| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ভারতের জগন্নাথন, জয়দীপ কিংবা কর্ণাদদের মতো ডানপন্থী পন্ডিতেরা আজকাল আর কোন রাখঢাক রাখছেন না। তারা বাংলাদেশের রংপুর দখল, বাংলাদেশ ভেঙ্গে নতুন একটা হিন্দু হোমল্যান্ড তৈরি এবং ১৯৪৭ এর দেশ ভাগের মত করে আরেকবার বাংলাদেশেই হিন্দু-মুসলিম ডেমোগ্রাফিক এক্সচেঞ্জের মতো কিছু র্যাডিক্যাল আইডিয়া নিয়ে লম্বা প্রেসক্রিপশন দিচ্ছেন।
আচ্ছা, তাদের এই থিওরিগুলোকেই যদি আমরা রিভার্স করি, মানে, তাদের এই সেম লজিক যদি ভারতের ওপর অ্যাপ্লাই করা হয়, তাহলে কী ঘটবে?
জয়দীপ মজুমদাররা যেভাবে রংপুরের ১৬,০০০ বর্গকিলোমিটার কেটে নেওয়ার কথা বলেন, সেই একই লজিকে যদি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ (মালদা, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর) কিংবা অসমের মুসলিম-মেজরিটি ডিস্ট্রিক্টগুলোকে নিয়ে কোনো 'Autonomous Zone' বা 'Homeland'-এর দাবি ওঠে, তবে তা কিন্তু ভারতের অখণ্ডতাকে গুঁড়িয়ে দেবে।
এই সিলিগুড়ি করিডোর (Chicken's Neck) মাত্র ১৭ থেকে ২২ কিলোমিটার চওড়া। এর চারপাশের ডেমোগ্রাফিক জোনগুলো যদি অস্থির হয়ে ওঠে, তবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল (North-East) মূল ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণ আইসোলেটেড হয়ে পড়বে। সামরিক মোবিলাইজেশন অসম্ভব হয়ে পড়বে এবং পুরো নর্থ-ইস্টের লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইন চিরতরে কলাপ্স করবে।
বাংলাদেশে মাইনরিটি প্রোটেকশনের নামে যে 'জনসংখ্যা বিনিময়' বা ফোর্সড মাইগ্রেশনের প্রেসক্রিপশন দেওয়া হচ্ছে, তা ১৪০ কোটির ভারতে অ্যাপ্লাই করলে তা কোনো সাধারণ দাঙ্গা হবে না, তা হবে একটি ফুওস্কেল সিভিল ওয়ার।
ভারতের ২০ কোটিরও বেশি মুসলিম জনসংখ্যাকে যদি কোনো ধরণের ফোর্সড পুশ-আউট বা ইন্টার্নাল এক্সচেঞ্জের মুখোমুখি করা হয়, তবে কাশ্মীর থেকে কেরালা, উত্তরপ্রদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত এমন এক রিফিউজি ক্রাইসিস তৈরি হবে যা সামলানোর ক্ষমতা কোনো আধুনিক রাষ্ট্রের নেই। এর ফলে ভারত আন্তর্জাতিকভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এবং UN, OIC ও ওয়েস্টার্ন স্যাংশনের মুখে পড়ে ভারতের অর্থনীতি (FDI এবং গ্লোবাল ট্রেড) রাতারাতি ধসে যাবে।
জগন্নাথন যে টু-নেশন লজিকের কথা বলেন, তা ভারতের অভ্যন্তরে প্রয়োগ করলে ভারতের সেকুলার ফ্রেমওয়ার্ক এবং ফেডারেল স্ট্রাকচার ভেঙে পড়বে। রাজ্যগুলোর মধ্যে রিসোর্স, পানি এবং সিট শেয়ারিং নিয়ে গৃহযুদ্ধ লেগে যাবে। উত্তর বনাম দক্ষিণ ভারতের ভাষাগত ও অর্থনৈতিক বিভাজন চরম রিজিয়োনালিজমের রূপ নেবে, যার সরাসরি সুবিধা নেবে চীন ও পাকিস্তান।
এইবার আসি গুন্টার ফেলহিনগারের ‘Ex-India’ তত্ত্ব নিয়ে আলোচনায়, যে আলোচনা শুনলে ইন্ডিয়ানদের পুচ্ছে আগুন লেগে যায়।
অনেকে অস্ট্রিয়ান লবিস্ট গুন্টার ফেলহিনগারের (Günther Fehlinger) ‘Ex-India’ তত্ত্বকে কেবলই একটি টুইটার ট্রল বা সস্তা প্রচার বলে উড়িয়ে দিতে চান। কিন্তু ফেলহিনগারের থিওরিটিকে যদি আপনি একটি গভীর কাঠামোগত কোণ থেকে দেখেন, তবে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক এক স্ট্র্যাটেজি।
দ্য ফেলহিনগার ডকট্রিন (Fehlinger Doctrine):
১৯৮৯ সালে যেভাবে ইউগোস্লাভিয়া এবং সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে পশ্চিমা ধাঁচের মার্কেট ডেমোক্রেসিতে রূপান্তর করা হয়েছিল, ভারতের ক্ষেত্রেও ঠিক সেই একই মডিউল প্রস্তাব করা হয়েছে। একে বলা হচ্ছে Balkanization of India (Dissolution into 20+ Republics)।
কেন এই তত্ত্বটি বাস্তবসম্মত থ্রেট?
The "Prison of Nations" Argument: ফেলহিনগার ভারতকে একটি একক রাষ্ট্র হিসেবে দেখেন না, বরং এটিকে ব্রিটিশদের তৈরি একটি "সাম্রাজ্যবাদী কাঠামো" (Bharatiya Empire) মনে করেন। তাঁর যুক্তি হলো, সোভিয়েত ইউনিয়নের মতোই ভারতের বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির রাজ্যগুলো আসলে জোর করে ধরে রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের অতি-কেন্দ্রেীকরণ এবং হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি যদি দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনকে খর্ব করে, তবে এই রাজ্যগুলোই একদিন স্বাধীনতার দাবি তুলবে।
The Geopolitical Friction: ভারত যখনই রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনে, BRICS-এর পরিধি বাড়ায় এবং ইউক্রেন ইস্যুতে পশ্চিমা ব্লককে চ্যালেঞ্জ করে, তখনই পশ্চিমাদের 'ডিপ স্টেট' ভারতের বিকল্প নেতৃত্ব বা ভারতকে খণ্ডিত করার পথ খোঁজে। ফেলহিনগারের ম্যাপে খালিস্তান, জম্মু-কাশ্মীর এবং স্বাধীন নর্থ-ইস্টের যে রূপরেখা দেখানো হয়েছে, তা আসলে ভারতের অভ্যন্তরীণ ক্ষতস্থানগুলোতেই লবণের ছিটা দেওয়ার মতো।
অর্থনৈতিক মন্দা বা কোনো বড় আন্তর্জাতিক যুদ্ধের ধাক্কায় যদি ভারতের কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হয়, তবে এই 'Ex-India' থিওরিই কিন্তু পশ্চিমা মদদে একটি রিয়েলিস্টিক ফ্র্যাকচার লাইনে রূপ নিতে পারে।
দ্য গাজওয়াতুল হিন্দ প্যারাডক্স: ম্যাক্সিমাম ক্যাজুয়ালটি কার?
এবার আসি আজকের শেষ এবং সবচেয়ে ক্রিটিক্যাল পয়েন্টে। রিলিজিয়াস এবং জিওপলিটিক্যাল সার্কেলে প্রায়ই একটি টার্ম শোনা যায় 'গাজওয়াতুল হিন্দ' (Ghazwatul Hind)।
অনেকে একে ভারতের বিরুদ্ধে একটি এক্সটার্নাল ইনভেশন বা ইসলামিক বিজয় হিসেবে রোমান্টিসাইজ বা পলিটিসাইজ করেন। কিন্তু এর পিওর লজিক্যাল এবং মিলিটারি অ্যানালিসিস কী বলে?
প্রেডিকশন অত্যন্ত পরিষ্কার এবং নিষ্ঠুর: যদি এই ধরণের কোনো হাইব্রিড বা কনভেনশনাল যুদ্ধ এই অঞ্চলে শুরু হয়, তবে তার ম্যাক্সিমাম ক্যাজুয়ালটি (সর্বোচ্চ ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি) ঘটবে ভারতীয় মুসলিমদেরই।
এর পেছনে ৩টি অকাট্য লজিক রয়েছে:
Geographical Dispersion & Vulnerability: ভারতীয় মুসলিমরা কোনো নির্দিষ্ট একটি সীমান্তে বা আলাদা ভূখণ্ডে বাস করেন না (কাশ্মীর বাদে)। তাঁরা ভারতের প্রতিটি রাজ্যে, জেলায়, মেজরিটি জনসংখ্যার মাঝে ছড়িয়ে আছেন। কোনো এক্সটার্নাল প্রক্সি ওয়ার বা অ্যাসাইমেট্রিক কনফ্লিক্ট যদি 'গাজওয়াতুল হিন্দ'-এর নামে শুরু হয়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে ভারতের অভ্যন্তরে যে Majoritarian Backlash বা প্রতিক্রিয়া হবে, তার প্রথম ও সরাসরি টার্গেট হবেন এই ২০ কোটি অভ্যন্তরীণ মুসলিম।
The State Crackdown & Suspicion: এই ধরণের কোনো তত্ত্ব বা যুদ্ধের জিগির উঠলে রাষ্ট্রের সিকিউরিটি অ্যাপারেটাস এবং ইন্টেলিজেন্সগুলোর প্রথম কোয়ারেন্টাইন ও ক্র্যাকডাউন শুরু হবে দেশের ভেতরেই। ফলে, কোল্যাটারাল ড্যামেজ হিসেবে লাখ লাখ নিরীহ মুসলিম নাগরিক রাষ্ট্রীয় সন্দেহ, আইনি নিপীড়ন এবং ইন্টার্নাল ডিসপ্লেসমেন্টের শিকার হবেন।
Border vs. Internal Front: পাকিস্তান বা আফগানিস্তান সীমান্ত থেকে কোনো র্যাডিকাল গ্রুপ যদি কোনো উস্কানি তৈরি করে, তবে সেই বর্ডার ফাইট বা ড্রোন স্ট্রাইকের চেয়ে হাজার গুণ বেশি ক্ষতিকর হবে ভারতের ভেতরের সামাজিক ভাঙন। সীমান্তের ওপারের অ্যাক্টররা সুরক্ষিত থাকবে, কিন্তু ফ্রন্টলাইনে যুদ্ধের বলির পাঁঠা হবে ভারতের মূল ভূখণ্ডের মুসলিম সমাজ।
ফাইনাল টেকঅ্যাওয়ে (The Ultimate Takeaway)
ইতিহাস আমাদের শেখায়, ১৯৪৭-এর দেশভাগ কোনো স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি, বরং ক্ষত তৈরি করেছে। আজ যারা ভারতে বসে বাংলাদেশের ম্যাপ কাটার প্রেসক্রিপশন দিচ্ছেন, তাঁরা আসলে নিজেদের অজান্তেই ভারতের অখণ্ডতাকে এক ভয়ানক লাইবিলিটির মুখে ঠেলে দিচ্ছেন।
কারণ, The laws of geopolitics are reciprocal. আপনি অন্যের সীমানায় যে আগুন জ্বালাবেন, ডেমোগ্রাফির বাতাস ঘুরে সেই আগুন আপনার নিজের ঘরেই ফিরে আসবে।
Stay sharp, think critically.