| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
আজকে জুলাই আন্দোলনের একটা কবিতা পাঠ করলাম যেটা পড়ে মাথা হ্যাং হয়ে গেছে। এই কবিতা নাকি সপ্তম শ্রেণীর ‘সপ্তবর্ণা’ বইতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কবিতার নাম ‘সিঁথি’, লেখক হাসান রোবায়েত। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসীমউদ্দীন আর সুফিয়া কামালের পাশে এই কবিতা জায়গা পেয়েছে। পুরো ব্যাপারটা একটু বিস্তারিত আলোচনা করা দরকার ।
ধরুন আপনি সপ্তম শ্রেণীর একজন ছাত্র। সকাল আটটায় বাংলা ক্লাস। শিক্ষক বই খুললেন, গলা খাঁকারি দিলেন এবং পড়তে শুরু করলেন, "ভাই মরল রংপুরে সেই, রংপুরই তো বাংলাদেশ, নুসরাতেরা আগুন দিল, দোজখ যেন ছড়ায় কেশ।" আপনি ভাবলেন এটা কি কোনো নতুন গানের কথা? শিক্ষক কি ভুল পাতা খুলেছেন? না, এটা আপনার পাঠ্যবইয়ের কবিতা। এই মুহূর্তে এটি বাংলা সাহিত্যের দিকপালদের পাশে পাঠ্যক্রমে বসে আছে। যেভাবে পাড়ার একটা চায়ের দোকান হঠাৎ কোনো আন্তর্জাতিক মানের রেস্তোরাঁর পাশে জায়গা পেয়ে যায়।
২০২৪ সালে বাংলাদেশে একটি ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান হলো। মানুষ রাস্তায় নামল, রক্ত ঝরল, সরকার পতন হলো। এটা নিঃসন্দেহে ইতিহাসের একটা বড় অধ্যায়। এরপর নতুন সরকার এলো এবং স্বাভাবিকভাবেই সিদ্ধান্ত হলো যে এই ঘটনাকে পাঠ্যক্রমে রাখতে হবে। এরপর যা হলো সেটা সাহিত্য বাছাই নয়, বরং একটা প্রবল হন্তদন্ত অবস্থা। যেভাবে অফিসের অনুষ্ঠানে শেষ মুহূর্তে দোকান থেকে যা পাওয়া যায় তা-ই নিয়ে আসা হয়।উপরের ছবি থেকে কবিতাটা পড়ুন একবার। পুরোটা।
পড়লেন? ভালো। এখন একটু থামুন এবং নিজেকে জিজ্ঞেস করুন : এটা পড়তে গিয়ে মাথায় কোনো সুর এলো কিনা। যদি এসে থাকে , এবং সেই সুরটা কোনো rap বিটের মতো মনে হয়, আপনি ভুল কিছু অনুভব করেননি। ছোট ছোট লাইন, জোর করে মেলানো ছন্দ, সরাসরি আবেগের চিৎকার, কোনো মেটাফোর নেই, কোনো গভীরতা নেই । এটা র্যাপ সংগীতশিল্পী এমিনেমের কোনো প্রতিবাদী গানের অসম্পাদিত বাংলা সংস্করণের মতো। এমিনেম অন্তত জানেন তিনি কী গাইছেন, কিন্তু লেখক দাবি করছে এটি একটি ‘কবিতা’।
সাহিত্যের প্রথম এবং সবচেয়ে সহজ প্রশ্ন হলো , এটা কি এমন কিছু বলছে যা আগে বলা হয়নি? কিংবা পুরনো কথাই কি নতুনভাবে বলছে? এই কবিতার উত্তর দুটোতেই ‘না’। "রক্ত", "শহিদ", "স্বাধীনতা", "মায়ের কান্না", "আরশ কাঁপা" এই শব্দগুলো এত বছর ধরে এত লেখায় এসেছে যে এগুলো এখন বাংলা সাহিত্যের ঘুণে ধরা গতানুগতিকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখনই কেউ দেশ নিয়ে কিছু লিখতে বসেন এবং গভীর চিন্তা করতে চান না, তখনই এই শব্দগুলো হাজির হয়।
এবার আসি চিত্রকল্পের প্রশ্নে। কবিতায় চিত্রকল্প মানে পাঠক চোখ বন্ধ করলে কিছু দেখতে পাবেন। জীবনানন্দ লিখেছিলেন "চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা", এই একটা লাইনে একটা পুরো রহস্যময় মুখ তৈরি হয়ে যায়। এই কবিতায় আছে "দোজখ যেন ছড়ায় কেশ"-এটার মানে কী? নরকের কি চুল আছে? এই উপমাটা মাথায় কোনো ছবি তৈরি করে না, বরং বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। আর "লাশের ভিতর লাশ ডুইবা যায়", এটা কি বাস্তবসম্মত কোনো বর্ণনা, নাকি কেবল নাটকীয় শোনানোর চেষ্টা?
এবার আসি গভীরতার প্রশ্নে। ভালো কবিতা একবার পড়লে একটা অর্থ দেয়, দ্বিতীয়বার পড়লে আরেকটা, তৃতীয়বার পড়লে হয়তো আগের দুটোকে ভুল প্রমাণ করে একটা নতুন অর্থ দেয়। এই কবিতা একবার পড়লেই শেষ। দ্বিতীয়বার পড়ার কোনো কারণ নেই, একবার পড়লেই সবটা বুঝা যায় । "ভাই মরল" - ভাই মরেছে। "মা কাঁদছে" - মা কাঁদছে। "স্বাধীনতা এসেছে" - স্বাধীনতা এসেছে। এটা কবিতা নয়, এটা একটা টাইমলাইন লেখার মতো যেটাকে লাইন ভেঙে সাজানো হয়েছে ।
আপনি যদি কবিতাকে গদ্যে লেখেন : "ভাই মরল রংপুরে, নুসরাতেরা আগুন দিল, মা ছেলের আইডি কার্ড দেখে কাঁদে, শেষে স্বাধীনতা এলো" তাহলে কবিতার কিছুই হারাবে না, কারণ হারানোর মতো কবিতা এখানে নেই। এবার আসুন পাঠ-পরিচিতিতে। কবিতাটা যেমন দুর্বল , তার সাথে একটা দুর্বল পাঠ-পরিচিতিও জুড়ে দেয়া হয়েছে ।
হাসান রোবায়েতের 'সিঁথি' কবিতায় সাম্প্রতিক বাংলাদেশের এক নির্মম ও মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতার প্রকাশ ঘটেছে। শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থান ২০২৪-এ বিজয়ী হয়ে বাংলাদেশের মানুষ নতুনভাবে মুক্তির স্বাদ পেয়েছে; কিন্তু অগণিত মানুষের আত্মদানের বিনিময়ে রচিত হয়েছে সে মৃত্যুর গাথা। শাসকপক্ষের মরণ-কামড় উপেক্ষা করে প্রাণ দিয়েছে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা। মুখের ভাষার উচ্চারণরীতি আর বাগবিধি ব্যবহার করে কবি এক রক্তস্নাত বাংলাদেশের অন্তরঙ্গ ছবি এঁকেছেন। তাতে দেশের কল্যাণ আর মানুষের মুক্তির প্রত্যয়ও ঘোষিত হয়েছে। কবিতাটিতে বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ২০২৪-এর অভ্যুত্থান এক নতুন বিজয়গাথা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
পাঠ পরিচিতির এক জায়গায় লেখা রয়েছে , "মুখের ভাষার উচ্চারণরীতি আর বাগবিধি ব্যবহার করে কবি এক রক্তস্নাত বাংলাদেশের অন্তরঙ্গ ছবি এঁকেছেন।" এই বাক্যটার মানে কী? বাগবিধি মানে ব্যাকরণ। কবি ব্যাকরণ ব্যবহার করে ছবি এঁকেছেন? পৃথিবীর প্রতিটি লেখকই তো ব্যাকরণ ব্যবহার করেন ! এটা কি কোনো বিশেষ কৃতিত্ব? এই একটি বাক্যই প্রমাণ করে পাঠ-পরিচিতিটি এমন একজন লিখেছেন যিনি অনেক কিছু বলার চেষ্টা করছেন কিন্তু বলার মতো কিছু খুঁজে পাচ্ছেন না। এই কবিতার পাঠ-পরিচিতি লিখতে বসে লেখক ঘটনার ইতিহাস বলেছেন , কারণ কবিতায় বলার কিছু ছিল না।
রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামালের পাশে এই কবিতা কেন? এই প্রশ্নের সাহিত্যিক কোনো উত্তর নেই। রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষাকে নতুন করে দেখিয়েছেন। নজরুল বিদ্রোহকে এমন ভাষায় প্রকাশ করেছেন যা আগে কেউ করেননি। জসীমউদ্দীন লোকজীবনকে কবিতায় এনেছেন এমন দক্ষতায় যা অতুলনীয়। সুফিয়া কামাল নারীর হৃদয়কে কবিতার ভাষা দিয়েছেন। এঁরা প্রত্যেকে বাংলা সাহিত্যে এমন কিছু যোগ করেছেন যা তাঁদের আগে ছিল না। আর এই কবিতা? এই কবিতা এমন কিছু বলেছে যা আগেও বলা হয়েছে, এমনভাবে বলেছে যা আগেও বলা হয়েছে। পাঠ্যবইয়ে জায়গা পেয়েছে কারণ সময়টা অনুকূলে ছিল, সাহিত্যিক মানদণ্ড নয়।
২০২৪ সালে যারা মারা গেছেন, চোখ হারিয়েছেন, পঙ্গু হয়েছেন - তাঁদের ইতিহাস পাঠ্যবইয়ে থাকুক। কিন্তু এই ঘটনার প্রতিনিধিত্ব করছে এই দুর্বল কবিতাটি যা তাদের প্রতিও সুবিচার নয়। একটা বড় ঘটনার স্মৃতি বহন করার জন্য বড় সাহিত্য দরকার। ২০২৪ নিয়েও নিশ্চয়ই ভালো লেখা হয়েছে বা হবে কিন্তু সেটা খোঁজার সময় বা সদিচ্ছা কারো ছিল না।
কবিতাটা পাঠ্যবই থেকে সরিয়ে দেওয়া হোক। তার জায়গায় ২০২৪ নিয়ে কোনো বস্তুনিষ্ঠ গদ্য বা প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতিকথা রাখা হোক। ইতিহাস ধরে রাখার জন্য এত তাড়াহুড়োর প্রয়োজন নেই। ইতিহাস পালায় না। কিন্তু একটা প্রজন্মের রুচি একবার নষ্ট হলে সেটা ফেরানো কঠিন। সেই ক্ষতিটা থেকে যায়, পাঠ্যবইয়ের পাতার মতোই নীরবে কিন্তু দীর্ঘস্থায়ীভাবে।
১৩ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:৫৩
সৈয়দ কুতুব বলেছেন: মবের রাজ্যে বিচার হয় চিৎকারের জোরে/ সত্যটা মরে আগে, মানুষ মরে তার পরে।
২|
১৩ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:৫০
হুমায়রা হারুন বলেছেন: সহমত
©somewhere in net ltd.
১|
১৩ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:৪৭
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: কবিতা রচনা করলেই তা পাঠ্য বইতে অর্ন্তভূক্ত করতে
হবে এমন আইন দেশে নাই ।
আবার বলি ভূল হয়েছে , বর্গীর দেশে মব চলছে
ও হ্যাঁ হ্যাঁ সব জায়েজ আছে ।
.....................................................................
আমরা হলাম ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা,
দুধ তো পাবনা , ম্যাঁ ম্যাঁ করেই জানটা দিতে হবে ।