নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

কে এইচ মামুন

কে এইচ মামুন › বিস্তারিত পোস্টঃ

একটি মৃত্যু-পথযাত্রী বাসের বয়ান

২৪ শে মার্চ, ২০১৩ রাত ১১:৪৯

পথচলা থেমে গেছে চিরতরে। হতে চলেছে আমার বর্নাঢ্য জীবনাবসান। হাতে অল্প কিছু সময় বাকী- এর মাঝেই আমি আমার অভিজ্ঞতা বলে যেতে চাই তোমাদের, যারা আমার উত্তরসূরী কিংবা পূর্বসূরী যারা বেঁচে আছো- পথ চলছো।



খুব বেশী দিনের জীবন না আমার। বছর পনের আগে আমার জন্ম। না- অন্য অনেকের মত ঘাটতি পূরন কিংবা কোন উর্বর সময়ে আমার জন্ম হয়নি। আমার মালিকের আমিই প্রথম। আমার সাথে সাথে তারও পথ চলা শুরু। যদিও এই মালিক শব্দটায় এসে আমার খটকা লাগে। তার প্রতি আমার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত না আক্রোশ থাকা উচিত আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি আজও। আমার জন্ম কতটা বৈধ বা আবৈধ সে নিয়ে আমার সংশয় আছে। যাই হোক আমার জন্মই সত্য!



মনে পড়ে খন্ড খন্ড আমাকে দিনের পর দিন একটু একটু গড়া হয়েছে। আমার জন্মের সময়ই মিস্ত্রির শ্রম-ঘাম দেখে বার বার নিজের জন্মের প্রতি ঘৃণা জন্মেছে। আবার জন্মের আনন্দে সেসব মুছেও গেছে। দিনের পর দিন পরম যত্নে আমাকে আকর্ষনীয় করা হয়েছে। সে কী প্রানান্ত চেষ্ঠা! আমি মুগ্ধ হয়েছি। শপথ নিয়েছি- জনস্বার্থে জীবন উত্সর্গের! এবং আজ এই বেলায় বলতে পারি- আমি আমার শপথের পথ থেকে কখনো বিচ্ছুত হইনি।



প্রথম যেদিন আমাকে রাস্তায় নামানো হল- আহা! কী সূখের ছিল সে দিন! মালিকের স্ত্রী ও তার অষ্টাদশী মেয়ের চকচকে মুখ আমার আজও চোখে লেগে আছে। আমার প্রথম পথচলা শুরু হয়েছিল সমূদ্র দর্শন দিয়ে। এমন ভাগ্য ক’জনের আছে আছে বলুন! প্রানোচ্ছল এক দল ছেলে মেয়ে যখন প্রথম আমার গর্ভে প্রবেশ করে তাদের স্বপ্নীল চোখগুলো- পৃথিবীকে বদলে দে’য়ার সহজ ইচ্ছেগুলো আমার জন্ম স্বার্থক করেছিল।



সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। অথচ কত কথা বলা বাকী! আমার তো পূনর্জন্ম নেই তাই এক জীবনের প্রাপ্তীগুলো জানিয়ে না গেলে বড় স্বার্থপরতা হবে। আমাকে তাই অত্যাল্প সময়ে বলতেই হবে-

বেশ চলছিল আমার। বাংলার প্রানকেন্দ্র ঢাকার এমন কোন পথ নেই যেখানে এই পনের বছরে আমার পা পড়েনি। কত লোক আমার গর্ভে প্রবেশ করেছে- আবার ত্যাগ করেছে আমাকে সেসব কি আর হিসেব আছে! তবু আনন্দ-বেদনার খতিয়ানে মোটা দাগের কিছু সঞ্চয় চোখে পড়বেই। আমার মনে আছে- প্রথম যেদিন আমার পা ভেঙে ছিল মালিবাগের মত যান্ত্রিক জায়গায়- আমি মুষড়ে পরেছিলাম। ভেবেছিলাম আমার চলা বুঝি এখানেই শেষ! আহা, কত কিছু তখনও দেখা বাকী! কিন্তু না, আমার ভুল ভাঙল। অতি অল্প সময়ে আমার পা আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী করা হল। লাগানো হল সম্পূর্ন নতুন একটি পা। মালিক কত্ত ভালবাসতো আমাকে! আমার প্রতি মালিকের এ দুর্লভ দয়া দেখে সেদিন অবিভূত হয়েছিলাম।

আমার এ দীর্ঘ পথ চলায় কি শিখিনি আমি- অঙ্ক থেকে শুরু করে সাহিত্য পর্যন্ত?! তবে সবচে’ বেশী শিখেছি ইতিহাস-রাজনীতি। রাষ্ট্রের এমন কোন গোপন কথা নেই যা আমার জানা নেই! এবং সবচে’ সূখের বিষয় এর জন্য প্রায় কিছুই করতে হয়নি আমাকে। কত বিজ্ঞ বিজ্ঞ(!) সন্তানেরা আমাকে স্বতঃস্ফুর্ত শিখিয়েছে! আমিও মহানন্দে যেখানে ৫২জনের বেশী আমার বইবার কথা নয় সেখানে এর প্রায় ডাবলও বয়ে বেরিয়েছি। এ আমার দয়া নয়- কৃতজ্ঞতা বোধ। এই কাজটি আমি মহানন্দেই করেছি। এবং তাদের মুখেই শুনেছি পৃথিবীতে একমাত্র আমরাই যারা এই ভারতবর্ষে আছি- এই ত্যাগটুকু স্বীকার করি, করতে হয়। আর গর্বে পৌনঃপুন বারে এই কাজটি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে করে গেছি। তবে একটি দিক থেকে আমরা যারা বাংলাদেশী- ব্যাতিক্রম ভাবেই সৌভাগ্যবান ছিলাম। প্রত্যেক সরকারের আমলেই অন্তত প্রায় মাস তিনেক আমরা মালিকের অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও ছুটি পেয়ে যেতাম। এজন্য আমরা সবসময়ের বিরুধীদলের কাছে কৃজ্ঞতও থাকতাম। আমাদেরও তো জীবন- বলুন!



নাহ! আর বোধহয় অভিজ্ঞতাগুলো তুলে ধরা হল না। নিঃশ্বাস একদমই বন্ধ হয়ে আসছে। তবুও আমার জীবনের সবচেয়ে করুন কিংবা ধন্য(!) হওয়ার দিনটার কথা আমাকে বলে যেতেই হবে। সে নিশ্চিত ভাবে আজকের দিনটিই!



গত কিছুদিন ধরেই একজন অত্যন্ত নামকরা লোকের কথা হরহামেশা শুনে আসছি। আমার জন্মের বহু আগে থেকেই তার নাকি অনেক সু(কু)খ্যাতি! এই ক’দিনে উনার কথা এতবার শুনেছি যে তাকে না দেখার আতৃপ্তী নিয়ে যেতে হচ্ছে বলে আমার আফসোসের সীমা নেই। তবে নিজ চোখে না দেখলেও উনার প্রভাবের কথা আমার চে’ ভালভাবে আর কে জেনেছে?

গতকালই নাকি উনার মৃত্যুদন্ড ঘোষনা করা হয়েছে। অসংখ্য লোককে উচ্ছাস প্রকাশ করতে দেখেছি। এর চুড়ান্ত সাক্ষী আমি নিজেও। লোকগুলোর উচ্ছাস দেখে আমি একটু অবাকও হয়েছিলাম। এই ঢাকার জীবনে যে এমন আর দেখিনি আগে! বলা বাহুল্য এটা আমার জীবনেই মাত্র একবার দেখেছি এর আগে- আমার প্রথমদিনে মালিকের মেয়ে এবং তার বন্ধুরা যখন আমায় সাগরকূলে নিয়ে গিয়েছিল।

তবে____



আজকের দিনটা ছিল সেই মহান(!) লোকের দন্ডাদেশের প্রতিবাদে আমাদের অপ্রত্যাশীত ছুটি। যে ছুটি পৃথিবীতে একমাত্র বাংলাদেশেই পাওয়া যায়। বলা চলে বাঙালীর অধীকার! কিন্তু___



কিন্তু এইবার আমার মালিক মহাশয় একটু নির্দয় হলেন। তিনি ঘোষনা দিলেন- নৈতিকভাবে তিনি এ দাবী সমর্থন করেন না। ফলে আমার ছুটি বাতিল। আমাকে চলতে হবে- এমনই তার আদেশ। আমি আবার আমার মালিকের একান্ত বাধ্যগত। জেনেশুনে কখনও বেয়াদবী করিনি। অতএব ছুটে চলা______



হায়! নিঃস্বার্থ ভাবে ক্ষমতার প্রায় ডাবল বোঝা নিয়ে আজীবন সেবা করে যাওয়া যে একটা গর্হিত অপরাধ সে কি আমার জানা ছিল! আমাকে আমার প্রাপ্য শাস্তি দে’য়া হল। কিংবা বলা যায় পুরষ্কার সরূপ এই কষ্টসাধ্য জীবন থেকে আমাকে মুক্তি দে’য়া হল সেই মহান(‍!) মানুষটার নাম করে। আমার গায়ে আগুন জ্বালানো হল! আমার গর্ভের সন্তানেরা আপন প্রান বাঁচা বলে পালাল। আমি বুঝতে পারলাম না কিভাবে আমার নিজের জীবনের বিনিময়ে সেই মহান(!) মানুষটার প্রান রক্ষা পাবে। তবে মুগ্ধ হয়ে দেখলাম- উদ্দাম নৃত্য!



আর সময় নেই- এবার যেতে হবে। তবে শেষ মূহুর্তেও আমার একটা তৃপ্তি আছে। কেউ আমাকে বাঁচাতে না আসলেও আমার মৃত্যু নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা হবে- লেখালেখি হবে। সেমিনার- বক্তব্য হবে। সেই বা কম কী!



এবং আবার আমার কোন উত্তরসূরী হয়ত আমার পথ ধরবে____________।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.