নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মানুষ মরে গেলে পঁচে যায় আর বেঁচে থাকলে বদলায়

সৈয়দ কুতুব

নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!

সৈয়দ কুতুব › বিস্তারিত পোস্টঃ

ধর্ম অবমাননা ও দোসর: তকমা দেওয়ার মানদণ্ড আসলে কে নির্ধারণ করবে?

২০ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:৫৯


ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের (ইউএপি) দুই শিক্ষককে যেভাবে তড়িঘড়ি করে অপসারণ করা হয়েছে, তা আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার এক গভীর সংকটকে সামনে এনেছে। সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীর এবং সহযোগী অধ্যাপক ড. এ এস এম মোহসীনকে কোনো সুষ্ঠু তদন্ত বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে যুক্তি এবং ন্যায়ের কেন্দ্র হওয়ার কথা, সেখানে স্রেফ 'মব' বা উন্মত্ত জনরোষের কাছে প্রশাসনের এই আত্মসমর্পণ প্রতিষ্ঠানটির সার্বভৌমত্বকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। এটি কেবল দুইজন ব্যক্তির চাকরি হারানো নয়, বরং একটি স্বাধীন শিক্ষা কাঠামোর পরাজয়।

ঘটনার মূলে ছিল লায়েকা বশীরের একটি ব্যক্তিগত ফেসবুক পোস্ট। মোহাম্মদপুরের একটি জোড়া খুনের ঘটনায় অপরাধী মুখ ঢেকে পালিয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে তিনি নিরাপত্তার খাতিরে মুখ চেনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নাগরিক উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন যে, এটি তার ব্যক্তিগত মত এবং এর সাথে কর্মস্থলের কোনো সম্পর্ক নেই। এমনকি তার কথায় কেউ যদি ভুল বোঝেন বা আহত হন, তার জন্য তিনি পরবর্তীতে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমাও চেয়েছিলেন। কিন্তু তার এই মানবিক ও যৌক্তিক অবস্থানকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে 'ধর্ম অবমাননা'র মোড়ক দেওয়া হয়েছে।

এই স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে লায়েকা বশীরের মতো একজন শিক্ষককে বহিষ্কার করার আগে বিষয়টি আসলেই 'ধর্ম অবমাননা'র পর্যায়ে পড়ে কি না, তা নিয়ে দেশের প্রথিতযশা ইসলামিক স্কলারদের সাথে কথা বলা জরুরি ছিল। কোনো একাডেমিক আলোচনা বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তামূলক পরামর্শ ধর্মদ্রোহিতা কি না, তা নির্ধারণের যোগ্যতা কোনো উন্মত্ত জনতার নেই। আলেমদের সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন করে বক্তব্যের প্রকৃত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা গেলেই কেবল ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হতো। হিজাব বা নেকাব নিয়ে তোলা একটি যৌক্তিক প্রশ্নকে ব্লাসফেমি বলে চালিয়ে দেওয়া মূলত ধর্মকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারেরই নামান্তর।

প্রাথমিক ভাবে যতটুকু বোঝা যায় সেটা হলো : লায়েকা বশীরের বিরুদ্ধে এই ক্ষোভের আসল কারণ ধর্মীয় নয়, বরং পেশাগত সততা। কয়েক মাস আগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটির কনভেনার হিসেবে একটি স্পর্শকাতর ঘটনার তদন্ত করে শাস্তির সুপারিশ করেছিলেন। সেই প্রভাবশালী চক্রটিই তাকে কোণঠাসা করার সুযোগ খুঁজছিল। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলা হয়েছে কেবল মব বা জনতাকে উত্তেজিত করার অস্ত্র হিসেবে। এমনকি যে মানুষটি জুলাই অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থেকে ভূমিকা রেখেছেন, তাকেই এখন 'আওয়ামী দোসর' ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে—যা চরম উপহাস ছাড়া আর কিছুই নয়।

অন্যদিকে ড. এ এস এম মোহসীনের ক্ষেত্রেও ‘সফট দোসর’ নামক একটি অসংজ্ঞায়িত অভিযোগে তাকে সরানো হয়েছে। কিন্তু একজন শিক্ষক ঠিক কোন কাজের মাধ্যমে 'দোসর' হয়ে উঠলেন, তার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা ব্যাখ্যা ছাড়াই তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। স্রেফ রাজনৈতিক তকমা ব্যবহার করে একজন বিভাগীয় প্রধানকে সরিয়ে দেওয়া প্রমাণ করে যে, বর্তমানে যে কাউকে যেকোনো সময় সামাজিকভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া যাচ্ছে। যখন একটি একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত রাজপথের মব জাস্টিস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তখন সেখানে শিক্ষার গুণগত মান বা শিক্ষকদের নিরাপত্তা বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না।

ক্যাম্পাসে মুখমণ্ডল ঢাকা থাকার ফলে যে বাস্তব প্রশাসনিক সমস্যাগুলো তৈরি হয়, তা এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। পরীক্ষায় একজনের পরিবর্তে অন্যজন অংশগ্রহণ করা বা জালিয়াতির ঘটনা ঠেকানো শিক্ষকদের জন্য এক দুঃসাধ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিচয় নিশ্চিত করার এই যৌক্তিক দাবিকে যখন 'পর্দার ওপর আঘাত' হিসেবে প্রচার করা হয়, তখন বুঝতে হবে আমরা যুক্তিবর্জিত এক অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছি। এতে ডিগ্রির গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খল : উভয়ই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিক্ষকরা যখন ভয়ের সংষ্কৃতিতে নিমজ্জিত হন, তখন তারা সত্য বা বিজ্ঞান পড়াতেও দশবার ভাবেন।

এই সংকটের একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান খোঁজা এখন সময়ের দাবি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল তড়িঘড়ি করে শিক্ষকদের সরিয়ে না দিয়ে দেশের প্রথিতযশা পুরুষ ও নারী ইসলামিক স্কলারদের নিয়ে একটি প্যানেল গঠন করা। কারণ হিজাব বা নেকাবে অভ্যস্ত নারী শিক্ষার্থীদের সাথে সরাসরি আলোচনার জন্য নারী স্কলারদের সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত জরুরি। ধর্মীয় অধিকার রক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা—এই দুটির মধ্যে কোনো সংঘাত নেই যদি আমরা আলোচনার টেবিলে বসতে রাজি থাকি। নারী নিরাপত্তা কর্মীদের মাধ্যমে আলাদা কক্ষে পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা করলেই এই সংকটের সমাধান সম্ভব ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়কে যদি আমরা মুক্তচিন্তার ধারক হিসেবে টিকিয়ে রাখতে চাই, তবে মব জাস্টিসের এই বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই শিক্ষকদের অব্যাহতি দেওয়ার এই নজির ভবিষ্যতে অন্য শিক্ষকদেরও বিপদে ফেলবে। শিক্ষকদের নিরাপত্তা ও মান রক্ষায় এখন রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কঠোর ভূমিকা প্রয়োজন। অন্যথায়, আমরা কেবল মেধাবী শিক্ষকদেরই হারাব না, বরং আমাদের গোটা শিক্ষাব্যবস্থা এক অসহিষ্ণু ও পশ্চাৎপদ সমাজে পরিণত হবে।


মন্তব্য ৩ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (৩) মন্তব্য লিখুন

১| ২০ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:১৫

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: https://www.facebook.com/share/v/1CbYUtfiZ2/

২| ২০ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:১৭

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: https://www.banglatribune.com/930607
https://www.facebook.com/share/v/1CbYUtfiZ2/

৩| ২০ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৫২

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: মব সর্মথিত দেশে
ন্যায় বিচার আশা করা অত্যন্ত দু:খজনক ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.