নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

জুয়েল তাজিম

জুয়েল তাজিম

অলস হবেন, তো হতাশা পাবেন। শুরু করুন,শেষ হবেই। সামনে এগোতে থাকুন, পথ কমবেই।

জুয়েল তাজিম › বিস্তারিত পোস্টঃ

ক্ষমতা আসলে কত দিনের?

২৩ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:৩৬

একটি ১২ ঘণ্টার প্যারোল, একটি শেষ বিদায় এবং ক্ষমতার অনিত্যতার নির্মম শিক্ষা

“পুলিশ ভাই, আমাকে তো এখনই নিয়ে যাবেন, আমি দুই মিনিট ফ্যামিলির সঙ্গে কথা বলি?”

কারাগার থেকে বের হওয়ার সময় ডা. দীপু মনির এমন আকুতি-ভরা কথার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকের মনেই হয়তো একই প্রশ্ন জেগেছে—মানুষ রাজনীতি করে কেন? আর ক্ষমতা হাতে এলে মানুষ এমন কিছু করে বসে কেন, যার প্রতিক্রিয়া একদিন ঘুরে নিজের জীবনেই এসে দাঁড়াতে পারে?

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দৃশ্যগুলো আরও বেশি ভাবিয়ে তুলেছে। সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেত্রী ডা. দীপু মনি তাঁর প্রয়াত স্বামী, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজকে শেষ বিদায় জানাতে মাত্র ১২ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে কারাগার থেকে বের হওয়ার অনুমতি পেয়েছিলেন। ২০ আগস্ট ২০২৬ সকাল ৬টার পর তাকে মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে করে কঠোর পুলিশি নিরাপত্তায় ঢাকায় নেওয়া হয়। তিনি স্বামীর মরদেহের কাছে যান, জানাজা ও দাফনে অংশ নেন এবং নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই বিকেল ৫টা ৫৮ মিনিটে আবার কারাগারে ফিরে যান।

দৃশ্যটি রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে দাঁড়িয়ে দেখলে এর মধ্যে অন্য এক ধরনের শিক্ষা খুঁজে পাওয়া যায়।

ক্ষমতা আসলে কত দিনের?

যে মানুষটি একসময় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় ছিলেন, যার সামনে অসংখ্য মানুষ অপেক্ষা করত, যার একটি নির্দেশ প্রশাসনের বহু স্তরে কার্যকর হতো—সময় বদলালে সেই মানুষটির নিজেরই বের হওয়ার জন্য অনুমতির প্রয়োজন হয়।

আর জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে—স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার পর—প্রিয় মানুষের পাশে থাকার সুযোগটুকুও নির্ভর করে যায় একটি প্রশাসনিক অনুমতির ওপর।

এখানেই হয়তো ক্ষমতার সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

ক্ষমতা স্থায়ী নয়। পদ স্থায়ী নয়। চেয়ার স্থায়ী নয়।

আজ যে ক্ষমতা আপনার হাতে, কাল সেটি অন্য কারও হাতে। আজ আপনার একটি নির্দেশে মানুষের জীবন সহজ বা কঠিন হয়ে যেতে পারে; কাল আপনার নিজের জীবনও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে, যেখানে অন্যের একটি সিদ্ধান্ত আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ইসলামের ইতিহাসে ক্ষমতার উত্থান-পতনের অসংখ্য শিক্ষা রয়েছে।

ফেরাউন ক্ষমতার এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে সে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে বলেছিল—

“আমি তোমাদের সর্বোচ্চ রব।”

— সূরা আন-নাযিআত, ৭৯:২৪

কিন্তু পরের আয়াতেই আল্লাহ তাঁর পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন এবং ফেরাউনের ঘটনাকে সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

অর্থাৎ ক্ষমতা যখন মানুষকে বিনয়ী না করে আত্মম্ভরী করে তোলে, তখন সেই ক্ষমতাই তার পতনের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

কারুনের গল্পও একই শিক্ষা দেয়—তবে সেখানে ক্ষমতার জায়গায় ছিল বিপুল সম্পদ। সে এমন সম্পদের অধিকারী হয়েছিল যে মানুষ তার ঐশ্বর্য দেখে বিস্মিত হতো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাকে ও তার প্রাসাদকে মাটির নিচে ধসিয়ে দেন। কুরআন স্পষ্টভাবে বলে—

“আমি তাকে ও তার গৃহকে ভূমির মধ্যে ধসিয়ে দিলাম।”

— সূরা আল-কাসাস, ২৮:৮১

অন্যদিকে নবী সুলাইমান (আ.)-এর জীবনে আমরা ক্ষমতার সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যবহার দেখতে পাই।

আল্লাহ তাঁকে বিশাল রাজত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর হাতে ছিল অসাধারণ ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব। কিন্তু সেই ক্ষমতা তাঁকে অহংকারী করেনি। বরং তিনি আল্লাহর অনুগ্রহকে নিজের কৃতিত্ব না ভেবে পরীক্ষা হিসেবে দেখেছিলেন—

“এটা আমার রবের অনুগ্রহ, তিনি আমাকে পরীক্ষা করছেন—আমি কৃতজ্ঞ হই, নাকি অকৃতজ্ঞ।”

— সূরা আন-নামল, ২৭:৪০

এখানেই ক্ষমতার প্রকৃত শিক্ষা।

ক্ষমতা শুধু পুরস্কার নয়—ক্ষমতা একটি পরীক্ষা।

আপনি ক্ষমতা পেয়েছেন—এটা দেখার বিষয় নয় যে আপনি কতজনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। বরং দেখার বিষয় হলো, ক্ষমতা হাতে পেয়েও আপনি কতটা ন্যায়বান থাকতে পারেন।

ক্ষমতা পেয়ে কতজনের ওপর প্রতিশোধ নিলেন—সেটি বড় কথা নয়।

বরং প্রশ্ন হলো, প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আপনি কতজনকে ক্ষমা করলেন।

ক্ষমতা পেয়ে কতজনকে ভয় দেখালেন—সেটি ইতিহাসের গৌরব নয়।

বরং কতজন দুর্বল মানুষের ভয় দূর করতে পেরেছেন—সেটিই আপনার মানবিকতার পরিচয়।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

“যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।”

— সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৮৮

এই একটি হাদিসই ক্ষমতার দর্শনকে অনেকটা পরিষ্কার করে দেয়।

কারণ মানুষ সাধারণত ক্ষমতা পেলে নিজের উচ্চতা দেখাতে চায়। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো—বিনয় মানুষকে ছোট করে না; বরং আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা বাড়ায়।

আজ আপনি ক্ষমতাবান।

কাল হয়তো অন্য কেউ।

আজ আপনার সামনে শত মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।

কাল হয়তো আপনার পাশে দাঁড়ানোর মতো দুজন মানুষও খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে।

আজ আপনার একটি ফোনে কারও দরজা খুলে যায়।

কাল হয়তো আপনার নিজের জন্য একটি দরজা খোলার অপেক্ষায় থাকতে হতে পারে।

আজ আপনি কারও কান্নাকে তুচ্ছ মনে করতে পারেন।

কাল হয়তো নিজের কান্না নিয়েই একা হয়ে যেতে পারেন।

তাই ক্ষমতা পেলে প্রতিশোধ নয়—ন্যায়বিচার করুন।

ক্ষমতা পেলে অহংকার নয়—বিনয়ী হোন।

ক্ষমতা পেলে দুর্বলকে ভয় দেখাবেন না—সম্ভব হলে তার ভয় দূর করুন।

কারণ কুরআন আমাদের সবচেয়ে মৌলিক সত্যটি স্মরণ করিয়ে দেয়—

“হে আল্লাহ! রাজত্বের মালিক! আপনি যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজত্ব কেড়ে নেন; আপনি যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন এবং যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন।”

— সূরা আলে ইমরান, ৩:২৬

এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে ক্ষমতার অহংকার আসলে কতটা ক্ষণস্থায়ী, তা বুঝতে খুব বেশি ইতিহাস পড়তে হয় না।

দীপু মনির এই সাম্প্রতিক ঘটনাকে তাই শুধু রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষের চোখে দেখলে হয়তো আমরা দৃশ্যটির গভীর শিক্ষা হারিয়ে ফেলব।

একজন মানুষ—যিনি একসময় রাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্রের খুব কাছাকাছি ছিলেন—আজ জীবনের এক ব্যক্তিগত শোকের মুহূর্তেও রাষ্ট্রীয় বিধি ও কারাগারের সময়সূচির মধ্যে আবদ্ধ।

এটি কারও জন্য আনন্দের বিষয় হওয়ার কথা নয়।

বরং এটি আমাদের সবার জন্য একটি গভীর মানবিক ও নৈতিক উপলব্ধির মুহূর্ত।

রাজনীতি থাকবে। ক্ষমতার পালাবদল থাকবে। মতের পার্থক্য থাকবে। বিচার ও ইতিহাসের নিজস্ব প্রক্রিয়াও চলবে।

কিন্তু তার ঊর্ধ্বে একটি সত্য থেকে যায়—

মানুষের জীবন খুব ছোট।

চেয়ার চিরস্থায়ী নয়।

পদবি চিরস্থায়ী নয়।

সম্পদ চিরস্থায়ী নয়।

প্রভাব-প্রতিপত্তি চিরস্থায়ী নয়।

মানুষের হাততালিও চিরস্থায়ী নয়।

একদিন সবাইকে সবকিছু ছেড়ে চলে যেতে হবে।

সেদিন প্রশ্ন হবে না—আপনার পদ কত বড় ছিল।

প্রশ্ন হবে না—আপনার হাতে কত ক্ষমতা ছিল।

প্রশ্ন হবে না—কতজন মানুষ আপনাকে ভয় পেত।

বরং প্রশ্ন হবে—

ক্ষমতা হাতে পেয়েও আপনি কতটা মানুষ থাকতে পেরেছিলেন?

আপনি কতটা ন্যায় করেছেন?

কতটা ক্ষমা করেছেন?

কতজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন?

আর সবচেয়ে বড় কথা—

ক্ষমতা আপনাকে আল্লাহর কাছাকাছি নিয়েছে, নাকি অহংকারের আরও কাছে নিয়ে গেছে?

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়—ফেরাউনের ক্ষমতা টেকেনি, কারুনের সম্পদ টেকেনি। আর কুরআন আমাদের সুলাইমান (আ.)-এর মতো ক্ষমতাবান একজন মানুষের উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছে, ক্ষমতা থাকলেও কৃতজ্ঞ ও বিনয়ী থাকা সম্ভব।

তাই ক্ষমতা পাওয়ার আনন্দের চেয়ে ক্ষমতা হারানোর সম্ভাবনাটি মনে রাখা বেশি জরুরি।

কারণ ক্ষমতা মানুষের হাতে সাময়িক আমানত; মালিকানা আল্লাহর।

আল্লাহ আমাদের প্রত্যেককে ক্ষমতা, সামর্থ্য ও অবস্থান পাওয়ার পর অহংকারী না হয়ে ন্যায়বান, বিনয়ী ও মানবিক হওয়ার তাওফিক দিন।

আমিন।

মন্তব্য ১ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ২৩ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:৩১

শাহিন-৯৯ বলেছেন:


খুবই চমৎকার একটি বিষয় তুলে ধরেছেন, ক্ষমতা হলো খুবই ক্ষণস্থায়ী একটি ম্যাজিক প্রদীপ, ইচ্ছেমত অনেক কিছু করা যায় কিন্তু যারা মানুষের কল্যানে সেই ম্যাজিক প্রদীপ কাজে লাগায় দিনশেষে সে মহান হয় আর বাকিদের অবস্থা আপনার লেখাতেই আছে।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.