| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
সেদিন উখিয়ার তপ্ত বালুর ওপর দাঁড়িয়ে প্রফেসর ইউনূস যখন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক টানে ঘোষণা করলেন—"তোয়ারা আগামী ইঁদত নিজর দেশত ফিরি যাইবা", তখন মনে হচ্ছিল মুহূর্তের জন্য পুরো বিশ্বটা বুঝি স্ট্যাচু হয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে। পাশে বসা গুতেরেস সাহেব এমনভাবে মাথা নাড়ছিলেন, যেন তিনি গতরাতেই মিয়ানমারের বর্ডার নিজের হাতে সিলমোহর করে এসেছেন। সাধারণ মানুষ সেদিন ভেবেছিল, ক্ষুদ্রঋণের কিস্তির মতো করেই বুঝি মিয়ানমার জান্তা প্রতি সপ্তাহে এক হাজার করে রোহিঙ্গা ফেরত নেবে।
সেই ক্ষণে কূটনীতি ছিল গৌণ, ভূ-রাজনীতি ছিল তুচ্ছ; আর চীনের সেই বিশাল পাইপলাইনের স্বার্থ যেন স্রেফ এক কাপ চায়ের টেবিলের গল্প। ইউনূস স্যার হয়তো ভেবেছিলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের স্টাইলে একটা ইমোশনাল বুস্ট দিলেই রাখাইনের কাঁটাতারগুলো মাখনের মতো গলে যাবে। চীনের গ্যাস পাইপলাইন, রাশিয়ার ভেটো, কিংবা আরাকান আর্মির বন্দুক সবই যেন সেদিন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার মিষ্টতায় স্রেফ মুচকি হাসি দিয়ে মিলিয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, পৃথিবীটা গ্রামীণ ব্যাংকের লোন রিকভারি সেন্টার নয়। ইউনূস স্যারের সেই আবেগঘন বক্তৃতার ঠিক পরদিন মিয়ানমারের সরকারি পত্রিকায় যখন হেডলাইন হলো-“বাংলাদেশের প্রধান নেতা রোহিঙ্গাদের সাথে তাদেরই ভাষায় কথা বলছেন, তার মানেই হলো এরা বাঙালি”-তখন আন্তর্জাতিক আদালতের উকিলরা বিষণ্ণ মনে কফির কাপে চুমুক দিয়ে ভাবলেন, "আরেকটু কম আবেগী হলে কি খুব ক্ষতি হতো?"
এদিকে রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে জামায়াতের ইউ-টার্ন ছিল দেখার মতো। তারা ভাবল, চীনের সামনেই যদি একটা স্বাধীন আরাকান’-এর দাবি তোলা যায়, তবে মন্দ হয় না। চীন অবশ্য সেই প্রস্তাব শুনে এমনভাবে তাকাল, যেন তাদের কলিজার পাইপলাইন কেউ ড্রিল মেশিন দিয়ে ফুটো করতে এসেছে। অথচ রাজনীতির পরিহাস দেখুন ! কয়েক মাস যেতে না যেতেই সেই জামায়াতই আবার চীনা রাষ্ট্রদূতের হাতে হাত রেখে বলল—"চীন আমাদের জানের বন্ধু, ১৯৭৬ থেকে তারা আমাদের পাশে আছে।" যখন পেট আর প্র্যাগমাটিজম হাত মেলায়, তখন আদর্শ সাধারণত পাশের ড্রেনেই আশ্রয় খুঁজে নেয়।
অন্যদিকে সৌদি আরবের যুক্তিটা ছিল আরও চমৎকার। তারা বাংলাদেশকে চাপ দিচ্ছে তাদের দেশে থাকা ৩ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দিতে। কেন? কারণ রোহিঙ্গারা এককালে জাল কাগজে বাংলাদেশি সেজে সৌদি গেছিল। এখন সেই পাপের দায় বাংলাদেশের! সৌদি আরব রোহিঙ্গাদের জন্য গত দশ বছরে মাত্র ৬ কোটি ডলার সাহায্য পাঠিয়েছে। অথচ বাংলাদেশে তাদের ২৮ লাখ শ্রমিকের পাঠানো রেমিট্যান্সের অঙ্কটা কষলে বোঝা যায়, আসলে কে কাকে চাপ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
একটা অন্তর্বর্তী সরকার, যাদের কোনো জনম্যান্ডেট নেই—তারা যখন লাখো মানুষকে ঘরে ফেরার রঙিন স্বপ্ন দেখায়, তখন সেই স্বপ্নটা আসলে ইতিহাসের ডাস্টবিনে জমা হওয়ার অপেক্ষায় থাকে। প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ, বিশেষ করে যখন সেই প্রতিশ্রুতির দায়ভার শেষ পর্যন্ত নিজের কাঁধে নিতে হয় না। রাজনীতির দাবা বোর্ডে 'মানবিকতা' সবসময়ই একটা সস্তা ঘুঁটি।
আজকের বাস্তবতা বড়ই রূঢ়। রোহিঙ্গারা এই ঈদেও ঘরে ফেরেনি। উল্টো আরও দেড় লাখ নতুন মানুষ এপারে চলে এল। মিয়ানমার জান্তা যাদের মারছিল, এখন আরাকান আর্মি তাদের গলা কাটছে—পার্থক্য শুধু ইউনিফর্মের ব্র্যান্ডে। ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া শিশুরা এখন নম্বর আর তাঁবুর মাঝে নাগরিকত্ব খুঁজছে। আরসা তাদের দলে টানছে, কারণ ক্ষুধার্ত আর হতাশ মানুষ খুব সহজেই হাতে অস্ত্র তুলে নেয়।
ইউনূস স্যারের সেই চাটগাঁইয়া বক্তৃতার ভিডিওটা অবশ্য হারিয়ে যায়নি। মিয়ানমার সেটা সযত্নে তাদের আর্কাইভে রেখেছে—যাতে আন্তর্জাতিক আদালতে প্রমাণ করা যায় যে, "এরা আসলে আমাদের লোকই না !"
এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে মানবতার চেয়ে পাইপলাইন বড়, রেমিট্যান্সের চেয়ে নাগরিকত্ব ছোট, আর একটি অন্তর্বর্তী সরকারের আবেগের চেয়ে ভূ-রাজনীতির চেস বোর্ড অনেক বেশি শক্তিশালী। রোহিঙ্গাদের এই ঈদেও ঘরে ফেরা হলো না; পরের ঈদেও হবে কি না, তা বিধাতা জানেন। তবে মানুষের একটা পাসপোর্ট তো কেউ কেড়ে নিতে পারে না—আর সেটা হলো আশা । সেই আশাতেই তারা বেঁচে আছে, যদিও ফেরার পথটা আজও অজানা ।
https://banglastream.net/news/bszhfvlgvrhm
©somewhere in net ltd.