| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সন্ধ্যার ঝাপসা আলোয় ড্রয়িংরুমে কেবল টিভির নিবুনিবু আলো। আমি একপাশে বসে আনমনে ভাবছি। আর আমার ছয় বছরের ছেলে—আমার অবয়বেরই এক রক্তমাংসের প্রতিচ্ছবি—মোবাইল স্ক্রিনের নীল আলোয় একমনে মাইনক্রাফট বানিয়ে চলেছে। তার কল্পনার ব্লকে ব্লক গড়ে উঠছে এক অদ্ভুত দুনিয়া।
কিন্তু আজ সে শুধু গেম নিয়েই বসে নেই। তার পাশে খোলা একটা খাতা, পেনসিল দিয়ে সেখানে বড় বড় করে কী সব যেন আঁকাঝুঁকা আর লিস্ট করা হচ্ছে। একটু পর সে খাতাটা বাড়িয়ে দিয়ে একরাশ গম্ভীর মুখে বলে উঠল—
— "বাবা, আমার টিমের নাম—'Titan Boss Army'। আমি লিডার, কারণ আমি বেস্ট স্টুডেন্ট।"
আমি অবাক হয়ে খাতাটা হাতে নিলাম। ১৪ জনের একটা লিস্ট। ক্লাসের সেরা পোলাপানদের বেছে নেওয়া হয়েছে। যদিও আমাজনে অভিযানে যাওয়ার কথা শুনে নাকি লিস্টের বেশ কয়েকজন ভয়ে ইতিমধ্যে পিছু হটতে শুরু করেছে!
ঠিক তখনই নিহাল একটু থমকে গিয়ে মিষ্টি গলায় জিজ্ঞেস করল,
— "বাবা, মারিয়ামকে কি টিমে নেওয়া যাবে?"
মারিয়াম হলো ওর ছোটবোন। আমি একটু অবাক হয়ে বললাম,
— "কেন রে? ওর কি অনেক সাহস?"
নিহাল চটজলদি জবাব দিল,
— "আরে হ্যাঁ! আমি নিজেই তো তেলাপোকা দেখলে ভয় পাই, আর মারিয়াম স্যান্ডেল খুলে তেলাপোকার দিকে তেড়ে যায়!"
ভাইয়ের এমন লজিক শুনে আমি আর হাসি ধরে রাখতে পারলাম না। ফলস্বরূপ, তার ‘টাইটান বস আর্মি’র স্পেশাল সদস্য হিসেবে দলে সুযোগ পেয়ে গেল ছোটবোন মারিয়াম।
নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ার পর তাদের গোপন মিশনগুলোর সেই মহাজাগতিক খসড়াটা আরও জমে উঠল। তালিকার এক নম্বরে লেখা—আমাজনে অভিযান। দুই নম্বরে—সেভ প্যালেস্টাইন। তিন নম্বরে—সেভ দ্য ওয়ার্ল্ড ফ্রম ওয়ার (যুদ্ধ থেকে পৃথিবী রক্ষা)। চারেরটায় বেশ মায়াবী একটা আকুতি—সেভ ট্রি ফ্লাওয়ার বাটস এবং বৃক্ষরোপণ। পাঁচ নম্বর পয়েন্টে এসে তার পড়াশোনার ছাপ স্পষ্ট—বড় হয়ে তারা সব নেগেটিভ এনার্জি আর খারাপ জিন কন্ট্রোল করবে। ছয় নম্বরে রয়েছে সমুদ্রের ভয়ংকর দানব—ক্রেকেন শিকার। আর শেষ পয়েন্টে এক অদ্ভুত শৈশবের উপলব্ধি—সাইরেন হেড, মেগাহর্ন সাইগাই বা স্কিবিটি টয়েলট রিয়েল লাইফে নাই, থাকলে এদের সাথে ফাইট করতো।
এই বয়সেই এত বড় বড় দায়িত্ব, এত সুদূর প্রসারী কল্পনা! আমাজন জঙ্গল থেকে শুরু করে ফিলিস্তিনের মুক্তি, বারুদের পৃথিবী থেকে যুদ্ধ মুছে দেওয়া—সবকিছু মিলিয়ে এক অপূর্ব মায়ায় সে একাই একশো।
তার দিকে তাকাতেই আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল। ক্লাস টু-থ্রিতে পড়ার সময় আমার নিজের মাথার ভেতরেও তো এমন কত রাজ্যের চিন্তা ঘুরপাক খেত! আমি ভাবতাম, আমি মরে গেলে আমাদের পুকুরটার কী হবে, মাছগুলো কে ধরবে? সময়ের স্রোত আমাকে তখন থেকেই তাড়িয়ে বেড়াত।
আজ আমি বুঝতে পারি, আমার ভেতরের সেই বিষণ্ণ হাহাকার, ফেলে আসা সময়ের জন্য কান্না—সেটাই এই ছেলেটার ভেতরে ভিন্ন এক রূপ নিয়েছে। আমার সেই স্মৃতিকাতরতার জিনটাই সে রূপান্তর করেছে এক দুনিবার সাহসিকতায়, এক মায়াবী অ্যাডভেঞ্চারে। আমি যেখানে অতীতে হারিয়ে যেতে চাইতাম, সে সেখানে ভবিষ্যৎ জয় করার ছক কষছে।
খাতার ওপর ঝুঁকে পড়া তার কচি মুখটার দিকে তাকিয়ে আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। আমি তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম।
বাইরে তখন মাগরিবের আজান শেষ হয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে এসেছে।
আমাদের ঘরের ফ্লোরে তখন আর ড্রয়িংরুমের টাইলস নেই—সেটা হয়ে উঠেছে আমাজনের দুর্গম জঙ্গল, যেখানে ‘টাইটান বস আর্মি’র সুপ্রিম কমান্ডার তার ছোট্ট তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে আছে যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীকে রক্ষা করার এবং সব ফুল কুঁড়ি বাঁচানোর এক অসম্ভব সুন্দর লড়াইয়ে।

©somewhere in net ltd.