নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মানুষ মরে গেলে পঁচে যায় আর বেঁচে থাকলে বদলায়

সৈয়দ কুতুব

নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!

সৈয়দ কুতুব › বিস্তারিত পোস্টঃ

রংয়ের মানুষ

১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৫০


গ্রেট মাদ্রাজ ফ্যামিন যখন অনুপ্রেরণার উৎস
একদিন আমাদের সবার প্রিয় সংসদ সদস্য আমির হামজা ওয়াজে বেশ গরম গরম কথা বলছিলেন। মহান আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টির সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হঠাৎ রাশমিকা মান্দানার প্রসঙ্গ টেনে আনলেন। রাশমিকা ভারতীয় অভিনেত্রী। আমির হামজার গোপন ক্রাশও হতে পারেন। তাঁর ফেস কাটিং নাকি দুনিয়ার মধ্যে এক নম্বর !

সেই রাশমিকা মান্দানা হঠাৎ একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এক বছর ধরে ৪০০ পরিবারের দায়িত্ব নেবেন তিনি। এসব পরিবারের জন্য চাল, ডাল, নুনসহ প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী ও অন্যান্য সহায়তার ব্যবস্থা করবেন। খবরটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই অনেকে তাঁকে মা অন্নপূর্ণা দেবীর সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করেছেন।

রাশমিকার এই উদ্যোগের অনুপ্রেরণা এসেছে তাঁর আসন্ন সিনেমার গল্প থেকে। দক্ষিণ ভারতের এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে নির্মিত সিনেমাটিতে তিনি জায়াম্মা নামের একটি চরিত্রে অভিনয় করছেন। সিনেমার গল্প তাঁকে বাস্তবেও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করেছে বলে খবর এসেছে।

রাশমিকা মান্দানা অভিনেত্রী হতে পারেন, কিন্তু ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। মানুষের পেট ভরে একবেলা ভাত খাওয়ানোর চেয়ে বড় মানবিক কাজ আর কী হতে পারে ! সামর্থ্য থাকলেই সবাই এমন দায়িত্ব নেন না। রাশমিকা নিয়েছেন।

তবে একটা বিষয় লক্ষ করার মতো। সিনেমায় দুর্ভিক্ষের গল্প দেখে একজন অভিনেত্রী বাস্তবে ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা পাচ্ছেন। শিল্প এখানে মানুষের জন্য কাজ করছে। একটা গল্প মানুষের মধ্যে মানবিক বোধ জাগিয়ে তুলছে। অথচ আমাদের সমাজে শিল্প ও সাংস্কৃতিক চর্চা নিয়ে অন্য রকম অভিজ্ঞতাও আছে।

খান সাহেবের ট্রমা
ছোটবেলায় শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকায় থাকতাম। সিডির দোকানে প্রায়ই একটা গান বাজত, ‘চিঠি লিখেছে বউ আমার ভাঙা ভাঙা হাতে’। গানটির শিল্পী ছিলেন মনির খান। গানটা আমার কাছে খুব একটা ভালো লাগত না। বরং বেশ ক্রিঞ্জ লাগত। কিন্তু লক্ষ করতাম, আমাদের বাড়ির নারী ভাড়াটিয়ারা গানটি বারবার শুনতেন। তখন সিডি প্লেয়ারে গান শোনার যুগ।

মনির খানকে পরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখেছি। তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। দুই দিন আগে তাঁর পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণে কিছু কথা পড়লাম। কথাগুলো আমার মনে দাগ কেটেছে। মনির খান জানিয়েছেন, ছোটবেলায় গান গাওয়ার সময় আশপাশের মসজিদ থেকে লোকজন এসে তাঁকে গান বন্ধ করতে বলতেন। গান গাওয়ার অপরাধে তাঁর বিরুদ্ধে সাত থেকে আটটি মামলাও হয়েছিল বলে তিনি জানিয়েছেন।

মনির খান গ্রামে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। আমি শহরে থেকেও কাছাকাছি অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। আমাদের কোচিং সেন্টারটি আমার বোন ও তার বন্ধুরা মিলে ২০১৩ সালের দিকে শুরু করেছিল। ২০১৮ সালের পর থেকে আমরা পারিবারিকভাবে সেটি পরিচালনা করতে শুরু করি। প্রতি বছর ক্লাস পার্টির আয়োজন হতো। একটু গানবাজনাও চলত।

একবার কোচিং সেন্টারে বেশ গানবাজনা হচ্ছিল। সেখানে যারা পড়ত, তাদের অধিকাংশই চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও সরকারি চাকরিজীবীদের ছেলেমেয়ে। হঠাৎ অভিযোগ উঠল, আমরা নাকি গান-বাজনা করে মাদ্রাসার ছাত্রদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছি। তাদের সামনে পরীক্ষা। অভিযোগকারীরা এতটাই আগ্রাসী হয়ে উঠলেন যে থানা থেকে লোকজন নিয়ে এলেন। আমরা বললাম, আর এক ঘণ্টা ক্লাস পার্টি চলবে, তারপর শেষ। কিন্তু ঘটনাটি আমার মাথায় থেকে গেল।

আমরাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালাতাম, তাঁরাও চালাতো। কিন্তু দিন দিন আমাদের মতো প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমছে, আর মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়ছে। একই সড়কে চার পাঁচটি মাদ্রাসা দেখা যায়। আগে যেসব বাড়িতে ৩১শে ডিসেম্বর রাতে গানবাজনা হতো, এখন সেখানে তেমন কিছু চোখে পড়ে না। উৎসবের পরিমাণও কমে আসছে।

কিছু বাড়িওয়ালাকে দেখেছি, নিজের ছেলেমেয়েরা ঠিকমতো আরবি পড়তে পারে না বলে তাঁদের মনে ভয় কাজ করে। মৃত্যুর সময় কে কোরআন পড়ে দেবে, সেই চিন্তা থেকে বাড়ির একটি অংশ মাদ্রাসার জন্য ছেড়ে দিয়েছেন বা ভাড়া দিয়েছেন। মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস নিয়ে আমার আপত্তি নেই।

কিন্তু ভয় থেকে নেওয়া সিদ্ধান্ত যখন ধীরে ধীরে সামাজিক পরিবেশ বদলে দেয়, তখন বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হয়। কখন যে আমাদের অজান্তে সমাজের এই পরিবর্তন ঘটতে শুরু করেছিল, বুঝতে অনেক সময় লেগেছে। মানুষ কি ধীরে ধীরে উৎসব, গান, সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে ?

পরকালের পাথেয়
'চুরি করেছ আমার মনটা’, ‘হায়রে হায়’, ‘মিস লঙ্কা’, ‘তুমি আমার জীবন, আমি তোমার জীবন’। বাংলা সিনেমার এসব গান ও সিনেমার সঙ্গে পরিচিত মানুষদের কাছে ববিতা ম্যাডাম বেশ পরিচিত একটি নাম। আমার মা খালাদের খুব প্রিয় অভিনেত্রী তিনি। মা ‘দুই জীবন’ সিনেমাটি কতবার দেখেছেন, তার হিসাব নেই।

সেই ববিতা ম্যাডাম বহু বছর পর সংবাদমাধ্যমে এসে জানিয়েছেন, তিনি নিজের পৈতৃক ভিটায় মসজিদ নির্মাণ করছেন। আলহামদুলিল্লাহ। মানুষের ইচ্ছায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মিত হচ্ছে, এটি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। তিনি আরও বলেছেন, জীবিত অবস্থায় কিছু ভালো কাজ করে পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করতে চান।

ববিতা ম্যাডামের হাঁটুর বয়সী ভারতীয় অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানাও কাজ করছেন। তবে দুজনের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। একজন অসহায় পরিবারের দায়িত্ব নিচ্ছেন, অন্যজন মসজিদ নির্মাণ করছেন। এখানে আমার মনে একটা প্রশ্ন আসে। ববিতা ম্যাডামের আয়ের উৎস কি ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ ? তাঁর অভিনয় জীবনের আয় দিয়ে নির্মিত মসজিদকে ধর্মীয়ভাবে কীভাবে দেখা হবে? প্রশ্নটা করার কারণ আছে।

আমরা সব সময় আমাদের মেজো চাচার সঙ্গে কোরবানি দিতাম। তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক ছিলেন। জামায়াতের রাজনীতির প্রতি তাঁর সমর্থন ছিল। কোরবানির সময় আমরা প্রায়ই শরিক সংকটে পড়তাম। আমাদের বাড়ির সামনের বাড়িতে বিআরটিসিতে চাকরি করা একজন লোক থাকতেন। তিনি আবার ভালো গরু চিনতেন। শরিকের সংকট হওয়ায় আমরা চাচাকে তাঁর কথা বললাম।

চাচা তাঁকে চিনতেন। কিন্তু তিনি সোজা বলে দিলেন, ওই লোকের টাকা হারাম। তাঁকে কোরবানির শরিক হিসেবে নেওয়া যাবে না। আমি বললাম, চাচা, তিনি তো বাড়িভাড়াও পান। সেই টাকাও কি অবৈধ ? চাচা বললেন, হ্যাঁ, সেটাও অবৈধ। তাঁর আয়ের উৎসই অবৈধ।

তখন থেকেই বিষয়টা আমার মাথায় ঘুরতে থাকে । কারও আয়ের উৎস যদি ধর্মীয় বিবেচনায় অবৈধ হয়, তাহলে সেই অর্থ দিয়ে ভালো কাজ করলে বিষয়টি কীভাবে বিচার করা হবে? ববিতা ম্যাডামের আয়ের উৎস নিয়ে আমি কোনো সিদ্ধান্ত দিচ্ছি না। তাঁর সম্পদের প্রকৃত উৎস সম্পর্কে আমার জানা নেই। কিন্তু ধর্মীয় নৈতিকতার প্রশ্নটি থেকেই যায়।

নিজের পৈতৃক ভিটায় মসজিদ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া একজন স্বনির্ভর নারী চাইলে সেখানে একটি নারী শিক্ষাকেন্দ্রও করতে পারতেন। চাইলে একটি এনজিও খুলে অসহায় নারীদের পাশে দাঁড়াতে পারতেন। তাতে হয়তো অনেক নারী শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতেন। কিন্তু তিনি মসজিদ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। উনার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাই ।

এবার আরেকটি দৃশ্য কল্পনা করুন। ববিতা ম্যাডামের অনুদানে মসজিদ তৈরি হলো। সেই মসজিদের আশপাশে মনির খানের মতো কেউ একজন গান অনুশীলন করছেন। মসজিদের লোকজন এসে তাঁকে গান বন্ধ করতে বললেন। এরপর হুমকি দিলেন, মামলা করলেন।তখন ববিতা ম্যাডামের কেমন অনুভূতি হবে ? তার আয়কৃত অর্থ যে পেশা থেকে এসেছে ঠিক সেই পেশার উপর অলিখিত সেন্সরশীপ কি আমাদের প্রিয় ম্যাডাম মেনে নিবেন ?

গানে হামলা-মামলার সেই গল্প মনির খানের বাস্তব জীবনেরই ঘটনা-ঢাকা পোস্ট

৪০০ পরিবারের দায়িত্ব নিলেন রাশমিকা - যুগান্তর

Bobita dreams of building a mosque on ancestral land- ভিউস বাংলাদেশ

ফটোকার্ড ক্রেডিট : সংগৃহীত


মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.