নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

জুয়েল তাজিম

জুয়েল তাজিম

অলস হবেন, তো হতাশা পাবেন। শুরু করুন,শেষ হবেই। সামনে এগোতে থাকুন, পথ কমবেই।

জুয়েল তাজিম › বিস্তারিত পোস্টঃ

মাঠহীন শৈশব, বন্দি প্রজন্ম

১৯ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:০২

শিশুরা খেলবে কোথায়—এই প্রশ্নটি এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন পরিবারের ব্যক্তিগত উদ্বেগ নয়; এটি আমাদের নগরজীবনের একটি গভীর সংকট। একসময় বিকেল হলেই শিশুরা ছুটে যেত মাঠে। পাড়ার গলি, খোলা মাঠ, গাছপালা, পার্ক—এসবই ছিল তাদের শৈশবের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু সেই দৃশ্য এখন ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।

শহর বড় হচ্ছে, ভবন বাড়ছে, জনসংখ্যা বাড়ছে—কিন্তু শিশুদের জন্য খেলার মাঠ কমছে। যেসব মাঠ একসময় এলাকার শিশু-কিশোরদের প্রাণকেন্দ্র ছিল, সেগুলোর অনেকগুলো আজ দখল, অব্যবস্থাপনা, নির্মাণকাজ কিংবা নানা ধরনের বাণিজ্যিক ব্যবহারের কারণে মানুষের নাগালের বাইরে। পার্ক ও উন্মুক্ত স্থানও একইভাবে সংকুচিত হচ্ছে।

ফলে আজকের শিশুরা বড় হচ্ছে কংক্রিটের দেয়ালের মধ্যে। মাঠের বদলে তাদের সঙ্গী মোবাইল ফোন, ট্যাব ও কম্পিউটার। দৌড়ঝাঁপের বদলে দীর্ঘ সময় বসে থাকা, প্রকৃতির সংস্পর্শের বদলে ভার্চুয়াল জগৎ—এটাই হয়ে উঠছে তাদের শৈশবের বাস্তবতা।

কেউ কেউ তাই তীব্র ব্যঙ্গ করে বলেন, শিশুরা যেন ‘ফার্মের মুরগি’ হয়ে যাচ্ছে। কথাটি কঠিন, কিন্তু এর পেছনে যে বাস্তবতা রয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা, মুক্ত পরিবেশ, প্রকৃতির সংস্পর্শ এবং সামাজিক মেলামেশা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ আমরা তাদের সেই সুযোগগুলো একে একে কেড়ে নিচ্ছি।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এর দায় কার?

অভিভাবকদের অনেক সময় বলা হয়, সন্তানকে বাইরে খেলতে দিন, মোবাইল থেকে দূরে রাখুন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সন্তানকে খেলতে পাঠানোর মতো নিরাপদ মাঠ কোথায়? হাঁটার মতো ফুটপাত কোথায়? যাওয়ার মতো পার্ক কোথায়? চারপাশে যদি শুধু ভবন, যানবাহন, ধুলাবালি, দখল আর দূষণ থাকে, তাহলে অভিভাবকরা সন্তানকে কোথায় পাঠাবেন?

এখানেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

নগর পরিকল্পনা কি শুধু রাস্তা, ভবন, মার্কেট আর আবাসিক প্রকল্প তৈরির নাম? একটি শহর কি শুধু মানুষের বসবাসের জন্য, নাকি মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্যও? যদি শহরে শিশুদের খেলার মাঠ না থাকে, প্রবীণদের হাঁটার পার্ক না থাকে, মানুষের শ্বাস নেওয়ার মতো সবুজ এলাকা না থাকে—তাহলে সেই উন্নয়ন আসলে কার জন্য?

দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, পরিকল্পনার সময় শিশুদের প্রয়োজনকে আমরা খুব কমই গুরুত্ব দিই। একটি নতুন আবাসিক এলাকা তৈরি হয়, কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ থাকে না। একটি পুরোনো মাঠের চারপাশে একের পর এক স্থাপনা গড়ে ওঠে। একটি পার্কের রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। কোথাও দখলদারিত্ব, কোথাও অব্যবস্থাপনা, কোথাও আবার উন্নয়নের নামে উন্মুক্ত স্থান সংকুচিত করা হয়।

কর্তৃপক্ষ তখন নানা নিয়ম, নীতিমালা ও পরিকল্পনার কথা বলে। কিন্তু বাস্তবে প্রশ্ন হলো—এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে কোথায়?

একটি শহরের প্রতিটি শিশুর জন্য মাঠ নিশ্চিত করা সম্ভব না হলেও, প্রতিটি এলাকার শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার সুযোগ নিশ্চিত করা অবশ্যই সম্ভব। এর জন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর পরিকল্পনা এবং জবাবদিহি। কিন্তু আমাদের দেশে অনেক সময় দেখা যায়, মাঠ রক্ষার চেয়ে মাঠ দখল ঠেকানো কঠিন। পার্ক রক্ষণাবেক্ষণের চেয়ে নতুন স্থাপনা নির্মাণ সহজ। পরিবেশ রক্ষার চেয়ে পরিবেশ ধ্বংসের অনুমোদন পাওয়া সহজ।

শিশুরা শুধু মাঠই হারাচ্ছে না; তারা হারাচ্ছে নিরাপদ বাতাস, বিশুদ্ধ পানি এবং সুস্থ পরিবেশও। সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা, দূষিত বাতাস, ভেজাল খাবার, দূষিত পানি—সব মিলিয়ে একটি শিশুর বেড়ে ওঠার পরিবেশ ক্রমেই অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বড় সংকট—স্বাস্থ্যসেবা। সাধারণ মানুষ অসুস্থ হলে চিকিৎসা নিতে গিয়ে অনেক সময় বিভ্রান্তি, অতিরিক্ত ব্যয় এবং নানা ধরনের অনিয়মের মুখোমুখি হন। অথচ নাগরিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যেসব প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা রাখার কথা, তাদের জবাবদিহি অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্নবিদ্ধ।

রাষ্ট্রের কাজ শুধু নাগরিকদের কর নেওয়া নয়; নাগরিকদের জন্য নিরাপদ ও সুস্থ জীবনযাপনের পরিবেশ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

একটি শিশুর হাতে মোবাইল তুলে দিয়ে তাকে আধুনিক বানানো যায় না। বরং তার হাতে বই, মাঠে খেলার সুযোগ, গাছের ছায়া, নির্মল বাতাস এবং নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ তুলে দিতে হয়। কারণ শিশুর বিকাশ শুধু পরীক্ষার ফলাফল বা প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে না; তার শরীর, মন, কল্পনা, সামাজিকতা এবং মানবিক বোধ—সবকিছুর বিকাশ দরকার।

আজকের শিশুরা যদি মাঠ না পায়, তারা হয়তো মোবাইলের স্ক্রিনে খেলবে। যদি প্রকৃতি না পায়, তারা ভার্চুয়াল জগতে প্রকৃতি খুঁজবে। যদি নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ না পায়, তারা একাকীত্বে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে।

তখন দায় শুধু শিশুর নয়, পরিবারেরও নয়—দায় আমাদের পুরো ব্যবস্থার।

শিশুর জন্য মাঠ কোনো বিলাসিতা নয়। পার্ক কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়। বিশুদ্ধ বাতাস, নিরাপদ পানি ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা কোনো দয়া নয়—এগুলো নাগরিকের মৌলিক অধিকার।

কর্তৃপক্ষকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—শহর কি শুধু ভবন ও রাস্তার জন্য, নাকি মানুষের জন্যও?

কারণ আমরা যদি আজ শিশুদের মাঠ কেড়ে নিই, আগামীকাল তারা আমাদের প্রশ্ন করবে—

“তোমরা আমাদের জন্য এত ভবন বানালে, কিন্তু খেলবার জন্য এক টুকরো মাঠও রাখলে না কেন?”

আর সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়তো তখন আর এত সহজ হবে না।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.