| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আমাদের বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে আজ সকালেই। আর এর চেয়ে ভালো সূচনা একজন আর্জেন্টিনা সমর্থক বা ফুটবলপ্রেমী কল্পনাও করতে পারতেন না।
আমার ফুটবল-প্রেমের শুরুটা ছিল মূলত দিয়েগো ম্যারাডোনাকে ঘিরে। আর্জেন্টিনা মানেই তখন ম্যারাডোনা, আর ম্যারাডোনা মানেই ফুটবলের অলৌকিকতা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই মুগ্ধতার কেন্দ্রবিন্দু বদলেছে। ২০০৬ সালে জার্মানি বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো এক তরুণকে দেখেছিলাম, যার পায়ের জাদু দেখে মনে হয়েছিল—হয়তো নতুন কোনো গল্প শুরু হচ্ছে। সেই তরুণের নাম ছিল লিওনেল মেসি।
তারপর কেটে গেছে দুই দশক। আমরা বড় হয়েছি, পৃথিবী বদলেছে, ফুটবল বদলেছে; কিন্তু মেসির জাদু যেন বদলায়নি।
এক সময় মেসির কারণেই লা লিগার নিয়মিত দর্শক হয়ে উঠেছিলাম। বার্সেলোনার খেলা মানেই ছিল এক ধরনের শিল্পকর্ম দেখা। প্রতিপক্ষকে হারানো নয়, বরং ফুটবলকে সৌন্দর্যের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার এক অবিরাম প্রচেষ্টা। তার পাস, ড্রিবল, ভিশন এবং গোল করার ক্ষমতা ফুটবলকে সাধারণ খেলা থেকে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করেছিল।
কিন্তু সময় তো কারও জন্য থেমে থাকে না। ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পর মনে হয়েছিল, ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর গল্পটি বুঝি শেষ হয়ে এলো। ইউরোপীয় ফুটবলের প্রচণ্ড প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছেড়ে মেসি পাড়ি জমালেন আটলান্টিকের ওপারে, ইন্টার মায়ামিতে। সেখানে প্রতিযোগিতার চেয়ে উপভোগ, চাপের চেয়ে আনন্দই যেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তবুও মেসি থামেননি
বরং তিনি অপেক্ষা করছিলেন আরেকটি বিস্ময়ের জন্য।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের চেয়ে আনন্দের মুহূর্ত ফুটবলজীবনে খুব কমই এসেছে। সেই ট্রফিটি জয়ের আগে ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ফুটবলে জেতার মতো প্রায় সবকিছুই জিতে ফেলেছিলেন তিনি। কিন্তু বিশ্বকাপ ছিল সেই একমাত্র অপূর্ণতা, যা পূর্ণ না হলে গল্পটা অসম্পূর্ণ থেকে যেত।
অবশেষে কাতারে তিনি সেই অপূর্ণতাও পূরণ করলেন।
আমরা ভেবেছিলাম, এটাই শেষ।
কিন্তু কিংবদন্তিরা বোধহয় শেষ অধ্যায় লেখার অধিকার নিজেরাই রাখেন।
তাই ২০২৬ বিশ্বকাপে, ৩৯ বছর বয়সে, ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নেমে তিনি এমন কিছু করলেন যা আগে কখনো করতে পারেননি। পাঁচটি বিশ্বকাপ খেলে ১৩ গোল করেছিলেন, কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে কখনো হ্যাটট্রিক করা হয়নি। আজ আলজেরিয়ার বিপক্ষে সেই অপূর্ণতাও মুছে গেল।
মাত্র ৭৮ মিনিট মাঠে থেকে চারটি শট নিলেন, যার তিনটিই জালে জড়াল। বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাটট্রিক!
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, তাকে যখন মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হচ্ছিল, তখনও মনে হচ্ছিল—আরও কিছুক্ষণ থাকলে হয়তো আরও একটি গোল যোগ হতে পারত।
এ যেন সেই পুরনো মেসিই।
সেই নিখুঁত পাস।
সেই অবিশ্বাস্য প্রথম স্পর্শ।
সেই মারাত্মক ফিনিশিং।
সেই জাদু।
এই তিন গোলের মাধ্যমে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা মিরোস্লাভ ক্লোসার গোলসংখ্যাকেও স্পর্শ করেছেন। যে রেকর্ড একসময় অনেক দূরের মনে হতো, আজ সেটিও তার নাগালে।
অনেকে হয়তো আলজেরিয়াকে হালকাভাবে নেবেন। কিন্তু ‘ফেনেকস’ বা মরুশেয়াল নামে পরিচিত উত্তর আফ্রিকার দলটি দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক ফুটবলের একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। তাদের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয় কেবল একটি জয় নয়; এটি একটি শক্তিশালী বার্তা।
আর্জেন্টিনা এসেছে জিততে।
আর মেসি এসেছেন ইতিহাসকে আরও একটু সমৃদ্ধ করতে।
২০২২ সালে আমরা ভেবেছিলাম, তার গল্পের সমাপ্তি দেখেছি। কিন্তু ২০২৬ এসে যেন বুঝিয়ে দিল, কিছু কিংবদন্তির গল্প কখনো সত্যিকার অর্থে শেষ হয় না। তারা বারবার ফিরে আসে, নতুন বিস্ময় নিয়ে।
আজকের সকালটা তাই শুধু একটি ম্যাচের সকাল নয়।
এটি ছিল ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায়ের সূচনা।
অভিনন্দন, ম্যাজিশিয়ান।
ফুটবলকে সুন্দর করে তোলার জন্য ধন্যবাদ।
©somewhere in net ltd.