নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মানুষ মরে গেলে পঁচে যায় আর বেঁচে থাকলে বদলায়

সৈয়দ কুতুব

নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!

সৈয়দ কুতুব › বিস্তারিত পোস্টঃ

পণ্ডশ্রম

১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা গেল উড়ে,

কান না পেলে চার দেয়ালে মরব মাথা খুঁড়ে।

কান গেলে আর মুখের পাড়ায় থাকল কি-হে বল?

কানের শোকে আজকে সবাই মিটিং করি চল।

যাচ্ছে, গেল সবই গেল, জাত মেরেছে চিলে,

পাঁজি চিলের ভূত ছাড়াব লাথি-জুতো কিলে।

সুধী সমাজ! শুনুন বলি, এই রেখেছি বাজি,

যে-জন সাধের কান নিয়েছে জান নেব তার আজই।

মিটিং হল ফিটিং হল, কান মেলে না তবু,

ডানে-বাঁয়ে ছুটে বেড়াই মেলান যদি প্রভু!

ছুটতে দেখে ছোট ছেলে বলল, কেন মিছে

কানের খোঁজে মরছ ঘুরে সোনার চিলের পিছে?

নেইকো খালে, নেইকো বিলে, নেইকো মাঠে গাছে;

কান যেখানে ছিল আগে সেখানটাতেই আছে।

ঠিক বলেছে, চিল তবে কি নয়কো কানের যম?

বৃথাই মাথার ঘাম ফেলেছি, পণ্ড হল শ্রম।

নাগরিক কবি শামসুর রাহমানের এই ‘পণ্ডশ্রম’ কবিতাটি পড়েন নাই এমন মানুষ বাংলাদেশে খুঁজে পাওয়া কঠিন। শামসুর রহমান খুব সুন্দরভাবে বাংলাদেশের মানুষের চরিত্র এবং গুজবের পেছনে দৌড়াদৌড়ি নিয়ে একটা অসাধারণ কবিতা লিখে গেছেন। আজকের যুগেও এই কবিতাটির প্রাসঙ্গিকতা একটুও কমে নাই, বরং আরও বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশিরা , না এদের বাংলাদেশি বলব না, 'বাঙু'রা সারাদিন গুজব, ট্রল আর অ্যাক্টিভিজম করে বেড়ায়।

আজকে সকাল থেকে তেমনই একটা গুজবে পুরো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গরম হয়ে গিয়েছিল। আর তা হলো বিএ অনার্স লেভেলে বাংলা, ইতিহাস আর দর্শনসহ মোট ছয়টা সাবজেক্ট বাতিল হচ্ছে। নতুন খসড়া মডেল অনুযায়ী এগুলোকে বাদ দিয়ে এআই, সাইবার সিকিউরিটি, আউটসোর্সিং ইত্যাদি প্রযুক্তিভিত্তিক বিষয় যোগ করা হবে। খবরটা ছড়াল ইত্তেফাক থেকে। ৭৫ বছরের পুরনো পত্রিকা, তাই বিশ্বাসযোগ্যতা আছে, এই ধারণায় অনেকেই সেটা শেয়ার করলেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোন ইনসাইডার নাকি তাদের এই ইনফরমেশন দিয়েছে। এতেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবরটি ভাইরাল হয়ে যায় । বাঙুদের আর পায় কে? মাঠে নেমে পড়েছে ফটোকার্ড আর নিজের মাথামোটা ব্রেন নিয়ে সরকারের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করতে।

একজন নারী শিক্ষিকা লিখলেন, “একটা দেশের উচ্চ শিক্ষায় নাকি সেই দেশের প্রধান ভাষার সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন পড়ানো হবে না! শিক্ষা ব্যবস্থা ইতোমধ্যেই ধর্ম ব্যবসায়ী ও শিক্ষা ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দিয়ে কয়েকটা প্রজন্মকে জম্বী বানিয়ে তোলা হয়েছে! অবশিষ্টাংশও ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করছে! এরচেয়ে দেশের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিলেই পারে সরকার!”

আরেক প্রবাসী শিক্ষিকা নাহিদ আখতারের বক্তব্য : “যত খুশি নতুন কোর্স যুক্ত করার করেন কিন্তু এত জরুরী কিছু সাবজেক্ট কিভাবে বাদ দিলেন? এই সরকার শিক্ষা নিয়ে ফাইজলামি শুরু করছে। মূর্খুতামির একটা লিমিট থাকা উচিত। একদল অশিক্ষিত লোকজন শিক্ষা বিষয়ক সিদ্ধান্ত নিলে তো এমন হবেই। শিক্ষা নিয়ে এই ফাইজলামি বন্ধ করেন।”

আবার এর মধ্যেই লেখক ও ব্র্যান্ড কমিউনিকেশন প্রফেশনাল রাজীব হাসান লিখেছেন: “আমাদের রাষ্ট্রে ইতিহাস নিয়ে কতজন গবেষণাবিদ দরকার? বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কতজন গবেষক তৈরি করছে? কতজন বাংলা, ইতিহাস, দর্শনের শিক্ষক দরকার? বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পাস করে বের হচ্ছে কতজন? পৃথিবী এখন ডাটা ড্রিভেন। ডাটা দেখুন, সিদ্ধান্ত নিন। এরই মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিবৃতি দিয়ে বলেছে খবরটা সঠিক নয়। যদি এমন কোনো চিন্তাভাবনা করেও থাকে, জাতির বিপুল আবেগের কারণে সরকারকে পিছু হটতে হবে। সরকার এরই মধ্যে শিক্ষা কাঠামোয় বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। কারিগরি শিক্ষার দিকে জোর দিচ্ছে। এটাকে উৎসাহিত করুন। এ ধরনের বড় পরিবর্তন হুট করে সবাই মানতে পারে না। কিন্তু আমরা যে ধীরে ধীরে পরিবর্তন করব, সেই সুযোগই নেই। টাইম ইজ রানিং আউট।”

বাঙুদের যখন এই অবস্থা, ঠিক তখনই দেখা গেল খবরটা আসলে পুরোপুরি ভুয়া। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ ধরনের কোনো আলোচনাই করে নাই। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সচিবালয়ে সাংবাদিকদের স্পষ্ট করে বলেন, এটা পুরোপুরি ভিত্তিহীন ও বাস্তববিহীন। কোনো বিষয় বাতিলের কোনো সিদ্ধান্ত বা আলোচনা হয়নি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, এটা কীভাবে বাদ দেওয়া যায়?” এবং “আমি জানি না এই নিউজ কোথা থেকে এসেছে।” জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে তারা এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজবে কান না দিয়ে অফিশিয়াল সোর্স থেকে খবর নেওয়াই যে বুদ্ধিমানের কাজ, তা আরও একবার প্রমাণ হলো।

সরকার কেন এমন সিদ্ধান্ত নেবে? চাইলেই কি নেওয়া যায়? এসব সাবজেক্টে রানিং কী পরিমাণ স্টুডেন্ট আছে? কতজন টিচার আছে? বাঙুদের কাণ্ড দেখে মনে হচ্ছিল যেন কাল সকাল থেকেই বিভাগগুলোর দরজায় তালা ঝুলে যাবে। আরে ভাই, ওই বিষয়গুলোতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পড়ে। অনেক শিক্ষক আছেন, যাদের অনেকে আবার ওই বিষয় থেকেই বিসিএস ক্যাডার। পাবলিক ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করে কত স্টুডেন্ট বিসিএস ক্যাডার হচ্ছে এবং ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে উক্ত সাবজেক্টের টিচার হয়েছেন তার হিসাব রাখে বাঙুরা? এসব বিসিএস ক্যাডার রাস্তায় নেমে পড়বে যখন তাদের চাকরিতে টান পড়বে।

ঘটনা হলো, আমলারা একটা প্রস্তাব দিয়েছেন মাত্র। প্রস্তাব আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এক জিনিস না। তার ওপর শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিজেই বলেছে, বিষয় বাতিলের খবর ভিত্তিহীন। কিন্তু ততক্ষণে তো কিছু মানুষের ইউটিউব থাম্বনেইল আর ফেসবুক স্ট্যাটাস তৈরি হয়ে গেছে ! দেশে কোনো ফাইল এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে গেলেই কিছু লোক ভাবেন বিপ্লব হয়ে গেছে। বাস্তবতা হলো, এত সহজে কোনো বিষয় বাতিল করা যায় না। এটা হতে পারে যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ডের কর্মকর্তা হয়তো আলোচনা তুলেছেন, কিন্তু মনে রাখতে হবে প্রচুর বাংলা, ইতিহাস এবং আর্টস থেকে পাস করা লোক মন্ত্রণালয়ে আছেন। এরা চাইলেও এমনটা হতে দিবেন না। কিন্তু আমাদের বাঙুদের এত চিন্তাভাবনার টাইম কোথায়?

মন্তব্য ০ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.