| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
বাংলাদেশে কোনো অর্থমন্ত্রীর বিদায়ের পর একটা জিনিস প্রায় দেখা যায় । তাঁর একটা লিগ্যাসি তৈরি হয় । স্মরণসভার মতো পত্রিকায় “যুগান্তকারী সংস্কার”, “সাহসী সিদ্ধান্ত”, “দূরদর্শী নেতৃত্ব” টাইপ শব্দ বারবার ব্যবহার করা হয় । কেউ না কেউ বলতে শুরু করেন , তাঁর সময়ে অর্থনীতি একটা নতুন ভিত্তি পেয়েছিল। এমন কথাও শোনা যায় , তিনি না থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আজকের জায়গায় আসত না। ব্যাপারটা এমন ধারাবাহিক ভাবে ঘটে যে আমার মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়, অর্থমন্ত্রীদের লিগ্যাসি নিয়ে কথা বলতে হবে এটা কেউ মনে হয় আগে থেকেই ঠিক করে রাখে । শুধু সময়মতো নামটা বসিয়ে বাদ বাকি কাজ সারা হয় ।
অর্থমন্ত্রী পদটা যে কোনো সরকারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির পর সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একজন হলেন অর্থমন্ত্রী। কারণ দেশের সবচেয়ে কঠিন ক্ষমতার একটি হলো টাকার নিয়ন্ত্রণ। কত টাকা আসবে, কোথা থেকে আসবে, কোথায় খরচ হবে, কত কর নেওয়া হবে, কোথায় ভর্তুকি কমবে, কত ঋণ নেওয়া হবে, কোন খাতে রাষ্ট্র বেশি ব্যয় করবে,এসব প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত গিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের টেবিলে সমাধান হয়। তাই একজন অর্থমন্ত্রী বিদায় নিলে তাঁকে নিয়ে আলোচনা হবে এটাই স্বাভাবিক। সমস্যা হয় তখন, যখন ঢালাও ভাবে প্রশংসা করতে গিয়ে নীতি প্রণয়নের প্রধান কারিগর হিসাবেও তাঁর নাম উচ্চারিত হতে থাকে ।
একজন নীতি প্রণয়ন করতে পারেন। আরেকজন সেটার খসড়া করতে পারেন। কেউ কারিগরি সহায়তা দিতে পারেন। কেউ অর্থায়নের শর্তের সঙ্গে সেটাকে যুক্ত করতে পারেন। আরেকজন সংসদে আইন পাস করিয়ে বাস্তবায়ন করতে পারেন। কিন্তু কয়েক বছর পর দেখা যায়, পুরো বিষয়টির জন্য কৃতিত্ব দেয়া হয় শেষের মানুষটিকে । সাধারণ জ্ঞান পরীক্ষায় যখন প্রশ্ন করা হতো , “বাংলাদেশে ভ্যাট প্রবর্তন করেন কে?” আমরা খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে লিখতাম, “এম সাইফুর রহমান।” এই উত্তর লিখতে লিখতে এমন একটা ধারণাই তৈরি হয়েছে যে ভ্যাট বুঝি সাইফুর রহমানের একক কোনো আবিস্কার । বিষয়টা এত সরল নয় ।
১৯৯১ সালে বাংলাদেশে VAT চালু হয় এবং তখন অর্থমন্ত্রী ছিলেন এম সাইফুর রহমান। নতুন কর ব্যবস্থা বাস্তবায়নে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে VAT তাঁর আবিষ্কার ছিল না। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই IMF-এর কারিগরি সহায়তায় VAT নিয়ে গবেষণা, খসড়া ও প্রস্তুতির কাজ অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিল। এমনকি অধ্যাদেশ জারির কাজও তাঁর অর্থমন্ত্রী হওয়ার আগেই শুরু হয়ে যায়। পরে সাইফুর রহমান সেটিকে সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আইনে পরিণত করে বাস্তবায়ন করেন। তাই পরীক্ষায় “বাংলাদেশে ভ্যাট প্রবর্তন করেন কে” প্রশ্নের উত্তরে সাইফুর রহমান লিখে নম্বর পাওয়া যাবে তবে ইতিহাসের বড় অংশ অজানা থেকে যাবে ।
সাইফুর রহমানের কৃতিত্বকে ছোটো করছি না। নতুন করব্যবস্থা দেশে চালু করা, সংসদে আইন পাস করানো, ব্যবসায়ীদের আপত্তি সামলানো, প্রশাসনকে প্রস্তুত করা, কোনোটাই সহজ কাজ নয়। কিন্তু নীতি বাস্তবায়ন করা আর নীতি প্রণয়ন করা এক জিনিস নয়। যে কোনো দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাস জানতে হলে এই পার্থক্যটা বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বাজারমুখী করার ক্ষেত্রেও একই বিষয় দেখা যায়। ২০০৩ সালের মে মাসে বাংলাদেশ নির্ধারিত বিনিময় হার ব্যবস্থা থেকে ভাসমান বিনিময় হার ব্যবস্থায় যায়। এর পেছনে তখনকার অর্থনৈতিক চাপও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়ছিল, অথচ রপ্তানি ও রেমিট্যান্স থেকে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহের সঙ্গে সেই চাহিদার ভারসাম্য রাখা কঠিন হয়ে উঠছিল। নির্ধারিত হারে টাকা ধরে রাখতে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে হস্তক্ষেপ করতে হতো ; এতে রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হতো। তার ওপর ২০০৫ সালে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে MFA সুবিধা উঠে যাওয়ার বিষয়টি সামনে ছিল, ফলে রপ্তানির প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে বিনিময় হারকে আরও নমনীয় করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে ২০০৩ সালের ৩১ মে বাংলাদেশ ভাসমান বিনিময় হার ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
একই সময়ে IMF-এর PRGF কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৪৯০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারকে সহায়তা করছিল। অর্থাৎ এটি শুধু একজন মন্ত্রীর সিদ্ধান্ত ছিল না। দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক চাপ, বাজারমুখী সংস্কারের প্রয়োজন এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক কর্মসূচি, সবকিছু মিলিয়েই নীতি প্রণয়ন করা হয়েছিলো। জন-সাধারণের কাছে প্রচার করে হয়েছিলো এই নীতি প্রণয়ন করেছিলেন এম সাইফুর রহমান ।
এরপর আসেন আবুল মাল আবদুল মুহিত, যিনি প্রায় এক দশক ধরে বাজেট দিয়েছেন । যাকে নিয়ে একই ধরণের প্রশংসা আমরা বর্তমানে দেখতে পাই । ২০১২ সালে যখন আইএমএফ ৯৮৭ মিলিয়ন ডলারের ঋণ দেয়, শর্তের তালিকায় ছিল রাজস্ব বাড়ানো আর ভর্তুকি কমানো। এর ফসল হিসেবে আসে ২০১২ সালের নতুন ভ্যাট আইন। বাংলাদেশের নিজস্ব বিশেষজ্ঞ কমিটি সুপারিশ করেছিল ভ্যাটের হার কম রাখতে, বেশি ছাড় দিতে -যুক্তি ছিল, বেশি হার ছোট ব্যবসা আর দেশীয় শিল্পের ক্ষতি করবে।
২০১৪ সালে যখন আইএমএফ যখন ১৪০ মিলিয়ন ডলারের কিস্তি আটকে দেয় নির্ধারিত সময়ে সরকার নতুন ভ্যাট আইন ঘোষণা না করায় , তখন সরকার নিজ কমিটির সুপারিশ ফেলে রেখে আইএমএফের ১৫% অভিন্ন হারের দাবি মেনে নেয়। মুহিত সাহেব নিজেই তখন নিশ্চিত করেন যে বিদ্যমান হার কমানো হবে না। এখানে মুহিত সাহেবের ভূমিকা রয়েছে । তিনি আইন পাস করিয়েছেন, বাজেটে জায়গা দিয়েছেন, প্রশাসনকে বাস্তবায়নে কাজ করিয়েছেন এবং রাজনৈতিক চাপ সামাল দিয়েছেন। তাই বলে সংস্কারের পুরো ক্রেডিট কি মূহিত সাহেব কে দিতে হবে ?
তারপর মঞ্চে আসেন আ হ ম মুস্তফা কামাল, যাকে ২০২০ সালে লন্ডনের "দ্য ব্যাংকার" ম্যাগাজিন দিয়ে দেয় "ফাইন্যান্স মিনিস্টার অফ দ্য ইয়ার ফর এশিয়া-প্যাসিফিক অ্যান্ড গ্লোবাল" খেতাব - বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, টাকা-ডিনমিনেটেড বন্ড, রেমিট্যান্স বৃদ্ধির কৃতিত্বে। পুরস্কার নিয়ে মন্ত্রী-মহোদয় প্রায়ই গর্ব করতেন ,তবে বাস্তবতা ছিলো ভিন্ন । হোয়াইট পেপার কমিটির অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, তারই আমলে তথ্য কারচুপি সবচেয়ে বেশি হয়েছিল ।
এই মানুষটির আমলে বাংলাদেশকে আবার আইএমএফের দরজায় দাঁড়াতে হয়; ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ নিয়ে। বিদ্যুৎ খাতের ক্যাপাসিটি চার্জের মতো দায় বাজেটের বাইরে জমতে থাকে বছরের পর বছর। বর্ষসেরা অর্থমন্ত্রী হিসাবে প্রশংসা এবং কারচুপির অভিযোগ যখন একই সাথে সামনে আসে ; তখন মনে হয় পুরস্কারটা দেয়া হয়েছিলো দেশের অর্থনীতিকে দক্ষতার সাথে পরিচালনা করেছেন বলে নয় , তার পারফরম্যান্সের জন্য ; আর পারফরম্যান্সটা ছিলো আসলে কতটা নিজের অদক্ষতাকে গোপন করা যায় ।
বর্তমানে আমির খসরু মাহমুদ অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন । আমি মোটামুটি নিশ্চিত , তিনি যেদিন বিদায় নিবেন সেদিন থেকেই শুরু হবে প্রশংসা । বলা হবে এনবিআরকে দুই ভাগ করে যে সংস্কার করে গেছেন তা ছিলো যুগান্তকারী । এর ফলে বাংলাদেশে রাজস্ব আদায় বেড়েছে । মজার ঘটনা হলো শুরুতে আমির খসরু সাহেব নিজেই এই সিদ্বান্তের বিরোধিতা করেছিলেন । এই কথা অবশ্য কেউ মনে রাখবে না । সবাই বলাবলি করবে খসরু সাহেবের দূরদর্শী নীতি প্রণয়নের ফলে ট্রিলিয়ন ডলার জিডিপির দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ ।
জেনে রাখা ভালো ; এনবিআর ভাগ করার আইডিয়া আইএমএফের তালিকায় থাকা একটা শর্তের অংশ । অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এটা বাস্তবায়নের সকল কাজ সম্পন্ন করা হয়েছিলো । আমির খসরু সাহেব শুধু এম সাইফুর রহমানকে অনুসরণ করেছেন । এতে করেই তিনি অবশ্য ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলেন । এভাবে নতুন নতুন অর্থমন্ত্রীদের আগমন ঘটে; তারা বাজেট দেন, প্রশংসিত কিংবা সমালোচিত হন-তারপর ঘটা করে বিদায় নেন। সরকার বদলায়, দল বদলায়, সংসদের আসনগুলোও নতুন মুখে ভরে ওঠে।
রাজস্ব বাড়াতে হবে, ভর্তুকি কমাতে হবে, বাজার উদার করতে হবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ঘাড় থেকে বোঝা কমাতে হবে কিংবা বিনিময় হারকে আরও নমনীয় করতে হবে- এই চিরচেনা প্রেসক্রিপশন আমরা বারবার দেখতে পাই । বাংলাদেশের ইতিহাসে তাই সবচেয়ে সফল অর্থমন্ত্রী কে, সেই প্রশ্নের উত্তর অর্থমন্ত্রীদের নামযুক্ত ফাইলগুলোর ভেতরে না খোজাঁটাই সবচেেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কারণ আপনি যতই চেষ্টা করেন ব্যর্থ হবেন । কোনো ব্যক্তি নয় প্রতিষ্ঠানের কথা ভাবুন । এতে আপনি সফলকাম হতে পারবেন ।
Mustafa Kamal named finance minister of the year-টিবিএস রিপোর্ট
বাংলাদেশে ভ্যাট চালু হয়েছিল যেভাবে-বিবিসি বাংলা
©somewhere in net ltd.