| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সমগ্র জীবনকে কেউ হয়ত দেখার চেষ্টা করে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, কেউ রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, কেউ আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে, কেউবা আবার শুধুমাত্র জৈবিক দৃষ্টিকোণ থেকে। ফলে মানুষের জীবন নিত্য অস্থির।
কারণ মানব জীবনকে শুধুমাত্র কোন একটা কাঠামোগত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করার সুযোগ নেই।
অধিকাংশ মানুষ নিজেকে ইজাড়া দিয়ে রাখে কোন-না-কোন মতাদর্শের কাছে। এমনকি এর ভেতরকার ধারা-উপধারার কাছেও। এতে মানুষ নিশ্চিন্ত হতে চাইলেও জীবনের খেই খুঁজে পায়না সে। কারণ এটা তার আভ্যন্তরিণ সিস্টেমের সাথে যায় না। মনুষ্য জীবন অত্যন্ত বিস্তৃত। ঠিক সৃষ্টি জগতের মতই রহস্যময়।
জীবনকে শুধু জীবনের জায়গা থেকেই দেখা উচিত। জীবনবোধের জায়গা থেকে যদি আমরা জীবনকে দেখতাম তাহলে অধিকাংশ বিষয়েই একমত হতে পারতাম। আর পৃথিবীতে শান্তিও অধরা-কল্পনার বস্তুতে পরিণত হতনা।
তত্ব দিয়ে জীবন বোঝা কিংবা জীবনের পথ খুঁজে পাওয়া আসলে সহজ কাজ নয়। কারণ তত্ব চলমান এবং নিত্য বিতর্ক উৎপাদন কারী। আর জীবন্? জীবন যা, ঠিক তাই। তার মানে এই নয়, তত্ত্বের কোন মূল্য নেই। তত্ত্বও সত্য উৎপাদনকারী।
তবে সংকটের বিষয় হল, কোন তত্ত্বই চূড়ান্ত নয়। যেখানে সত্য নিজেই আপেক্ষিক সেখানে কোন তত্ত্ব কিভাবে সত্যের প্রকৃত রুপ ধারণ করতে পারে? ফলে যারা নিজেকে কোন একটা তত্ত্বের কাছে সঁপে দেন তারা সত্যের স্বাদ আংশিক ভাবে পান । এবং এ আংশিক সুখ আস্বাদন তাকে আরো অনেকগুলো মিথ্যাকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে প্ররোচিত করে।
কারণ প্রত্যেকটা তত্ত্ব আমাদের সামনে হাজির হয় একেকটা প্যাকেজ আকারে। আমরা একটা প্যাকেজের অন্তর্গত সকল কিছুকে হয় পুরোপুরি সত্য হিসেবে কিংবা একেবারে মিথ্যা হিসেবে বিবেচনা করি। আর এখানেই ভুল করে ফেলি। বাস্তব সত্য হচ্ছে, প্রত্যেক প্যাকেজই সত্য-মিথ্যা মিশ্রিত হতে পারে। কারণ খোদ বিজ্ঞান আজকে যে বিষয়টাকে সত্য বলছে সেটা আগামীকাল যুক্তিযুক্তভাবে মিথ্যা প্রমাণিত হচ্ছে। বিজ্ঞাণীই নাকচ করে দিচ্ছেন নিজের দেয়া পূর্বের অভিমত।
‘অর্ধসত্য’ বলে একটা ব্যাপার আছে; এ ব্যাপারটা বুঝা জরুরী। একটা সত্য কেবল নির্দিষ্ট শর্তে কিংবা নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে সত্য হতে পারে। অন্য প্রেক্ষাপটে এ সত্যটা কাজে নাও লাগতে পারে। অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে জন্ম নিতে পারে ভিন্ন ভিন্ন সত্যের। সমস্যাটা হয় তখন, যখন আমরা কোন সত্যকে সকল সময়, স্থান-কাল, প্রেক্ষাপটেই সত্য বলে মনে করি; যেটা আদৌ তা নয়। আবার একই ভাবে যখন কোন মিথ্যাকে এভাবে বিবেচনা করি। এখান থেকেই যেকোন ধরণের উগ্রপন্থা কিংবা হটকারিতার জন্ম নেয়।
প্রকৃত পক্ষে একজন মানুষ যখন নিজেকে এবং নিজের বিবেককে সমস্ত তত্ত্ব, আদর্শ, মত-পথ এমনকি ধর্মের কাছ থেকেও ইজারা মুক্ত করতে পারে তখনই সে মানুষ হয়। এ জন্য প্রয়োজন ব্যাপক জানা-শোনার আগ্রহ আর মুক্ত চিন্তার সাহস। এই পৃথিবীতে জানার আগ্রহ সম্পন্ন মানুষের সংখ্যা অনেক থাকলেও মুক্ত চিন্তা করার সাহস রাখেন এমন মানুষের সংখ্যা খুবই নগন্য। এমনকি যারা ঢাক-ঢোল পিটিয়ে নিজেদের মুক্ত চিন্তার অধিকারী বলে দাবী করেন তারাও নন।
তবে এমন কোন কথাও নেই যে বিবেকের সাথে কোন মত-আদর্শ সমান্তরালে চলতে পারেনা। কোন একটা আদর্শ বা তত্ত্ব বিবেকের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতেই পারে। একারণে মানুষের জন্য সাধারণভাবে কোন ধর্ম পালন, মতাদর্শে বিশ্বাস কিংবা তত্ত্বে অনুসারী হওয়া মোটেই সমস্যাজনক নয়। কারণ একজন মানুষ যখন বিবেকেরে পথে চলে তখন সে শুধু কোন কিছুর ভাল দিকগুলোই গ্রহন করে। ঢালাওভাবে বৈধতা প্রদান কিংবা ঘৃণা করার প্রবণতা দূর হয়ে যায়। এককথায় সে আর গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসায় না। যেমন কখনো ধর্মের একটা সিদ্ধান্ত নাস্তিক বা অধার্মিক একজনের বিবেকের সাথে মিলে যেতে পারে। আবার কখনো নাস্তিকের একটা মত ধার্মিকের বিবেকের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু চিন্তা-বিবেক যদি হয় খোপবদ্ধ তাহলে এক্ষেত্রে একজন নাস্তিক ধর্মের কথাটা নাকচ করে দিবে আবার একজন ধার্মিকও নাস্তিকের কথাটা মানবেনা- এটাই স্বাভাবিক। আর এ না মানাটা কোন বাছ-বিচার ছাড়াই। উগ্র আদর্শিক শ্রেণীগুলোর ভেতর এই প্রবণতাটাই লক্ষ্য করা যায় মোটাদাগে।
আসলে পৃথিবীতে বড় বড় যেসব সংকট রয়েছে আমরা যদি বিবেকের পথে হাঁটতাম তাহলে এর সবগুলোই দূর হয়ে যেত। ছোট ছোট ব্যাপারগুলো নিয়ে মতদ্বৈততা থাকত, তবে তা কখনো মানুষকে উগ্রতা কিংবা সহিংসতার দিকে পরিচালিত করত না।
অথচ আজকের পৃথিবীর চিত্র হচ্ছে মামুলি ব্যাপার মানুষকে যুদ্ধ বিগ্রহের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, আর বড় বড় ব্যাপারগুলো থাকছে দৃষ্টির আড়ালে।
আসলে শান্তির প্রতিষ্ঠার জন্য অধিকাংশ সমস্যার সমাধান আমাদের জানা। শুধুমাত্র তাত্বিক এবং মতাদর্শ্গত অহংকার এসব সমস্যার সমাধানে আমাদের এক হতে দেয়না। ফলে মানুষ হিসেবে নিজেদেরকে পরিপূর্ণতার পরিচয় দিতে আমরা বারবার ব্যার্থ হই।পূণাঙ্গ মনুষ্যত্ব লাভের জন্য আমাদের উচিত নিজেদেরকে সকল কিছু থেকে ইজাড়া মুক্ত করা, অন্যের বিবেক দিয়ে না ভেবে নিজের বিবেক দিয়ে ভাবার চেষ্টা করা। সর্বোপরি আমাদের তত্ব ছেড়ে জীবনে নেমে আসা উচিত। শান্তির জন্য এটা একটা ভাল উপায় হতে পারে ।

©somewhere in net ltd.