নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মানুষ মরে গেলে পঁচে যায় আর বেঁচে থাকলে বদলায়

সৈয়দ কুতুব

নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!

সৈয়দ কুতুব › বিস্তারিত পোস্টঃ

সাড়ে হাজার বিজ্ঞানী এবং একটি স্ক্যামের গল্প

২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:২৮


জুলাইয়ের কোটা আন্দোলনের পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। সেই সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের অংশ হিসেবে পাকিস্তান বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘নলেজ করিডোর’-এর আওতায় আল্লামা ইকবাল বৃত্তি চালু করে। ২০২৫ সালের আগস্টে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের ঢাকা সফরের সময় বৃত্তির ঘোষণা দেওয়া হয়। তখন বৃত্তিটিকে সম্পূর্ণ অর্থায়িত হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। টিউশন ফি, আবাসন, মাসিক ভাতা, প্রাথমিক খরচ, এমনকি যাওয়া-আসার বিমানভাড়ার কথাও বলা হয়েছিল।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম দফায় প্রায় ৭৪ জন শিক্ষার্থী পাকিস্তানে যান। কিন্তু পরে নির্বাচিত কয়েকজন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, তাঁদের অফার লেটারের শর্ত প্রচারিত সুবিধার সঙ্গে মিলছে না। কেউ কেউ পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ের বদলে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তাব পাওয়ার কথাও জানান। বিতর্কের মুখে পাকিস্তান হাইকমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে সুবিধা বরাদ্দের নিয়ম আলাদা। অর্থাৎ বৃত্তির ঘোষণা আর শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানো শর্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

২০২৬ সালের ১১ মে নলেজ করিডোরের এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বৃত্তিটির প্রশংসা করেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও শিক্ষা ও কারিগরি সহযোগিতার কথা বলেন। পরে বৃত্তির শর্ত নিয়ে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়লে কেউ পাকিস্তানকে ‘ঠগী রাষ্ট্র’, কেউ ‘স্ক্যাম রাষ্ট্র’ বলে আখ্যা দেন। নেটিজেনরা কড়াভাবে বিষয়টি নিয়ে লেখালেখি করেছেন ।

এই বিতর্কের তিন-চার মাসের মাথায় প্রথম আলোতে প্রকাশিত হলো প্রতিবেদন, ‘পাকিস্তান পারল, বাংলাদেশ কেন পারল না?’ এবার বিষয়টি বৃত্তি নয়, আইসিটি সেবা রপ্তানি। বিভিন্ন হিসাবে পাকিস্তানের আইসিটি সেবা রপ্তানি প্রায় ৩৮০ থেকে ৪৭০ কোটি ডলার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হিসাব প্রায় ৭২.৫ কোটি থেকে ৯০ কোটি ডলারের মধ্যে।

এই খবর নিয়ে আমাদের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম। পাকিস্তান নিয়ে বাংলাদেশের আলোচনা সাধারণত ইতিহাস, রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। পাকিস্তান কোনো ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকলে আমরা স্বস্তি পাই, কিন্তু কোনো ক্ষেত্রে এগিয়ে গেলে কেন এগিয়েছে, তা জানার আগ্রহ খুব একটা দেখা যায় না। পাকিস্তানকে ব্যর্থ রাষ্ট্র বললে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়বে না। তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত, সেটি এক প্রশ্ন। আর তারা কোনো অর্থনৈতিক খাতে কীভাবে এগিয়েছে, তা বোঝার চেষ্টা করা আরেক প্রশ্ন। দুটি বিষয়কে এক করে ফেললে নিজেদেরই ক্ষতি।

বাংলাদেশ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকে পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের সাক্ষরতার হার ছিল প্রায় ৭৯ শতাংশ। পাকিস্তানে ২০২১ সালে এই হার ছিল প্রায় ৫৮.৯ শতাংশ। তথ্যের বছর আলাদা হলেও ব্যবধানটি লক্ষণীয়। মাধ্যমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ এগিয়ে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৪ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে বাংলাদেশের মোট ভর্তির অনুপাত ছিল প্রায় ৬৪ শতাংশ, পাকিস্তানে প্রায় ৪৮ শতাংশ। নারীশিক্ষা ও শিক্ষায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি রয়েছে।

মাথাপিছু আয় ও পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ এগিয়ে। তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশের অবস্থান পাকিস্তানের তুলনায় অনেক শক্তিশালী। এসব অর্জন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু একটি দেশের সাক্ষরতার হার, মাথাপিছু আয় কিংবা পণ্য রপ্তানি বেশি হলেই সব অর্থনৈতিক খাতে সে এগিয়ে থাকবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। আইসিটি সেবা রপ্তানির হিসাব সেটাই দেখাচ্ছে। সামাজিক উন্নয়নে এগিয়ে থেকেও একটি নির্দিষ্ট শিল্পে পিছিয়ে থাকা সম্ভব। বরং এই বৈপরীত্য থেকেই বোঝা যায়, উন্নয়নের সব ক্ষেত্র একই গতিতে এগোয় না।

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। রেমিট্যান্সও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। এই দুই খাতের অবদান বিশাল, কিন্তু অর্থনীতির ভবিষ্যৎ শুধু বর্তমানের সফল খাত দুটি দিয়ে নিশ্চিত করা যায় না। নতুন পণ্য, নতুন সেবা ও নতুন বাজার তৈরি করতে হয়। একসময় যে খাত আমাদের এগিয়ে নিয়েছে, চিরকাল সেই খাতই একইভাবে এগিয়ে নেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। অর্থনীতির কাজ হলো পরবর্তী সম্ভাবনাটিও তৈরি করা।

প্রযুক্তি বদলাচ্ছে, ক্রেতাদের চাহিদা বদলাচ্ছে, উৎপাদনব্যবস্থা বদলাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে প্রচলিত কিছু কাজের চাহিদাও কমতে পারে। কম মজুরিতে শ্রম দেওয়ার সুবিধা দিয়ে অনির্দিষ্টকাল আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা যাবে না। আমাদের এমন দক্ষতা, পণ্য ও সেবা তৈরি করতে হবে, যেগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অর্থ দিতে আগ্রহী হবেন। আইসিটি সেবা রপ্তানি সেই সুযোগগুলোর একটি। কিন্তু সুযোগ থাকা আর সুযোগ কাজে লাগানো এক বিষয় নয়। এর জন্য দক্ষ কর্মী, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগ, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ২০১৮ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের তিনটি মানদণ্ড পূরণ করেছিল। উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কিছু সুবিধা বদলে যেতে পারে। তাই ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জিসিসি, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা এবং আরসিইপিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করলেই রপ্তানি বাড়ে না। চুক্তি বাজারের দরজা খুলতে পারে, কিন্তু সেই বাজারে বিক্রি করার মতো প্রতিযোগিতামূলক পণ্য ও সেবা তৈরি করে দিতে পারে না। দরজা খোলার পর ভেতরে ঢোকার প্রস্তুতিও থাকতে হয়।

ভারতের দিকে তাকালেই বিষয়টি বোঝা যায়। দেশটির আইটি সেবা রপ্তানি বছরে প্রায় ১৩ হাজার কোটি ডলারের পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর পেছনে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার, ইংরেজিতে দক্ষ কর্মী, বেসরকারি প্রযুক্তি কোম্পানি এবং ধারাবাহিক নীতিগত সহায়তা রয়েছে। ভারতকে নিয়ে আমাদের আলোচনা কম নয়। কিন্তু পাকিস্তানের মতো তুলনামূলক ছোট অর্থনীতিও যখন কয়েক শ কোটি ডলারের আইসিটি সেবা রপ্তানি করতে পারে, তখন আমাদের প্রশ্ন করা উচিত, এই খাতে আমাদের অগ্রগতি এত কম কেন ? শুধু ভারতের সঙ্গে তুলনা করলে হয়তো ব্যবধান দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হবে। পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা করলে নিজেদের ব্যর্থতার জায়গাগুলো আরও স্পষ্ট করে খুঁজে দেখা সম্ভব।

পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা খাতের দিকে তাকালে ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হায়ার এডুকেশন কমিশন বা এইচইসির কথা আসে। প্রতিষ্ঠানটির প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন বিজ্ঞানী আতাউর রহমান। উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়ন, শিক্ষক ও গবেষক তৈরি, গবেষণায় অর্থায়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এইচইসি ভূমিকা রেখেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকে প্রযুক্তি ও শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবে পাকিস্তানের আইসিটি রপ্তানির সাফল্যকে শুধু এইচইসির অবদান বলা যাবে না। বেসরকারি সফটওয়্যার কোম্পানি, ফ্রিল্যান্সার, আন্তর্জাতিক আউটসোর্সিং বাজার, করনীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনার নিয়মসহ আরও অনেক বিষয় এতে ভূমিকা রেখেছে।

এইচইসির অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ওআরআইসি বা অফিস অব রিসার্চ, ইনোভেশন অ্যান্ড কমার্শিয়ালাইজেশনের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণাকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করা এবং গবেষণার ফল বাজারে ব্যবহারযোগ্য করে তোলা। ধরা যাক, কোনো শিক্ষার্থী কৃষিজমির রোগ শনাক্ত করার সফটওয়্যার তৈরি করলেন। সেটি কৃষকের কাজে লাগতে পারে, কৃষিপ্রতিষ্ঠান কিনতে পারে, এমনকি বিদেশেও বিক্রি হতে পারে। কিন্তু গবেষককে যদি শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ করতে হয়, আর পণ্য তৈরি, বিনিয়োগ ও বাজার খোঁজার কোনো ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে সেই উদ্ভাবন পরীক্ষাগারেই পড়ে থাকতে পারে। গবেষণা আর ব্যবসার মধ্যে সেতু তৈরি করার প্রয়োজন এখানেই।

পাকিস্তানে বিজনেস ইনকিউবেশন সেন্টার বা বিআইসির মাধ্যমে নতুন উদ্যোগ গড়ে তোলার সহায়তাও দেওয়া হয়। এইচইসির ইনোভেটর সিড ফান্ডের আওতায় নির্বাচিত স্টার্টআপের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার ডলার পর্যন্ত অর্থায়নের ব্যবস্থা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এখানে শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, সম্ভাব্য উদ্যোক্তা হিসেবেও দেখা হয়। অবশ্য অর্থ দিলেই স্টার্টআপ সফল হয় না। পাকিস্তানের গবেষণার মান, অর্থায়নের ধারাবাহিকতা এবং উচ্চশিক্ষার দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে মান বজায় রাখা নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। তারপরও গবেষণা থেকে পণ্য, পণ্য থেকে ব্যবসা এবং ব্যবসা থেকে রপ্তানি আয়ের একটি সংযোগ তৈরি করার চেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশেও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের গবেষণা অনুদান, হাইটেক পার্ক, ইনকিউবেটর ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি রয়েছে। ফলে আমাদের সমস্যা এমন নয় যে দেশে কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। এসব উদ্যোগের ফলাফল কী ? বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কতটা শিল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে, কত প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি হচ্ছে, কত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানে কাজ পাচ্ছেন, আর কতজন নতুন প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসা গড়ে তুলছেন? শুধু প্রতিষ্ঠান তৈরি, প্রশিক্ষণ দেওয়া কিংবা প্রকল্প উদ্বোধনের হিসাব দিয়ে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। একটি উদ্যোগ কত টাকা খরচ করল, তার চেয়ে শেষ পর্যন্ত কী তৈরি করল, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আওয়ামী লীগ ২০০৯ সাল থেকে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় ছিল। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্লোগান দেওয়া হয়েছে, স্কুলে আইসিটি শিক্ষা চালু হয়েছে, প্রশিক্ষণকেন্দ্র তৈরি হয়েছে, হাইটেক পার্ক নির্মাণ করা হয়েছে। সজীব ওয়াজেদ জয়, মোস্তাফা জব্বার ও জুনাইদ আহ্‌মেদ পলকের মতো ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময়ে প্রযুক্তি খাতের নীতি ও প্রচারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রযুক্তি নিয়ে প্রচার কম ছিল না। কিন্তু এত দীর্ঘ সময় পরও বাংলাদেশের আইসিটি সেবা রপ্তানি কেন প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের আশপাশে রয়ে গেছে, সেই প্রশ্নের উত্তর কোথায়?

২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আইসিটি খাতে প্রায় ২০০ কোটি ডলার ব্যয়ের একটি হিসাব আলোচনায় এসেছে। এই অঙ্কের প্রতিটি খাত ও প্রকল্পের ব্যয় যাচাই করা জরুরি। তবে মূল প্রশ্নটি শুধু কত টাকা খরচ হয়েছে, তা নয়। সেই অর্থের বিনিময়ে কী তৈরি হয়েছে? নতুন কত রপ্তানিমুখী প্রযুক্তি কোম্পানি গড়ে উঠেছে, কত বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে, কত দক্ষ কর্মী আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ পেয়েছেন এবং কত টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে? সরকারি প্রকল্পের ব্যয় ও উদ্বোধনের হিসাব সহজেই পাওয়া যায়। কিন্তু অর্থনীতিতে তার স্থায়ী অবদান কত, সেই হিসাবটাই বেশি জরুরি।

প্রশিক্ষণকেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে, আইসিটি বিষয়ে বই ও পাঠ্যক্রম চালু করা হয়েছে, শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসবের কিছু ইতিবাচক ফল নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন তরুণ কী কাজ করতে পারছেন, তাঁর দক্ষতার চাহিদা বাজারে আছে কি না, তিনি দেশে বা বিদেশে কাজ পাচ্ছেন কি না, কিংবা নিজে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারছেন কি না, সেগুলোও দেখতে হবে। প্রশিক্ষণ দেওয়া আর কর্মসংস্থান তৈরি করা এক বিষয় নয়। একটি প্রকল্পে দশ হাজার মানুষ প্রশিক্ষণ নিলেন, এই তথ্যের চেয়ে তাঁদের মধ্যে কতজন দক্ষতা ব্যবহার করে আয় করছেন, সেটি অনেক বেশি অর্থবহ।

হাইটেক পার্কের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। পার্কের ভবন, জমি, অবকাঠামো ও উদ্বোধনের খবর উন্নয়নের দৃশ্যমান অংশ। কিন্তু সেখানে কতটি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত ব্যবসা করছে, কত বিনিয়োগ এসেছে, কত দক্ষ কর্মী কাজ করছেন এবং কত ডলার রপ্তানি হচ্ছে, তা না জানলে প্রকৃত সাফল্য বোঝা যাবে না। একটি পার্কে অবকাঠামো তৈরি করা সম্ভব, কিন্তু প্রযুক্তি কোম্পানি তৈরি করা যায় না শুধু ভবন বানিয়ে। তার জন্য দক্ষ জনবল, অর্থায়ন, ব্যবসা পরিচালনার সুবিধা, স্থিতিশীল নীতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ প্রয়োজন।

শিক্ষা সংস্কারের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। ২০০৯ সালের দিকে মুখস্থনির্ভর শিক্ষার বদলে সৃজনশীল পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও বুয়েটের অধ্যাপক কায়কোবাদসহ অনেক শিক্ষাবিদ এই আলোচনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের শুধু মুখস্থ করানো নয়, বরং চিন্তা, বিশ্লেষণ ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বাড়ানো। উদ্দেশ্যটি খারাপ ছিল না। কিন্তু সৃজনশীল প্রশ্ন চালু হলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীলতা তৈরি হয় না। শিক্ষক কীভাবে পড়াচ্ছেন, শ্রেণিকক্ষে কী হচ্ছে, পরীক্ষা কীভাবে নেওয়া হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা বাস্তবে কতটা বুঝে শিখছে, তার ওপরও ফল নির্ভর করে।

শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গাইডনির্ভর প্রস্তুতি, পরীক্ষার ধরন এবং শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। পরে পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়নপদ্ধতিতে আরও পরিবর্তন আনা হয়েছে। কিন্তু বারবার বই ও পরীক্ষার পদ্ধতি বদলালেই শিক্ষার মান বাড়ে না। শিক্ষার্থীরা কী দক্ষতা অর্জন করছে, সেই দক্ষতা দিয়ে কী সমস্যা সমাধান করতে পারছে এবং উচ্চশিক্ষা বা কর্মক্ষেত্রে তার কতটা ব্যবহার হচ্ছে, সেগুলোও যাচাই করতে হবে। শিক্ষার পেছনে ব্যয় করার উদ্দেশ্য শুধু সার্টিফিকেট দেওয়া নয়, এমন মানুষ তৈরি করা, যারা বাস্তব জীবনে জ্ঞান কাজে লাগাতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ২৫ বছর বা তার বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর স্নাতকোত্তর বা তার বেশি ডিগ্রিধারীদের অনুপাত নিয়েও একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে বাংলাদেশের হার প্রায় ৩.৭ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়। শিক্ষিত তরুণের সংখ্যা বাড়ছে, অথচ তাঁদের অনেকেই সরকারি চাকরির জন্য বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিচ্ছেন, এ বাস্তবতা চোখের সামনে রয়েছে। বিশ তম গ্রেডের অফিস সহায়ক পদেও উচ্চশিক্ষিত প্রার্থীদের প্রতিযোগিতা দেখা যায়। এত শিক্ষা অর্জনের পরও কেন এত মানুষের কাছে কাঙ্ক্ষিত কর্মজীবনের প্রধান পথ হয়ে উঠছে একটি সরকারি চাকরি ?

সরকারি চাকরির প্রতি আকর্ষণের কারণ বোঝা কঠিন নয়। নিয়মিত বেতন, চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তুলনামূলক নিশ্চয়তা রয়েছে। কিন্তু একজন শিক্ষিত তরুণ যদি নিজের দক্ষতা ব্যবহার করে ব্যবসা শুরু করার চেয়ে বছরের পর বছর চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতিকে নিরাপদ মনে করেন, তাহলে শুধু তরুণদের মানসিকতাকে দায়ী করে লাভ কী? ভালো চাকরির সুযোগ কম, উদ্যোক্তা হওয়ার ঝুঁকি বেশি, গবেষণা থেকে ব্যবসা তৈরির ব্যবস্থা দুর্বল এবং প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থায়ন ও বাজার পাওয়া কঠিন হলে মানুষ নিরাপদ পথই বেছে নেবে। এটি শুধু ব্যক্তির পছন্দের সমস্যা নয়, অর্থনীতির কাঠামোরও সমস্যা।

উচ্চশিক্ষার মান ও সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ২০২৩ সালে ইউজিসির অধীনে হায়ার এডুকেশন অ্যাকসেলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন বা হিট প্রকল্প শুরু হয়। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদের এই প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৪ হাজার ১৬ কোটি টাকা। বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংক যৌথভাবে এতে অর্থায়ন করছে। উচ্চশিক্ষার মান, গবেষণা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো এর লক্ষ্য। কিন্তু প্রকল্পটি ঘিরে অনিয়ম এবং প্রায় হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও আলোচনায় এসেছে।

তবে এই প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন শুধু অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সজীব ওয়াজেদ জয়, মোস্তাফা জব্বার ও পলকের মতো ব্যক্তিরা প্রযুক্তি খাত নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁদের উদ্যোগে আইসিটি শিক্ষা, প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও হাইটেক পার্কের মতো কার্যক্রম হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক বাজারের মধ্যে কার্যকর সম্পর্ক তৈরি করতে পেরেছে ?

সজীব ওয়াজেদ জয়কে প্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষিত ও ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রচারক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তির শিক্ষাগত যোগ্যতা বা প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা দিয়ে কোনো নীতির সাফল্য বিচার করা যায় না। বিচার করতে হয় তার ফল দিয়ে। মোস্তাফা জব্বার বাংলা কম্পিউটিং ও বিজয় কিবোর্ডের জন্য পরিচিত। তাঁর কাজের ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকতে পারে। কিন্তু বাংলা কম্পিউটিংয়ে অবদান রাখা আর একটি দেশের প্রযুক্তি খাতকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা এক বিষয় নয়। মন্ত্রণালয়ের কাজ প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ দেখানোতে শেষ হয় না; সেই প্রযুক্তিকে উৎপাদন, ব্যবসা ও রপ্তানির সক্ষমতায় রূপান্তর করাও তার দায়িত্ব।

দীর্ঘ ১৪–১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা একটি সরকারের কাছে ফলাফল জানতে চাওয়া অন্যায় নয়। সরকার যদি ডিজিটাল বাংলাদেশের মতো বড় প্রতিশ্রুতি দেয়, তাহলে সেই প্রতিশ্রুতির সাফল্য মাপার জন্যও স্পষ্ট সূচক থাকতে হবে। কতটি প্রকল্প হয়েছে, কতজন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, কতটি ভবন তৈরি হয়েছে, এগুলো এক ধরনের হিসাব। কত রপ্তানি বেড়েছে, কত উৎপাদনশীল চাকরি তৈরি হয়েছে এবং কত নতুন প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে আছে, এগুলো আরেক ধরনের হিসাব। দ্বিতীয় হিসাবটি ছাড়া প্রথমটি দিয়ে উন্নয়নের পূর্ণ ছবি পাওয়া যায় না।

নতুন সরকার আইসিটি খাতে দশ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। লক্ষ্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু লক্ষ্য ঘোষণা করাই কাজের শেষ নয়। প্রশিক্ষণের মান কেমন, নতুন কতটি প্রতিষ্ঠান তৈরি হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে কতজন চাকরি পাচ্ছেন, রপ্তানি আয় কত বাড়ছে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আসছে কি না, সেগুলো নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার। এক বা দুই বছর পর এসব ফল যাচাই করা সম্ভব হওয়া উচিত। দশ বছর পরও যদি শুধু প্রশিক্ষণ ও প্রকল্পের সংখ্যা শোনানো হয়, তাহলে নতুন স্লোগান পুরোনো সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।

পাঠ্যবইয়ে নতুন বিষয়, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করাও ভালো উদ্যোগ হতে পারে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা সেই জ্ঞান দিয়ে কী তৈরি করতে পারছে, কী সমস্যা সমাধান করতে পারছে, কোন শিল্পে কাজ করতে পারছে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতার কাছে কী বিক্রি করতে পারছে, সেটিও ভাবতে হবে। প্রযুক্তি শিক্ষা মানে শুধু কম্পিউটার চালানো শেখা নয়। এর সঙ্গে পণ্য তৈরি, সফটওয়্যার উন্নয়ন, ব্যবসা পরিচালনা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক গ্রাহকের চাহিদা বোঝার সক্ষমতাও জড়িত। এসবের সংযোগ তৈরি না হলে পাঠ্যক্রমে নতুন বিষয় যোগ হবে, কিন্তু অর্থনীতিতে তার প্রভাব সীমিত থেকে যেতে পারে।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ, অবকাঠামো, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্ক তৈরিতে বিনিয়োগ হয়েছে। তারপরও প্রত্যাশিত বিদেশি বিনিয়োগ কেন আসছে না, নতুন রপ্তানি খাত কেন গড়ে উঠছে না, আর অর্থনীতি কেন এখনও কম মজুরির শ্রমনির্ভর খাতের ওপর এতটা নির্ভরশীল, এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। শুধু অবকাঠামো থাকলেই বিনিয়োগ আসে না। দক্ষ কর্মী, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা, স্থিতিশীল নীতি, সহজ ব্যবসা পরিচালনা, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং বিনিয়োগকারীর আস্থা একসঙ্গে কাজ করে। এর একটিতে ঘাটতি থাকলেও সম্ভাবনাময় খাত পিছিয়ে পড়তে পারে।

আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে তৈরি পোশাক ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিকে বহুমুখী করার সুযোগ পেয়েছিল। ডিজিটাল বাংলাদেশ সেই সুযোগের একটি বড় অংশ হতে পারত। কিন্তু আইসিটি সেবা রপ্তানি, প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এবং উচ্চ দক্ষতার কর্মসংস্থানে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হলে সেই প্রতিশ্রুতির সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয় হয়েছে, মানুষের সময় গেছে, তরুণেরা প্রশিক্ষণ নিয়েছে। সেই বিনিয়োগের ফল জানতে চাওয়ার অধিকার জনগণের রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত উন্নয়নের বিচার স্লোগান দিয়ে হয় না, আবার শুধু ব্যর্থতার তালিকা দিয়েও হয় না। দেখতে হয়, মানুষের জীবন কতটা বদলেছে, অর্থনীতি কতটা উৎপাদনশীল হয়েছে, নতুন কী শিল্প তৈরি হয়েছে, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে আমরা কতটা প্রতিযোগিতা করতে পারছি। ডিজিটাল বাংলাদেশের নামে যদি সত্যিই বিপ্লব হয়ে থাকে, তাহলে আজও আমাদের ‘পাকিস্তান পারল, বাংলাদেশ কেন পারল না '' এমন লেখা পড়তে হতো না ।

বিডিনিউজ ২৪ - পাকিস্তানের স্কলারশিপ কেলেঙ্কারি: বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণার দায় কার?
প্রথম আলো : পাকিস্তান পারলো , বাংলাদেশ কেন পারলো না ?

Allegations of fund misuse in UGC’s Tk4,000 crore ‘HEAT’ -ডেইলি সান





মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.