| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
একজন মানুষ অসুস্থ বোধ করছেন। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে কাতর কণ্ঠে বলছেন, একটু বসতে দেবেন? শরীরটা ভালো লাগছে না। আশপাশে মানুষ আছে, আসন আছে, চলমান ট্রেন আছে—শুধু তাঁর জন্য একটু জায়গা নেই। কয়েক মিনিট পর মানুষটি মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবন রক্ষা করা গেল না।
ঘটনাটি কেবল একজন মানুষের মৃত্যুর বেদনা নয়; এটি আমাদের সামাজিক বিবেকের সামনে রাখা এক নির্মম প্রশ্ন। আমরা কি সত্যিই মানুষকে ভালোবাসি, নাকি কেবল মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলতে ভালোবাসি?
একটি সমাজের মানবিকতা বোঝার জন্য তার সংবিধান পড়তে হয় না, রাজনৈতিক বক্তৃতা শুনতে হয় না, কিংবা দেয়ালে লেখা নীতিবাক্যও দেখতে হয় না। দেখতে হয়—একজন অসহায় মানুষ বিপদে পড়লে তার পাশে কে দাঁড়ায়।
আমরা প্রায় সবাই ইনসাফের কথা বলি। অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করি, বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই, রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচার দাবি করি। সরকারের দায়িত্বহীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলি, প্রশাসনের ব্যর্থতা নিয়ে সমালোচনা করি। এসবই প্রয়োজনীয়, এসবই নাগরিক অধিকার।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের কাছে যে ইনসাফ দাবি করি, নিজের আচরণে সেই ইনসাফের চর্চা কতটুকু করি?
একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষকে আসন ছেড়ে দেওয়া কোনো দয়া নয়—এটি তাঁর প্রতি সম্মান। অসুস্থ কাউকে একটু জায়গা করে দেওয়া কোনো মহানুভবতা নয়—এটি ন্যূনতম মানবিক দায়িত্ব। বিপদে পড়া একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো কোনো অতিরিক্ত সামাজিক কাজ নয়—এটি মানুষ হিসেবে আমাদের মৌলিক দায়বদ্ধতা।
অথচ আমাদের বাস্তবতা বড় অদ্ভুত।
আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দীর্ঘ পোস্ট লিখি, কিন্তু পাশের মানুষটির কষ্ট চোখে পড়লেও অনেক সময় নির্বিকার থাকি। রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি চাই, অথচ নিজের দায়িত্বের জায়গায় নীরব থাকি। অন্যের বিবেক নিয়ে প্রশ্ন তুলি, নিজের বিবেককে প্রশ্ন করার প্রয়োজন অনুভব করি না।
আমাদের কাছে ইনসাফ যেন একটি রাজনৈতিক অবস্থান, একটি পরিচয় কিংবা একটি সুবিধাজনক স্লোগান। অথচ ইনসাফের প্রথম পাঠ শুরু হয় নিজের ঘর থেকে, নিজের আচরণ থেকে, অপরিচিত একজন মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে।
সরকারের দায়িত্ব আছে—নিরাপদ গণপরিবহন নিশ্চিত করা, জরুরি চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া, স্টেশনে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা রাখা এবং অসুস্থ যাত্রীদের দ্রুত উদ্ধার করার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এসব দায়িত্ব কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ঘটনার প্রকৃত বিবরণ ও পরিস্থিতি যথাযথভাবে যাচাই করে সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার ঘাটতিও চিহ্নিত করা জরুরি।
কিন্তু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা কি আমাদের মানবিক দায়িত্বকে বাতিল করে দেয়?
একজন মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়লে অ্যাম্বুলেন্স ডাকার আগে কি তাঁর পাশে দাঁড়াতে কোনো সরকারি নির্দেশনার প্রয়োজন হয়? কাউকে বসার জায়গা করে দিতে কি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক? একজন মানুষ মাটিতে পড়ে গেলে তাঁকে সাহায্য করার জন্য কি আগে দায়িত্ব বণ্টনের বিজ্ঞপ্তি জারি করতে হবে?
না। কিছু দায়িত্ব আছে, যেগুলো মানুষ হিসেবে আমাদের বিবেক থেকেই জন্ম নেওয়ার কথা।
অবশ্যই, একটি আসন ছেড়ে দিলেই একজন অসুস্থ মানুষের জীবন নিশ্চিতভাবে বেঁচে যেত—এমন দাবি করা যায় না। অসুস্থতার প্রকৃতি, চিকিৎসা এবং জরুরি সহায়তা পৌঁছানোর সময়—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাঁর অনুরোধে সাড়া দেওয়া, তাঁকে বসতে সাহায্য করা, অসুস্থতা বুঝে দ্রুত সহায়তা ডাকা—এসবই ছিল মানবিক উদ্যোগের সুযোগ।
এখানেই আমাদের ব্যর্থতা নিয়ে ভাবতে হবে।
আমরা এমন এক সমাজ গড়তে চাই, যেখানে সরকার থাকবে জবাবদিহির আওতায়, প্রতিষ্ঠান থাকবে আইনের অধীনে এবং প্রতিটি নাগরিক পাবে ন্যায়বিচার। কিন্তু সেই সমাজের নাগরিক হিসেবে আমাদের নিজেদেরও তো জবাবদিহি থাকতে হবে। কারণ রাষ্ট্রের চরিত্র শুধু শাসকের আচরণে প্রকাশ পায় না; নাগরিকের আচরণেও তার প্রতিফলন ঘটে।
সরকার ছাড়া আমরা সবাই ইনসাফের লোক—কথাটি শুনতে যতটা সহজ, বাস্তবে ততটাই কঠিন।
কারণ অন্যের অন্যায় শনাক্ত করা সহজ, নিজের অন্যায় স্বীকার করা কঠিন। রাষ্ট্রের ব্যর্থতার তালিকা তৈরি করা সহজ, নিজের দায়িত্বের হিসাব দেওয়া কঠিন। ন্যায়বিচারের দাবি তোলা সহজ, নিজের সুবিধা ছেড়ে অন্যের অধিকার নিশ্চিত করা কঠিন।
ইনসাফের প্রকৃত পরীক্ষা সেখানেই।
আপনি বাসে বা মেট্রোরেলে বসে আছেন—একজন প্রবীণ মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। আপনি নিজের আসনটি ছেড়ে দিলেন। হয়তো কেউ আপনাকে দেখল না, কেউ প্রশংসা করল না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপনার ছবি ভাইরাল হলো না। তবু কাজটি সঠিক।
আপনার সামনে একজন মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আপনি নিজের গন্তব্যের তাড়া ভুলে তাঁর পাশে দাঁড়ালেন, সাহায্য চাইলেন, জরুরি সেবায় যোগাযোগ করলেন। হয়তো কেউ আপনার নাম জানল না। তবু আপনার দায়িত্ব পালন হলো।
ন্যায়বিচারের জন্য সব সময় মঞ্চ লাগে না। মানবিকতার জন্য ক্যামেরা লাগে না। বিবেকের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য পরিচিতি লাগে না।
লাগে শুধু এই উপলব্ধি—অন্যের জীবন, কষ্ট ও অধিকারও আমার নিজের জীবনের মতোই মূল্যবান।
মৃত্যুর পর একজন মানুষের জন্য শোক প্রকাশ করা আমাদের স্বাভাবিক মানবিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু সেই শোক যদি জীবিত মানুষের প্রতি আমাদের আচরণ পরিবর্তন না করে, তাহলে শোকের সামাজিক তাৎপর্য কোথায়?
আজ একজন প্রবীণ মানুষ একটু বসার জায়গা না পেয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন—আগামীকাল সেই মানুষটি আমার বাবা হতে পারেন, আপনার মা হতে পারেন, কিংবা আমরা নিজেরাই হতে পারি। বয়স, অসুস্থতা ও অসহায়ত্ব কোনো নির্দিষ্ট পরিবারের জন্য সংরক্ষিত নয়। জীবন আমাদের সবাইকে কখনো না কখনো অন্যের সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল করে তুলতে পারে।
তাই অন্যের অসহায়ত্বকে নিজের ভবিষ্যতের আয়নায় একবার দেখে নেওয়া প্রয়োজন।
আমরা সরকারের কাছে ইনসাফ চাইব, অবশ্যই চাইব। প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার দাবিও তুলব। কিন্তু একই সঙ্গে নিজেদেরও প্রশ্ন করব—আমার নাগরিক দায়িত্ব কতটুকু পালন করছি? আমার পাশে কেউ বিপদে পড়লে আমি কী করি? আমার সামান্য সুবিধা ত্যাগ করে অন্যের সামান্য স্বস্তি নিশ্চিত করতে আমি প্রস্তুত কি না?
কারণ ইনসাফ কেবল আদালতের রায় নয়, রাষ্ট্রের নীতিও নয়; ইনসাফ মানুষের প্রতিদিনের আচরণেও বেঁচে থাকে।
সরকারের দায়িত্ব সরকার পালন করুক, প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব প্রতিষ্ঠান পালন করুক—কিন্তু মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্বটুকু যেন আমরা অন্য কারও ঘাড়ে চাপিয়ে না দিই।
আমরা সবাই ইনসাফের পক্ষে—এই পরিচয় তখনই সত্য হবে, যখন অন্যের অধিকার রক্ষায় আমাদের নিজের স্বার্থ কিছুটা হলেও পিছিয়ে দিতে পারব।
অন্যথায় আমরা ইনসাফের লোক নই; আমরা কেবল ইনসাফের বক্তা।
আর বক্তৃতায় একটি সমাজের বিবেকের পরিচয় পাওয়া গেলেও, তার প্রকৃত মানবিকতার পরিচয় পাওয়া যায় সংকটের মুহূর্তে—যখন একজন মানুষ সাহায্য চান, আর বাকিরা সিদ্ধান্ত নেন, তাঁরা মানুষ হয়ে উঠবেন, নাকি কেবল যাত্রী হয়েই থাকবেন।
২|
২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:২৪
রাজীব নুর বলেছেন: এযুগের মানুষের মধ্যে মায়াদয়া নেই।
এযুগের মানুষ গুলো খুব খারাপ।
©somewhere in net ltd.
১|
২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৪৩
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: কয়েক মিনিট পর মানুষটি মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন।
শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবন রক্ষা করা গেল না।
..................................................................................................
এই ঘটনা প্রমান করে আমরা এখন, অসভ্য ও বর্বর জাতিতে পরিণত হয়েছি ।
আমাদের বিবেকের চেতনা আজ শুণ্যর কোঠায় , .....
তাই তো বৃদ্ধ বাবা/ মাকে বউয়ের কারনে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাই,
মা'র কাছ থেকে জমির দলিল করে নিয়ে রাস্তায় ফেলে আসি
ঝাঁকজমক করে অনুষ্ঠান করি, অথচ অনাহারী প্রতিবেশীর খোঁজ খবর রাখিনা
.....................................................................................................
এই জাতির কপালে আরও শাস্তি অপেক্ষা করছে । এখন এধরনের সহমর্মিতা
ভিন জাতি পালন করে আর আমাদের দেখে উপহাস করে !
যে আমরা কতটা অভাগা জাতি !!!