| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
খায়রুল আহসান
অবসরে আছি। কিছু কিছু লেখালেখির মাধ্যমে অবসর জীবনটাকে উপভোগ করার চেষ্টা করছি। কিছু সমাজকল্যানমূলক কর্মকান্ডেও জড়িত আছি। মাঝে মাঝে এদিক সেদিকে ভ্রমণেও বের হই। জীবনে কারো বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করিনি, এখন তো করার প্রশ্নই আসে না। জীবন যা দিয়েছে, তার জন্য স্রষ্টার কাছে ভক্তিভরে কৃতজ্ঞতা জানাই। যা কিছু চেয়েও পাইনি, এখন বুঝি, তা পাবার কথা ছিলনা। তাই না পাওয়ার কোন বেদনা নেই।
খৃষ্টপূর্ব পাঁচ শতকের গ্রীক দার্শনিক হেরাক্লিটাস বলেছিলেন, "No man ever steps in the same river twice"। অর্থাৎ নদীর জল বহমান, সেটা দৃশ্যমান হলেও বা না হলেও। একটা মানুষ নদীর জলে পা ডুবিয়ে উঠে সাথে সাথে পুনরায় পা ডুবাতে চাইলে কখনোই আর আগের জলে পা ডোবাতে পারবে না। ততক্ষণে সে জল হয় স্রোতে ভেসে সম্মুখে অনেক দূর চলে গেছে, না হয় স্রোত না থাকলেও, অন্য জলের সাথে মিশে তার স্বতন্ত্র পরিচিতি হারিয়েছে। কত সহজবোধ্য একটা কথা, কিন্তু এর ভেতরেও কত গভীর একটা দর্শন লুকিয়ে আছে! আমরা কি কখনো এটা নিয়ে ভেবেছি, ভাবলেও কতক্ষণ? যে জল একবার আমাদের শরীর স্পর্শ করে গেছে, সে জলের অস্তিত্ব চিরতরে বিলীন হয়ে গেছে। আমরা কস্মিনকালেও আর তার ছোঁয়া পাবো না, দেখাও পাবো না। যে মুহূর্তটা একবার গত হয়েছে (প্রতিটি মুহূর্ত অবশ্য মাত্র একবারই গত হয়), সেই মুহূর্তটার পুনরায় দেখা পাওয়া আর কখনোই সম্ভব নয়।
হেরাক্লিটাস এর এই উক্তিটার সাথে আমি দ্বাদশ শ্রেণিতে থাকাকালীন পরিচিত হয়েছিলাম। ছাত্রাবস্থায় ঢাকা থেকে লালমনিরহাট যাওয়া আসা করতাম বেশিরভাগ সময় রেলপথে, মাঝে মাঝে সড়ক পথেও। যে পথেই যাই, যমুনা নদী অতিক্রম করতে হতো। সড়ক পথে গেলে আরিচা-নগরবাড়ি ফেরিতে, রেলপথে গেলে বাহাদুরাবাদঘাট-তিস্তামুখঘাট রুটে, স্টীমারে। নদী পারাপারের সময় আমি সবসময় ফেরি অথবা স্টীমারের রেলিং ধরে আশেপাশের দৃশ্য দেখতাম। নদীর বুক চিড়ে কচুরিপানার (মাঝে মাঝে মাঝখানে বা এক কোণায় বসা একটি পাখির বাসাসহ) ভেসে যাওয়ার, মাথার ওপরে ওড়াাউড়ি করা পাখির, নদীর তীর ধরে ধীর পায়ে গুণ টেনে হেঁটে যাওয়া ক্লান্ত মাঝির মুখাবয়বের, চরের মাঝখানে বসতি গড়া গেরস্থ দম্পতির উলঙ্গ শিশুর তপ্ত বালুর উপর দৌড়াদৌড়ি করার ইত্যাকার দৃশ্য দেখে মনে মনে ভাবতাম, এদের সাথে কি জীবনে আর কখনো দেখা হবে? উত্তর পেতাম হেরাক্লিটাসের সেই কথাটার মধ্যেই। না, কখনোই আর নয়।
নদীর জলের মত সময়ও আপন গতিতে নিরন্তর বহমান। চন্দ্র, সূর্য ও তারকাদের উদয় ও অস্তমিত হওয়া না দেখলে হয়তো আমরা সময়ের গতি সম্পর্কে, দিনরাত্রির আগমন ও নির্গমন সম্পর্কে সঠিক ও সুনির্দিষ্ট সময়টা মনে ধরে রাখতে পারতাম না। যাপিত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই চলমান ও অপসৃয়মান। ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডলের সকল কিছুই সর্বদা গতিশীল; চলমান, বহমান অথবা ঘূর্ণায়মান। বস্তুর বহমান গতি আমরা দেখতে পেলেও পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে আমরা ঘূর্ণন গতিটি টের পাই না। অথচ পৃথিবীর সাথে সাথে আমরাও কিন্তু নিত্য ঘুরছি, যেমন এই গানটিতে বলা হয়েছেঃ
“দুরন্ত ঘূর্ণির এই লেগেছে পাক,
এই দুনিয়া ঘোরে বন বন বন বন
ছন্দে ছন্দে কত রঙ বদলায়”!
সময় আমাদের প্রত্যেকের জীবনে মহামূল্যবান একটি সম্পদ। প্রতিটি মুহূর্তের একেকটি স্মৃতি থাকে, যদিও প্রতিটি স্মৃতি মনের ফ্রেমে বেঁধে রাখা যায় না। তবে জীবন-কম্পিউটারের হার্ড ড্রাইভে প্রতিটি স্মৃতিই জমা থাকে। যেসব দৃশ্য মস্তিষ্কে ইতিবাচক অনুভূতি সৃষ্টি করে, মনের ফ্রেমে সেসব দৃশ্যের স্থায়ীত্ব অনেক বেশি হয়ে থাকে। সাধারণতঃ শৈশবের স্মৃতিগুলোই সেসব স্থান বেশি দখল করে থাকে। যেমন আমি এখনও একজন হ্যাংলা পাতলা দইওয়ালার কণ্ঠস্বর শুনতে পাই, যিনি বেলা এগারটার দিকে আমাদের বাসার পাশ দিয়ে যাবার সময় “দই নেবেন, দই” বলে ডাক দিয়ে যেতেন। রাত দশটার দিকে এক হটপেটিসওয়ালা একটি হটকেইসে করে আনা হটপেটিস বিক্রির জন্য ডাক দিয়ে যেতেন। এছাড়া কটকটিওয়ালা, লেইস ফিতাওয়ালার ডাক তো ছিলই। আর মনে নেতিবাচক অনুভূতি সৃষ্টি করে, এমন দৃশ্যও মানুষের মনে থাকে। যেমন একটি দৃশ্য আমি এখনও দেখি যেখানে আমাদের বাসার উপর দিয়ে একটি চিল চিঁ চিঁ শব্দ করে উড়তে উড়তে হঠাৎএকটি নিষ্পাপ মুরগির ছানা ছোঁ মেরে মুখে নিয়ে উড়ে যাচ্ছে আর মা মুরগিটি তার দিকে অসহায়ভাবে তাকিয়ে আছে। মুরগি একটি অতি নিরীহ গৃহপালিত পক্ষীজাত প্রাণী। অন্য সময়ে হাত তুলে একটু ‘হুশ’ শব্দ করলেই সেটা দৌড়ে পালাবার পথ পায় না। কিন্তু যখন সে মা হয়ে ডজনখানেক বাচ্চা নিয়ে ঘুরাঘুরি করে, তখন একটা কাক, চিল বা এমনকি শত্রুভাবাপন্ন কোন মানুষ বা অন্য কোন প্রাণী দেখলেও সে দৌড়ে তাকে আক্রমণ করতে যায়। এটাই বাচ্চাদের প্রতি তার মাতৃত্বসুলভ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
মায়েদের নিয়ে আমার দুটি ব্যক্তিগত দৃশ্যের স্মৃতি আমার মনে চির অমলিন থাকবে বলে বিশ্বাস করি। আমার মা ৯২ বছর বয়সে মারা গিয়েছেন। মৃত্যুর কয়েক বছর আগে তিনি ডিমেনশিয়া রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং ধীরে ধীরে তার নিকট অতীতের সকল স্মৃতি ভুলে যাচ্ছিলেন, যদিও সুদূর অতীতের সকল স্মৃতিই স্মরণ করতে পারতেন। শেষের দিকে তিনি নিজ হাতে খেতে পারতেন না। অনেক সময় শিশুদের মত খাবার মুখে নিয়ে চুপ করে বসে থাকতেন। একদিন দুপুরে আমি তাকে খাইয়ে দিলাম। খাবার মুখে নিয়ে চুপ করে বসে থাকলে আমি তাকে মুখে বললাম চাবিয়ে খেতে, আর ইঙ্গিতে দেখিয়ে দিলাম কিভাবে চাবাতে হবে। উনি সেটা দেখে আস্তে আস্তে চাবাতে শুরু করলেন। খাওয়া শেষে তার মুখ মুছে দিতে দিতে তার শীর্ণ ডান হাতের পাতাটা ধরলাম। তিনিও আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে আমার মুখের দিকে অনেকক্ষণ অপলক তাকিয়ে রইলেন । কী দেখছিলেন তিনি আমার মুখে, এবং তা দেখে কি কিছু ভাবছিলেন? জানিনা।
অপর দৃশ্যটি আমার বড় ছেলের জন্মের সময়ের ঘটনা। জন্মের পরপরই শিশু যে স্বাভাবিক কান্না কাঁদে, সে কান্নাটা করতে সে বেশ সময় নিচ্ছিল। তাই অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে নার্সদের দৌড়াদৌড়ি পড়ে গিয়েছিল। একজন অভিজ্ঞ নার্স এসে ওর পায়ের পাতাদুটো একসাথে করে উল্টো করে ধরে পিঠে মৃদু চাপড় দিতেই সে জোরে কান্না জুড়ে দিল। ওর কান্নায় সবার মুখে স্বস্তির আভা ফুটে উঠলো। পরে নার্স ওকে ক্লীন করে ইনজেকশন ইত্যাদি দিয়ে নরম তোয়ালে পেচিয়ে ওর মায়ের প্রসারিত ডান বাহুর উপর শুইয়ে দিল। ওর চোখে তখনও কান্নার জল করছিল টলমল। ও কিছুক্ষণ ইতি উতি তাকিয়ে মাথা ঘুরিয়ে ওর মায়ের মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকলো। ওর এই টলটল চোখে তাকিয়ে থাকা দেখে দীর্ঘ লেবার যুদ্ধে ক্লান্ত শ্রান্ত ওর মায়ের মলিন মুখে এক স্বর্গীয় হাসি ফুটে উঠলো। কি অনুপম সে দৃশ্য্! মাত্র কয়েক মিনিটের শিশু, জন্মের পর এক ঘণ্টাও যার পার হয়নি, কী দেখছিলো সে তার মায়ের মুখের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে? মাকে কষ্ট দেয়ার জন্য সে কি তাকে স্যরি বলছিল? কে তাকে বলে দিয়েছিল যে তার মায়ের মুখ দেখতে হলে তাকে উল্টো দিকে মাথা ঘুরিয়ে তাকাতে হবে? জানিনা!
প্রায় ছাব্বিশ বছর আগে কর্মোপলক্ষে একসময় সিলেটে ছিলাম। তখন ট্রেনেই যাতায়াত হতো। ট্রেন যখন শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া ও ভানুগাছ বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে যেত, তখনকার অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্যাবলী আজও মনের ফ্রেমে গেঁথে আছে। ট্রেন মাঝে মাঝে হঠাৎ করেই সিগন্যাল না পাওয়া অথবা অন্য কোন কারণে আউট স্টেশনে থেমে যেত। তখন ট্রেনের জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে লজ্জাবতী গাছ কিংবা বিভিন্ন ধরনের ফার্ন জাতীয় উদ্ভিজ্জের উপর দিয়ে প্রজাপতিদের ওড়াউড়ি দেখতে ভালো লাগতো। এ ছাড়া চলমান ট্রেন থেকে টেলিগ্রাফের তারে বসে থাকা ফিঙে পাখিদের দেখতেও খুব ভালো লাগতো। ট্রেনে করে উত্তরবংঙ্গে যাবার সময় এক বিশেষ দৃশ্য্ দেখতে পেতাম। শুকনো ঋতুতে ভূমিতে লাঙল দেয়ার পর চারিপাশে বড় বড় মাটির ঢেলা পড়ে থাকতো। হালের গরু দিয়ে মই চালিয়ে সেগুলো ভাঙা যেত না। তাই মই দেয়ার আগে ক্ষেতমজুরেরা মুগুরের মত একটি বিশেষ ধরণের কাষ্ঠখণ্ডের উপকরণ দিয়ে ছন্দে ছন্দে আঘাত হেনে মাটির ঢেলাগুলো ভেঙে দিত। তার পরে মই চালিয়ে জমিন চাষযোগ্য করে তুলতো। চলন্ত ট্রেনের জানালা দিয়ে দূর দূরান্তের ধূ ধূ মাঠে ঘটমান এসব দৃশ্য দেখতে ভালো লাগতো।
প্রতিটি মুহূর্তই কিছু মায়া রেখে যায়, যদি সেটিকে নিবিড়ভাবে দেখা যায়। আজকাল হাতঘড়িতে খুব কম লোকই সময় দেখে। সময় বাঁচানোর জন্য তড়িঘড়ি করে হাতে ধরা সেলফোন থেকেই আমরা সময় জেনে নেই। তিন চার বছর আগে কি হলো, র্যান্ডম সময় দেখার জন্য যখনই সেলফোনের দিকে তাকাই, আনুমানিক ২০% সময়ে (প্রতি পাঁচ বারে একবার) আমি একটাই সময় দেখতে পাই, সেটা হলোঃ 06:12। এর পর থেকে এই সময়টার প্রতি আমার এতটাই মায়া জন্মে যায় যে আমি ঘরের দেয়াল ঘড়িতে যদি কখনো ঐ সময়টা দেখতাম, তখনই সেলফোনের ঘড়ির দিকেও তাকাতাম। তাকিয়েই থাকতাম, যতক্ষণ না ঐ সময়টা অতিক্রান্ত হয়ে যেত। ঘড়ি অনেক সময় অনেক কিছু বলে যায়, যা আমরা শুনতে পাই না।
ঘর থেকে যখন সবাই একে একে কাজে বের হয়ে যায়, আমাদের উচিত প্রত্যেককে দুয়ার পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে দোয়া ও শুভকামনা করা। আমরা যখন কারো হাসপাতালে ভর্তি হবার খবর পাই, তখন দেরি না করে দ্রুত তাকে দেখতে যাওয়া উচিত। একজন মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার সময় মানসিকভাবে সবচেয়ে দুর্বল থাকে। বন্ধুবান্ধব, সহযোগী, আত্মীয়-স্বজনদের উপস্থিতি তাকে মানসিকভাবে শান্তি দিতে পারে। আমি সবসময় এ কাজটা করার চেষ্টা করে থাকি। তার পরেও অনেক সময় গাফিলতি থাকে। যাচ্ছি যাবো করতে করতে আমার দু’জন শুভানুধ্যায়ীকে দেখতে যাবার আগেই তারা পরপারে চলে গেছেন, এ দুঃখ প্রায়ই মনে ভাসে। সময় বয়ে যায় তার নির্ধারিত গতিতে। আমরা সময়কে ছুঁতে পারিনা, কিন্তু সময় আমাদেরকে ছুঁয়ে যায়! সময় স্মৃতি রেখে যায়; সে স্মৃতিকেও আমরা ছুঁতে পারিনা, যদিও সে স্মৃতি আমাদেরকে অন্তরন্তর ছুঁয়ে থাকে।
ঢাকা
১৭ জুলাই ২০২৬
শব্দ সংখ্যাঃ ১২৭৭
পোস্টের ভাবনা-সহায়ক নিজস্ব কিছু পোস্টের লিঙ্কঃ
©somewhere in net ltd.