| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চিকনিকান্দি ইউনিয়নের একটি গ্রাম কালারাজা। কালারাজা গ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাস আর ঐতিহ্যের স্মৃতি। বর্তমান বাকেরগঞ্জ, পটুয়াখালী, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, কোটালীপাড়া ও বাগেরহাটের পূর্বাংশ নিয়ে গঠিত ছিল প্রাচীন বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ রাজ্য।
বাকলা চন্দ্রদ্বীপের রাজা ছিলেন জয়দেব। জয়দেব মারা যাওয়ার পর সিংহাসনে আরোহণ করেন তার মেয়ে কমলা সুন্দরী। রানী কমলার ¯^vgxi নাম ছিল বলভদ্র বসু।
কথিত আছে, বলভদ্র বসু দেখতে কালো ছিলেন। তাই প্রজারা তাকে কালারাজা বলতো। গলাচিপার কালারাজার বিল তার নামেই হয়েছে বলে মনে করা হয়। কালারাজার বিলই বর্তমানে কালারাজা গ্রাম হিসেবে পরিচিত। তবে কালারাজা গ্রামের নামকরণ নিয়ে রয়েছে লৌকিক কাহিনী।
বাকলার রাজা জয়দেবের কোনো ছেলে ছিল না। কমলা সুন্দরী ও বিদ্যাসুন্দরী নামে তার দুই মেয়ে। রাজা জয়দেব দুই মেয়েকেই উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করেন। দুই বোনের মধ্যে কমলা ছিলেন প্রতিভাময়ী। বাবার নির্দেশে তিনি রাজ্য পরিচালনা ও অস্ত্র চালনা শিক্ষা লাভ করেন। রাজ্যের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতদের নিকট তিনি সংস্কৃত ও বাংলা ভাষায় জ্ঞান লাভ করেন। বিভিন্ন শাস্ত্রেও অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি। রাজা জয়দেব কমলা সুন্দরীকে বাবুগঞ্জ থানার দেহেরগতি গ্রামের উষাপতির পুত্র বলভদ্র বসুর সঙ্গে বিয়ে দেন।
দেহেরগতির বসু পরিবার কৌলিন্য ও শিক্ষায় অগ্রগামী ছিল। বিদ্যোৎসাহী বলভদ্র বসু বিভিন্ন শাস্ত্রে পণ্ডিত ছিলেন। যুদ্ধবিদ্যায় তিনি ছিলেন বাকলা রাজ্যের মধ্যে অতুলনীয়। বলভদ্র বসুর গুণে মুগ্ধ হয়ে রাজা জয়দেব তাকে জামাতা হিসেবে গ্রহন করেন।
বিয়ের পর রাজকুমারী কমলা দেহেরগতি চলেন যান। সেখানে কিছু দিন থাকার পর স্বামী বলভদ্র বসুসহ বাকলার রাজধানীতে ফিরে আসেন। বাবা রাজা জয়দেবের নির্দেশে তাদের জন্য নির্মিত বাড়িতে বসবাস করেন। তাদের দিনগুলো ছিল সুখকর। মৃত্যুর আগে রাজা জয়দেব কমলাকে সিংহাসনের উত্তরাধীকারী ঘোষণা করেন।
ধারণা করা হয় ১৪৯০ খ্রিস্টাব্দে রাজকুমারী কমলা বাকলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। স্বামী বলভদ্র বসু তাকে রাজ কার্যে সহায়তা করতেন। রাজ্য শাসন ও প্রজা পালনে কমলা অসামান্য কৃতিত্বের পরিচয় দেন। ওই সময় গৌড়ের সুলতান ছিলেন আলাউদ্দিন হুসেন শাহ্।
প্রজাদের পানির কষ্ট দূর করার জন্য রানী কমলা রাজ্যে অনেক বড় বড় দীঘি খনন করেন। দীঘিগুলোর মধ্যে কমলার দীঘি, বিদ্যা সুন্দরীরর দীঘি অন্যতম।
রানী কমলা নিজের নামে রাজ্যের মধ্যে বৃহত্তম দীঘি খনন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিন দরুন ১৩ কানি অর্থাৎ একশ একর ভূমি নিয়ে দীঘি খনন করার জন্য সভাসদদের নির্দেশ দেন রানী কমলা। এক সময় দীঘি কাটা শেষ হল। বিরাট উঁচু পাড়। এত বড় দীঘি বাকলা রাজ্যে কেউ কোনো দিন খনন করেননি। দীঘি খননে খরচ হল নয় লাখ টাকা। তেঁতুলিয়া নদীর পশ্চিম পাড়ে বাউফলের কালাইয়া গ্রামে খনন করা হয় রানী কমলার নামে কমলার দীঘি। তখন তেঁতুলিয়া নদী ছিল একটি খালের মতো।
দীঘি খনন করা হলো। কিন্তু সমস্যা আরেকটি। এত বড় দীঘি, কিন্তু তাতে পানি উঠছে না। রানী কমলা ব্যাকুল হয়ে পড়লেন। ব্রাহ্মণ দিয়ে পুজা করালেন। কাঙ্গাল-ভোজ দিলেন। কিছুতেই কিছু না। দীঘিতে পানি উঠছেই না। এদিকে প্রজারা রানীকে দোষারোপ করতে শুরু করলেন- দেবতা রানীর ওপর অসন্তুষ্ট। রানী অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন। কথিত আছে, এক রাতে রানী স্বপ্নে দেখেন, তিনি যদি দীঘিতে নেমে গঙ্গা দেবীকে পূজা করেন এবং এক পাড় থেকে আরেক পাড় হেঁটে যান তাহলে দীঘি পানিতে ভরে যাবে।
রানী দীঘিতে নেমে গঙ্গাদেবীকে পূজা দিয়ে এক পাড় থেকে আরেক পাড়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। ব্রাহ্মণকূল, সভাসদ ও প্রজারা একদৃষ্টিতে কমলার দিকে চেয়ে আছেন। রানী যখন দীঘির মাঝখানে তখন দীঘির চারদিক থেকে পানি আসছে। পানি দেখে রানী নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি জলমগ্ন হয়ে যাচ্ছেন দেখে সবাই তাঁকে ওপরে উঠে আসার জন্য বার বার অনুরোধ করলেন। কিন্তু রানী উঠতে পারছিলেন না। কমলা সবাইকে বললেন, তিনি গঙ্গাদেবীর সঙ্গে নিরাপদ আশ্রয়ে যাচ্ছেন। তাঁর শিশুপুত্র পরমানান্দকে যেন প্রতিদিন একবার দীঘির ঘাটে রাখা হয়। সেখানে তিনি শিশুপুত্রকে দুগ্ধপান করাবেন। এই বলে রানী ধীরে ধীরে দীঘির পানিতে ডুবে গেলেন।
রানী কমলার মর্মান্তিক মৃত্যুর সময় তাঁর স্বামী বলভদ্র বসু দেহেরগতিতে ছিলেন। শ্রাবণ মাস। অঝোরে ঝরছে বৃষ্টি। অমাবশ্যার জোয়ারে নদী-নালা, খাল-বিল পানিতে টইটুম্বুর, পশ্চিমের বাতাসে হাজারি পাল তুলে তর-তর করে এগিয়ে যাচ্ছিল বজরা। বজরার ভেতরে অনুচরসহ বসে আছেন বলভদ্র বসু। দেহেরগতি থেকে নৌকায় বাকলার রাজধানীতে যাচ্ছিলেন তিনি। সন্ধ্যা নেমে আসায় মাঝি-মাল্লারা বজরা ঘোরালেন লোকালয়ের দিকে। এরই মধ্যে অনুচরদের মধ্য থেকে কেউ এক জন বলভদ্র বসুকে জানালেন, রানী কমলা পানিতে ডুবে মারা গেছেন। এ কথা শুনে নিজেকে সংবরণ করতে পারলেন না তিনি। শোক সামলাতে না পেরে ঝাঁপ দিলেন বিলের পানিতে। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও পাওয়া গেল না তাঁকে। বিলের পানিতে ডুবে মারা যান বলভদ্র বসু।
বলভদ্র বসুর এই মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলেই প্রচার করা হয়। রাজ্যের সবাই জানলেন, স্ত্রী কমলার মৃত্যুর শোক সইতে না পেরে বলভদ্র বসু পানিতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তিনি যে জায়গায় পানিতে ঝাঁপ দেন সে জায়গাটি কালারাজার বিল নামে পরিচিতি পায়। আর কালারাজার বিলই বর্তমান কালারাজা গ্রাম।
কালারাজার আত্মহত্যার কাহিনী নিয়েও বিতর্ক আছে। কারণ কমলার মৃত্যুর পর তিনি পুত্র পরমানন্দ বসুর অভিভাবক হিসাবে অনেকদিন রাজ্য শাসন করেন বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। রানী কমলার মৃত্যু কাহিনীও বিশ্বাস যোগ্য নয়। তবে এ কথা ঠিক যে, তিনি ওই দীঘিতে ডুবেই মারা যান। ধারণা করা হয় রানী কমলা সেদিনের ব্রাহ্মণ ও জ্যোতিষীদের অন্ধ বিশ্বাসের শিকার হয়েছিলেন। তাদের পরামর্শেই সরলমতি কমলা দীঘির মাঝখানে গিয়ে পূজা দিয়েছিলেন। খুব সম্ভব একদল দুষ্ট কর্মচারী ওই সময় দীঘির এক পাড় কেটে দেয় এবং সে স্থান দিয়ে তেঁতুলিয়া নদীর জোয়ারের স্রোত দীঘিতে ঢুকে পড়ে। এসময় রানী কমলাকে উদ্ধারের জন্য কেউ কোনো চেষ্টা করেনি। কমলা পানিতে ডুবে মৃত্যু বরণ করেন।
রানী কমলার করুণ মৃত্যু কাহিনী বাকলা রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সবাই তাঁর মৃত্যুতে হতভম্ব হয়ে যায়। কমলার করুণ মৃত্যুকাহিনী নিয়ে রচিত হয় সাহিত্যকর্ম। শত বছর ধরে কমলার গান এ অঞ্চলে গীত হতো ।
ধারণা করা হয় রাজা বলভদ্র বসুরও মৃত্যু হয় পানিতে ডুবে। তার মৃত্যুর ঘটনায়ও দুষ্টু কর্মচারী ও সভাসদদের ষড়যন্ত্র ছিল। তাদের ষড়যন্ত্রেই বলভদ্র বসুকে গলাচিপার কালারাজার বিলের পানিতে ডুবিয়ে মারা হয়।
[email protected]
©somewhere in net ltd.