| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
"মাংস সমিতি।" এরকম নাম শুনলে প্রথমে হাসি পায়। সঞ্চয় সমিতি শুনেছি, ঋণ সমিতি শুনেছি, এমনকি মহিলা সমিতিও শুনেছি। কিন্তু মাংস সমিতি? তারপর একটু ভাবলে হাসি থেমে যায়। কারণ এই নামটা আসলে বাংলাদেশের একটা গভীর সত্যকে সামনে তুলে এনেছে। যে দেশে একটা গরিব পরিবারের কাছে ঈদে গরুর মাংস রান্না হওয়াটা এখনও একটা বিশেষ ঘটনা, সেই দেশে "মাংস সমিতি" নামটা হাস্যকর না। এটা আসলে অনেক বেশি বাস্তব।
বাংলাদেশের মুসলিম গরিব পরিবারে গরুর মাংস সাধারণ কোনো খাবার নয়; এটা একটা উপলক্ষের খাবার। ঈদে এলাকায় গরু জবাই হলে মহল্লায় একটা আলাদা আমেজ দেখা যায়, বাচ্চারা উত্তেজিত থাকে, মহিলারা সকাল থেকে রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। মুরগির কিনলে এই অনুভূতি হয় না। মুরগি যেকোনো দিন কেনা যায়, যেকোনো দিন রান্না করা যায়। কিন্তু গরুর মাংস? সেটা অন্য ব্যাপার। সেটা বছরে কয়েকবার, বিশেষ দিনে, বিশেষ মানুষদের জন্য। এই মানসিকতা বুঝলেই বোঝা যায় কেন "মাংস সমিতি" নামটা শুনে ১,২০০ পরিবার লাইন দিয়েছিলেন।
বগুড়ার মালগ্রাম চাপড়পাড়ায় আব্দুল হাকিম, আকরাম আর শাহীন মিলে একটা সমিতি খুলেছিলেন। প্রস্তাবটা ছিল একদম সহজ। সপ্তাহে মাত্র ১০০ টাকা দিন, বছর শেষে ঈদের আগে পাবেন ৮ কেজি গরুর মাংস। এলাকার রিকশাওয়ালা, কারখানার শ্রমিক, গৃহিণী সবাই রাজি হয়ে গেলেন। কারণ ১০০ টাকা তো সবাই দিতে পারেন। এই পরিমাণ টাকার জন্য কেউ বেশি ভাবেন না, বেশি যাচাই করেন না।
এক বছর পরে সেই ১০০ টাকা হয়ে গেল ৫,০০০ টাকা। ১,২০০ পরিবারের জমানো টাকা মিলে হলো ৭৭ লাখ। সাতাশ রমজানের দিকে মাংস দেওয়ার কথা ছিল। এমনকি একটা প্যান্ডেলও বানানো হয়েছিল, যাতে মানুষ আরও বিশ্বাস করে, যাতে মনে হয় সত্যিই কিছু একটা হচ্ছে। তারপর মাংস বিতরণের দিন সকালে মানুষ এসে দেখলেন প্যান্ডেল আছে, কিন্তু সমিতি নেই। পরিচালক নেই। মোবাইল বন্ধ।
অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন , এত মানুষ একসাথে কীভাবে প্রতারণার শিকার হলো। আব্দুল হাকিম ছিলেন জামায়াতের শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের স্থানীয় সেক্রেটারি, এলাকার পরিচিত মুখ এবং ধর্মীয় পরিচয়ওয়ালা ব্যক্তি। বাংলাদেশে এখনো মানুষ বিশ্বাস করে যে ধর্মীয় পরিচয়ের লোক সহজে প্রতারণা করবেন না। এই মানবিক বিশ্বাসটাই হলো তাদের দুর্বলতা। পরিচিত ও ধর্মীয় আবরণের মানুষকে আমরা অন্ধভাবে বিশ্বাস করি, ভাবি না যে নীতিবোধ পোশাকে নয়, সততায়। আর এই অন্ধ বিশ্বাস আর সস্তায় পাওয়ার লোভ : দুটোই মিলে শেষ পর্যন্ত ১,২০০ পরিবারের ৭৭ লাখ টাকা চুরির পথ প্রশস্ত করেছে।
কিন্তু এই ঘটনার একটা জায়গায় এসে থামতে হয়। বাবলী আক্তারের কথা। তিনি কীটনাশক কারখানায় কাজ করেন, তার স্বামী অটোরিকশা চালান। দুজন মিলে কাজ করেন, মাসে মোটামুটি একটা আয় আছে। তারপরও তিনি এই সমিতিতে টাকা দিয়েছেন। শুধু নিজের টাকা না, কারখানার আরও ৪৪ জন সহকর্মীর টাকাও তার হাত দিয়ে গেছে। কেন? কারণ তিনি এলাকার বিশ্বস্ত মানুষ ছিলেন। সহকর্মীরা তাকে বিশ্বাস করেছিলেন। আর তিনি বিশ্বাস করেছিলেন সমিতিকে। এখন বাবলী আক্তারের কোনো ঈদ নেই। শুধু মাংস নেই বলে না, ৪৪ জন মানুষের কাছে জবাব দিতে হবে বলে। এই যন্ত্রণাটা কেবল আর্থিক না, এটা সামাজিক এবং মানসিকও।
এবার একটু কঠিন প্রশ্ন করা দরকার। এই ১,২০০ পরিবারের হাতে আর কোনো উপায় ছিলো না? সপ্তাহে ১০০ টাকা নিজের কাছে রাখলে বছরে ৫,২০০ টাকা জমত। সেই টাকায় বাজার থেকে নিজেই মাংস কেনা যেত। অথবা ১,২০০ পরিবার নিজেরা মিলে একটা কমিটি বানাতে পারতেন, নিজেদের মধ্য থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি রাখতেন, স্বচ্ছ হিসাব রাখতেন। তাহলে ৭৭ লাখ টাকা কারও পক্ষে নিয়ে পালানো সম্ভব হতো না।
এখানেই আসল সমস্যা। বাংলাদেশে গরিব ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষকে কখনো আর্থিক সচেতনতা শেখানো হয়নি। ব্যাংক, ডিপিএস, সমবায় এগুলো তাদের কাছে অনেক দূরের জিনিস মনে হয়। তারা যা চেনেন তাই করেন। পরিচিত মুখকে বিশ্বাস করেন। আর এই সহজ বিশ্বাসটাকেই বারবার পুঁজি বানানো হয়।
তাছাড়া এখানে লোভের বিষয়টাও মাথায় রাখতে হবে। অনেক পরিবার একটা না, দুটো তিনটা কার্ড নিয়েছেন। আখলি বেগম ১০ থেকে ১২ কেজি মাংসের আশা করছিলেন। মানে তিনি দুটো কার্ড নিয়েছিলেন। ১০০ টাকা দিয়ে ৮ কেজি মাংস পাওয়ার অফার যখন সামনে থাকে, তখন মনে হয় আরেকটা কার্ড নিলে আরও বেশি পাব। এই জায়গাটায় বিশ্বাসের পাশাপাশি লোভও কাজ করেছে। এটা স্বীকার না করে শুধুসব দোষ সমিতির উপর একক ভাবে চাপানো ঠিক হবে না। মানুষ শুধু ঠকে না, মানুষ নিজেও কখনো কখনো একটু বেশি পাওয়ার আশায় চোখ বন্ধ করে বিনিয়োগ করে ।
ঈদের আগে টাকা হারানোর ব্যথাটা অন্যরকম। যারা কখনো এই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেছেন তারা জানেন। সারা বছর কষ্ট করেছেন শুধু এই একটা দিনের জন্য। বাচ্চাদের মুখে একটু ভালো খাবার তুলে দেবেন, পরিবার নিয়ে একটু আনন্দ করবেন। সেই স্বপ্নটা যখন রমজানের শেষ দিকে এসে ভেঙে পড়ে তখন যে কষ্ট হয় সেটা কেবল আর্থিক না। এটা একটা পুরো বছরের আশার মৃত্যু।
বগুড়ার ১,২০০ পরিবার এই ঈদে মাংস ছাড়াই থাকবেন। পুলিশ তদন্ত করছে, অভিযোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু আব্দুল হাকিম, আকরাম আর শাহীনের ফোন বন্ধ। তারা এখন কোথাও আছেন, ৭৭ লাখ টাকা নিয়ে। আর চাপড়পাড়ার গলিতে বাবলী আক্তারের মতো মানুষেরা ভাবছেন ৪৪ জনের টাকা কীভাবে শোধ করবেন।
প্রতারক চালাক ছিল, এটা সত্যি। কিন্তু আমরাও যতদিন পরিচিত মুখ দেখলে চোখ বন্ধ রাখব, ধর্মীয় পরিচয় দেখলে যাচাই বাছাই করা ছেড়ে দেব, আর একটু বেশি পাওয়ার আশায় হিসাব না করে এগিয়ে যাব, ততদিন এসব ঘটনা বারবার ঘটবে। বিশ্বাসের অমর্যাদা যারা করেছে তারা তো অপরাধী বটেই, কিন্তু যারা চোখ বুজে বিশ্বাস করে , তাদেরও কি ভাবার সময় আসেনি?
বগুড়ায় মাংস সমিতির নামে ৭৭ লাখ টাকা নিয়ে উধাও জামায়াত নেতা- দৈনিক ইনকিলাব
https://dailyinqilab.com/national/article/875505
২০ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৩:২৯
সৈয়দ কুতুব বলেছেন: যখন আমরা ঢাকার মিরপুর বারো তে থাকতাম এরকম একটা ঘটনা ঘটেছিলো। আমাদের বাড়ির পাশে একজন দোকানদার নাম ছিলো বশির ; সেও একজন বাড়িওয়ালা ছিলো । সে এক পীরের মুরিদ ছিলো। পীর সমিতির বিজনেস করতো । প্রতি বৃহস্পতিবার সে মজমা বসাতো মুরিদদের বাসায় । ভালো খানাপিনা হতো । বশির মিয়ার বিবি আমার মায়ের কাছে টাকা ধার চাইলো একবার যে উনাদের বিজনেস বাড়াতে চান । পীরের সমিতিতে টাকা দিবেন । মা পাশের বাড়ির লোক ভেবে দিলেন । পরে বশির মিয়ার বউ আবার ফেরত ও দিয়ে দিতেন । একবার হলো কি পীর এক লাখ টাকা তুলে উধাও হয়ে গেলেন । বশির মিয়া সহ সকল মুরিদের মাথায় হাত । এদিকে মায়ের থেকে ধার নেয়া টাকা আর শোধ দিতে পারে নি বশির মিয়ার বউ । টাকা নিয়ে তাদের সাথে আমাদের রিলেশন খারাপ হয় ।
©somewhere in net ltd.
১|
২০ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৩:১৭
শ্রাবণধারা বলেছেন: আপনার এই লেখা পড়ে মনে পড়লো, আমার মা অনেকদিন আগে এরকম একটা সমিতিতে টাকা রেখেছিল - বোধহয় কিছু বেশি লাভ দিবে এই আশায়। তারপর যা হবার তাই। এরকমই কোন জামাইত্যা টাইপের কেউ টাকা মেরে পালিয়ে গিয়েছিল।
মুসকিল হল, আমরা বড় বিশ্বাসপ্রবন জাতি। আমিও তার বাইরে নই। যেমন ধরেন এই আমি ইউসুফ ডাক্তারকে বিশ্বাস করেছিলাম। ভেবেছিলাম, এই লোকের জীবনে আর কি পাওয়ার বাকি আছে যে দেশের সর্বনাশ করবে!