| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
একজন তরুণ রাত জাগে।
টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকে বই, নোট আর অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর। ঘরের বাতিটা নিভে যায় গভীর রাতে, কিন্তু তার চোখের ঘুম আসে না। কারণ তার সামনে শুধু একটা চাকরির পরীক্ষা নয়—সামনে থাকে একটি স্বপ্ন, একটি পরিবারের প্রত্যাশা, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষা।
বাবা হয়তো চুপচাপ জিজ্ঞেস করেন,
“কেমন হচ্ছে পড়াশোনা?”
মা হয়তো নামাজ শেষে সন্তানের জন্য দোয়া করেন।
আর সেই তরুণ মনে মনে ভাবে—
“একবার শুধু চাকরিটা হয়ে যাক। তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে।”
সে জানে, প্রতিযোগিতা কঠিন। একটি পদের বিপরীতে হাজার হাজার প্রার্থী। তবু সে লড়াই করে। কারণ তার বিশ্বাস—যোগ্যতা থাকলে একদিন না একদিন রাষ্ট্র তাকে মূল্যায়ন করবে।
কিন্তু সেই বিশ্বাসের সামনে যদি একদিন প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়—
“শুধু রিটেনটা পাশ কর, ভাইবা আমরা দেখবো।”
তখন?
তখন তার হাতে থাকা বইগুলো হয়তো আর আগের মতো ভারী মনে হবে না।
ভারী হয়ে উঠবে বুকটা।
মেধার সঙ্গে লড়াই, নাকি পরিচয়ের সঙ্গে?
সরকারি চাকরি এই দেশের লাখো তরুণের কাছে শুধু একটি চাকরি নয়। এটি সামাজিক নিরাপত্তার প্রতীক, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন, নিজের জীবনের অনিশ্চয়তা থেকে বেরিয়ে আসার একটি দরজা।
এই দরজাটুকু যেন মেধার জন্য খোলা থাকে—এটাই তো স্বাভাবিক প্রত্যাশা।
কিন্তু সরকারি কর্মচারী নিয়োগে গ্রেড ১১–২০-এর ক্ষেত্রে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাব সেই জায়গাতেই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় গ্রেড ১১–১২-তে লিখিত পরীক্ষার ১০০ নম্বরের বিপরীতে ভাইভায় ৫০ নম্বর, গ্রেড ১৩–১৬-তে ৪০ এবং গ্রেড ১৭–২০-তে ২৫ নম্বর রাখার কথা বলা হচ্ছে।
সংখ্যাগুলো হয়তো কাগজে শুধু কয়েকটি সংখ্যা।
কিন্তু একজন চাকরিপ্রার্থীর জীবনে এগুলো অনেক বড় কিছু।
কারণ লিখিত পরীক্ষার খাতা একজন পরীক্ষার্থীর মেধার তুলনামূলকভাবে একটি নিরপেক্ষ ছবি তুলে ধরে। একই প্রশ্ন, একই সময়, একই নিয়ম।
কিন্তু ভাইভা?
সেখানে একজন মানুষ বসে আছেন আর অন্য পাশে একটি বোর্ড।
কয়েক মিনিটের কথোপকথন।
কয়েকটি প্রশ্ন।
কিছু পর্যবেক্ষণ।
তারপর নম্বর।
এখানেই তৈরি হয় subjective assessment-এর জায়গা।
আর ভাইভার নম্বর যত বাড়ে, বোর্ডের হাতে থাকা discretionary power-ও তত বাড়ে।
সেখানেই আমাদের ভয়।
আমরা ভাইভার বিরুদ্ধে নই
না, আমরা ভাইভা বাতিলের কথা বলছি না।
একজন প্রার্থী শুধু লিখতে পারেন কি না, তা দিয়ে তো রাষ্ট্রের কর্মচারী হওয়ার যোগ্যতা সম্পূর্ণ বিচার করা যায় না। তার আচরণ, যোগাযোগের সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা, পরিস্থিতি মোকাবিলার দক্ষতা—এসবও গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—
ভাইভা কি এমন শক্তিশালী হবে, যাতে লিখিত পরীক্ষায় অর্জিত মেধাক্রমকে কয়েক মিনিটের subjective assessment দিয়ে উল্টে দেওয়া যায়?
যদি একজন তরুণ লিখিত পরীক্ষায় অসাধারণ করে এবং আরেকজন তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকে, অথচ ভাইভার নম্বরের ব্যবধানে শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে যায় প্রথমজন—তাহলে আমরা কোন মেধাকে পুরস্কৃত করলাম?
পরিশ্রমকে?
নাকি বোর্ডের পছন্দকে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুব জরুরি।
‘মামা-খালু’ যেন আবার যোগ্যতার সংজ্ঞা না হয়ে যায়
এই দেশের তরুণেরা ‘মামা-খালু’র গল্প শুনে বড় হয়েছে।
তদবিরের গল্প শুনেছে।
লবিংয়ের গল্প শুনেছে।
পরিচিত মানুষের ফোনে চাকরি হওয়ার গল্প শুনেছে।
কখনো কখনো টাকার বিনিময়ে সুযোগ চলে যাওয়ার গল্পও শুনেছে।
এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্যই তো এতদিন দাবি ছিল—নিয়োগব্যবস্থাকে আরও মেধাভিত্তিক করা হোক, লিখিত পরীক্ষার গুরুত্ব বাড়ানো হোক, ভাইভার প্রভাব কমানো হোক।
অথচ এখন যদি উল্টো পথে হাঁটা হয়, তাহলে প্রশ্ন জাগে—
আমরা কি আবার সেই পুরোনো অন্ধকারের দিকে ফিরে যাচ্ছি?
একজন মেধাবী তরুণ যদি মনে করেন, লিখিত পরীক্ষায় ভালো করেও শেষ পর্যন্ত তার ভাগ্য নির্ধারণ করবে কারও ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, তাহলে তার রাষ্ট্রের ওপর আস্থা কোথায় থাকবে?
তারপরও কি তাকে আমরা বলব—
“পরিশ্রম করো, মেধা দিয়ে এগিয়ে যাও”?
সরকারি চাকরি কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি হয়তো এখানেই।
সরকারি চাকরি কোনো রাজনৈতিক দলের লোক নিয়োগের জায়গা নয়।
সরকার বদলায়।
রাজনৈতিক ক্ষমতা বদলায়।
কিন্তু রাষ্ট্র থাকে।
আর সরকারি কর্মচারীরা সেই রাষ্ট্রের হয়ে জনগণের সেবা করেন।
তাই একজন মানুষকে যখন সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন তাকে কোনো দলের কর্মী হিসেবে নয়—রাষ্ট্রের কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
তার সামনে দল নয়, থাকবে রাষ্ট্র।
তার কাছে পরিচয় নয়, থাকবে দায়িত্ব।
তার কাছে রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, থাকবে জনগণের অধিকার।
বিশেষ করে গ্রেড ১১–২০-এর অনেক কর্মচারী সরাসরি জনগণের সঙ্গে কাজ করেন। মানুষের দৈনন্দিন সরকারি সেবার বড় একটি অংশ তাদের হাত দিয়েই বাস্তবায়িত হয়।
তারা যদি নিরপেক্ষ হন, রাষ্ট্রের সেবা মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
আর তারা যদি দলীয় বিবেচনায় পরিচালিত হন, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেই সাধারণ মানুষ—যার কোনো ‘মামা-খালু’ নেই, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই, কোনো ক্ষমতাবান মানুষের ফোন নম্বর নেই।
ফ্যামিলি কার্ড থাকুক, কৃষক কার্ড থাকুক—কিন্তু রাষ্ট্র যেন কারও ব্যক্তিগত কার্ড না হয়
রাষ্ট্র জনগণের জন্য যত ভালো উদ্যোগই নিক না কেন, তার বাস্তব সফলতা নির্ভর করে মাঠপর্যায়ের মানুষের ওপর।
ফ্যামিলি কার্ড হবে।
কৃষক কার্ড হবে।
বিভিন্ন সামাজিক সেবা পৌঁছে যাবে মানুষের ঘরে।
কিন্তু সেবাদানকারী মানুষটি যদি নিরপেক্ষ না হন, তাহলে কাগজে যত সুন্দর পরিকল্পনাই লেখা থাকুক, বাস্তবে তার চেহারা বদলে যেতে পারে।
তখন প্রশ্ন উঠবে—
কার্ডটি কে পেল?
যে সত্যিই যোগ্য ছিল?
নাকি যে পরিচিত ছিল?
সেখানেই একটি নিয়োগব্যবস্থার ভুল সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে একটি বড় সামাজিক সমস্যার জন্ম দিতে পারে।
তাই ভাইভা থাকুক, কিন্তু ‘ভাইবা আমরা দেখবো’ সংস্কৃতি নয়
আমাদের আপত্তি ভাইভায় নয়।
আমাদের আপত্তি ভাইভার অস্বচ্ছ ক্ষমতায়।
ভাইভা থাকুক।
কিন্তু নির্দিষ্ট Rubrics থাকুক।
কোন যোগ্যতার জন্য কত নম্বর—তা নির্ধারিত থাকুক।
Subjective assessment থাকুক, কিন্তু নির্দিষ্ট criteria-এর মধ্যে।
Interview board থাকুক, কিন্তু unchecked discretion নয়।
মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা থাকুক।
জবাবদিহি থাকুক।
কারণ রাষ্ট্রের একটি চাকরি কারও ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নয়।
এটি একজন নাগরিকের অধিকার ও যোগ্যতার প্রশ্ন।
শেষ কথা
একজন তরুণ যখন সরকারি চাকরির পরীক্ষার হলে বসে, তার সঙ্গে শুধু একটি কলম থাকে না।
সঙ্গে থাকে তার বাবা-মায়ের স্বপ্ন।
থাকে পরিবারের আর্থিক অনিশ্চয়তা থেকে বেরিয়ে আসার আকাঙ্ক্ষা।
থাকে নিজের জীবন বদলে দেওয়ার প্রত্যাশা।
থাকে অসংখ্য রাতের ঘুমহীন পরিশ্রম।
থাকে একটা বিশ্বাস—
“আমি যদি যোগ্য হই, তাহলে রাষ্ট্র আমাকে মূল্যায়ন করবে।”
এই বিশ্বাসটা ভেঙে দেবেন না।
কারণ একটি নিয়োগব্যবস্থা শুধু কর্মচারী নিয়োগ করে না; এটি তরুণ প্রজন্মের কাছে রাষ্ট্রের চরিত্রও প্রকাশ করে।
রাষ্ট্র যদি বলে—মেধা দেখাও, যোগ্যতা প্রমাণ করো, আমরা তোমাকে মূল্যায়ন করব, তাহলে তরুণেরা রাষ্ট্রকে বিশ্বাস করবে।
আর যদি বার্তা হয়—
“শুধু রিটেনটা পাশ কর, ভাইবা আমরা দেখবো”—
তাহলে একদিন হয়তো বই বন্ধ করে অনেক তরুণ প্রশ্ন করবে—
“তাহলে এতদিন আমি পড়লাম কেন?”
আমরা সেই প্রশ্নের জন্ম দিতে চাই না।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে চাকরি পেতে কারও মামা-খালুর প্রয়োজন হবে না, রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রয়োজন হবে না, তদবিরের প্রয়োজন হবে না।
প্রয়োজন হবে শুধু—
মেধা।
যোগ্যতা।
সততা।
আর একটি স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা।
কারণ সরকারি চাকরি কোনো দলের লোক নিয়োগের জায়গা নয়।
এটি রাষ্ট্রের জন্য মানুষ বেছে নেওয়ার জায়গা।
আর রাষ্ট্রের মানুষ বেছে নেওয়ার দায়িত্বে সবচেয়ে বড় শব্দটি হওয়া উচিত—
মেধা। 
©somewhere in net ltd.
১|
০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৩৮
সৈয়দ কুতুব বলেছেন: সরকারের বেশিদিন ক্ষমতায় থাকার ইচ্ছা নেই ।