিয়ে নাকি তিনি বেশ চিন্তিত।
এ ধরনের মন্তব্য স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়ে তোলে এবং প্রতিপক্ষের কর্মী সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে এর প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও দলীয় শীর্ষ নেতৃত্ব তুলনামূলকভাবে সংযত অবস্থান নিয়েছে। সাধারণত ছাত্রদলের কর্মীরা এতক্ষণে নাসিরকে কঠিন ধোলাই দেওয়ার কথা। অবশ্য কুষ্টিয়ার ছাত্রদল তাদের নেতার এই অপমান সহ্য করতে না পেরে নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীর উপর ডিম নিক্ষেপ করে।
কুষ্টিয়ায় এনসিপি আর ছাত্রদলের মধ্যে রীতিমতো হাতাহাতি ও সংঘর্ষ বেঁধে গেল। আর সেই সংঘর্ষের এক পর্যায়ে একজন এনসিপি কর্মীর পকেট থেকে অস্ত্রের মতো কিছু একটা বেরিয়ে আসতে দেখা গেল যা তাৎক্ষণিকভাবে মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। পরবর্তীতে এনসিপির পক্ষ থেকে ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা করে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে যে সেটি আসলে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না, ওটি ছিল শুধুমাত্র আত্মরক্ষার জন্য একটি লাঠির মতো জিনিস বা ডিফেন্সিভ স্টিক। তবে এনসিপির এই ব্যাখ্যা অনেকেই বিশ্বাসযোগ্য মনে করেননি। চারদিকে জোর রব উঠে গেল যে এনসিপির কাছে আসলে কত পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র জমা থাকতে পারে এবং বিএনপির উচিত তা নিয়ে এখনই একটা জোরদার তদন্ত শুরু করা।
কুষ্টিয়ায় নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীর ওপর ডিম নিক্ষেপের এই ঘটনার পর এনসিপির প্রভাবশালী নেতা আসিফ মাহমুদ আর চুপ থাকতে পারলেন না। তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়ে সরাসরি হুংকার দিয়ে বলেন, "সরকারি দল যদি ভায়োলেন্স চায়, সেটা যে আমাদের থেকে ভালো কেউ পারবে না এটা ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানেই আমরা দেখিয়ে দিয়েছি। আমাদের সহযোদ্ধাদের ওপর যারা হামলা করেছে, তাদেরকে আজ রাতের মধ্যে গ্রেপ্তার করতে হবে। যদি গ্রেপ্তার না করা হয়, আপনারা যদি ভায়োলেন্স বেছে নেন, তাহলে আমরাও ভায়োলেন্স বেছে নিতে বাধ্য হব।"
তীব্র সামাজিক চাপ ও দলীয় কর্মীদের ভেতরের অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে বিএনপি সরকার শেষ পর্যন্ত কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছে। সেই চাপের ধারাবাহিকতায় এনসিপির নেতা তারেক রেজাকে গ্রেপ্তার করার ঘটনা নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। বাস্তবে বিএনপি এবং এনসিপির মধ্যে যে শীতল উত্তেজনা দীর্ঘদিন ধরে জমাট বেঁধেছিল, তা আরও উসকে দিয়েছে আসিফ মাহমুদের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও হুমকিসূচক অবস্থান। তবে ঘটনাটিকে শুধু দুই দলের সরাসরি সংঘাত হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি স্পষ্ট হয় না; এর ভেতরে আরও জটিল রাজনৈতিক সংকেত কাজ করছে বলে মনে হয় ।
বিশেষ করে এই বার্তাগুলো একদিকে যেমন বিএনপির জন্য চাপ তৈরি করছে, তেমনি আড়ালে থাকা আওয়ামী লীগের প্রতি একটি সতর্কবার্তা হিসেবেও ধরা হচ্ছে। এনসিপির লাগামহীন বক্তব্য ও আচরণ নিয়ে বিএনপি সমর্থকদের ভেতরে দীর্ঘদিনের যে চাপা অসন্তোষ জমে ছিল, তা এখন আরও স্পষ্ট হচ্ছে তবে তারা এখনও সরাসরি বড় ধরনের সংঘর্ষে যেতে পারছে না। বিএনপি কি সত্যিকারের অর্থে এনসিপিকে কোনোভাবে ভয় পাচ্ছে? নাকি এনসিপির পিছনে অবস্থিত প্রকৃত শক্তির সম্পূর্ণ গভীরতা সম্পর্কে কেউ এখনো স্পষ্ট কোনো ধারণা রাখেন না?
এমনকি যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণ ইস্যুতেও এনসিপি বিএনপিকে নিয়ে অশ্রাব্য ভাষায় কথা বলতে ছাড়েনি। জাইমা রহমান থেকে শুরু করে হোম মিনিস্টারের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার হুমকি দেওয়ার মতো জঘন্য কাজ অবাধে চলছে। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক এবং অবিশ্বাস্য বিষয় হলো বাংলাদেশে গত দুই মাসে প্রায় একশোটি ধর্ষণের ভয়াবহ খবর এসেছে যার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিভিন্ন মাদরাসা এবং ধর্মীয় নেতাদের নাম জড়িত রয়েছে। দেশের খ্যাতিমান ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা যেমন এই ভয়াবহ বাস্তবতাকে উপেক্ষা করছেন, এনসিপিও তেমনিভাবে চোখ বন্ধ করে বসে আছে। এনসিপির লেজটা আসলে কোথায়?
©somewhere in net ltd.