| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকা থেকে নিখোঁজ অপ্রতিম নামের ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার দুপুর ১ টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কের পাশের একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান। মরদেহ উদ্ধারের সময় তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। জিডি সূত্রে জানা গেছে, গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানাধীন ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে হেঁটে বের হয়েছিল অপ্রতিম। এরপর আর বাসায় ফেরেনি। সে বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
নিখোঁজ হওয়ার পর অপ্রতিমের মা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকুতি জানিয়ে লিখেছিলেন, তাঁর ছেলে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল। তিনি সবাইকে অনুরোধ করেছিলেন, যে যেখান থেকে পারেন তাঁর ছেলেকে খুঁজে পেতে সহায়তা করতে। শেষ পর্যন্ত ছেলেটিকে জীবিত পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় তদন্তের স্বার্থে তুহিন নামের একজনকে আটক করেছে পুলিশ।
অপ্রতিমের মৃত্যুর খবরটি স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা হচ্ছে, সংবাদমাধ্যমে খবর হচ্ছে, শিক্ষিত সমাজের মানুষজন উদ্বিগ্ন হচ্ছেন। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের ১৩ বছর বয়সী একমাত্র সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর মৃত অবস্থায় উদ্ধার হয়েছে, বিষয়টি নিয়ে এত আলোচনা হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু এই ঘটনাটি দেখতে গিয়ে আমার মাথায় অন্য একটি প্রশ্নও আসছে। বাংলাদেশে মৃত্যুতেও কি ধনী-গরিবের বৈষম্য আছে?
অপ্রতিমের মতো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের সন্তান মারা গেলে বিষয়টি খুব সহজেই আমাদের মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত সমাজের আলোচনায় চলে আসে। সংবাদমাধ্যমে খবর হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কথা বলেন, প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরি হয়। পরিচিত কোনো সাংবাদিকের সন্তান মারা গেলেও আমরা একইভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। সাগর-রুনি দম্পতির মতো পরিচিত সাংবাদিকদের হত্যাকাণ্ড কিংবা বুয়েটের আবরার ফাহাদের মৃত্যুর মতো ঘটনাগুলো কতটা বড় জাতীয় আলোচনায় পরিণত হয়েছিল, আমরা সবাই জানি।
কিন্তু আমার মতো কোনো সাধারণ পরিবারের একজন মানুষের সন্তান যদি মারা যায়, তাহলে কি একই পরিমাণ আলোড়ন তৈরি হয়? কোনো দিনমজুরের সন্তান, কোনো রিকশাচালকের সন্তান কিংবা কোনো নিম্নবিত্ত পরিবারের শিশু নিখোঁজ হলে তার মায়ের কান্না কি একই পরিমাণে সংবাদমাধ্যমে জায়গা পায়? তার ছবি কি একইভাবে হাজার হাজার মানুষের নিউজফিডে ঘুরে বেড়ায়? প্রশাসনের ওপর কি একই ধরনের চাপ তৈরি হয়?
মৃত্যুর কষ্টে অবশ্যই শ্রেণিবৈষম্য নেই। ধনী মানুষের সন্তান মারা গেলে তার বাবা-মায়ের কষ্ট যেমন সত্যি, গরিব মানুষের সন্তান মারা গেলেও তার বাবা-মায়ের কষ্ট তেমনই সত্যি। কিন্তু মৃত্যুর পর সমাজের মনোযোগ সব মানুষের জন্য সমান হয় না। কারও মৃত্যু আমাদের কাছে জাতীয় ঘটনা হয়ে যায়, আবার কারও মৃত্যু পরিবারের চার দেয়ালের মধ্যেই আটকে থাকে। এটাই হয়তো আমাদের সমাজের সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতাগুলোর একটি।
অপ্রতিমের ঘটনাটি আরও একটি কারণে আমাকে ভাবাচ্ছে। তাঁর মা বলেছেন, অপ্রতিম তাঁর আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল। এখন অনেকে হয়তো বলবেন, এত ছোট ছেলের হাতে আইফোন কেন দেওয়া হলো? দামি ফোন নিয়ে একটি শিশু বাইরে যাবে কেন? কিন্তু প্রতিটি সন্তানই তা বাবা-মায়ের কাছে অতি আদরের। অপ্রতিম হয়তো এর আগেও মায়ের ফোন নিয়ে ছবি তুলেছে, এর আগেও বন্ধুদের সঙ্গে বের হয়েছে, এর আগেও নিরাপদে বাসায় ফিরে এসেছে।
আমার মা প্রায়ই বলেন, বিপদ প্রতিদিন আসে না। কথাটা খুবই সাধারণ, কিন্তু এর মধ্যে জীবনের বড় বাস্তবতা আছে। গতকাল পর্যন্ত কোনো বিপদ হয়নি বলে আজও হবে না, এমন নিশ্চয়তা আসলে পৃথিবীতে নেই। অপ্রতিম হয়তো সেদিনও খুব সাধারণভাবেই বের হয়েছিল। তার কাছে সেটি ছিল আর দশটা বিকেলের মতোই একটি বিকেল। সে হয়তো জানতই না, সেই বিকেল তার জীবনের শেষ বিকেল হয়ে যেতে পারে।
আমাদের সমাজটা এমন হওয়ার কথা ছিল না ; একজন ১৩ বছরের ছেলে মায়ের ফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হলে তার নিরাপত্তা নিয়ে এত বড় প্রশ্ন তৈরি হবে। কিন্তু এখন বাস্তবতা হলো, ছোট একটি ফোনও কারও জন্য লোভের কারণ হতে পারে, রাস্তায় ছিনতাইকারী থাকতে পারে, মাদকাসক্ত কেউ হিংস্র হয়ে উঠতে পারে, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা সামান্য কারণেও ভয়ংকর আচরণ করতে পারে। অপ্রতিমের ক্ষেত্রে ঠিক কী ঘটেছে, কেন ঘটেছে, তার ফোনের সঙ্গে ঘটনার কোনো সম্পর্ক আছে কি না, এসব তদন্ত শেষ হওয়ার আগে বলা যাবে না। কিন্তু এই সম্ভাবনাগুলোই দেখিয়ে দেয় আমাদের সমাজ কতটা অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।
পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর পুলিশ কত দ্রুত অনুসন্ধান শুরু করেছিল, কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তদন্তে কোনো গাফিলতি ছিল কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত থেকেই আসা উচিত। তবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে পুলিশ কোনো নিখোঁজ ব্যক্তির বিষয়ে কতটা দ্রুত এবং গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করে, সেটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন আছে। ৫ আগস্টের পর পুলিশের মধ্যে গা-ছাড়া ভাব আরো বেড়ে গেছে যা নিয়ে মানুষ আলোচনা করছে। আগে পুলিশের আচরণ অনেক সময় অতিরিক্ত ক্ষমতাশালী বা কর্তৃত্বপরায়ণ মনে হতো, এখন কোথাও কোথাও উল্টো নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ শোনা যায়। রাষ্ট্র চাইলে অবশ্যই কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় পুলিশকে আরও সক্রিয় হতে বাধ্য করতে পারে।
এখানেই সরকারের দায়িত্বের প্রশ্ন আসে। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের সন্তান মারা গেলে ঘটনাটি নিয়ে এত বড় সামাজিক আলোড়ন তৈরি হবে, এটা সরকারেরও বোঝা উচিত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন সাহেব সংসদে জামায়াত-শিবিরকে যতটা কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেন, একই রকম দৃঢ়তা যদি কিশোর গ্যাং, মাদক ব্যবসায়ী, ছিনতাইকারী ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে দেখানো যেত, তাহলে হয়তো অপরাধীদের মধ্যেও কিছুটা ভয় তৈরি হতো। একটি সমাজে অপরাধীকে রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে যতটা ভয় দেখানো হয়, সাধারণ অপরাধীকে ভয় দেখানোর ক্ষেত্রেও যদি রাষ্ট্র একই ধরনের দৃঢ়তা দেখাত, তাহলে সাধারণ মানুষ হয়তো একটু বেশি নিরাপদ বোধ করত।
আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় বিপদ হলো কিশোর গ্যাং। এই প্রজন্মের অনেক কিশোর কীভাবে অপরাধী চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে, সেটি নিয়ে আমাদের আরও গভীরভাবে ভাবতে হবে। কিশোর গ্যাংয়ের হাতে চিকিৎসক মারা যাওয়ার ঘটনা আমরা দেখেছি, ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে মানুষ মারা যাওয়ার ঘটনা দেখেছি, শিক্ষক আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও দেখেছি। কোনো একটি ঘটনা নিয়ে আমরা উত্তেজিত হই, তারপর নতুন কোনো ঘটনা এসে পুরোনোটাকে সরিয়ে দেয়। এভাবেই ধীরে ধীরে ভয়ংকর ঘটনাগুলোও আমাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে।
সমাজের সমস্যাটা শুধু আইনশৃঙ্খলার নয়। মাদক, অবৈধ অর্থ, হতাশা, বেকারত্ব, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, দ্রুত টাকা ও ক্ষমতা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা-সবকিছু মিলে আমাদের সমাজের চরিত্র বদলে গিয়েছে। কয়েকদিন আগে দেখলাম দেশে শিশু নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। সরকার কথা বলেছে, সংবাদমাধ্যমে খবর হয়েছে। আমার মতো সাধারণ মানুষের মনে তাই প্রশ্ন এসেছে, নিখোঁজ হওয়া শিশুদের মধ্যে আরেকজন কি অপ্রতিমও হয়ে গেল?
এখন মনে হচ্ছে অপ্রতিমের ঘটনাটি সম্ভবত সেই নিখোঁজ শিশুদের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। কিন্তু তাতে সমস্যা দুর হয়ে গেছে বলা যাবে না। একটি শিশুও যদি নিখোঁজ হয়ে যায়, তার পরিবারকে দিনের পর দিন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়। শিশু পাচার, সংঘবদ্ধ অপরাধ কিংবা অন্য কোনো অপরাধচক্রের সঙ্গে এসব ঘটনার সম্পর্ক আছে কি না, রাষ্ট্রকে সেটিও খুঁজে দেখতে হবে। সরকারকে শুধু অপরাধী ধরলেই হবে না, অপরাধী তৈরি হওয়ার পরিবেশটাও ধ্বংস করতে হবে।
মানুষ কেন এত হতাশ? তরুণদের মধ্যে কেন এত ক্ষোভ? মাদক কেন এত সহজে ছড়িয়ে পড়ছে? অবৈধ টাকা কীভাবে সমাজের নিচের স্তর পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে? কেন একটি শিশু বা কিশোর খুব অল্প বয়সেই অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে? মানুষের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব কেন মিলছে না? রাষ্ট্র যদি এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে না চায়, তাহলে শুধু পুলিশ দিয়ে সমস্যার সমাধান করা যাবে না।
অপ্রতিমকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। তাঁর মায়ের কাছে পৃথিবীর কোনো বিচারই তাঁর সন্তানকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কিন্তু অপ্রতিমের মৃত্যু অন্তত আমাদের একটা প্রশ্ন করতে বাধ্য করুক। বাংলাদেশে একটি শিশুর স্বাভাবিকভাবে বড় হওয়ার জন্য আমরা আসলে কতটা নিরাপদ সমাজ তৈরি করতে পেরেছি ?
ফটোকার্ড ক্রেডিট : ডেলটা লেন্স
কুবি শিক্ষিকার ছেলের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় আটক এক- ডেইলি ক্যাম্পাস
https://thedailycampus.com/public-university/274179
কুবি শিক্ষিকার ছেলের মরদেহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে উদ্ধার
২|
১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪২
কলিমুদ্দি দফাদার বলেছেন:
খুবই দুঃখজনক।
দেশের কিছু মিডিয়া, রাজনৈতিক গোষ্ঠী ভারতীয় আধিপত্যবাদ মোকাবেলায়
যুদ্ধবিমান, অস্ত্রপাতি, ক্রয়সহ সামরিক জোট করার ক্ষেত্রে যতটা না উচ্চবাচ্য করে
পুলিশ বাহিনীর আধুনিকায়ন দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ব্যায় বৃদ্ধির ব্যাপারে চুপচাপ কেন?
©somewhere in net ltd.
১|
১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৯
নিমো বলেছেন: দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সর্বকালের সেরা অবস্থায় আছে। থানার অস্ত্র থানায় নাই। জঙ্গীদের ছেড়ে দিয়েছেন কারণ তারা ফ্যাসিবাদ বিরোধী। অবশ্য এসব ভারতের ষড়যন্ত্র হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ভাইয়ার প্ল্যানটা বোধহয় নূতন বোয়িং, এয়ারবাস, টাইফুন, জে-১০ নামক প্লেনে করে আসছে।