নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মানুষ মরে গেলে পঁচে যায় আর বেঁচে থাকলে বদলায়

সৈয়দ কুতুব

নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!

সৈয়দ কুতুব › বিস্তারিত পোস্টঃ

আওয়ামী লীগ আসার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে

১৫ ই মে, ২০২৬ রাত ১:২৫


সোশ্যাল মিডিয়ায় দুটো স্ট্যাটাস পড়লাম। দুজনই বিএনপি সমর্থক।
প্রথমজন লিখেছেন, গতকালকের গরম খবর ছিল আওয়ামী লীগরে ঝুলায় মারছে বিএনপি বা জামায়াত শিবির। তারপরে প্রথম আলো নিউজ করলো পদ্মার পাড়ে কৃষকের ধান কাইটা দিচ্ছে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ। রাতের বেলা কালবেলা দেখাইলো মাশরাফির পোড়া বাড়ি। তবে কেন পোড়াইছিল, মাশরাফি কেমনে ১০০ পারসেন্ট ভোট পাইছিল, ই অরেঞ্জরে কেমনে জুস বানাইছিল সেইগুলা বললো না। অনেক ওহ ক্যাপ্টেন মাই ক্যাপ্টেন করলো।

দ্বিতীয়জন লিখেছেন, জামায়াত শিবির যখন প্রথম আলো পোড়াচ্ছিল আমি প্রথম আলোর পক্ষে ছিলাম। কারণ আমার দল বিএনপি বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। বিনিময়ে ওরা কী করে জানেন? বিএনপিকে কখনো অ্যাক্সেস দেয় না। তাদের নিজস্ব কিছু সিলেক্টিভ বুদ্ধিজীবী, সেলেব আর সফট পাওয়ার আছে, তাদের দিয়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগরে জিন্দা রাখতে চায়।


এই দুটো স্ট্যাটাস পড়ে অনেকে হাসছে। কেউ কেউ বলছেন বিএনপি সমর্থকদের অভিযোগ হাস্যকর। কেউ বলছেন অতিরঞ্জিত। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো এই কথাগুলা এখন আর শুধু ফেসবুকের কমেন্ট সেকশনে সীমাবদ্ধ না। দেশের অনেক মানুষের মাথায় এখন একই সন্দেহ ঘুরতেছে। মানুষ এখন নিউজ দেখে শুধু খবর বুঝতে চায় না। খবরের ভিতরে কোন খেলা চলতেছে সেটাও বুঝতে চায়।

বাংলাদেশের মিডিয়া চালাকির সাথে একটা কাজ করে। এরা কখনো সরাসরি কিছু বলে না। শুধু মানুষকে বুঝায় কোন বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে। আজকে সারাদিন বাংলাদেশের টপ ট্রেন্ডিং ছিল মাশরাফি বিন মর্তুজার সাক্ষাৎকার। তিনি বুকে কষ্ট নিয়ে বলেছেন মরলে যেন তার লাশ নড়াইলে কবর না দেওয়া হয়। শুনেই খারাপ লাগলো। কারণ আমরা মাশরাফিকে শুধু ক্রিকেটার হিসেবে দেখিনি। আমরা তাকে ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক হিসেবে দেখেছি।

একসময় যখন ক্রিকেটারদের যোদ্ধা বলা হতো তখন মাশরাফি নিজেই বলেছিলেন দেশের আসল যোদ্ধা কৃষকরা। মানুষের কাছে তার জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে। মাশরাফি যখন আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে ভোটারবিহীন নির্বাচনের অংশ হলেন তখন মানুষ দুই ভাগ হয়ে গেল। জুলাই আন্দোলন এলো। কিন্তু মাশরাফি নীরব থাকলেন। পরে দেশ ছেড়ে চলে গেলেন। এখানেই মিডিয়ার খেলা শুরু। আজকে তার বাড়িঘর পোড়ানোর ছবি দেখিয়ে মায়াকান্না কাঁদছে কিন্তু কেন মানুষ সেই বাড়ি পোড়ালো সেই প্রশ্নটা কোথাও নেই। একশ ভাগ ভোট তিনি কীভাবে পেলেন কিংবা ই অরেঞ্জ কাণ্ডে সাধারণ মানুষের টাকা কীভাবে লোপাট হলো সেই বিষয়গুলো নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। আছে শুধু ওহ ক্যাপ্টেন মাই ক্যাপ্টেন।

মাশরাফিকে নিয়ে মানুষের ভিতরে একটা আলাদা আবেগ আছে এটা সত্যি। কারণ আমরা তাকে ক্রিকেটার হিসেবে ভালোবেসেছিলাম। তিনি মাঠে খুঁড়ায়া খুঁড়ায়া বল করতেন। মানুষ তাকে নায়ক বানিয়েছিলো। কিন্তু বাংলাদেশের সমস্যা হলো আমরা নায়ক আর রাজনীতিবিদকে আলাদা করতে পারি না। একবার কেউ সেলিব্রিটি হয়ে গেলে আমরা ধরে নেই তিনি ফেরেশতা। তারপর সেই ফেরেশতা যখন এমপি হয় তখন আমরা অবাক হই কেন তিনি আর দশজন এমপির মতো হয়ে গেলেন। মাশরাফিকে এমন অপমানিত হতে দেখে কোনো দিন ভালো লাগেনি কারণ উনার খেলা দেখে বড়ো হয়েছি।

মাশরাফির রেশ কাটতে না কাটতেই প্রথম আলো প্রথম পাতায় ছেপেছে সাকিব আল হাসানের সাক্ষাৎকার। সাকিব দেশে ফিরতে চান এবং মামলা মোকাবেলা করতে রাজি হলেও শর্ত দিয়েছেন তার দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে। সাকিবের কাছে এক কোটি টাকা চাঁদা চাওয়া হয়েছে এমন নিউজ ফটোকার্ড দিয়ে ছড়ানো হচ্ছে যাতে সাধারণ মানুষের সহানুভূতি পাওয়া যায়। মাশরাফির প্রতি মানুষের কিছুটা বেদনা কাজ করলেও সাকিবের প্রতি ঘৃণা থাকাটাই স্বাভাবিক কারণ তিনি শুরু থেকে আপাদমস্তক সুবিধাবাদী। নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে পরিবার পর্যন্ত ব্যবহার করেছেন এবং তার অপকর্ম কোনো পচা আওয়ামী নেতার চেয়ে কম নয়। অথচ সব মিলিয়ে তাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যেন মানুষ ধীরে ধীরে তার প্রতি সহানুভূতি অনুভব করে। এটাই বাংলাদেশের মিডিয়ার প্রকৃত দক্ষতা।

টেলিভিশন খুললে প্রতিটি টকশোতে একই আলোচনা শোনা যাচ্ছে: অন্তর্বর্তী সরকার দেশ বিক্রি করে দিয়েছে কিংবা আমেরিকা সব নিয়ে যাচ্ছে। অথচ হাওরে বন্যায় কৃষকের সব ধান ডুবে গেছে তা নিয়ে টকশোতে আলোচনা নেই কারণ যারা সেখানে আসেন তারা মূলত ধনিক শ্রেণি। চালের দাম বাড়লেও তাদের সমস্যা নেই তাই কৃষকের ট্রাজেডি তাদের এজেন্ডাতেও নেই। হাম নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অবহেলার সমালোচনা অবশ্যই হওয়া উচিত। আমরাও চাই গত দেড় বছরের যত অনিয়ম হয়েছে সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। কিন্তু একটা নিউজ মিডিয়া যদি একই সংবাদ বারবার প্রচার করে তাহলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠবেই।

সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো এখন হঠাৎ করে আওয়ামী লীগের দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা কমে গেছে। ব্যাংক লুট নিয়ে কোনো কথা নেই। হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার নিয়ে চিৎকার নেই। এমনকি শেখ হাসিনাকে নিয়ে যেসব টকশোতে আগে তীব্র ভাষায় কথা হতো সেখানেও এখন এক ধরনের নীরবতা। কিন্তু সারাদিন একটা psychological environment তৈরি করা হচ্ছে। যেন মানুষ ধীরে ধীরে বলতে শুরু করে - আগে যা ছিল খারাপ ছিল ঠিকই কিন্তু এখনো তো খুব ভালো কিছু হচ্ছে না।

এই ধরনের narrative নতুন কিছু না ; এটা একটা খুব পরিচিত খেলা যা ২৪-এর জুলাই মাসে আমরা একবার প্রত্যক্ষ করেছি। খেলাটার কৌশল অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু বারবার কার্যকর: প্রথমে মানুষকে এমনভাবে হতাশ করে তোলো যে তারা নিজেদের বিশ্বাস এবং আত্মবিশ্বাস সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে ফেলে, তারপর সেই বিধ্বস্ত মানুষের সামনে stability এবং নিরাপত্তার স্বপ্ন ছড়িয়ে দাও, এবং যখন তারা অস্থিরতায় ভুগছে তখন যেকোনো প্রতিশ্রুতি মেনে নিতে প্রস্তুত হয়ে যায় - সেই সুযোগে ধীরে ধীরে, অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পুরনো শক্তিকেই নতুন packaging-এ বাজারে ফেরত আনো। বাংলাদেশের মানুষ এখন সেই stage-টা পার করছে ।









মন্তব্য ০ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.