নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

বেঁচে থাকলে বড় হবো....

চারাগাছ

চারাগাছ একদিন ডালপালা ছড়াবে.....

চারাগাছ › বিস্তারিত পোস্টঃ

রূপের ডালি খেলা — যে আয়নায় আমাদের নিনকা রূপসী ছিল

১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২২



কিছু গল্প থাকে, যেগুলো পড়া হয় না—বয়ে বেড়ানো হয়।

কত বছর আগে পড়েছিলাম, মনে নেই। তখন আমি ছোট। পৃথিবীটাকে এখনকার মতো চিনতাম না। মানুষকে দেখতাম মুখ দিয়ে নয়, মন দিয়ে। কে সুন্দর, কে অসুন্দর—তার কোনো হিসাব ছিল না। ভালো মানুষ মানেই সুন্দর মানুষ—এই সহজ, ন্যায়পর অজ্ঞতার মধ্যেই তখন আমাদের শৈশব।

এই গল্পটাও তখন থেকেই আমার সঙ্গে আছে।

গল্পের সাত নম্বর ফ্ল্যাটের নিনকাকে আমরা সুন্দরী বানিয়ে দিই।

তার চওড়া খাঁদা নাক ছিল, মোটা ঠোঁট, কপাল আর গালে রুটির গুঁড়োর মতো ছুলি, বিবর্ণ চোখ, সোজা চুল। বড় হয়ে এসব নিশ্চয়ই আমাদের চোখে পড়ত। কিন্তু তখন পড়েনি।

কারণ—

“যে ন্যায়পর অজ্ঞতায় আমরা তখন ছিলাম, তাতে ভালো মানুষকে ধরা হতো সুন্দর আর খারাপকে অসুন্দর।”

কী আশ্চর্য একটা শৈশব ছিল আমাদের!

নিনকা মাঝখানে দাঁড়াত, আর আমরা তাকে সুন্দর করে দিতাম কথায় কথায়।

“কী সুন্দর গলা—রাজহাঁসের মতো।”

“রাজহাঁসের মতো নয়, মোরাল গ্রীবা।”

“কী সুন্দর প্রবালের মতো ঠোঁট...”

“সাগরের মতো নীল চোখ।”

“মুক্তোর মতো দাঁত।”

আমাদের কথাগুলো হয়ে উঠত আয়না।

নিনকা তাতে নিজেকে দেখত সত্যিকারের রূপসী।

এই লাইনটায় এসে আজও আমার বুকের কোথায় যেন একটা ব্যথা হয়।

কারণ ছোটবেলায় আমরা বুঝিনি—মানুষের জীবনে আয়না কত নিষ্ঠুর হতে পারে।

একটা সময় পর্যন্ত মানুষ নিজেকে দেখে প্রিয়জনের চোখে। তারপর একদিন কেউ তাকে সত্যিকারের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।

গল্পে নতুন ছেলেটা আসার পর ঠিক সেটাই হয়।

“আয়নায় বরং নিজের মুখখানা একবার দ্যাখ গে যা!”

এই একটা কথা নিনকার ভেতরের রূপের ডালিটা ভেঙে দেয়।

তারপর থেকে সে আর আমাদের কাছে আসে না।

আমরাও বুঝি না কী হয়েছে।

শুধু দেখি—যে মেয়েটা এতদিন আমাদের চোখে রূপসী ছিল, সে হঠাৎ নিজের চোখেই অপরিচিত হয়ে গেছে।

বড় হওয়াটা বোধহয় এমনই।

একদিন আমরা অন্যের চোখে নিজেদের দেখতে শিখি।

তারপর নিজের চোখে নিজেকে দেখতে গিয়ে হারিয়ে ফেলি সেই মানুষটাকে, যে একসময় খুব সহজেই সুখী হতে পারত।

কিন্তু গল্পের শেষের দিকে এসে নিনকাকে আমি আর কোনোদিন ভুলতে পারিনি।

বৃষ্টিভেজা সেই সন্ধ্যা।

নতুন ছেলেটার জানলার নিচে দাঁড়িয়ে আছে নিনকা। ঠান্ডায় ভিজছে, তবু নড়ছে না।

মা এসে তাকে নিয়ে যাচ্ছে।

তারপর হঠাৎ—

“চেয়ে দ্যাখ আমার দিকে। তুই কি ভাবিস, আমি সুন্দরী?”

নিনকা মায়ের দিকে তাকায়।

এই জায়গায় এসে ছোটবেলায় আমার চোখ ভিজে যেত।

আজও যায়।

মা কি কখনো সুন্দরী হয়?

মা কি কখনো অসুন্দরী হয়?

মায়ের মুখে কি আমরা কখনো নাক, চোখ, ঠোঁটের হিসাব করি?

মা তো মা।

আর নিনকা তখন যেন প্রথমবার বুঝতে পারছে—সৌন্দর্য বলে পৃথিবীতে একটা নিষ্ঠুর জিনিস আছে, যেটা মানুষকে নিজের কাছ থেকেই দূরে সরিয়ে দেয়।

তারপর সে মায়ের সঙ্গে রূপের ডালি খেলতে চায়।

আমি জানি না, পৃথিবীর সাহিত্যে এর চেয়ে মায়াময় কোনো দৃশ্য আছে কি না।

সে মাকে আবার সুন্দর করে তুলতে শুরু করে।

“কী সুন্দর তোমার মরাল গ্রীবা...”

“বড় বড় চোখ তোমার সাগরের মতো নীল...”

“কী সুন্দর তোমার লম্বা সোনালী চুল...”

“প্রবালের মতো ঠোঁট...”

“মুক্তোর মতো দাঁত...”

এবার আর শিশুরা কথা বলছে না।

কথাগুলো যেন দুজন মানুষের অন্ধকার জীবন থেকে উঠে আসছে।

সেই মুহূর্তে রূপের ডালি আর খেলা থাকে না।

হয়ে ওঠে আশ্রয়।

হয়ে ওঠে ভালোবাসা।

হয়ে ওঠে এক মেয়ের মাকে আবার সুন্দর করে দেওয়ার শেষ চেষ্টা।

তারপর গল্পটা শেষ হয় একেবারে নিঃশব্দে—

“সাত নম্বর ফ্ল্যাটের নিনকা মারা যায় ১৯৪২ সালে মগার কাছে ফ্রন্টে। নার্স ছিল সে।”

এই লাইনটায় এসে আমি ছোটবেলা থেকেই কেঁদেছি।

কেন কাঁদি—সেটা ঠিক জানি না।

হয়তো কারণ এতক্ষণ আমি নিনকার সঙ্গে ছিলাম।

পপলার গাছের নিচে ছিলাম।

বৃষ্টির মধ্যে ছিলাম।

রূপের ডালির সেই গোল হয়ে দাঁড়ানো শিশুদের একজন ছিলাম।

আমি দেখেছি নিনকাকে সুন্দর হতে।

আমি দেখেছি তাকে আয়নায় নিজের মুখ দেখতে।

আমি দেখেছি তার ভেতরের কিছু একটা মরে যেতে।

আমি দেখেছি তাকে আবার মায়ের মুখে সৌন্দর্য ফিরিয়ে দিতে।

তারপর হঠাৎ জানতে পারি—সে নেই।

অনেক বছর ধরে নেই।

১৯৪২ সাল থেকে নেই।

অথচ আমার কাছে সে এখনো সেই বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় দাঁড়িয়ে আছে।

এই হলো গল্পের নিষ্ঠুরতা।

কিছু চরিত্র গল্প শেষ হলে চলে যায় না।

তারা আমাদের শৈশবের ভেতরে বসে থাকে।

বছর যায়।

শহর বদলে যায়।

রাস্তার নাম বদলে যায়।

আমরা বড় হয়ে যাই।

আমাদের চারপাশে আয়না বাড়তে থাকে।

কিন্তু কোথাও একটা উঠানে কয়েকজন শিশু এখনো গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

কেউ একজন ছড়া কাটছে—

“এনা, বেনা, রেস... কুইন্তের, কন্তের, জেস…”

আর সাত নম্বর ফ্ল্যাটের নিনকা চোখ নামিয়ে তার ফ্রকে হাত বুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সে জানে, এবারও তাকে সুন্দরী করা হবে।

কারণ তখনো আমরা জানতাম না সৌন্দর্য কী।

শুধু জানতাম—

যে ভালো, সে সুন্দর।

আর তাই, এত গল্প পড়েও, এত গল্প ভালোবেসেও, এই গল্পটাকেই আমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ গল্প বলে মনে করি।

কারণ এটি আমাকে কোনো গল্পের কথা মনে করিয়ে দেয় না।

এটি আমাকে আমার শৈশবের কথা মনে করিয়ে দেয়।

সেই শৈশবের কথা, যে শৈশব একদিন চুপিচুপি আমাদের কাছ থেকে চলে গেছে—

কিন্তু এখনো বৃষ্টির শব্দ হলেই কোথাও থেকে বলে ওঠে,

“আয়, রূপের ডালি খেলি।”

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.