| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
বিষাক্ত ছোবল
যা বলার সরাসরি বলে ফেলি, কে কি ভাবল দেখার সময় নাই।
ঝামেলায় পড়ে গেছেন খালেদা জিয়া।
বগুড়ায় এক জনসভায় কোনো রাখঢাক
ছাড়াই সেনাবাহিনীকে দেশের
রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের আহ্বান
জানিয়েছেন তিনি। এখন তাঁর দলের
অনেকে উঠেপড়ে লেগেছেন শাক
দিয়ে মাছ ঢাকার মতো সে কথা আড়াল
করতে।
আমরা ভালো করেই জানি, আমাদের
রাজনীতিবিদদের মুখের কোনো লাগাম
নেই। যখন যা খুশি বলবেন,
পরে বিপদে পড়লে বলে দেবেন, কই,
এমন কথা তো বলিনি। যুক্তি দেখাবেন,
আমি যা বলেছি, তার ভুল
ব্যাখ্যা হয়েছে, অথবা বিকৃত
উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। ১০-২০ বছর
আগে সে কথা বলে পার পাওয়া যেত।
যেদিন থেকে জাপানিরা ভিডিও
ক্যামেরা নামক ভয়ানক এক
বোমা সাধারণ মানুষের
হাতে তুলে দিয়েছে, রাজনীতিবিদদের
জন্য সত্যি-মিথ্যা যা খুশি বলে পার
পাওয়া হারাম হয়েছে। গোদের ওপর
বিষফোড়া হয়ে এখন এসেছে স্মার্ট
ফোন। সবার হাতেই এখন সে ফোন,
আমেরিকান রিপাবলিকান পার্টির
প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মিট রমনির
কথাই ধরুন। নিজের সমর্থকদের
নিয়ে তাঁদের একজনের বসার ঘরে মুখ
ফসকে বলেছিলেন, আমেরিকার ৪৭
শতাংশ মানুষ সরকারি সাহায্য
নিয়ে বেঁচে থাকে। এদের কেউ
তাঁকে ভোট দেবে না।
রমনি হয়তো ভেবেছিলেন, ঘরের
মধ্যে নিজের লোকদের
কাছে বলা সে কথা আর কে ফাঁস
করবে। সে কথা যে একজন ওয়েটার
নিজের স্মার্ট ফোনে রেকর্ড
করে বসবে, আর
তা ইন্টারনেটে ছেড়ে দেবে, এমন
কথা তিনি ঘূণাক্ষরেও ভাবেননি। আর
সেই ভুলেই কুপোকাত হলেন তিনি।
একই ভুলের ফাঁদে পড়েছেন
বিরোধীদলীয় নেতা। অনুমান করি,
তিনি যদি জাদু জানতেন,
অথবা কোনো জিন-পরী তাঁর
কথামতো উঠত-চলত, তাহলে বগুড়ায়
তাঁর বলা কথা তিনি এক লহমায়
বোতলে বন্দী করতেন। তা সম্ভব নয়
জেনে তাঁর দলের কর্তাব্যক্তিরা এখন
পাকা জিমন্যাস্টের
মতো সে কথা তাঁদের
পছন্দমতো একবার বাঁকা করছেন,
ত্যাড়া করছেন, সামনে ঝোঁকাচ্ছেন,
পেছনে ঠেলছেন। লক্ষ্য—
যে কথা নেত্রী বলেছেন,
তা তিনি বলেননি, সে কথা প্রমাণ
করা। সমস্যা হলো ওই ভিডিও।
প্রতিটি কথাই তো ধরা আছে। বলিনি,
সে কথা বলে এখন তাঁরা রেহাই পাবেন
কী করে?
প্রথম আলো সে ভিডিওর একটি লিঙ্ক
দিয়েছে। তা শুনে দেখলাম
খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘সেনাবাহিনীর
দেশের প্রতি কর্তব্য রয়েছে।
তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন
করবে না। মানুষ খুন করবে, আর
তারা চেয়ে চেয়ে দেখবে? কাজেই
সেনাবাহিনী সময়মতোই তাদের
ভূমিকা পালন করবে।’
আপাতভাবে ভুল কিছুই
বলেননি বিরোধী নেত্রী। দেশের
সংকটের সময়
সেনাবাহিনী এগিয়ে আসবে,
এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। শুধু
যুদ্ধের সময় নয়, যেকোনো বড় ধরনের
প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়
সেনাবাহিনীকে আমরা এগিয়ে আসতে দেখেছি।
সমস্যা হলো, এসব কাজে তারা হাত
লাগায় দেশের সরকারের নির্দেশ
অনুসারে।
সরকারি কর্মচারী হিসেবে শুধু
শাসনতন্ত্র নয়, প্রশাসনিক
বিধিমালা অনুসরণেও
তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সরকারের
বিরুদ্ধে, তার নির্দেশ ও অনুমতি ছাড়া,
সেনাবাহিনী যখন স্বতঃপ্রণোদিত
হয়ে মাঠে নেমে আসে, তখন
ব্যাপারটা হয়ে পড়ে সংবিধানবহির্ভূত।
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যে ঠিক
সেই আহ্বানই রয়েছে।
আইনজীবী বা রাজনীতিকেরা তাঁর
সে কথার নানা ব্যাখ্যা দিয়েছেন,
আমরা তা পড়েছি। কিন্তু এসব
পণ্ডিতজন কি সাধারণ মানুষ কী বলছে,
তা পড়ে দেখেছেন? আগে মানুষের
‘পালস’ বোঝার উপায় ছিল দেয়ালের
লিখন পড়া। এখন তার দরকার নেই,
ইন্টারনেটে কে কী বলছে, তা চোখ
বুলিয়ে নিলেই কাজ চলে। আমি এসব
পণ্ডিতদের পরিশ্রম লাঘব করার জন্য
প্রথম আলোর পাঠকদের কিছু মন্তব্য
তুলে ধরছি।
১. মাননীয় বিরোধীদলীয়
নেত্রী দেশে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার
উসকানি দিচ্ছেন।
২. সামরিক বাহিনী সময়মতো কাজ
করবে বলেছেন বিরোধীদলীয় নেত্রী।
ঠিক কী কাজের কথা বলছেন তিনি?
নিজের হাতে শাসনভার তুলে নেওয়া।
৩. কী আজব কথা, মুখে গণতন্ত্র আর
শেষ ভরসা সেনাবাহিনী!
৪. বিরোধী নেত্রী প্রমাণ করলেন
জনগণের ওপর তাঁর আস্থা নেই। সকল
আস্থা বন্দুকের নলের ওপর।
৫. রাজনীতিবিদেরা ব্যর্থ
হলে সামরিক বাহিনী হস্তক্ষেপ করে।
রাজনীতিবিদ খালেদা কি নিজের
ব্যর্থতা স্বীকার করে নিচ্ছেন?
৬. দুই দিন
আগে বলা হলো সেনাবাহিনী কেন
নামানো হলো, আজ বলছেন
সেনাবাহিনী কেন নামানো হয় না।
বড্ড কনফিউজিং।
৭. বিরোধী নেত্রী ক্ষমতার
লোভে দেশের মানুষের
স্বার্থবিরোধী কথা বলছেন।
পাবলিকের চোখে চশমা পরানোর দিন
শেষ।
বাংলাদেশের মানুষ সেনাবাহিনীর
হস্তক্ষেপের
ওকালতি করে যেকোনো উসকানির
ব্যাপারে ভীত ও উদ্বিগ্ন হবে,
তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। এই দেশের
ইতিহাসের একটা বড় সময়
কেটেছে সেনাবাহিনীর শাসনে। সেই
দুঃসময়ের
অমানিশা আমরা কাটিয়ে এসেছি।
১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর
বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক
প্রাতিষ্ঠানিকতার ভিত নির্মিত
হয়েছে। গণতন্ত্র বহুতল বিশিষ্ট এক
বাড়ির মতো, ইটের পর ইট
বিছিয়ে সে বাড়ি তৈরি হয়। তার
সঙ্গে জড়ানো থাকে দেশের মানুষের
স্বেদ, তাদের রক্ত ও স্বপ্নের বিস্ময়।
সামরিক হস্তক্ষেপে গণতন্ত্রের ভিত
ক্ষতিগ্রস্ত হোক, এমন
কামনা শুধুমাত্র ব্যর্থ ও পরাজিত
রাজনীতিকদের পক্ষেই করা সম্ভব।
খালেদার মুখে তেমন হস্তক্ষেপের
উসকানি শুনতে পেয়ে আমরা বিস্মিত
হয়েছি, কারণ খালেদা মোটেই ব্যর্থ
বা পরাজিত রাজনীতিক নন। পাঠকদের
মন্তব্যে সেই বিস্ময় ও হতাশার ধ্বনিই
শোনা গেছে।
যে যুক্তিকে বিরোধী নেত্রী সামরিক
হস্তক্ষেপ অনুমোদন করেছেন,
পাকিস্তানি রাজনীতিতে সে যুক্তি বারবার
শোনা গেছে। ‘এ ছাড়া আর অন্য
কোনো পথ ছিল না’, ক্ষমতা দখলের পর
এই যুক্তি দেখিয়েছেন আইয়ুব
থেকে মোশাররফ,
পাকিস্তানে প্রতিটি সামরিক
একনায়ক। এমনকি সে দেশের সর্বোচ্চ
আদালত, সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত
সে যুক্তির পক্ষে সাফাই গেয়েছেন।
১৯৫৪ সালে খাজা নাজিমুদ্দিনের
সরকারকে হটিয়ে সামরিক বাহিনীর
সমর্থনে গোলাম মোহাম্মদ
শাসনতন্ত্র-
বহির্ভূতভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার
পর দেশের প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ
মুনীর তার পক্ষে সাফাই
দিতে গিয়ে তথাকথিত ‘ডকট্রিন অব
স্টেট নেসেসিটি’র কথা বলেছিলেন।
এরপর যতবার পাকিস্তান
সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে,
কোনো না কোনোভাবে সেই একই
যুক্তি দেখানো হয়েছে। বলা হয়েছে,
দেশ বাঁচাতে এ ছাড়া আর কোনো পথই
ছিল না।
বিরোধী নেত্রীর ভাষণ আরেকবার
শুনুন। দেশ এখন সংকটে, মানুষ খুন
হচ্ছে, এই অবস্থায় দেশ
বাঁচাতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ
ছাড়া বিকল্প নেই। নতুন বোতলে সেই
‘ডকট্রিন অব স্টেট নেসেসিটি’র
পুরোনো মদ, দেশকে পাকিস্তান
বানানোর শেষ চেষ্টা!
খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের
পক্ষে থেকেছেন, গণতান্ত্রিক
নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনবার দেশের
প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। তিনি কেন
অসাংবিধানিক পথে, সেনাবাহিনীর
কাঁধে বন্দুক রেখে, ক্ষমতা দখলের
কথা ভাববেন? খালেদা জিয়ার
কাছে অনুরোধ, প্লিজ, দেয়ালের লিখন
পড়ুন। রাজনীতিকদের কথা নয়, দেশের
মানুষের কথা শুনুন।
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও
কলাম লেখক।
©somewhere in net ltd.