| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |

‘পরিবার’ বলতে কী বুঝায়? কয়েকজন মানুষ একসাথে থাকা ও খাওয়া কে ‘পরিবার’ বলা যেতে পারে কি? রক্তের সম্পর্ক আছে বলেই কি আমরা নির্দিষ্ট ‘পরিবার’ হয়ে যাই? বিপদে-আপদে একে অন্যকে সাহায্য করার নাম কি ‘পরিবার’? আমি আসলে ‘বিশুদ্ধ পরিবার’ এর সংজ্ঞা খুঁজছিলাম।
হোস্টেলে অনেক মানুষ একসাথে থাকেন এবং তারা একসাথে খাওয়া-দাওয়াও করেন কিন্তু তারা তো ‘পরিবার’ হিসেবে নিজেদের দাবী করেন না। রক্তের সম্পর্ক-ই যদি শেষ কথা হত, তাহলে অনেক এতিম মানুষের জীবনে ‘পরিবার’ নামক শব্দ-ই থাকতো না।
আর যদি বিপদে-আপদে একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর নাম ‘পরিবার’ হয় তাহলে ‘বিশুদ্ধ পরিবার’ তার সংজ্ঞা হারায়। বন্ধু থেকে আত্মীয়-স্বজন থেকে কলিগ পর্যন্ত সবাই সাহায্য করতে পারেন কিন্তু তারা কখনোই নিজেদের পরিবার হিসেবে অন্তত সরাসরি দাবী করতে পারেন না; উচিতও নয়।
তাহলে ‘পরিবার’ বলতে কী বুঝায়? আমি আরও গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করছি। সত্যি বলতে, এমন কোনো সহজ সংজ্ঞা নেই যা সব কিছুকে ব্যাখ্যা করে। সুতরাং আমরা যখন ‘পরিবার’ বলি, তখন আসলে কী বুঝাই?
প্রথমত, আমাদের ভাষাটিই অসম্পূর্ণ। বাংলায় ‘পরিবার’ শব্দটি সংস্কৃত ‘পরিবার’ থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো: যা পরিবেষ্টন করে। কিন্তু এই পরিবেষ্টন আবার কী? কিছু মানুষকে? কিছু দেয়ালকে? নাকি কিছু অনুভূতিকে?
আমরা যখন বলি এই লোকগুলো আমার পরিবার, তখন আসলে আমরা বলতে চাইছি যে, এই মানুষগুলোর সাথে আমার এমন একটি সম্পর্ক আছে যা অন্য কোনো সম্পর্কের মতো নয়। কিন্তু সেই সম্পর্কটা ঠিক কোথায় বসে আছে?
হোস্টেলে অনেক মানুষ একসাথে থাকে, একসাথে খায়, কখনো কখনো একসাথে হাসে ও কাঁদেও। কিন্তু তারা ‘পরিবার’ নয়। কেন? কারণ হোস্টেলের সম্পর্কগুলোর মধ্যে একটি অনিবার্য অস্থায়িত্ব থাকে। সবাই জানে যে, এই সম্পর্কগুলো ভেঙে যাবে। কেউ চিরদিন থাকবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেবল সময়ের দৈর্ঘ্যই কি বিষয়? না।
একটি দীর্ঘ মেয়াদী বৈবাহিক সম্পর্কও যদি কেবল অভ্যাসগত হয়ে যায়, যদি তার মধ্যে সেই অন্তর্দহন না থাকে, তবে সেটি কি আর ‘পরিবার’ থাকে? অনেক সংসার আছে যেখানে দুইজন মানুষ দশ বছর ধরে একসাথে আছেন কিন্তু মনে মনে দুজনেই একা। তারা কি ‘পরিবার’? সমাজ বলবে হ্যাঁ, কিন্তু তাদের অনুভূতি কী?
রক্তের সম্পর্ক একটি রহস্য। কোনো কারণ ছাড়াই আমরা রক্তের সম্পর্ককে ভালোবাসি। একজন ভাই বা বোনের প্রতি আমাদের টান কখনো কখনো বোঝানো যায় না। কিন্তু এই রক্তের সম্পর্ক যদি যথেষ্ট হত, তবে কেন অনেক ভাইবোন পরস্পরের শত্রু হয়ে যান? কেন একই রক্তে লালিত দুইজন মানুষ একে অপরের জন্য অপরিচিত হয়ে যান?
আমি স্বীকার করছি, রক্ত একটি ভিত্তি দেয়, কিন্তু সেই ভিত্তির উপর কী করা হয়, তা নির্ভর করে অন্য কিছুর উপর। তাই এতিম মানুষেরা ‘পরিবার’ হারান না, কারণ ‘পরিবার’ কোনো রক্তের গুণগত বৈশিষ্ট্য নয়।
তাহলে সেই গুণটি কী? আমি মনে করি, ‘পরিবার’ হলো সেই স্থান যেখানে আমরা ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’ হয়ে যাই কিন্তু আমাদের ‘আমি’-টিকে হারাই না। এটি একটি বিড়ম্বনা। হোস্টেলে আমরা ‘আমরা’ হই, কিন্তু সেটি একটি সাময়িক ‘আমরা’।
ক্লাসে আমরা ‘আমরা’, দলে আমরা ‘আমরা’, কিন্তু সেই ‘আমরা’ থেকে আমরা সহজেই বের হয়ে আসতে পারি। পরিবারে সেটি সম্ভব নয়। বা সম্ভব হলে, সেটি একটি আঘাত হয়ে আসে।
আপনি যখন আপনার পরিবার থেকে বের হয়ে আসেন, তখন একটি অংশ আপনার ভেতরে রয়ে যায়। আপনি বের হতে পারেন, কিন্তু আপনি আর আগের আপনি থাকেন না।
এই অবিচ্ছেদ্যতাটিই কি ‘পরিবার’? কিন্তু তাহলে বন্ধুত্ব কী? কিছু বন্ধুত্ব এত গভীর হয় যে, তা পরিবারকে ছাড়িয়ে যায়। দুই বন্ধু যারা একযুগ ধরে একসাথে আছে, যারা একে অপরের সব কিছু জানে, যারা বিপদে একে অপরের পাশে আছে, তারা কি ‘পরিবার’?
সমাজ তাদের ‘পরিবার’ বলবে না, কিন্তু তাদের অনুভূতি কী? এখানে আমরা একটি দ্বৈততায় পড়ি। আমরা চাই ‘পরিবার’ একটি বিশেষ শব্দ থাকুক, কিন্তু আবার আমরা দেখি যে, সেই বিশেষ অনুভূতি অন্য কোথাও পাওয়া যায়। তাহলে কি ‘পরিবার’ কেবল একটি সামাজিক লেবেল মাত্র?
না, আমি সেটা মনে করি না। আমি মনে করি ‘পরিবার’ এর মধ্যে একটি অতিরিক্ত স্তর আছে যা বন্ধুত্বে নেই। সেটি হলো দায়িত্বের অজানা সীমা। পরিবারে আমরা এমন দায়িত্ব নেই যা আমরা কখনো প্রশ্ন করি না। আপনার বোন যদি রাত তিনটায় ফোন দেয়, আপনি জানেন না কেন, কিন্তু আপনি উঠবেন। কোনো প্রশ্ন নেই। কোনো হিসাব নেই। এই হিসাবহীনতা-ই হয়তো ‘পরিবার’।
বন্ধুরাও সাহায্য করে, কিন্তু সেই সাহায্যের মধ্যে একটি স্বীকৃতি থাকে যে, এটি তার নিজস্ব একটি পছন্দ। পরিবারে সেই পছন্দের অনুভূটি মুছে যায়। এটি স্বতঃসিদ্ধ হয়ে যায়। এটি ভালো নাকি মন্দ, তা নিয়ে বিতর্ক আছে, কিন্তু এটি একটি বৈশিষ্ট্য।
কিন্তু এই দায়িত্ব যদি একতরফা হয়? যদি একজন দেয় এবং অন্যজন নেয়? তবে কি সেটি ‘পরিবার’? না। তখন সেটি একটি অসুস্থ সম্পর্ক। তাহলে ‘পরিবার’ হলো সেই স্থান যেখানে দায়িত্ব ও ভালোবাসা পরস্পরের মধ্যে অদৃশ্য একটি ধারায় প্রবাহিত হয়, যার কোনো শুরু বা শেষ নির্ধারণ করা যায় না।
আপনি দেন, আপনি পান, কিন্তু কখন কী দিয়েছেন বা পেয়েছেন তা আলাদা করে মনে করতে পারেন না। এটি একটি সম্পূর্ণতা।
আবার ‘পরিবার’ শুধু বিপদে নয়, এটি নিরাপদেও। এটি সেই স্থান যেখানে আপনি কিছু না করেও থাকতে পারেন। হোস্টেলে আপনাকে কিছু একটা করতে হয়। যেমন: গল্প করতে হয়, উপস্থিতি জানাতে হয়। পরিবারে আপনি চুপচাপ বসে থাকতে পারেন। আপনার উপস্থিতিই যথেষ্ট। এই ‘অকর্মণ্যতার গ্রহণযোগ্যতা’ হয়তো ‘পরিবার’ এর সবচেয়ে গভীর সংজ্ঞা।
সমাজে আমাদের সবসময় কিছু একটা করতে হয়, কোনকিছুর কারণ হতে হয়, প্রমাণ করতে হয়। পরিবারে আপনাকে কিছু প্রমাণ করতে হয় না। আপনি শুধু ‘আছেন’, তাতেই সবাই খুশি।
তাহলে এতিম মানুষেরা কীভাবে ‘পরিবার’ পান? তারা এই অভিজ্ঞতাটি অন্য কোথাও খুঁজে পান। হয়তো একজন শিক্ষকের কাছে, হয়তো একজন বন্ধুর কাছে, হয়তো একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। কিন্তু সেখানে সময় লাগে। এবং সেখানে একটি ‘নির্বাচন’ থাকে।
পুনরায় রক্তের সম্পর্কে কিন্তু এই নির্বাচন নেই, তাই সেটি কখনো কখনো বোঝা যায় না কেন আছে। কিন্তু নির্বাচিত পরিবারে এই ‘নির্বাচন’ একটি গভীর স্বাক্ষর রেখে যায়। আপনি জানেন যে, এই মানুষটিকে আপনি বেছে নিয়েছেন, বা আপনাকে তারা বেছে নিয়েছে। এবং সেই নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি; প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে তৈরি করে একটি নতুন ধরনের গভীরতা।
আমি ভাবছি, ‘পরিবার’ কি শুধুই মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ? কিছু মানুষ তাদের পোষা প্রাণীকে পরিবারের অংশ বলেন। কিছু মানুষ একটি নির্দিষ্ট স্থানকে যেমন: একটি গ্রাম, একটি বাড়ি কে পরিবার বলেন। হয়তো ‘পরিবার’ হলো সেই কেন্দ্র যার চারপাশে আমাদের জীবনের অর্থ গঠিত হয়। এটি একটি বিন্দু নয়, এটি একটি ক্ষেত্র। একটি গ্রাভিটেশনাল ক্ষেত্র যেখানে আমরা স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হই।
শেষ পর্যন্ত, আমার মনে হয় ‘পরিবার’ কোনো সংজ্ঞায় বন্দি হয় না কারণ এটি জীবন্ত। এটি বদলায়। এটি রক্তে হতে পারে, নির্বাচনে হতে পারে, স্মৃতিতে হতে পারে, বা স্বপ্নে হতে পারে। কিন্তু যেখানেই হোক না কেন, সেখানে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। আপনি যখন সেখানে থাকেন, তখন আপনি বিশ্বের বাকি অংশ থেকে আলাদা একটি ভাষায় কথা বলেন। একটি ভাষা যা শব্দ ছাড়াই বোঝা যায়। একটি ভাষা যেখানে নীরবতারও অর্থ থাকে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, একটি ভাষা যেখানে ‘আমি’ এবং ‘তুমি’ এর মধ্যে যে দূরত্ব, সেটি কখনো কখনো মুহূর্তের জন্য মুছে যায়, এবং শুধু ‘আমরা’ থেকে যায়। আর সেই মুহূর্তগুলোর স্মৃতিই হয়তো ‘পরিবার’।
Also Read It On: পরিবার বনাম পরিবেষ্টন: রক্তের সম্পর্কের বাইরে এক অদ্ভুত ‘আমরা’-র গল্প
©somewhere in net ltd.