| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!

গফুর মিয়া অভাবের তাড়নায় গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় এসেছিল। সংসারে মানুষ মোট ছয়জন, গফুর, তার স্ত্রী আর চার সন্তান। দুই সন্তান হওয়ার পর তার স্ত্রী আর সন্তান নিতে চায়নি। সে গফুরকে বলেছিল, “দুইজনকেই তো ঠিকমতো খাওয়াতে পারি না, আর সন্তান নিলে সংসার চলবে কীভাবে।” গফুর বলেছিল, “মুখ দিয়েছেন যিনি, আহারও দেবেন তিনি।” কিন্তু আহার দেওয়ার দায়িত্বটা যে শেষ পর্যন্ত তার নিজের ঘাড়েই এসে পড়বে, সেটা এখন হাড়ে হাড়ে টের পায় সে।
বেশি সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে গফুরের স্ত্রীও প্রায় সময় অসুস্থ থাকত। শরীরে রক্ত কম ছিল, খাবারের অভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তবু সংসারের সব কাজ তাকেই করতে হতো। গফুর ও তার বউ এক আধবেলা খেত আর বাকি সময় উপোস থাকত। কিন্তু ছোট বাচ্চাদের পক্ষে তো আর না খেয়ে থাকা সম্ভব নয়। সন্ধ্যা হলেই তারা ক্ষুধায় কান্নাকাটি শুরু করত। গফুর তখন তাদের বুঝিয়ে বলত, “আর একটু কষ্ট কর, সব ঠিক হইয়া যাইব।” কীভাবে ঠিক হবে, সেটা অবশ্য সে নিজেও জানত না।
গফুর ঠিক করল, গ্রামে আর থাকা যাবে না, ঢাকায় যেতে হবে। তার বিশ্বাস, বড় শহরে গেলে কাজ পাওয়া যাবে, সন্তানদের পেট ভরে খাওয়াতে পারবে। ঢাকায় পা রাখার পর গফুর কিছুক্ষণ অবাক হয়ে চারদিকে তাকিয়ে রইল। এত মানুষ সে জীবনে একসঙ্গে দেখেনি। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি দোকান, কোথাও বিরিয়ানি, কোথাও ভাত মাংস, কোথাও নান পরোটা, আর মানুষ দোকানের সামনে বসে খাচ্ছে, কেউ একা, কেউ দল বেঁধে।
গ্রামে এত মানুষকে একসঙ্গে খেতে সে কোনোদিন দেখেনি। তার মনে বিশ্বাস জন্মালো, আর না খেয়ে থাকতে হবে না। তার স্ত্রী গরমে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “আগে থাকার জায়গাটা ঠিক করো, বাচ্চাগুলা দুই দিন ধরে ঠিকমতো খায়নি।” গফুর চার সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আর একটু কষ্ট কর, ঢাকায় আইছি যখন, দিন অবশ্যই ফিরব।”
গফুরের এক আত্মীয় মিরাজ মণ্ডল ঢাকার একটি বস্তিতে থাকত। তার সঙ্গে পরামর্শ করেই মূলত গফুর ঢাকায় এসেছিল। কয়েকদিন স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে মিরাজের ঘরেই থাকতে হলো। এক সন্ধ্যায় মিরাজ কাজ শেষে বাড়ি ফিরলে দুজন বসে আলাপ করল। মিরাজ জিজ্ঞেস করল, “কী করবি ভাবছিস, ব্যবসা করবি নাকি অটো চালাবি?” গফুর মাথা নাড়িয়ে বলল, “ঢাকা শহর কিছুই চিনি না, অটো চালাইলে পথ হারায়া ফেলব।” “তাহলে কী করবি?” জিজ্ঞেস করলে গফুর বলল, “আমি আর আমার বউ মিলে খাবারের দোকান দেব, রাস্তার পাশে, কম দামে মানুষরে খাওয়াব।”
মিরাজ জিজ্ঞেস করল, “কী খাবার?” গফুর বলল, “ভাতের হোটেল, ভাত আর গরুর মাংস।” মিরাজ বলল, “বাজারে মাংসের দাম যে চড়া, লাভ করবি কীভাবে?” গফুর শান্তভাবে বলল, “লাভ কম হবে, বিক্রি বেশি হবে।” মিরাজ বুঝল, গফুরের মাথায় জিদ চেপে বসেছে, সে আর গফুরকে তেমন কিছু বলল না।
পরদিন মিরাজ বস্তিতে হালিম বিক্রি করা মাসুদ নামের এক লোকের সঙ্গে কথা বলল, কোথা থেকে কম দামে মাংস পাওয়া যায়, কীভাবে খরচ কমানো যায়, খোঁজ নিল। পরে নিজের জিম্মায় সুদের ওপর কিছু টাকা জোগাড় করে গফুরকে দিল। কয়েকদিন পর রাস্তার পাশে ছোট্ট একটা খাবারের দোকান খুলে গেল। বড় কোনো নাম নেই, বড় কোনো সাইনবোর্ডও নেই, শুধু সামনে লেখা, “ভাত আর গরুর মাংস একশো টাকা, ভাত আনলিমিটেড।” গফুরের নীতি ছিল সহজ, লাভ কম, বিক্রি বেশি।
রিকশাচালক, শ্রমিক, পথচারী, নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ, যারা কম টাকায় পেট ভরে খেতে চায়, তারা গফুরের দোকানে আসতে লাগল। একশো টাকায় ভাত আর গরুর মাংস খাওয়া তাদের কাছে কম নয়। গফুর দোকানের এক পাশে বসে মানুষকে খেতে দেখত। কেউ ভাত মাখছে, কেউ মাংসের ঝোল দিয়ে ভাত খাচ্ছে। গফুর মনে মনে ভাবত, “আহারে পেট, এই পেটের জন্য মানুষ কত পাপ কাজ করে, মানুষ মানুষরে ঠকায়, মিথ্যা বলে, ঘুষ খায়, চুরি করে, সবই এই পেটের জন্য।”
সিরাজ নামের এক তরুণ কনটেন্ট ক্রিয়েটর রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল গফুরের দোকানের সামনে লেখা কথাটার দিকে, ভাত আর গরুর মাংস মাত্র একশো টাকা। সিরাজের মাথায় সঙ্গে সঙ্গে একটা ভিডিওর চিন্তা এলো। সে গফুরকে জিজ্ঞেস করল, “ভাই, একটা ভিডিও বানাই?” গফুর বুঝতে পারল না ভিডিও দিয়ে কী হবে, তবু রাজি হয়ে গেল। সিরাজ ভিডিও বানিয়ে ক্যাপশন দিল, “ঢাকার মধ্যে সবচেয়ে কম দামে গরুর মাংস পাওয়া যায় যে হোটেলে।” গফুরের দোকান ভাইরাল হয়ে গেল।
দূরদূরান্ত থেকে কনটেন্ট ক্রিয়েটররা আসতে লাগল, তাদের সঙ্গে সাংবাদিক, ফুড ব্লগার আর নানা ধরনের মানুষ। কেউ বলছে, “আজকে আমরা এসেছি ঢাকার সবচেয়ে ভাইরাল একশো টাকার গরুর মাংস খেতে”, কেউ আবার বলছে, “বন্ধুরা, এতদিন এই দোকানটা মানুষের চোখের আড়ালে ছিল।” গফুর প্রথমে খুব খুশি হলো, তার মনে হলো সে বড় হয়ে যাচ্ছে, মানুষ তাকে চিনছে, তার দোকানের নাম হচ্ছে। কিছুদিন পর সে বুঝতে পারল, সবাই আসছে ঠিকই, কিন্তু সবাই টাকা দিয়ে খাচ্ছে না। অনেক কনটেন্ট ক্রিয়েটর প্রচারের নাম করে ফ্রিতে খেয়ে যাচ্ছে, কেউ এক প্লেট, কেউ দুই প্লেট, কেউ আবার কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে এসে বলছে, “ভাই, আপনার দোকান আমরা ভাইরাল করে দিচ্ছি।”
গফুর এসব দেখে খুশিই হতো, কিন্তু তার স্ত্রী ব্যাপারটা একদম ভালো চোখে দেখত না। সে গফুরকে জিজ্ঞেস করল, “এই যে এত মানুষ আসে, সবাই কি খায়?” গফুর বলল, “খায় তো।” “টাকা দেয়?” জিজ্ঞেস করলে গফুর চুপ করে রইল। তার স্ত্রী বলল, “তাহলে আসে ক্যান?” গফুর বলল, “প্রচার করতে।” তার স্ত্রী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “প্রচার দিয়া সংসার চলে না।” গফুর কোনো উত্তর দিল না। তার মাথায় তখন ভাইরাল হওয়ার নেশা ঢুকে গেছে।
কোনো কনটেন্ট ক্রিয়েটর দোকানের সামনে ক্যামেরা ধরলেই সে খুশি হয়ে যেত, এদিকে আসল ক্রেতারা ধীরে ধীরে দোকানে আসা কমিয়ে দিয়েছে। যে মানুষগুলো একশো টাকা দিয়ে শান্তিতে ভাত খেতে আসত, তারা এখন দোকানে এসে চারদিকে ক্যামেরা দেখে বিরক্ত হয়, কেউ কেউ অন্য দোকানে চলে যেত। কিন্তু গফুরের সেদিকে নজর ছিল না, সে ভাবত দোকানের নাম যত ছড়াবে, ব্যবসা তত বাড়বে।
ঠিক তখনই এক সকালে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ করিম পত্রিকা পড়তে পড়তে গফুরের খবর দেখতে পেলেন। খবরটা পড়ে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, তারপর বললেন, “একশো টাকায় দুপুরের খাবার।” পাশে থাকা আরেক উপদেষ্টা বললেন, “জি স্যার।” রাশেদ করিম বললেন, “প্রধানমন্ত্রী যদি একশো টাকায় দুপুরের খাবার খান, তাহলে কেমন হয়?” আরেক উপদেষ্টা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “স্যার, দারুণ আইডিয়া।”
রাশেদ করিম বললেন, “দেশের মানুষকে দেখাতে হবে এই সংকটের সময় প্রধানমন্ত্রীও সাশ্রয় করছেন, মানুষ জানুক প্রধানমন্ত্রী নিজেও খরচ কমিয়ে চলছেন।” একজন উপদেষ্টা জিজ্ঞেস করলেন, “স্যারকে আগে জানানো উচিত হবে কি ?” রাশেদ করিম মাথা নাড়িয়ে বললেন, “না, আমাদের পক্ষ থেকে এটা স্যারের জন্য সারপ্রাইজ গিফট হবে, আমরা উনাকে কতটা ভালোভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছি, সেটা উনি জানতে পারলে খুশি হবেন।”
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রচারণা শুরু হয়ে গেল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট হলো, টেলিভিশনে আলোচনা হলো, পত্রিকায় খবর ছাপা হলো। সব জায়গায় একই কথা, দেশের সংকটের সময়ে প্রধানমন্ত্রী সাশ্রয়ী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তিনি দুপুরে মাত্র একশো টাকার লাঞ্চ করছেন। প্রধানমন্ত্রীর চোখে সেই প্রচারণা পড়ল, তিনি উপদেষ্টাদের ডেকে পাঠালেন, জিজ্ঞেস করলেন, “এগুলো কী প্রচার করছেন?” রাশেদ করিম বিনয়ের সঙ্গে বললেন, “স্যার, দেশের মানুষের জানা দরকার আপনি দেশের জন্য কী করছেন।”
প্রধানমন্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, “এতে কী হবে?” রাশেদ করিম বললেন, “মানুষকে বুঝতে শিখবে যে সংকটের সময়ে বেশি খরচ করা যাবে না, খাবার কম খেলে আমদানি খরচ কমবে, ডলার সাশ্রয় হবে।” প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করলেন, “এতে কি সত্যিই কাজ হবে?” সকল উপদেষ্টা একসঙ্গে বলে উঠলেন, “অবশ্যই হবে স্যার।”
ঠিক তখনই জ্বালানি মন্ত্রী এসে ঘরে ঢুকলেন, তার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল পরিস্থিতি ভালো নয়। তিনি বললেন, “স্যার, অবিলম্বে কিছু একটা করতে হবে, আমার পক্ষে জ্বালানি সংকট আর সামলানো সম্ভব হচ্ছে না।” প্রধানমন্ত্রী ক্লান্ত গলায় বললেন, “আপনারা সবাই মিলে একটা সিদ্ধান্ত দেন, আমার মাথায় কোনো বুদ্ধি খেলছে না।” রাশেদ করিম কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, “স্যার, আজকের পত্রিকায় দেখলাম অটোরিকশা আর রাস্তার পাশের দোকানগুলো অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে, তাদের কারণে বিদ্যুৎ সংকট বাড়ছে, অটোরিকশা বন্ধ করা আর রাস্তার দুই পাশের ফুটপাতের দোকানগুলো উচ্ছেদ করলে সমস্যার সমাধান হতে পারে।” প্রধানমন্ত্রী বললেন, “দেখেন, আপনারা যা ভালো মনে করেন।”
পরদিন সিটি করপোরেশনের মেয়র, জ্বালানি মন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক হলো। রাশেদ করিম নিজেই একটি এলাকার নাম বলে দিলেন, “এখান থেকে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেন।” কয়েক ঘণ্টা পর সেই এলাকায় পুলিশ পৌঁছে গেল।
গফুর তখন দোকানে বসে, দুপুরের সময়, কয়েকজন কাস্টমার খাচ্ছে। হঠাৎ কয়েকজন পুলিশ এসে দোকানের সামনে দাঁড়াল, “দোকান বন্ধ কর।” গফুর অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “ক্যান?” পুলিশ বলল, “অবৈধ দোকান, ফুটপাত দখল করে বসেছিস।” গফুর বলল, “আমি তো জায়গার ভাড়া দিই।” পুলিশ জিজ্ঞেস করল, “কাকে?” গফুর বলল, “সফিক মোল্লারে।” পুলিশ হেসে বলল, “শালা সরকারি জায়গা, তুই কার কাছ থেকে ভাড়া নিস?” গফুর বলল, “আমি নিজের ইচ্ছায় এখানে দোকান দেই নাই, সফিক মোল্লা জায়গা দিছে, মাসে মাসে টাকা নিছে, আমার ভাড়ার টাকা ফেরত দেন, তারপর দোকান ছাড়ুম।” পুলিশ বলল, “যা ভাগ, দোকান বন্ধ কর।” গফুর নড়ল না, বলল, “সফিক মোল্লা না আসা পর্যন্ত দোকান ছাড়ুম না।”
পুলিশ দোকানে তল্লাশি শুরু করল, কিছুক্ষণ পর তারা অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ খুঁজে পেল। একজন পুলিশ চিৎকার করে বলল, “এই তো, অবৈধ বিদ্যুৎ।” সংযোগ ছিঁড়ে ফেলা হলো, দোকানের কিছু মালামালও মাটিতে পড়ে গেল। গফুর ছুটে গিয়ে বলল, “আমার দোকান নষ্ট কইরেন না।” একজন পুলিশ তাকে ধাক্কা দিল। গফুরও রাগ সামলাতে পারল না, এক কনস্টেবলকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল। এরপর মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি বদলে গেল, কয়েকজন পুলিশ একসঙ্গে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, মারতে মারতে তাকে দড়ি দিয়ে কোমরে বেঁধে নিয়ে গেল।
গফুরের স্ত্রী ছুটে এসে পুলিশের পায়ে ধরে কাঁদতে লাগল, “আমার স্বামীরে ছাইড়া দেন।” একজন পুলিশ রেগে গিয়ে বলল, “তোর স্বামীর কত সাহস যে পুলিশের গায়ে হাত দেয়, এবার মজা বুঝবি।” গফুরের তখন কোমরে দড়ি বাঁধা। সে স্ত্রীকে বলল, “তুই কারও পা ধরিস না, আমি কোনো অন্যায় করি নাই।” তারপর বলল, “তুই মিরাজ ভাইয়ের কাছে যা, আর সফিক মোল্লারে খুঁজে বাইর কর, জিগাইস জায়গা যদি সরকারি হয়, তাইলে সে মাসে মাসে ভাড়া নেয় কেমনে।” পুলিশ গফুরকে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে গেল।
সন্ধ্যার সংবাদে এলো, “ভাইরাল একশো টাকার ভাত মাংসের দোকানের মালিক গফুর গ্রেপ্তার।” প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ করিম তখন টেলিভিশনের সামনে বসে ছিলেন। খবরটা দেখে তিনি মৃদু হাসলেন।
©somewhere in net ltd.