নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মানুষ মরে গেলে পঁচে যায় আর বেঁচে থাকলে বদলায়

সৈয়দ কুতুব

নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!

সৈয়দ কুতুব › বিস্তারিত পোস্টঃ

ভারত ছাড়া আমাদের চলেই না ....

০৭ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৩:৩৫


ছবিতে যাকে দেখছেন তিনি জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হোসেন টুকু। জুলাইয়ের বিশ তারিখের পর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না, কোথায় ছিলেন কী করছিলেন কেউ জানত না। আজ হঠাৎ তিনি ফিরে এলেন, আর ফিরেই একেবারে শব্দবোমা ফাটালেন। ভারতের হাইকমিশনারের কাছে আরও বেশি ডিজেল চেয়ে বসলেন তিনি। ব্যস, টুকু সাহেব রাতারাতি ভাইরাল হয়ে গেলেন।

গতকালই বাংলাদেশ আর ভারতের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল তুঙ্গে। শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল মিটিংকে ঘিরে যে মাত্রার ভাঙচুর বা প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছিল, তেমন কিছুই আসলে ঘটেনি। আর ঠিক তার পরদিন সকালেই টুকু সাহেব হাজির হলেন, খবর দিলেন যে ভারতের কাছে ডিজেল চেয়েছেন। তাকে ধন্যবাদ জানানো উচিত, কারণ এভাবেই বোধহয় তিনি ভারতীয় আধিপত্যের মোকাবেলা করে যাচ্ছেন।

অথচ দেশে যখন গ্যাস আর বিদ্যুৎ সংকট চলছিল, তখন এই মানুষটাকে কোথাও দেখা যায়নি। খোদ বিএনপির নিজের লোকজনই শুরু থেকে তার কাজের মান নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। হয়তো জ্বালানি বিষয়ে তিনিই বিএনপির সবচেয়ে যোগ্য মানুষ, কিন্তু তার অতীতের রেকর্ড নিয়ে মানুষের মনে দুশ্চিন্তা থেকেই যায়। শোনা যায় আগের আমলেও ব্যর্থ হয়েছিলেন। তবে অন্যের কথায় হতাশ হয়ে বসে থাকতে চাই না। শাহরুখ খানের এক ছবির সংলাপ মনে পড়ে, পৃথিবী সবাইকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয়। সেই বিশ্বাস থেকেই চাই টুকু সাহেব সফল হোন। কিন্তু আজ পর্যন্ত তার জ্বালানি নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা কোনো পত্রিকায় বা কোনো সাক্ষাৎকারে চোখে পড়েনি।

এই মানুষটাই আজ ডিজেল চাইতে গিয়ে অন্তর্জালে ভাইরাল হয়ে গেলেন। গণমাধ্যম এই খবর প্রচার করে মিলিয়ন ভিউ কামিয়ে নিয়েছে। পালিয়ে থাকা লীগ নেতারা গর্তের ভেতর থেকেই উল্লাস করছে আর বলাবলি করছে , আমাদের নেত্রীর দূরদর্শিতাতেই আজ তারা ভারত থেকে হাত পেতে তেল আনার সুযোগ পাচ্ছে। আর টুকু সাহেবও যেন নিজের কাজ দিয়ে আওয়ামী লীগের সেই মিথ্যা বয়ানকেই সত্যি প্রমাণ করার জন্য মাঠে নেমে পড়েছেন।

ভারত থেকে আমরা মোট কত ডিজেল আনি? বছরে মাত্র চার লাখ পঞ্চাশ হাজার টন। অথচ টুকু সাহেবের কথা শুনলে মনে হয় দেশের পুরো ডিজেলের জোগানই বুঝি ভারত থেকে আসে। সাধারণ মানুষ এত হিসাব নিয়ে মাথা ঘামায় না, তারা সহজেই একটা মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত গল্পে বিভ্রান্ত হয়ে যায়। দেশে মোট ডিজেলের চাহিদা প্রায় ষাট লাখ টন। বাকি ডিজেল আমরা নিজেরা পরিশোধন করি অথবা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করি, কিন্তু সেই খবর কখনো এভাবে ভাইরাল হয় না। অথচ সংকট যখন চরমে ওঠে, গ্যাস আর বিদ্যুতের হাহাকারে দেশের মানুষের হাঁসফাঁস অবস্থা হয়, তখন টুকু সাহেবের টিকিটির দেখা মেলাও ভার ।

এদিকে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় প্রকল্পের খবর কে রাখে ? সর্বশেষ যা জানা গিয়েছিল তা হলো ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এক বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা দেবে। সরকারের তরফ থেকে নাকি সবকিছু চূড়ান্ত হয়ে গেছে, কাজ শুরু হবে ২০২৭ সালে আর শেষ হবে ২০৩০ সালে । পুরো প্রকল্পের খরচ পড়বে প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার কোটি টাকা। আইডিবির ঋণ বাদ দিলে বাকি টাকা কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়ে কোথাও কোনো আলোচনা নেই। টুকু সাহেবের মাথায় এ নিয়ে কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা তাও অজানা। ইপিসি ঠিকাদার খোঁজার জন্য টেন্ডার দেওয়া হয়েছিল বলে শোনা গিয়েছিল, কিন্তু তার কোনো আপডেট আজও চোখে পড়েনি। প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট হিসেবে দায়িত্বে আছে একটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান, ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেড।

এই প্রতিষ্ঠানটি ২০১৬ সাল থেকে এই রিফাইনারির পরামর্শক হিসেবে কাজ করছে। দশ বছর ধরে দায়িত্বে থেকেও প্রকল্পের কাজ কার্যত এগোয়নি। অথচ পরামর্শক ফি বাবদ ডলারে টাকা তারা ঠিকই নিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে বিপিসিএল যখন নুমালিগড় রিফাইনারিতে তাদের সাড়ে একষট্টি শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে দেয়, তখন অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেড আর ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেডের একটি জোট সেই শেয়ার কিনে নেয়। ফলে ইআইএল নুমালিগড়ে সরাসরি প্রায় সাড়ে চার শতাংশ শেয়ারের মালিক হয়ে যায়, আর সেই মালিকানা আজও বহাল আছে।

বাংলাদেশের এই রিফাইনারি প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে নুমালিগড় রিফাইনারিরও শেয়ারহোল্ডার, যে রিফাইনারি থেকেই পাইপলাইনে বাংলাদেশে ডিজেল রপ্তানি হয়। এখানেই একটা স্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়। যে প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের নিজস্ব রিফাইনিং সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্পে গতি এনে দেওয়ার দায়িত্বে আছে, সেই একই প্রতিষ্ঠানের নিজের বিনিয়োগ আছে এমন এক রিফাইনারিতে, যেটার ব্যবসা কমে যাবে যদি বাংলাদেশের নিজের রিফাইনারি সফল হয়। তাহলে এই প্রতিষ্ঠানের আসলেই কি প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার সদিচ্ছা থাকে, এই প্রশ্ন তোলাটা মোটেও অযৌক্তিক নয়।

এর মানে এই নয় যে ইচ্ছাকৃতভাবে দেরি করানো হয়েছে। তবে এই কাঠামোগত স্বার্থের সংঘাত নিয়ে পাবলিক অডিট বা সংসদীয় তদন্ত হওয়া দরকার, এটা একেবারেই যৌক্তিক দাবি। সরকার থেকে সরকার পর্যায়ের এমন পরামর্শক নিয়োগে সাধারণত স্বার্থের সংঘাত প্রকাশ করা আর নিয়মিত স্বাধীন পর্যালোচনা হওয়া উচিত ছিল। বাংলাদেশে এই ধরনের কোনো প্রকাশ্য পর্যালোচনা এই সরকারের আমলে দেখা যায়নি।

ভারত থেকে ডিজেল আনার এই পুরো প্রক্রিয়াটা আসলে দুই দিক থেকেই লোকসানের। একদিকে ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেড দশ বছর ধরে পরামর্শক ফি বাগিয়ে বসে আছে অথচ প্রকল্পের কাজ এগোয়নি। অন্যদিকে ঠিক একই সময়ে বাংলাদেশ ভারত থেকে, বিশেষ করে নুমালিগড় থেকে, ডিজেল আমদানি ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে, যেখানে সেই একই ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেডের শেয়ার রয়েছে। যদি রিফাইনারি প্রকল্পটা সময়মতো শেষ হতো, তাহলে বছরে মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হতো।

সরকার যদি সত্যিই এই নতুন রিফাইনারি বানাতে না পারে, তাহলে বরং প্রকল্পটা বন্ধ করে দিক, আর যেভাবে এখন আমদানি চলছে সেভাবেই চলুক। কারণ যে প্রকল্প শুরুতে সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকার ছিল, চৌদ্দ বছরে সেটা এখন দাঁড়িয়েছে একত্রিশ হাজার কোটি টাকায়, প্রায় চার গুণ বেশি। এমনকি সবশেষ প্রাক্কলন ছিল তেতাল্লিশ হাজার কোটি টাকা, যা থেকে বারো হাজার কোটি টাকা কমিয়ে একত্রিশ হাজারে নামানো হয়েছে।

খরচ বাড়া আর সময় পেরিয়ে যাওয়া এই দুটো ব্যাপার একসঙ্গেই চলছে। যত দেরি হচ্ছে, নির্মাণসামগ্রী, শ্রম আর প্রযুক্তির দাম তত বেড়ে যাচ্ছে, ফলে প্রকল্পের খরচও বেড়ে যাচ্ছে। এটা একটা দুষ্টচক্রের মতো, দেরি হলে খরচ বাড়ে, খরচ বাড়লে অর্থায়নে জটিলতা তৈরি হয়, আর তাতে আরও দেরি হয়। আর এই পুরো সময় জুড়ে বাংলাদেশ ডিজেল আমদানি চালিয়ে যাচ্ছে, যার একটা অংশ যাচ্ছে সেই একই নুমালিগড় রিফাইনারিতে, যেখানে ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেডের শেয়ার রয়েছে।

ফটোকার্ড ক্রেডিট : ইত্তেফাক










মন্তব্য ৮ টি রেটিং +২/-০

মন্তব্য (৮) মন্তব্য লিখুন

১| ০৭ ই আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৬:১৯

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: ইতিহাস বলে আমরা বুদ্ধিতে ভারতের থেকে কম ছিলামনা ।
এখন কেন আমরা প্রতিক্ষণ মার খাচ্ছি ?
কারণ আমরা বিভ্রান্ত , আমরা স্বার্থপর, আমরা মীর জাফর হয়ে গেছি ।

২| ০৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:৫০

মাথা পাগলা বলেছেন: সংকটের সময় ভারত বারবারই বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য বন্ধুর পরিচয় দিয়েছে।

আগে শুনতাম দেশবিরোধী চুক্তি অনুযায়ী এই পাইপলাইন দিয়ে হাসিনা সমস্ত গ্যাস ভারতে পাচার করতো। হাসিনা পতনের পর বাঙ্গু সোনাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত ছিলো এই পাইপলাইন ভাঙ্গা। এখন ভারতে কাছেই আরো বেশি তেল চায়, পাকিস্তান কি দোষ করলো? এদের লজ্জা শরম কিছু নাই।


শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল মিটিংকে ঘিরে যে মাত্রার ভাঙচুর বা প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছিল, তেমন কিছুই আসলে ঘটেনি।

শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সম্মেলনে জয়েন করার অপরাধে সাকিব আল হাসানের বাড়ি জঙ্গি সোনারা ভেঙ্গে দিয়েছে। যারা জাতির পিতাকে সপরিবারে শিশু সন্তানসহ নির্মমভাবে হত্যা করতে পারে তাদের পক্ষে সবই সম্ভব। সাকিব আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুপরিচিত। যার কারণে এই সংবাদ আন্তর্জাতিকমহলে বেশভালোভাবেই প্রচার হয়েছে এবং বাংলাদেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র বলার চেষ্টা চলছে।

৩| ০৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:৫৪

রাসেল বলেছেন: অবাক পৃথিবী, অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়! দেশপ্রেমের বুলি যত জোরে, স্বার্থের হিসাব তত গভীরে। শক্তির খেলায় পিষ্ট হয় শুধু সাধারণ মানুষ।

৪| ০৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৫৭

অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য বলেছেন: ব্যক্তি টুকুর আগের রেকর্ডও ভালো না। তাও একই পদে এবার।

৫| ০৭ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৪:১৪

রাজীব নুর বলেছেন: ভারতকে বন্ধু ভাবতে সমস্যা কি আপনার?

০৭ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৪:২৪

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: বাংলাদেশের স্বার্থ সবার আগে ।

৬| ০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:২৫

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:



পোস্টের লেখা পাঠে আমার মনে পড়ে যায় আমার দেখা ফিল্ম অশনি সংকেতের কথামালা । সত্যজিৎ রায় ছবিটি
নির্মাণ করেন ১৯৭৩ সালে, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে। ছবিটি ১৯৭৩ সালের
বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন বেয়ার পায়।

আমার বিবেচনায় , অশনি সংকেত এর রাজনীতি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রচার বা মতাদর্শের রাজনীতি নয়;
বরং এটি রাষ্ট্র, যুদ্ধ, অর্থনীতি ও সামাজিক ক্ষমতার কাঠামোর কারণে কীভাবে একটি দুর্ভিক্ষ বা অভাব মানুষের তৈরি
বিপর্যয় এ পরিণত হয় তার রাজনীতি।

কয়েকটি স্তরে বিষয়টি বোঝা যায়।১৯৪৩-এর বাংলার দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। যুদ্ধের প্রয়োজন
মেটাতে খাদ্য ও অন্যান্য সম্পদের ওপর চাপ, প্রশাসনিক নীতি এবং বাজারব্যবস্থার বিপর্যয় সব মিলিয়ে সাধারণ
মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তি ভয়াবহভাবে সংকুচিত হয়েছিল। ফলে ছবির প্রশ্নটা কেবল খাবার নেই কেন? নয়; বরং খাবার
থাকা সত্ত্বেও মানুষ না খেয়ে মরছে কেন?

এই জায়গাটিই ছবিটিকে গভীর রাজনৈতিক করে তোলে। যুদ্ধের কিংবা কুটনীতির রাজনীতি গ্রামে কীভাবে পৌঁছায়
এটাই ছিল ছবির অসাধারণ দিক। সত্যজিৎ যুদ্ধক্ষেত্র দেখাননি। কোনো সেনাবাহিনী, যুদ্ধের দৃশ্য বা বড় রাজনৈতিক
বক্তৃতাও নেই। তিনি দেখিয়েছেন একটি প্রত্যন্ত গ্রাম যেখানে প্রথমে মানুষ বুঝতেই পারে না যে তাদের চারপাশে
একটি ভয়ংকর বিপর্যয় তৈরি হচ্ছে।

এটাই ছবির ‘অশনি সংকেত’ বিপদ আসছে, কিন্তু সাধারণ মানুষ প্রথমে তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণটি
বুঝতে পারে না।অর্থাৎ, দিল্লি/লন্ডন/যুদ্ধের সিদ্ধান্তের অভিঘাত এসে পড়ে বাংলার একটি ক্ষুদ্র গ্রামের হাঁড়িতে।
অভাব মানুষকে শুধু ক্ষুধার্ত করে না , সমাজের নৈতিক কাঠামোকেও ভেঙে দেয়, এটি ছবিটির সবচেয়ে শক্তিশালী
রাজনৈতিক বক্তব্যগুলোর একটি।

প্রথমদিকে মানুষ একে অপরের সাহায্য করে, সামাজিক সম্পর্ক স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু খাদ্য ক্রমশ দুর্লভ হয়ে গেলে
চাল হয়ে ওঠে ক্ষমতার বস্তু, নারীর নিরাপত্তা বিপন্ন হয়, মানুষ গ্রাম ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়, নৈতিকতার পুরনো নিয়ম
দুর্বল হয়ে পড়ে, জাতপাতের সীমারেখা বদলে যায়, বেঁচে থাকার প্রবৃত্তি অনেক সময় মানবিকতাকে ছাপিয়ে যায়।
অর্থাৎ নিত্য পন্য ও সেবার অভাব শুধু পেটের সমস্যা নয়; এটি একটি সমাজব্যবস্থার সংকট, রাজনীতির সংকট
রাস্ট্রের সংকট ।

সত্যজিৎ রায় ছবিটিকে ব্রিটিশবিরোধী বা রাষ্ট্র বিরোধি রাজনৈতিক বক্তৃতা বানাননি। এ ছবিতে তিনি দর্শককে বলেননি
এই পক্ষ ভালো, ওই পক্ষ খারাপ। বরং দেখিয়েছেন, ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে নেওয়া সিদ্ধান্তের সবচেয়ে ভয়াবহ মূল্য কে
দেয় সেটি।

এই কারণে ‘অশনি সংকেত’ এর রাজনীতি অনেকটা মানুষের পেটের রাজনীতি খাদ্য কে পাবে, কে পাবে না; কার
সামাজিক মর্যাদা তাকে একটু বেশি সুবিধা দেবে; বাজারে কার হাতে ক্ষমতা; এবং রাষ্ট্রীয়/যুদ্ধকালীন ব্যবস্থার বোঝা
শেষ পর্যন্ত কার ওপর গিয়ে পড়বে।
অশনি সংকেত’এর মূল রাজনৈতিক বক্তব্য চিল একটি মহা অভাব কেবল প্রকৃতির অভিশাপ নয় যুদ্ধ, রাষ্ট্রীয় নীতি,
বাজার, সম্পদের বণ্টন এবং সামাজিক বৈষম্যের সম্মিলিত ফলেও একটি সংকটকালীন অবস্থা তৈরি হতে পারে।

এখন এটিকে বাংলাদেশের বর্তমান দৃর্যোগতুল্য খাদ্য শস্য , ভোগের পন্য ও জ্বালানী তেলের মত পন্য সামগ্রি অভাব
তা মিটানোর জন্য ভারতের দিল্লীর সাথে ঢাকার কুটনৈতিক কলাকৌশলী পুর্ণ হেয়ালীপনা কর্যকলাপের ফলে যেমনটি
এই পোস্টের লেখায় ফুটে উঠেছে ।

আমি ইচ্ছাকৃতভাবে এটিকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রচারপত্র না করে জনস্বার্থ, খাদ্য
নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক বাস্তবতার সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছি।

ভাবছি অশনি সংকেত; খাদ্য, জ্বালানি ও কূটনীতির ভুল খেলায় বাংলাদেশ কি নতুন সংকটের দিকে এগোচ্ছে?
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অশনি সংকেত’ কেবল একটি দুর্ভিক্ষের গল্প নয়। সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে আমরা
দেখি একটি বিপর্যয় শুরু হওয়ার অনেক আগেই তার লক্ষণ দেখা যায়। কিন্তু সাধারণ মানুষ তখনও বুঝতে পারে না
সামনে কী ভয়াবহতা অপেক্ষা করছে।

প্রথমে চালের দাম বাড়ে।তারপর বাজারে সরবরাহ কমে।তারপর মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।তারপর প্রয়োজনীয়
পণ্য দুর্লভ হয়ে ওঠে।এবং একসময় বোঝা যায় সমস্যাটি আর কোনো একক পণ্যের নয়; সমস্যাটি পুরো জীবনযাত্রার নিরাপত্তার।আজকের বাংলাদেশে তাই ‘অশনি সংকেত’ কথাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উপমা হয়ে উঠতে পারে।
খাদ্য ও জ্বালানি দুটিই জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়, একটি দেশের খাদ্যশস্য, ভোজ্যপণ্য, সার, জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের
সরবরাহ যদি বহুলাংশে আমদানিনির্ভর হয়, তাহলে বৈদেশিক সম্পর্কের টানাপোড়েন আর কেবল পররাষ্ট্রনীতির
বিষয় থাকে না। তার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের রান্নাঘর, পরিবহন, কৃষি, বাজার ও কর্মসংস্থানে।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে ভারতের ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ভরতা তৈরি করেছে। ২০২৬
সালে ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে একাধিক দফায় ডিজেল এসেছে;
মার্চ-এপ্রিলেই কয়েক দফায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল সরবরাহের খবর প্রকাশিত হয়েছে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার অস্থিরতার মধ্যেও ভারত বাংলাদেশকে অতিরিক্ত
জ্বালানি সরবরাহের অনুরোধ মেটানোর কথা জানিয়েছে।

অর্থাৎ বাস্তবতা হলো বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু ঢাকার অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে না;
আন্তর্জাতিক বাজার এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কও তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই জায়গাতেই কূটনীতি ব্যর্থ হলে অর্থনীতির ওপর তার অভিঘাত পড়তে পারে।

অশনি সংকেত ঠিক কোথায়? সম্প্রতি ঢাকা-দিল্লির রাজনৈতিক সম্পর্কেও নতুন করে টানাপোড়েন দেখা যাচ্ছে।
ভারতের মাটিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা
বেড়েছে; বাংলাদেশ এ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে এবং ভারত বলেছে, ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন বা বক্তব্যের সঙ্গে
তাদের সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা বা অনুমোদন ছিল না। এই রাজনৈতিক বিরোধকে যদি খাদ্য, জ্বালানি বা
প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহের সঙ্গে এক করে দেখা হয়, তাহলে বিপদ আরও বড় হতে পারে।

কারণ কূটনীতিতে রাজনৈতিক মতপার্থক্য সাময়িকভাবে সামলানো যায়; কিন্তু বাজারে চাল, ডাল, তেল, জ্বালানি
বা বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হলে তার অভিঘাত সরাসরি মানুষের জীবনে পড়ে।

‘অশনি সংকেত’এর শিক্ষা এখানেই।দুর্ভিক্ষ একদিনে আসে না।সংকট আগে আসে বাজারে।
তারপর আসে মানুষের মনে।তারপর আসে পরিবারের বাজেটে।তারপর আসে সামাজিক সম্পর্কে।
সবশেষে তার রাজনৈতিক অভিঘাত দেখা যায়।

সবচেয়ে বড় বিপদ অভাবের আগে যদি অনিশ্চয়তা আসে। মানুষ যখন নিশ্চিত থাকে যে আগামীকাল বাজারে
চাল পাওয়া যাবে, পেট্রল-ডিজেল পাওয়া যাবে, বিদ্যুৎ থাকবে এবং প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বজায় থাকবে
তখন সাময়িক মূল্যবৃদ্ধিও কোনোভাবে সামলে নেওয়া যায়।কিন্তু যখন মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি হয় আগামী
সপ্তাহে কী হবে? তেলের সরবরাহ থাকবে তো?চালের দাম আর কত বাড়বে? বিদেশ থেকে পণ্য আসবে তো?
তখন অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে একটি মনস্তাত্ত্বিক সংকটও শুর হয়।ব্যবসায়ী মজুত বাড়াতে চান।ভোক্তা
প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনতে চান।পরিবহন খরচ বাড়ে।কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ে।খুচরা বাজারে দাম
বাড়ে।
এভাবেই একটি সরবরাহ-সমস্যা ধীরে ধীরে মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক অস্থিরতার সমস্যায় পরিণত হতে পারে।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আবেগ নয়, জাতীয় স্বার্থের হিসাব প্রয়োজন। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ভারত
ভালো না খারাপএটি নয়।প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ কি তার খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে এমনভাবে পরিচালনা করছে,
যাতে কোনো একটি দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি হলেও সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন না হয়?
ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সুতরাং প্রয়োজন এমন কূটনীতি যেখানে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু নির্ভরশীলতা একমুখী হবে না।

বাংলাদেশকে একই সঙ্গে ভারত, চীন, মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক বাজার সব দিকেই বাস্তববাদী
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। খাদ্যশস্য, জ্বালানি, সার ও অপরিহার্য পণ্যের জন্য বিকল্প উৎস তৈরি
করতে হবে।কারণ একটি দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ হলে যদি একটি দেশের মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত তার
অভিঘাত পৌঁছে যায়, তাহলে সেটি শুধু কূটনৈতিক দুর্বলতা নয় এটি জাতীয় নিরাপত্তার দুর্বলতা।

অশনি সংকেত’ মানেই দুর্ভিক্ষ আসছে এ কথা নয়, এখানে একটি সতর্কতা জরুরি।এখানে ‘অশনি সংকেত’
বলতে বোঝানো হচ্ছে বিপদের সম্ভাব্য পূর্বলক্ষণ, তাই সতর্ক হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে:
খাদ্যনিরাপত্তা + জ্বালানি নিরাপত্তা + বৈদেশিক মুদ্রা + আমদানিনির্ভরতা + কূটনৈতিক উত্তেজনা = সম্ভাব্য ঝুঁকির সমষ্টি।
এগুলোর কোনো একটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে অন্যগুলোর ওপরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

আজকের সতর্কবার্তাটি তাই খুব সহজ,দিল্লির সঙ্গে ঢাকার কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে মতপার্থক্য থাকতেই পারে।
কিন্তু সেই মতপার্থক্যের কারণে যেন খাদ্যশস্যের সরবরাহ ব্যাহত না হয়, প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের বাজার অস্থির
না হয়, জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত না হয়, কৃষি ও পরিবহন খাত বিপর্যস্ত না হয়, এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের
জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় পর্যায়ে না পৌঁছায়। কারণ রাজনীতির ভুলের মূল্য রাজনৈতিক নেতারা সবসময় দেন না।
অনেক সময় সেই মূল্য দিতে হয় বাজারের সাধারণ ক্রেতাকে, কৃষককে, শ্রমিককে, পরিবহনকর্মীকে এবং মধ্যবিত্ত
পরিবারকে।

‘অশনি সংকেত’-এর সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটাই বিপর্যয় যখন চোখে দেখা যায়, তখন অনেক সময় তার
প্রতিরোধের সবচেয়ে ভালো সময়টি ইতিমধ্যে চলে গেছে।তাই আজই যদি খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বহুমুখী আমদানি-ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত সরকারি মজুত এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি নিশ্চিত করা
না যায়, তাহলে ভবিষ্যতের কোনো একদিন মানুষ হয়তো পেছনে ফিরে বলবে সংকট তো হঠাৎ আসেনি;
অশনি সংকেত অনেক আগেই দেখা গিয়েছিল আমরা শুধু তা পড়তে পারিনি।

এটাই আজকের বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।

শুভেচ্ছা রইল

৭| ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৬

রাজীব নুর বলেছেন: পোষ্টে আবার এলাম। কে কি মন্তব্য করেছেন, সেটা জানতে।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.