নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমি একজন ইউরোপ প্রবাসী, জীবনের ঝড়-ঝাপটায় পাক খেয়ে গড়ে ওঠা আজকের এই আমি। ব্লগে তুলে ধরি মনের গভীরে লুকানো আবেগের রং, যা সোশ্যাল মিডিয়ার চটকদার আলোয় মেলে না। আমি অনুভূতির এক ফেরিওয়ালা, শব্দে বুনে যাই জীবনের অলিখিত গল্প…

আমিই সাইফুল

চলতে চলতে হবে পরিচয়.....

আমিই সাইফুল › বিস্তারিত পোস্টঃ

গলির মোড়ে অপেক্ষা

২৭ শে মার্চ, ২০২৫ ভোর ৫:৩৮

ঢাকার ব্যস্ত শহরে গুলশান থেকে বনানী আসতে আসতে সন্ধ্যা প্রায় ছুঁইছুঁই। রাস্তার জ্যাম, গাড়ির হর্ন আর পথচারীদের হাঁকডাকের মাঝে আমার মনে একটাই চিন্তা—আজ বাসায় ফিরে কী খাবো? গত কয়েকদিন ধরে বাসার কাজের মেয়ে রহিমা আসছে না। ফোন করলে শুধু বলে, “ভাইজান, গ্রামে গেছি, একটু দেরি হবে।” দেরি হবে মানে? তিনদিন তো হয়ে গেল! তাই আজ বাধ্য হয়ে গলির মোড়ে আব্দুল চাচার দোকানে এসে দাঁড়িয়েছি। চাচার দোকানটা ছোট্ট, কিন্তু এখানকার বিস্কুট, পাউরুটি আর চা-পানির ব্যবস্থা আমার মতো একাকীদের জন্য আশীর্বাদ!

আমি দোকানের সামনে এসে থামলাম। ঘড়িতে দেখি সন্ধ্যা সাতটা বেজে গেছে। রাস্তার পাশে একটা মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান ভেসে আসছে। আব্দুল চাচা দোকানের কাউন্টারে বসে পুরোনো একটা রেডিওতে গান শুনছেন। আমি বললাম, “চাচা, একটা বড় পাউরুটি দেন, আর সাথে দশটা পাকা কলা।” চাচা মুচকি হেসে বললেন, “আবার কলা আর পাউরুটি? তুমি তো এই দিয়ে মাস পার করে দিচ্ছ, রিয়াদ!” আমি হেসে বললাম, “কী করবো চাচা, বাসায় রান্না করার লোক নেই। এটাই এখন ভরসা।”

চাচা পাউরুটি আর কলাগুলো একটা পলিথিনে ভরে দিলেন। আমি পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে টাকা গুনতে গুনতে হঠাৎ চোখ পড়লো রাস্তার ওপাশে। একটা রিকশা থেকে কেউ নামছে। রাস্তার লাইটের হলুদ আলোয় দেখা গেল, সে আর কেউ নয়—আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকা মেয়েটি, তানিয়া। আমি তাকে মনে মনে “গলির রানি” বলে ডাকি। তানিয়া আমাদের বিল্ডিংয়ের দোতলায় থাকে। দেখতে সাধারণ, কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি আর হাঁটার ভঙ্গিতে কী যেন একটা আছে, যেটা আমাকে বারবার টানে।

আমি তাড়াতাড়ি আব্দুল চাচাকে বললাম, “চাচা, ভাঙতি আছে?” চাচা পকেটে হাত ঢুকিয়ে বললেন, “দেখি তো…”। এদিকে আমার চোখ তানিয়ার দিকে। রিকশাওয়ালা তার হলুদ দাঁত বের করে হাসছে। বোঝাই যাচ্ছে, তানিয়ার কাছে হয়তো ভাঙতি নেই। আমার খুব ইচ্ছে হলো রিকশাওয়ালাকে গিয়ে বলি, “ভাই, আমি দিয়ে দিচ্ছি।” কিন্তু তারপরই মনে পড়লো একবারের ঘটনা। গত মাসে একটা ছেলেকে এভাবে ভাড়া দিতে গিয়ে সে আমাকে ভুল বুঝেছিল। তারপর থেকে এসব বাহাদুরি দেখানো বন্ধ করে দিয়েছি।

তানিয়া ধীরে ধীরে দোকানের দিকে এগিয়ে আসছে। আমি দেখলাম, তার পরনে একটা সবুজ শাড়ি, আর হাতে একটা ছোট ব্যাগ। আমার দিকে তাকালো। একবার, দুবার। আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন দুলে উঠলো। আব্দুল চাচা আমাকে বাকি টাকা ফেরত দিয়ে বললেন, “নে, যা।” আমি চাইছিলাম চাচা আরেকটু দেরি করুক, যাতে তানিয়ার সাথে কথা বলার সুযোগ পাই। কিন্তু চাচা বুঝলেন না। আমি বাধ্য হয়ে পাউরুটি আর কলার ব্যাগ হাতে নিয়ে বাসার দিকে রওনা দিলাম।

বিল্ডিংয়ের গেটের কাছে পৌঁছে দেখি, আমাদের দারোয়ান কাদের মিয়া গেটের সামনে বসে পান চিবোচ্ছে। লাল রঙের পানের রস তার ঠোঁটে লেগে আছে। আমি বললাম, “কী ব্যাপার, কাদের ভাই? এখানে বসে কী করছেন?” সে হেসে বলল, “কিছু না, ভাই। একটু বসলাম।” আমি তার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ একটা বুদ্ধি এলো। পকেট থেকে ৫০ টাকার একটা নোট বের করে বললাম, “কাদের ভাই, একটা কাজ করবেন?” সে ভ্রু কুঁচকে বলল, “কী কাজ?” আমি বললাম, “২০ মিনিটের জন্য এখান থেকে একটু দূরে চলে যান। এই টাকাটা আপনার।”

কাদের মিয়া প্রথমে বুঝতে পারলো না। তারপর হেসে বলল, “এইডা কী কথা, ভাই? কেউ আইসা গেট খুলতে না পারলে আমারে গালি দিবো!” আমি তাকে আশ্বাস দিয়ে বললাম, “কেউ আসলে আমি আছি না! তুমি শুধু ২০ মিনিটের জন্য চলে যাও। আমি ম্যানেজ করবো।” সে টাকাটা হাতে নিয়ে একটু ভেবে বলল, “ঠিক আছে, ভাই। ২০ মিনিট পর আইসা পরবো।” এই বলে সে গেটের পেছন দিয়ে হাঁটা দিল।

আমাদের বিল্ডিংয়ের গেটটা অটো-লক সিস্টেমের। আমি গেটটা টেনে বন্ধ করে দিলাম। এখন যদি কেউ ভেতর থেকে না খোলে বা চাবি না থাকে, তাহলে গেট খোলা যাবে না। আমার কাছে চাবি আছে, কিন্তু আমি এমন ভাব করলাম যেন আমি গেট খোলার জন্য অপেক্ষা করছি। মনে মনে ভাবলাম, তানিয়া যদি আসে, তাহলে তার সাথে কথা বলার একটা সুযোগ পাবো।

কিন্তু একটা সমস্যা আছে। এর মধ্যে যদি বাসা থেকে কেউ বের হয়ে গেট খুলে দেয়, তাহলে আমার প্ল্যান ভেস্তে যাবে। আমি গেটের পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। মিনিট দুয়েক পর দেখি, তানিয়া আসছে। তার হাঁটার ধরনে একটা আলাদা ছন্দ আছে। আমি তাকে দেখেই বুকের ভেতরটা আবার উতলা হয়ে উঠলো। কেন এমন হয়, আমি নিজেও জানি না। অনেক মেয়েকে দেখেছি, অনেকের সাথে কথা বলেছি। কিন্তু তানিয়ার কাছে এলেই আমার ভেতরটা কেমন যেন অস্থির হয়ে ওঠে।

তানিয়া গেটের কাছে এসে দাঁড়ালো। আমার ঠিক পাশে। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি, যেন কিছুই জানি না। সে বলল, “দারোয়ান কোথায়?” আমি একটু ঘাবড়ে গেলাম। এত তাড়াতাড়ি কথা বলবে, ভাবিনি। আমি বললাম, “দেখছি না তো।” সে একটু ভ্রু কুঁচকে তাকালো, তারপর কলিং বেল টিপলো। আমি মনে মনে ভাবছি, আরেকটু যদি দেরি হতো, তাহলে আমি কিছু বলতে পারতাম। যেমন, “আজ দিনটা কেমন গেল?” কিংবা “একটু গরম পড়েছে, তাই না?” কিন্তু কিছুই বলা হলো না।

কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে কেউ এসে গেট খুলে দিল। তানিয়া ভেতরে ঢুকে গেল। আমিও তার পেছন পেছন ঢুকলাম। আমার মনে একটা ছোট্ট আক্ষেপ রয়ে গেল। আরেকটু হলেই হয়তো কথা বলতে পারতাম।

পরের দিন সকালে আমি অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলাম। জানালা দিয়ে দেখি, তানিয়া বিল্ডিংয়ের নিচে দাঁড়িয়ে কার সাথে যেন কথা বলছে। তার হাতে একটা ফোন। আমি তাড়াতাড়ি জুতো পরে নিচে নামলাম। কিন্তু আমি পৌঁছানোর আগেই সে একটা গাড়িতে উঠে চলে গেল। আমি একটু হতাশ হয়ে আব্দুল চাচার দোকানে গেলাম।

চাচা বললেন, “কী রে রিয়াদ, আজ আবার পাউরুটি?” আমি হেসে বললাম, “হ্যাঁ চাচা, আর কী করবো।” চাচা একটা পাউরুটি দিয়ে বললেন, “তোর বউয়ের খবর কী?” আমি লজ্জা পেয়ে বললাম, “কী যে বলেন চাচা! আমি তো এখনো বিয়ে করিনি।” চাচা হেসে বললেন, “আরে, আমি তো সেই মেয়েটার কথা বলছি। যে কাল রিকশা থেকে নেমেছিল। দেখলাম তোকে দেখে একটু থমকে গেল।”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “সত্যি?” চাচা বললেন, “হ্যাঁ, আমার চোখে ধুলো পড়ে না। তুই একটু চেষ্টা করলে কথা হতেই পারে।” আমি মনে মনে ভাবলাম, চাচা ঠিকই বলেছে। কিন্তু কথা বলবো কীভাবে? আমি তো তার সামনে গেলেই নার্ভাস হয়ে যাই।

সেদিন অফিস থেকে ফিরে এসে দেখি, তানিয়া বিল্ডিংয়ের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে। আমি তার দিকে তাকালাম। সে আমার দিকে তাকালো। আমি সাহস করে বললাম, “আজ গরমটা একটু বেশি, তাই না?” সে হেসে বলল, “হ্যাঁ, তাই তো।” আমি আর কী বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু তার হাসিটা আমার মনে গেঁথে গেল।

এভাবে দিন যায়, আর আমি তানিয়ার সাথে ছোট ছোট কথা বলার সুযোগ খুঁজি। কখনো গেটে, কখনো লিফটে। প্রতিবারই আমার বুকের ভেতরটা লাফায়। কিন্তু আমি জানি, এই লাফানোটা আমার জন্য একটা সুখ। হয়তো একদিন সাহস করে সব বলে দেবো। কিন্তু এখন, আমি শুধু অপেক্ষা করি—গলির মোড়ে, তার একটু দৃষ্টির জন্য।

মন্তব্য ৬ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (৬) মন্তব্য লিখুন

১| ২৭ শে মার্চ, ২০২৫ ভোর ৬:৫৬

বাকপ্রবাস বলেছেন: বয়স হল, তায় প্রেমপ্রেম লেখা লেখা হয়না, আপ পড়লাম। ভাল লাগল। ঈদে কী নিলেন? নাহিদ পাঞ্জাবী?

২৭ শে মার্চ, ২০২৫ সকাল ১০:০৪

আমিই সাইফুল বলেছেন: ভাই বিদেশে আবার ঈদ।

২| ২৭ শে মার্চ, ২০২৫ সকাল ৯:৫৩

রাজীব নুর বলেছেন: সহজ সরল গল্প। জীবনের গল্প।

২৭ শে মার্চ, ২০২৫ বিকাল ৩:৫২

আমিই সাইফুল বলেছেন: ধন্যবাদ ভাই

৩| ২৭ শে মার্চ, ২০২৫ সকাল ১০:১৯

কাজী ফাতেমা ছবি বলেছেন: ভালো লাগলো গল্পটি
পরের পর্বে কী হয় জানতে মন চায়।

২৭ শে মার্চ, ২০২৫ বিকাল ৩:৫৩

আমিই সাইফুল বলেছেন: পরের পর্ব আসবে কিনা জানি না। ধন্যবাদ আপু ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.