নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

জুয়েল তাজিম

জুয়েল তাজিম

অলস হবেন, তো হতাশা পাবেন। শুরু করুন,শেষ হবেই। সামনে এগোতে থাকুন, পথ কমবেই।

জুয়েল তাজিম › বিস্তারিত পোস্টঃ

হারিয়ে যাওয়া সুন্নাহ—যে আলো আমরা ধীরে ধীরে ভুলে যাচ্ছি

০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৩

কিছু জিনিস হারিয়ে গেলে আমরা টের পাই। মানুষ হারালে শূন্যতা অনুভব করি, প্রিয় কোনো বস্তু হারালে খুঁজে বেড়াই, কোনো স্মৃতি হারিয়ে গেলে আফসোস করি। কিন্তু এমন কিছু হারিয়ে যায়, যার শূন্যতা আমরা অনেক সময় বুঝতেই পারি না।

আমাদের জীবন থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কিছু সুন্নাহ।

সুন্নাহ—শুধু কিছু আনুষ্ঠানিক আমলের নাম নয়। এটি একজন মুমিনের জীবনযাপনের সৌন্দর্য, আচরণের পরিমিতি, ইবাদতের পদ্ধতি এবং প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজের মধ্যে নবী ﷺ-এর আদর্শকে ধারণ করার নাম। অথচ সময়ের পরিবর্তন, অজ্ঞতা, গাফলতি এবং সামাজিক অভ্যাসের চাপে এমন অনেক সুন্নাহ আজ আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে।

কখনো মনে হয়, সুন্নাহ মানেই বুঝি শুধু বড় বড় কিছু আমল। অথচ নবী ﷺ-এর জীবন ছিল ছোট ছোট সুন্দর অভ্যাসে পরিপূর্ণ। ঘুম থেকে ওঠা থেকে ঘুমাতে যাওয়া, খাবার খাওয়া থেকে পানি পান করা, ঘরে প্রবেশ থেকে বাইরে বের হওয়া, শিশুদের সঙ্গে আচরণ থেকে প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব—জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল তাঁর ﷺ আদর্শ।

আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, এসবের অনেক কিছুই করতে বড় কোনো আয়োজন লাগে না। লাগে শুধু একটু সচেতনতা, একটু ভালোবাসা এবং রাসূল ﷺ-এর জীবনকে নিজের জীবনে ফিরিয়ে আনার আন্তরিক ইচ্ছা।

রাসূলুল্লাহ ﷺ হারিয়ে যাওয়া সুন্নাহকে পুনরুজ্জীবিত করার ব্যাপারে বিশেষ উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি তাঁর এমন কোনো সুন্নাহকে জীবিত করবে, যা তাঁর পরে মানুষ পরিত্যাগ করেছে, সে তা অনুসরণকারী ব্যক্তিদের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে—অথচ তাদের সওয়াবের কোনো ঘাটতি হবে না। —তিরমিযী, হাদীস: ২৬৭৭।

তাহলে প্রশ্ন হলো—আমরা কি জানি, আমাদের জীবন থেকে কোন কোন সুন্নাহ হারিয়ে যাচ্ছে?

হয়তো আমরা জানি না যে, মাঝে মাঝে খালি পায়ে হাঁটাও সাহাবায়ে কেরামের জীবনে ছিল। রাসূল ﷺ তিন আঙুল দিয়ে খাবার গ্রহণ করতেন। ঘুম থেকে উঠে মুখের ঘুমের চিহ্ন হাত দিয়ে মুছে নিতেন। গুনাহ হয়ে গেলে অজু করে দুই রাকাত সালাত আদায় করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন। রাতে খাবারের পাত্র ঢেকে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। মিসওয়াকের প্রতি তিনি এত গুরুত্ব দিয়েছেন যে, উম্মতের কষ্টের আশঙ্কা না থাকলে প্রত্যেক সালাতের সময় মিসওয়াকের নির্দেশ দিতেন।

আজ আমরা অনেক সময় দরজায় কড়া নাড়ি, ফোন করি, আবার উত্তর না পেলেও বিরক্ত হই। অথচ ইসলামের সুন্দর শিষ্টাচার হলো—তিনবার অনুমতি চাওয়া; অনুমতি না পেলে ফিরে যাওয়া।

আমরা হয়তো বড়দের সালাম দিতে ভুল করি না, কিন্তু ছোটদের সালাম দেওয়ার বিষয়টি ভুলে যাই। অথচ রাসূল ﷺ শিশুদের পাশ দিয়ে গেলেও তাদের সালাম দিতেন। পরিচিত মানুষ তো বটেই, অপরিচিত মানুষকেও সালাম দেওয়ার শিক্ষা তিনি দিয়েছেন।

একটু ভেবে দেখুন—একটি সালাম কতটুকুই বা কঠিন? অথচ সেই ছোট্ট সালামই একজন মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা তৈরি করতে পারে, অপরিচিত দুজন মানুষের মধ্যে পরিচয়ের সেতু গড়ে দিতে পারে।

পানি পান করার ক্ষেত্রেও ছিল নববী শিষ্টাচার। বসে এবং তিন শ্বাসে পানি পান করা, পানির পাত্রে নিশ্বাস না ফেলা—এসবও তাঁর ﷺ শিক্ষা।

ঘুমানোর আগেও একজন মুমিনের জীবন থেমে যায় না। অজু করে শোয়া, ডান কাতে শোয়া, বিছানা ঝেড়ে নেওয়া, সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ে শরীরে হাত বুলিয়ে নেওয়া—এসব আমল রাতের নিস্তব্ধতাকেও ইবাদতের সৌন্দর্যে ভরিয়ে দিতে পারে।

আমরা হয়তো আনন্দের সংবাদ পেলে বন্ধুদের ফোন করি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিই, সবাইকে জানাই। কিন্তু আল্লাহর দেওয়া সেই আনন্দের জন্য সিজদায় পড়ে যাওয়ার অভ্যাসটি কতজনের আছে? নবী ﷺ আনন্দদায়ক কোনো সংবাদ পেলে আল্লাহর জন্য সিজদা করতেন।

খাবারের ক্ষেত্রেও তাঁর ﷺ শিক্ষা ছিল অপচয়বিরোধী ও কৃতজ্ঞতাপূর্ণ। খাবারের পাত্র ও আঙুল পরিষ্কার করে খাওয়া, পড়ে যাওয়া লোকমা পরিষ্কার করে খেয়ে নেওয়া এবং পেট ভরে না খেয়ে খাবার, পানীয় ও শ্বাসের জন্য পরিমিত জায়গা রাখা—এসবের মধ্যেও রয়েছে এক ধরনের জীবনদর্শন।
আর অবসর?

আজকের অবসর মানেই অনেকের কাছে মোবাইলের পর্দা, স্ক্রলিং, ভিডিও আর অনর্থক ব্যস্ততা। অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেই প্রতিদিন সত্তরের অধিকবার আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার ও তাওবা করতেন।

আমরা কি কখনো নিজের অবসর সময়টাকে এভাবে হিসাব করেছি?

মসজিদে প্রবেশ করে বসে পড়ার আগে দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ, অজুর পর দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল অজু, ফরজ সালাতের পর আয়াতুল কুরসী, রাতের তাহাজ্জুদ, দিনের চাশতের সালাত—এসব আমল আমাদের জীবনের কতটা জায়গা দখল করে আছে?
কখনো আমরা ভাবি, ভালো মুসলমান হওয়ার জন্য হয়তো অনেক বড় কিছু করতে হবে। অথচ নববী জীবন আমাদের শেখায়—বড় পরিবর্তন অনেক সময় ছোট ছোট আমল থেকেই শুরু হয়।

রাস্তা থেকে একটি কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া সদকা। হাসিমুখে কারও সঙ্গে কথা বলাও সদকা। শিশুদের সালাম দেওয়া ভালোবাসার শিক্ষা। পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দেওয়া ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা। পরামর্শ করে কাজ করা সামাজিক সৌন্দর্য। বিক্রিত পণ্য ফেরত নেওয়া মানুষের প্রতি উদারতা। আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসা ঈমানের শক্ত বন্ধন।
অর্থাৎ সুন্নাহ শুধু জায়নামাজের ওপর সীমাবদ্ধ নয়; সুন্নাহ আমাদের আচরণেও আছে, কথায় আছে, খাবারে আছে, ঘুমে আছে, পরিবারে আছে, ব্যবসায় আছে, সমাজে আছে।

বৃষ্টির পানি শরীরে লাগানো থেকে শুরু করে সফর শেষে মসজিদে গিয়ে দুই রাকাত সালাত আদায় করা, জুমার দিনে বেশি বেশি দরূদ পাঠ করা, প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখা, মুহাররমে নফল রোজা রাখা—নবী ﷺ-এর জীবন আমাদের এমন অসংখ্য আমলের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেগুলো আমরা হয়তো জানি, কিন্তু নিয়মিত জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারিনি।
সবচেয়ে বড় কথা, সুন্নাহকে জীবিত করার অর্থ শুধু নিজে আমল করা নয়; ভালোবাসা দিয়ে অন্যের কাছেও তা পৌঁছে দেওয়া।

একজন বাবা যদি সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই সালামের অভ্যাস শেখান, একজন মা যদি সন্তানকে ঘুমানোর আগে সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করতে শেখান, একজন শিক্ষক যদি ছাত্রদের সঙ্গে নববী কোমলতায় আচরণ করেন, একজন ব্যবসায়ী যদি ক্রেতার অধিকার রক্ষা করেন, একজন সাধারণ মানুষ যদি রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক কিছু সরিয়ে দেন—তাহলে একটি একটি করে সুন্নাহ আবার সমাজে ফিরে আসতে পারে।

হয়তো একদিন কেউ আমাদের দেখে বলবে—“এই মানুষটি আমাকে সালাম দিলেন কেন?”

আমরা বলব—“কারণ আমার নবী ﷺ পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দিতে শিখিয়েছেন।”

হয়তো কোনো শিশু আমাদের দেখে অবাক হবে—“আপনি আমাকে সালাম দিলেন?”

আমরা হাসিমুখে বলব—“কারণ রাসূল ﷺ শিশুদেরও সালাম দিতেন।”

এভাবেই তো সুন্নাহ বেঁচে থাকে।

বইয়ের পাতায় নয়, মানুষের জীবনে।

কথার মধ্যে নয়, আচরণের মধ্যে।

শুধু আলোচনায় নয়, বাস্তব আমলে।

হারিয়ে যাওয়া সুন্নাহ আসলে কেবল কিছু ভুলে যাওয়া আমলের তালিকা নয়। এগুলো আমাদের প্রিয় নবী ﷺ-এর জীবনের ছড়িয়ে থাকা কিছু আলো। সময়ের ধুলোয় সেই আলো হয়তো কিছুটা ম্লান হয়েছে, কিন্তু নিভে যায়নি।

প্রয়োজন শুধু আবার তা তুলে নেওয়ার।

আজ থেকেই হয়তো সবগুলো সম্ভব হবে না। কিন্তু একটি দিয়ে শুরু করা যায়।

আজ কাউকে সালাম দিয়ে শুরু হোক।

কাল মিসওয়াক দিয়ে।

কোনো এক রাতে অজু করে ডান কাতে শুয়ে।

কোনো এক সকালে দুই রাকাত চাশতের সালাত দিয়ে।

কোনো এক আনন্দের মুহূর্তে সিজদায়ে শুকর দিয়ে।

কোনো এক ভুলের পর দুই রাকাত সালাতুত তাওবা দিয়ে।

ছোট মনে হওয়া এই আমলগুলোই হয়তো একদিন আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

কারণ, যে মানুষ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর একটি হারিয়ে যাওয়া সুন্নাহকে নিজের জীবনে ফিরিয়ে আনে, সে শুধু একটি আমল করছে না—সে নববী আদর্শের একটি ছোট্ট প্রদীপ আবার জ্বালিয়ে দিচ্ছে।

আর একটি প্রদীপ থেকে আরেকটি প্রদীপ জ্বলে।

এভাবেই একদিন হয়তো আমাদের ঘরে, পরিবারে, সমাজে—আবার সুন্নাহর আলো ফিরে আসবে।

আসুন, হারিয়ে যাওয়া সুন্নাহ খুঁজি।
শুধু পড়ার জন্য নয়—জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য।

আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর সুন্নাহকে ভালোবাসা, জানা, মানা এবং অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.