| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
মানুষটি দুটি ডিম চুরি করেছে।
কেউ বলবে—"আরে, মাত্র দুটি ডিম! এ নিয়ে এত কথা?"
হ্যাঁ, কথা আছে। কারণ সভ্যতা কখনো কোটি টাকার দুর্নীতি দিয়ে ভাঙতে শুরু করে না। তার পতন শুরু হয় দুটি ডিম, একটি মিথ্যা, একটি প্রতারণা, একটি অন্যায় সুবিধা আর একটি নষ্ট বিবেক দিয়ে।
সেদিন একজন নারী যানজটে আটকে থাকা একটি পিকআপ ভ্যান থেকে নিঃশব্দে দুটি ডিম তুলে নিলেন। হয়তো তাঁর কাছে সেই দুটি ডিমের আর্থিক মূল্য তেমন কিছুই ছিল না। কিন্তু তিনি যা নিয়ে গেলেন, তা ডিমের চেয়ে অনেক বড়।
তিনি নিয়ে গেলেন একজন পরিশ্রমী মানুষের প্রাপ্যের একটি অংশ।
আর যদি আশপাশে কোনো শিশু সেই দৃশ্য দেখে থাকে, তবে সে আরও বড় একটি শিক্ষা পেল—চুরি সব সময় রাতের অন্ধকারে হয় না; দিনের আলোতেও হয়। সুন্দর পোশাক পরা মানুষও অন্যের জিনিস নিজের করে নিতে পারে। ধরা না পড়লে অন্যায়ও যেন স্বাভাবিক।
শিশুরা বই পড়ে যতটা শেখে, তার চেয়ে অনেক বেশি শেখে বড়দের আচরণ দেখে।
তারা আমাদের কথার চেয়ে আমাদের কাজকে বেশি বিশ্বাস করে।
আপনি যদি তাকে প্রতিদিন সততার গল্প শোনান, কিন্তু সুযোগ পেলে অন্যের অধিকার কেড়ে নেন, তাহলে আপনার বক্তৃতা নয়—আপনার হাতই তার শিক্ষক হয়ে যায়।
সেদিন চুরি হয়তো ছিল মাত্র দুটি ডিমের।
কিন্তু হারিয়ে যেতে পারে একটি শিশুর সরল বিশ্বাস—যে বড়রা সৎ, মানুষ অন্যের কষ্টের মূল্য বোঝে, সমাজে ন্যায় বলে এখনও কিছু আছে।
আমরা প্রায়ই প্রশ্ন করি—বাংলাদেশে দুর্নীতি এত গভীরে গেল কীভাবে?
উত্তরটি হয়তো খুব জটিল নয়।
দুর্নীতি কোনো সরকারি অফিসে জন্ম নেয় না।
ঘুষের ফাইল, টেন্ডারের কারসাজি, ব্যাংক লুট কিংবা অর্থপাচার—এসবের বীজ অনেক আগেই বপন হয়ে যায়। যখন একটি শিশু দেখে, অন্যের প্রাপ্য থেকে একটু কম দিয়ে দেওয়া যায়; ওজনে সামান্য কম দিলেও চলে; গৃহকর্মীর প্রাপ্য আটকে রাখলেও খুব সমস্যা নেই; কর ফাঁকি দেওয়াকে বুদ্ধিমত্তা বলা হয়; সুযোগ পেলে একটু "ম্যানেজ" করাই যেন জীবনের নিয়ম।
সেখান থেকেই জন্ম নেয় একটি বিপজ্জনক দর্শন—
"সুযোগ পেলে সবাই করে।"
এই একটি বাক্যই একটি জাতির নৈতিক পতনের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘোষণা।
আমরা বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়েছি, কিন্তু বিবেকের বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে পারিনি।
আমরা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়িয়েছি, কিন্তু তাকওয়া ও আমানতদারিকে সামাজিক শক্তিতে পরিণত করতে পারিনি।
আমরা সন্তানদের জিপিএ শিখিয়েছি, কিন্তু সব সময় শেখাতে পারিনি—অন্যের একটি টাকাও আমার নয়।
আমরা ইতিহাস নিয়ে যুদ্ধ করি, রাজনীতি নিয়ে বিভক্ত হই, মতাদর্শ নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক করি। অথচ আমাদের পায়ের নিচে যে চরিত্রের মাটি প্রতিদিন একটু একটু করে সরে যাচ্ছে, সেদিকে তাকানোর সময় নেই।
একটি জাতিকে ধ্বংস করতে সব সময় যুদ্ধ লাগে না।
একটি জাতিকে ধ্বংস করতে যথেষ্ট—যদি মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে, "ছোটখাটো অন্যায় কোনো অন্যায় নয়।"
না, এটি দুটি ডিমের গল্প নয়।
এটি এমন এক সমাজের গল্প, যেখানে অনেক মানুষ এখনও মনে করে—ধরা না পড়লে চুরি, চুরি নয়।
একদিন এই "মাত্র দুটি ডিম" বড় হয়ে দাঁড়ায় ঘুষে, প্রতারণায়, ক্ষমতার অপব্যবহারে, ব্যাংক লুটে, কর ফাঁকিতে, ভেজাল খাদ্যে, নকল ওষুধে এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়া অবিশ্বাসে।
কারণ দুর্নীতি আচমকা জন্মায় না।
দুর্নীতি বড় হয়।
আর তার প্রথম বিদ্যালয় কোনো দপ্তর নয়—পরিবার, সমাজ এবং প্রতিদিনের ছোট ছোট আপস।
তাই প্রশ্নটি দুটি ডিমের নয়।
প্রশ্নটি হলো—আমরা আমাদের সন্তানদের কী উত্তরাধিকার দিয়ে যাচ্ছি?
সম্পদ, না সততা?
চাতুর্য, না চরিত্র?
কারণ অর্থ হারালে মানুষ আবার উপার্জন করতে পারে।
ক্ষমতা হারালে আবার ফিরে পেতে পারে।
কিন্তু একটি জাতি যদি তার চরিত্র হারায়, তবে হারিয়ে যায় তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস।
©somewhere in net ltd.