| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
মনে রেখো ঈশ্বর সৃষ্টিও করেন না, ধ্বংসও করেন না, তোমারই আদিম প্রকৃতি ঈশ্বরে অনুস্যূত থেকে সেই মূর্চ্ছনায় নানারকম মূর্ওনার ভিতর-দিয়ে বিবর্ওিত হ'তে-হতে এই পরিণতি লাভ করেছে, যে-পরিণামের ফল এই বিদ্যমান তুমি, আর, এই বিবর্ওিন সংঘটিত হয়েছে তোমার চাহিদামাফিক সুসঙ্গত বিন্যাসে বিন্যাসিত হ'তে-হ'তে যেমনতর চলেছ তেমনি ক'রে, আর, সওানুস্যূত জীবন হ'য়ে সেই মূর্চ্ছনা তোমারই এই জীবনে বোধিতাৎপর্য্য-অনুক্রমায় সংক্রামিত হ'য়ে চলেছে; যেমন তোমার জীবন আছে, সেই আকাঙ্ক্ষার অনুপ্রেরণায় যেমন চলছ, যেমন করছ, হ'চ্ছ যেমন প্রাপ্তিও তোমার তেমনতর সংঘটিত হ'য়ে উঠেছে, অর্থাৎ, এই হওয়াটাই তোমার স্ব-তে পর্য্যবসিত হ'য়ে নিজত্বকে অভিদীপিত ক'রে তুলেছে, তেমনি তোমার ঐ আকাঙ্ক্ষা সক্রিয় সুকেন্দ্রিক তৎপরতায় যেমনতর চলনে চলৎশীল হ'য়ে চলবে, করার ভিতর-দিয়ে হওয়ার উপকরণ সংগ্রহ ক'রে আয়ত্ত ক'রে তা'কে সওায় সংগ্রথিত ক'রে তুমি হবেও তেমনি, পাবেও তেমনি; ফল কথা, তোমার দোষগুণ, হওয়া-পাওয়া, ভালমন্দ যা'-কিছু তা'র জন্য দায়ী তুমি, ঈশ্বরেরর প্রাণন-দীপনা জীয়ন্ত জলুসে তা'তেই অনুস্যূত হ'য়ে থাকে; সুকেন্দ্রিক তৎপরতায় ঈশ্বর-অনুধ্যায়ী হ'য়ে চল প্রেরিত জীবনবেদীকে আশ্রয় ক'রে, তোমার প্রাপ্তিও ঈশ্বরীয় হ'য়ে উঠবে, বৃত্তি বা প্রবৃত্তির উপাসনা ক'রে চল, তোমার আকাঙ্ক্ষামাফিক সংসৃষ্ট হ'য়ে উঠবে তুমি স্বতঃই,
"নাদত্তে কস্যচিৎ পাপং ন চৈব সুকৃতং বিভুঃ।
অজ্ঞানেনাবৃত জ্ঞানং তেন মুহ্যন্তি জন্তবঃ
১৩২২ সালের কথা।পদ্মানদীর তীরে যে ঘরে শ্রীশ্রীঠাকুর ও অনন্তনাথ থাকিতেন,ঐ ঘরে একদিন রাত্রি অনুমান দেড়ঘটিকার সময় শ্রীশ্রীঠাকুর একখানি চৌকির উপর শুইয়া আছেন। আমি ও অনন্তনাথ তথায় পৃথক পৃথক আসনে বসিয়া নাম ধ্যান করিতেছিলাম। এমন সময় হঠাৎ শ্রীশ্রীঠাকুর চৌকি হইতে নামিয়া দরজা খুলিয়া বাহিরে দৌড় দেন ও বলিতে থাকেন,--'পরমপিতা, তোমার কাজ কিরুপে করব--লোক পাচ্ছি না, 'তখন আমি ও অনন্তনাথ তাঁহার পিছন পিছন দৌড়াই। আমরা দেখি যে শ্রীশ্রীঠাকুর পদ্মানদীর তীরে শ্মশানের নিকটবর্তী বালুচরার উপর আকাশমুখী হইয়া দাড়াইয়া হস্তদ্বয় উর্দ্ধে উত্তোলন করিয়া কাঁপিতে কাঁপিতে উন্মাদের ন্যায় বলিতেছেন--- 'হে পরমপিতা, মানুষ পাইলাম না।আমি থেকে কি করব?আমি যাই, আমি যাই।' তখন আমি, অনন্তনাথ উভয়ে শ্রীশ্রীঠাকুরের শ্রীপাদপদ্ম জড়াইয়া ধরিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে আবেগভরে আর্তকন্ঠে বলিতে লাগিলাম--'ঠাকুর, আমাদের ছেড়ে যেও না, আমরা তাহলে বাঁচব না'। তখন আমাদের উভয়ের শরীর শ্রীশ্রীঠাকুরের দেহের স্পর্শে থরথর করিয়া কাঁপিতে লাগিল। আমরা বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া দেখিলাম যে শ্রীশ্রীঠাকুরের মুখমন্ডল হইতে সার্চলাইটের মত এক অপূর্ব আলোক-জ্যোতিঃ নির্গত হইয়া আকাশ স্পর্শ করিয়াছে,তাহাতে অন্ধকার রাএেও আকাশের মেঘগুলি সাদা গোলাপি আভাযুক্ত দেখা যাইতেছে। তখন শ্রীশ্রীঠাকুরের মুখমন্ডল এক অপূর্ব জ্যোতির্ময় রুপ পরিগ্রহ করিয়াছে, বিশেষ করিয়া শ্রীশ্রীঠাকুরের কপালখানি সে অপূর্ব আলোকে আয়নার ন্যায় স্বচ্ছ দেখা যাইতেছে। ক্রমশঃ শ্রীশ্রীঠাকুরের সহজ জ্ঞান ফিরিয়া আসিবার সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার দেহখানি অবশ হইয়া মাটিতে পড়িয়া যাওয়ার উপক্রম হইল। তৎক্ষণাৎ আমরা দুইজনে শ্রীশ্রীঠাকুরের দুইহস্ত আমাদের দুই স্কন্দের উপর দিয়া ধরিয়া লইয়া তাঁহাকে উক্ত শয়নগৃহে ফিরাইয়া আনিলাম। অতঃপর ক্রমে ক্রমে শ্রীশ্রীঠাকুর সুস্থ হন।
চোখের সামনে সপাং করে চাবুক মেরেছে সহিস তার গাড়ির ঘোড়ার পিঠে। যন্ত্রণায় আঁতকে উঠেছেন অনুকূলচন্দ্র। উঃ! চাবুকটা যেন পড়েছে নিজের পিঠেই। কি হল? কি হল? সবাই ব্যস্ত হয়ে ছুটে এসেছে কাছে। পিঠের উপর তখন হাত বলোচ্ছেন অনুকূলচন্দ্র। দেখি কি হল? গায়ের জামাটা খুলে ফেললে তারা টেনে। দেখলে, দড়ির মতো একটা লম্বা মোটা কালশিরে। মাঝে মাঝে কেটে গিয়ে রক্ত পড়ছে। সবাই অবাক। গরুর গলায় দড়ির ফাঁস লেগেছে। দড়িটা কেটে দিতে গেল একজন। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে অনুকূলচন্দ্র। উঃ একটু কেটে গেল বুঝি রে! সঙ্গে সঙ্গে রক্ত বেরিয়ে পড়ল নিজের ঘাড়ের চামড়া থেকে। লোকটা দেখল, দড়ি কাটতে গিয়ে গরুর চামড়া একটু কেটে ফেলেছে। দাঁতনের জন্য ডাল ভাংগতে পারে না অনুকূলচন্দ্র। গাছের পাতা ছিঁড়তে পারে না। ফুল তুলতে পারে না, কাছে গিয়ে গন্ধ শুঁকে আসে।
।। কতটা ঘুমনো দরকার ।I
শ্রীশ্রীঠাকুর --- আমি এমনও দেখেছি যে দশ মিনিট ঘুমে যেন পাঁচ ঘন্টা ঘুমের কাজ হ'য়ে যায় কোনও ক্লান্তি থাকে না --- ever vitalised ( সর্বদা সঞ্জীবিত ) । অবশ্য নামধ্যান , যাজন যত বাড়ানো যায় , ততই এইরকম হয় । একদিনে এটা হয় না , তবে ইচ্ছা করলেই ধীরে-ধীরে ঘুম কমানো যায় ।
প্রশ্ন-- স্মৃতিশক্তি বাড়ে কিসে?
শ্রীশ্রীঠাকুর-- একটা ভাবছ, একটা করছ। তখন যদি আর একটা কিছু তার ওপরে ওঠে, তবে একটা চাপা প'ড়ে যায়। আমার মনে হয়, অমন করা ভাল নয়। যা' করবে, তা' thoroughly (ঠিকভাবে) করবে। ঐরকম মনোযোগ নিয়ে সমস্ত জিনিসটাকে face করা (মোকাবিলা করা) লাগে। তখন এমন হ'য়ে যায় যে দশ-বিশটা কাজ simultaneously ক'রতে পারবে thoroughly (পুরোপুরিভাবে)। আমি কুষ্ঠিয়ায় একবার একসঙ্গে দশজন মানুষকে dictation দিয়েছিলাম। চৌদ্দ জন প্রশ্ন করছে, চৌদ্দ জনের দিকে মনোযোগ রেখে এমনভাবে adjust ক'রে (নিয়ন্ত্রণ ক'রে) dictate ক'রে যাচ্ছি যে প্রত্যেকের প্রশ্নেরই জবাব হ'চ্ছে।
প্রশ্ন-- চিত্ত স্থির হয় কেমন ক'রে?
শ্রীশ্রীঠাকুর-- চিত্ত স্থির হওয়া মানে static (স্থিতিশীল) হওয়া নয়। আমরা এককে কে'ন্দ্র ক'রে যখন চলি, তখনই হয় চিত্ত স্থির। চিত্ত dynamic (গতিশীল) , active (সক্রিয়) , sharp (তীক্ষ্ন) ও responsive (সাড়াপ্রবণ) থাকবে concentric (সুকেন্দ্রিক) হ'য়ে- এই হ'লো চিত্তস্থৈর্য্যের মূল কথা। যে যত সম্বেগ-সম্বুদ্ধ, যে যত অনুরাগী, তার ততটা হয়।
প্রশ্ন-- আমি কে ?
শ্রীশ্রীঠাকুর-- পরমকারুণিক যিনি, পরম-উৎস যিনি, তাঁরই উৎসৃষ্ট আমি। তাঁরই একটি কিরণ তুমি, একটি কিরণ আমি, একটি কিরণ এই ছায়াপথ, ঐ তারা , ঐ সব।
প্রশ্ন-- মন্ত্র মানে কী ? মন্ত্রের প্রয়োজন কী ?
শ্রীশ্রীঠাকুর-- মন্ত্র মানে যা' মনকে প্রবৃত্তি থেকে ত্রাণ করে। আর, মন্ত্র মানে জীবনের সঙ্কেত! সবটার মধ্য দিয়ে সেটা কার্য্যে পরিণত করতে চাই। প্রবৃত্তিচলনের দরুন নানা বিচ্ছিন্ন বোধিপ্রণালী, যা' সৃষ্টি হ'য়ে আছে আমাদের ভিতর, মন্ত্রের প্রতীক যিনি তাঁতে সুকেন্দ্রিক হ'লে সেগুলি নিয়ন্ত্রিত হয়। আনন্দমুখর অর্থভাবনা-সমন্বিত মন্ত্র জপের ভিতর-দিয়ে মানুষের অবচেতন মনের অনিয়ন্ত্রিত বহু কিছুই উদ্ভাসিত হ'য়ে নিয়ন্ত্রিত হ'য়ে উঠতে পারে।


ঠাকুর নাচছেন আর তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছেন গোঁসাই।
এই কি সেই আদিত্যবর্ণ ? আলোকময় প্রথম প্রকাশের মৌল সত্তা ? নাচতে নাচতে গোঁসাইয়ের গায়ের উপর হেলে পড়লেন ঠাকুর। ভাবস্হ হয়েছেন বুঝি। ধরতেই এলিয়ে পড়ল দেহ। সবাই মিলে ধরাধরি করে এনে শুইয়ে দিলে ঘরের মেঝেয়। শান্ত স্থির দেহে জীবনের চিহ্ন পাওয়া যায় না খুঁজে। গায়ে ধাক্কা দিলেও সাড়া নেই। বিগতবাহ্য শবসমান হয়েছে শরীর।
একজন থার্মোমিটার এনে বগলে দিলে। তাজ্জব ব্যাপার! উত্তাপ উঠেছে একশো দশে। একখানা জ্বলন্ত লাল টিকে এনে বসিয়ে দিলে একজন। চামড়া পুড়ে ভিতরে বসে যেতে লাগল দগদগে টিকেখানা। অথচ দেহখানা একটু কাঁপল না, তেমনি পড়ে রইল বিকারহীন। হঠাৎ থরথর করে কেঁপে উঠল ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটা। ডান পায়েরটা কাঁপতে কাঁপতে কাঁপল বাঁ পায়েরটাও। শেষে হাতের পায়ের চারটি বুড়ো আঙুলই কাঁপতে লাগল। সে কী কাঁপা ! স্পন্দনের বেগ এত যে, ঠিক করাই দুঃসাধ্য মিনিটে কত বার কাঁপছে।
ক্রমশঃ দ্রুত কম্পন ধীর হল। ধীর হতে হতে থামল একেবারে। থামতেই গোটা দেহটা সেই শব শয়ান থেকেই শূন্যে লাফিয়ে উঠল দেড় হাত দু হাত উঁচুতে। শূন্যে উঠে আবার দেহটা খসে পড়ল মাটিতে। ওদিকে দেহ তেমনি নিঃসাড়। মুখমন্ডল দিয়ে বেরুচ্ছে জ্যোতির ছটা। কারণহীন করুণার মধুব্যঞ্জনা।
এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেওয়া হল না। বাবা বললেন, ডাক্তারি পড়লে মন্দ হয় না। দেখ চেষ্টা করে। বাবার কথামতো কলকাতায় চলে এলেন ১৯১০ সালে। বউবাজারে শরৎ মল্লিকের ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুল বর্তমানে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ। অনুকূলচন্দ্র গিয়ে বললে, আমাকে ভর্তি করে নিন, আমি ডাক্তারি পড়ব। কতদূর পড়েছ ? প্রশ্ন হল কর্তৃপক্ষের। আজ্ঞে, এন্ট্রান্স অবধি পড়েছি, পড়া সব শিখেছি, স্যর শুধু পরীক্ষাটা দিতে পারিনি। তুমি ত বলছ, আমরা তা জানব কেমন করে ? তবে আমাকে পরীক্ষা করে নিন। অনুকূলচন্দ্র নাছোড়। কর্তৃপক্ষ রাজি হলেন। বেশ শক্ত শক্ত প্রশ্ন দেওয়া হল। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ অনুকূলচন্দ্র। ভর্তি হয়ে গেলেন ডাক্তারি পড়তে। এক দূর সম্পর্কীয় আত্মীয় অনেকগুলো টাকা ধার নিয়েছিলেন পিতা শিবচন্দ্রের কাছ থেকে। ঠিক হল, তিনি মাসে মাসে শোধ করবেন। মাসিক দশ টাকা সাহায্যের প্রতিশ্রুতি নিয়ে গ্রে স্ট্রিটের এক কয়লার গদিতে এসে উঠল অনুকূলচন্দ্র। পায়ের জুতোয় তালি পড়েছে গন্ডা খানেক। তলা ক্ষয় হতে হতে সুকতলা ছিঁড়ল। একেবারে নগ্নপদ। অবস্থা আরও সংগিন হয়ে উঠল। টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিলেন ভদ্রলোক। হোটেলে খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল অনুকূলচন্দ্রের। একবেলা মুড়ি আর একবেলা কলের জল। কলতলায় গিয়ে পেট ভরে জল খেয়ে আসছে দু বেলা। বাইলকলিক আরম্ভ হয়ে গেল পিত্তিবিকার হয়ে। ক্রমশঃ বাড়তে লাগল যন্ত্রণা। শেষে একদিন হয়ে পড়ল অচেতন।
প্রশ্ন-- নাম করার ফলে যে রোগ সারে তার কারণ কী?
শ্রীশ্রীঠাকুর-- Cohesive urge - এ (সংযোজনী আকূতিতে) living sperm ও ovum (জীবন্ত শুক্রকীট ও ডিম্বাণু) মিলিত হ'য়ে zygotte (জীবনকণা) form (গঠন) ক'রে cell - division (কোষবিভাজন) হ'তে থাকে। তার ফলেই গ'ড়ে ওঠে আমাদের এই শরীর এই cohesive urge (সংযোজনী আকূতি)ই libido (সুরত)। এই libido (সুরত)-এরই expression (অভিব্যক্তি) হ'ল vital ray (জীবনরশ্মি) বা energy (শক্তি)। urge (আকূতি)-টা যখন active (সক্রিয়) হয়, সেইটাই energy (শক্তি)। Libiodoic concentration (সুরতসম্বেগসম্পন্ন একাগ্ৰতা) নিয়ে নাম করলে তার থেকে vital ray (জীবনরশ্মি) বা vital energy (জীবনীয় শক্তি) emanate (নির্গত হয়) করে। রোগীর যে vital ray (জীবনরশ্মি) shattered (বিধ্বস্ত) হয়েছে, ওইভাবে নাম করার ফলে তোমার ভিতর থেকে একটা vital ray (জীবনরশ্মি) বিচ্ছুরিত হয়ে তাতে induced (সঞ্চালিত) হওয়ার ফলে তার curative force (রোগ আরোগ্যকারী শক্তি) অর্থাৎ vital flow (জীবন-প্রবাহ) বেড়ে যায়। তাই আরোগ্য হয়।
প্রশ্ন-- মন সংযম করা যায় কি ক'রে ?
শ্রীশ্রীঠাকুর-- সেই জন্য বেত্তা গুরুর প্রয়োজন। বেত্তা মানে যিনি জানেন। ব্রহ্মবিদ্ ব্রহ্মৈব ভবতি। ব্রহ্মজ্ঞ গুরুতে টান চাই। তাঁতে টান থাকলে আমি চোর, ডাকাত, ভাল-মন্দ যা'ই হই না কেন, সব-কিছু নিয়েই আমি তাঁতে সুকেন্দ্রিক হ'য়ে উঠি এবং তাতে আমার চরিত্র নিয়ন্ত্রিত হয়। গুরুর প্রতি অনুরাগ ছাড়া মন বিক্ষিপ্ত হ'য়ে পড়ে। আর, অনুরাগে ব্যাক্তিত্ব বিকশিত হ'য়ে ওঠে।
প্রশ্ন-- সহনশীলতা বাড়ে কী ক'রে?
শ্রীশ্রীঠাকুর-- অভ্যাস করতে-করতে হয়। মানুষ যদি কেউ কোন দুর্ব্ব্যবহার করে, তখন ভাবা উচিত, সে প্রবৃত্তি-অভিভূতির দরুন অমন করছে, তাই মনে যেন কোন ব্যথা না নিই। তার অবস্থাটা যেন বুঝি। মানুষ তো প্রবৃত্তি-অভিভূত হ'য়ে চলেই। কিন্তু আমার একমাত্র প্রবৃত্তিই হন যেন ভগবান। তাঁকে নিয়ে এবং তাঁর জন্যই যেন সব-কিছু হয়। এইটে হ'লো সরলতম প্রবৃত্তি। তাঁকে ভালবাসব এবং তাঁর জন্যই দুনিয়াকে ভালবাসব। এতে অন্য সব প্রবৃত্তি সরল হ'য়ে ওঠে।
প্রশ্ন-- জীবনের উদ্দেশ্য তো সুখী হওয়া।
শ্রীশ্রীঠাকুর-- ঐ তো হ'ল না! তুমি দুঃখীও হতে পার। গন্তব্য হ'ল ঈশ্বর। ঈশ্বরকে তো দেখতে পাই না, তাঁকে পাই ইষ্টের মধ্যে। যেমন পিতৃত্ব-কে পাই পিতার মধ্যে। তঁদর্থী যা'-কিছু তাই করব, তাতে অশেষ দুঃখও আসতে পারে, আবার সুখও আসতে পারে, মৃত্যুও আসতে পারে, আবার অনন্ত জীবনও পেতে পার।
প্রশ্ন-- ঠাকুর! বিশ্বাসটা পাকা হয় কি ক'রে?
শ্রীশ্রীঠাকুর-- বিশ্বাস জিনিসটা শ্বাসক্রিয়ার মতো সহজ। ওটা এতই পাকা যে ও-সম্বন্ধে সন্দেহ, অবিশ্বাস বা প্রশ্ন আসে না। কারণ, ওটা প্রত্যক্ষ। মানুষের ভালবাসা যা'তে, বিশ্বাস তা'তে। ঐ তার জীবন। তা'তে অবিশ্বাস আসলে সে তো আর নেই। সদগুরুর-সান্নিধ্যে এসে মানুষ positively (বাস্তবে) যতটুকু তাঁকে follow (অনুসরণ) ক'রে , unexpectanly (অপ্রত্যাশী হ'য়ে) , out of love (ভালবেসে), - তার ভিতর-দিয়ে তার যে experience (অভিজ্ঞতা) হয়, সেই experience (অভিজ্ঞতা)-ই তাকে ব'লে দেয় যে, বিশ্বাসের অমনতর স্থল আর নেই। কারণ, মানুষ জীবনে অতো সুখ আর কিছুতে পায় না, অতো স্বস্তি আর কিছুতে পায় না। ঐটুকুই তার জীবনের অমৃত। তাই বিশ্বাস না ক'রে সে যাবে কোথায়? অনেকের love at first sight (প্রথম দেখাতেই ভালবাসা) হয়। তাদের বিশ্বাসও হয় স্বতঃ। বিশ্বাস যাকে বলে, তা' একেবার হ'লে, কখনও নষ্ট হয় না। বিশ্বাস সম্বন্ধে সত্যানুসরণে অনেক কথা আছে।
একটি ভাই এসে বললেন- ঠাকুর, আপনি বাবা-মাকে ভক্তি করার কথা বলেন, কিন্তু আমার বাবা-মাকে মোটেই ভাল লাগে না। জোর ক'রে কি ভক্তি হয় ? শ্রীশ্রীঠাকুর- বাবা-মাকে ভাল লাগে না মানে, নিজের জীবনকেই তোমার ভালো লাগে না। অমন কথা কখনও বলবি না। অমন কথা বলাও পাপ, ভাবাও পাপ, শোনাও পাপ। বাবা-মা হ'লেন তোমার জীবনের আদিভূমি, তাঁদের দিয়েই জালাইছে তোমার শরীর-মন।তাঁদের যদি অপভার করতে শেখ, দেখবে, দুনিয়ায় তোমার loafer (বাউন্ডুলে) হ'য়ে ঘুরে বেড়ান ছাড়া কোন গত্যন্তর থাকবে না। বাপ-মায়ের প্রতি ভক্তিশ্রদ্ধা নেই, অথচ জীবনে বড় হইছে এমন একটা মানষুও দেখা যায় না। আমি বলছি-তুই রোজ এইগুলি করবি।রোজ সকালে উঠে বাবা-মাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করবি। ইষ্টভৃতি করিস তো ?
ভাইটি- আজ্ঞে করি।
শ্রীশ্রীঠাকুর- ইষ্টভৃতি করার পর বাবা ও মাকেও কিছু-না-কিছু রোজ দিবি। নিজ হাতে বাবা-মার সেবাযত্ন করবি। বাবার জুতোটায় হয়তো কালি দিয়ে দিলি। পা ধোয়ার জলটা হয়তো জলটা হয়তো এনে দিলি। রান্না করতে-করতে মা ঘেমে গেছে, তুই যেয়ে হয়তো পাখা নিয়ে বাতাস করলি। নিত্যনূতন ভেবে-ভেবে বের করবি আর বাবা-মার সন্তোষ ও শান্তি হয় যা'তে,হাতেকলমে তাই করবি। কয়েকদিন এই ক'রে দেখ-তখন দেখবি,বাবা-মাকে কত মিষ্টি লাগে, বুঝতে পারবি তারা কী বস্ত। বাবা! এই জ্যান্ত দেবতাদের যদি খুশি করতি না পার, তাঁরা যদি প্রসন্ন না হন, তাহ'লে কিন্ত সব দেবতার দরজায় তোমার কাঁটা প'ড়ে যাবে। কারও প্রসন্নতা উৎপাদন করা সম্ভব হবে না তোমার পক্ষে।
মানুষ সবসময় একটা আশ্রয় খোঁজে। মাকে খুব ভালোবাসতাম। মা হুজুর মহারাজের কথা খুব বলতেন, তাই হুজুর মহারাজের উপর প্রগাঢ় বিশ্বাস ছিল। কেউ মারলে তাঁর ছবির কাছে যেয়ে প্রার্থনা করতাম। যে মেরেছে তা'র কোন ক্ষতি হো'ক তা' চাইতাম না, কিন্তু আমি যে বেদনা পেয়েছি, সে-কথা জানাতাম। এমনতর জানিয়ে মনে একটা শান্তি পেতাম। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মেয়েদের প্রতি একটা বিশেষ আকর্ষণ বোধ করতে লাগলাম। একবার পর-পর তিন রাত এক পরমা রূপসীর স্বপ্ন দেখি। জায়গাটা যেন নবদ্বীপ- সেখানে একটা দোতালা ঘর, ঘরের মধ্যে আলো জ্বল-জ্বল করছে। মেয়েটির শরীর থেকে যেন রূপযৌবনের বন্যা ব'য়ে যাচ্ছে। চর্ম্মচক্ষুতে অমন পাগল করা রূপ আমি কখনও দেখিনি। আমাকে বাঁধার জন্য কত ছলা-কলা, হাব-ভাব, ভঙ্গিমা বিস্তার করতে লাগল। চোখেমুখে কী লাস্যভরা আত্মনিবেদন ! আমাকে যত মোহিত করে, আমি তত বলি- আমি পরমপিতা ছাড়া কিছু চাই না। সে আবার বলে- 'আমাকে ভালবাস, আমি সব দেব। পরমপিতাকে দিয়ে কী হবে?' আমি তখন রুখে দাঁড়াই বটে, কিন্তু ভিতরে-ভিতরে তীব্র আকর্ষণ অনুভব করি। তা' সত্বেও জোর ক'রে আত্ম-সম্বরণ করি। পর-পর তিন রাত্রি একই স্বপ্ন আমাকে আকুল ক'রে তুললো। শেষের দিন আমার অবস্থা কাহিল, আমি যেন আর নিজেকে সামলাতে পারি না। তবু মনের রোখ আছে- কিছুতেই আত্মসমর্পণ করব না। ভিতরে যেন ঝড় ব'য়ে যাচ্ছে, আমাকে ভেঙ্গে ফেলতে চাচ্ছে। এমন সময় আমার মায়ের আর্বিভাব হ'লো। মায়ের কপাল থেকে যেন একটা আগুন ঠিকরে বেরুতে লাগলো। মা ধমক দিয়ে বললেন- নাম করতে পার না? তখনই আমি নাম করতে সুরু করলাম। মা'র ঐ মূর্ত্তি দেখে মেয়েটা যেন কর্পূরের মত উবে গেল। ঐরকম একটা আশ্রয় না থাকলে প্রলোভন ও দুঃখ-বিপদের সময় অক্ষত থাকা কঠিন হ'য়ে পড়ে। সদগুরুর প্রতি অনুরাগ নিয়ে সর্ব্বাবস্থায় নাম করার অভ্যাস করতে হয়। ওতে অনেক রেহাই পাওয়া যায়।
আপনি literation (লেখাপড়া) ও education (শিক্ষা) দুটো কথা বলেন--এ দুয়ের মধ্যে পার্থক্য কী?
শ্রীশ্রীঠাকুর-- Literation মানে লিখতে-পড়তে জানা, তার সঙ্গে চরিত্রের কোন সম্পর্ক নাই। কলের গানের রেকর্ডে কত ভাল-ভাল কথা সাজান থাকে, বাজালে বেরিয়ে আসে। রেকর্ডের কোন জীবন বা চরিত্র নেই- যে-জীবন বা চরিত্রে কথাগুলির প্রতিফলন দেখা যাবে। Literation (লেখাপড়া) মানে, অমনতর নিষ্প্রাণভাবে কতকগুলি ভাল-ভাল কথা শিখে রাখা ও আওড়ান। Education (শিক্ষা) মানে- চরিত্রগঠন, habits , behavior (অভ্যাস-ব্যবহার) ঠিক করা। নীতিগুলি জীবনের সঙ্গে গেঁথে ফেলা। তোমরা প্রবর্ত্তক, তোমরা চেষ্টা করছ সদাচার ও সুনীতি মেনে চলতে। ভুলত্রুটি সত্ত্বেও যদি তোমরা লেগে থাক, তাহ'লে দেখবে, ধীরে-ধীরে সিদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছ।
'স্বভাবগুণে অভাব নষ্ট, এটা কিন্তু খাঁটি স্পষ্ট'-- এর মানে কী ?
শ্রীশ্রীঠাকুর-- মানুষকে পেতে হয় বিধিমাফিক ক'রে। মানুষের স্বভাবটা যদি এমনতর হয় যাতে বিধিমাফিক করাটা তার স্বতঃ হ'য়ে ওঠে, সেবায় মানুষের হৃদয় জয় করার অভ্যাস তাকে পেয়ে বসে, উৎস-অভিমুখটা অকাট্য হ'য়ে তাকে অপ্রমাদী ক'রে তোলে-তাহ'লে মা-লক্ষী তো তার পিছনে-পিছনে ছোটেন। নারায়ণী অর্থাৎ সত্তাবর্দ্ধনী সেবা যার স্বভাব, প্রকৃতিই তার পরিচর্য্যার জন্য ব্যগ্ৰ হ'য়ে ওঠে। কেউ যদি প্রতাশাপীড়িত হ'য়ে দু'চারদিন ঐ ধাঁজে চ'লে উপযুক্ত ফল না পেয়ে ঐ চলন ছেড়ে দেয়, তাহ'লে বুঝতে হবে ওঠা তার স্বভাবগত হয়নি। তাই, অভাব তাকে ছাড়ে না। স্বভাব হ'লে প্রত্যাশার বালাই থাকে না। ঐভাবে না চ'লেই পারে না। তাই ধীরে-ধীরে ফল যা' হবার হয়ই।
এমন কোন অবস্থা কি আছে যেখানে আর পতন হয় না?
শ্রীশ্রীঠাকুর-- সমস্ত প্রবৃত্তি ইষ্টে thoroughly interested (সম্পূর্ণভাবে অন্তরাসী) হ'লে তখন পতনের ভয় থাকে না। যে-সব প্রবৃত্তি ও আশা-আখাঙ্খা ইষ্টের সঙ্গে সঙ্গতিশীল হ'য়ে ওঠে না, সেগুলিকে প্রশ্রয় দিলে বেঘোরে প'ড়ে যেতে হয়। সেগুলি নাকে দড়ি দিয়ে যে কোন্ ভাগাড়ে টেনে নিয়ে যেতে পারে, তার ঠিক নেই। অহঙ্কার, অভিমান ও নিজ খেয়ালের এলাকা পার হ'য়ে যে ইষ্টের চির-অনুগত দাস হ'য়ে তাঁর মর্জ্জিমত চলতে রাজী থাকে, পরমপিতার দয়ায় সে রেহাই পেয়ে যায়। যে হয় তাঁর , সে পায় নিস্তার। সত্যিকার টান থাকলে, সাময়িক স্খলন-পতন হলেও আবার ঠেলে ওঠে। অনুতাপ তাকে এমন ক'রে ঠেসে ধরে, যে সে নিজেকে সংশোধন না ক'রেই পারে না।
শ্রীশ্রীঠাকুর-- ভগবানকে পরীক্ষা করতে যেও না। তাঁকে তোমার সর্ত্তাধীন ক'রে তোমার মনোমত ক'রে পেতে চেও না। তাঁকে নিঃসর্ত্তে ভালবাস ও অনুসরণ কর। তাঁর মনোমত হ'তে চেষ্টা কর। তাঁকে যদি তোমার ভ্রান্ত ইচ্ছা ও স্বার্থের অধীন ক"রে পেতে চাও, তাতে তোমার কোনো লাভ নেই। তোমারই ক্ষতি তাতে সবচাইতে বেশী। তুমি জান না কিসে তোমার মঙ্গল। তোমার পাগল মন এক-এক সময়ে এক-এক রকম চাইবে, সেই সব চাওয়ার পূরণ ও তার ফলাফল তোমাকে কালে-কালে এমনভাবে বিপর্য্যস্ত ক'রে ফেলতে পারে যে তোমার পক্ষে তাল সামলানই দায় হবে। সুতরাং আবোল-তাবোল চেও না তাঁর কাছে। বরং তিনি কী চান, তাই বোঝ, তাই চাও করার ভিতর-দিয়ে। আর, তোমার নিজস্ব যদি কোনো চাহিদা থাকে, তাও পেতে হবে করার ভিতর-দিয়ে। না ক'রে পাওয়ার বাহানা নিয়ে ভগবানের শক্তি পরীক্ষা করতে যেও না। এমনতর গান আছে- এবার যদি না ত্বরাও তারা তোমার নাম আর কেউ লবে না। ও-সব ছেদো কথায় ভগবান ভোলেন না। ত্রাণ লাভ করতে গেলে তোমাকে বিধি-মাফিক তাই করতে হবে যাতে ত্রাণ লাভ হয়। তাঁর যা' করবার তিনি করতেই আছেন। যে করতে লাগে সে পদে-পদে তাঁর দয়া টের পায়। না করলে তাঁর দয়া বোধের মধ্যে আসে না। ভগবান মানুষের নিন্দাস্ততির ধার ধারেন না। সক্রিয় ভক্তি, ভালবাসা ও আত্মনিয়ন্ত্রণই তাঁর অনুমোদন লাভ করে।
প্রফুল্ল-- কেউ সদগুরু কিনা তা' কী ক'রে বোঝা যাবে?
শ্রীশ্রীঠাকুর-- প্রথম কথা হ'লো তিনি তাঁর গুরুতে সর্ব্বতোভাবে সংন্যস্ত হবেনই। তাঁর করা, বলা, ভাবার মধ্যে ফারাক থাকবে না। পূর্ব্বতনদের প্রতি তাঁর প্রণতি থাকবেই কি থাকবে। আর তিনি প্রত্যেকের বৈশিষ্ট্যকে রক্ষা ক'রে চলবেন। তিনি অলৌকিকতার আশ্রয় গ্ৰহণ না ক'রে মানুষকে সহজ পথে এমনভাবে পরিচালনা করবেন যা'তে তা'দের চারিত্রিক বিকাশ ঘটে। মানুষকে প্রকৃত মনুষ্যত্বের অধিকার ক'রে তোলার দিকেই তাঁর ঝোঁক থাকবে সব থেকে বেশী। আরও বহু কিছু আছে। তবে এ-গুলি সদগুরুর fundamental and universal traits (মৌলিক এবং সার্ব্বজনীন চারিত্রিক লক্ষণ)।
প্রশ্ন-- মন আর আত্মায় পার্থক্য কী?
শ্রীশ্রীঠাকুর-- আমার আত্মা মানে existence (অস্তিত্ব)। যিনি চৈতন্য-স্বরূপ। চৈতন্যের উপর পারিপার্শ্বিকের তরঙ্গাভিঘাতে মনের সৃষ্টি হয়, এক-এক রকমের তরঙ্গে এক-এক রকমের বৃত্তি বা অবস্থান্তর সৃষ্টি হয়। সব বৃত্তি ইষ্টে concentrated (কেন্দ্রায়িত) হ'লে মন একমুখী, সার্থক ও কারণমুখী হয়, চাঞ্চল্য ও বিক্ষেপের নিরসন হয়। এর finer and finer (সূক্ষ্মতর থেকে সূক্ষ্মতর) রূপ আছে। সৃষ্টি যেখানে আরম্ভ হয়েছে সেখানেই মনের আরম্ভ হয়েছে। আবার সৃজন-পরিক্রমার ভিতর-দিয়ে ঘোরাফেরা ক'রে সত্যলোক, অগমলোক, অলখলোকের দিকে সমাহিত হ'তে চলেছে। Feeling (বোধ)-- টা ভাল ক'রে কওয়া যায় না, glimpse (আভাস) দেওয়া যায়। বলাটা অনেক different (আলাদা) হ'য়ে যায়। লয়ের অবস্থাটা বোধ করবার, ঠিক বলা যায় না।
প্রশ্ন-- প্রার্থনা কী?
শ্রীশ্রীঠাকুর-- প্রার্থনা করতে হয়- তুমি আমার চিরকাল থাক, সারা বুক জুড়ে থাক, আর আমার যা' কিছু তোমাতে সার্থক হ'য়ে উঠুক। তাতেই মানুষ কৃতী হয়, ঐশ্বর্য্যশালী হ'য়ে ওঠে। তাঁকে নিজের মনোমতো ক'রে চাইতে নেই, তাঁর মনোমতো হওয়ার আকুতি রাখতে হয়।
আমি যেন তোমাকে ভালোবাসতে পারি, এ প্রার্থনায় তাঁকে ভালবাসা সম্পর্কে সংশয় আছে, ও-প্রার্থনা ভাল নয়। আমি ছেলেবেলা থেকে কখনও ও-প্রার্থনা করিনি। মনে আসলেও ভেবেছি, ওতে তো আমার কাম সারা।
কথাপ্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন-- দেখেন দাশদা (দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন) কেমন ছিলেন। তিনি মা'র কাছে দীক্ষা নিতে চাইলে মা সোজাসুজি বললেন- দেখ, বড়লোকেরা মনে করে, তা'রা ভগবানকেও অনুগ্ৰহ করে। তোমার নাম নিয়ে কাজ নেই। অনুকূল ছেলেমানুষ। তুমি চিত্তরঞ্জন, তোমার কত নামকাম। তুমি এসব কি আর ধ'রে থাকবে? তখন কত অনুনয়-বিনয় ক'রে মাকে খুশি ক'রে চিত্তরঞ্জন নাম নিলেন। মাকে বললেন- 'চিত্তরঞ্জন যেখানে মাথা নোয়ায়, সে-মাথা আর সে উঠায় না।' সত্যিই তাঁর মধ্যে দেখেছিলাম অপূর্ব্ব আনুগত্য ও নিষ্ঠা। তাই তিনি মানুষের মনের মধ্যেও ঠাঁই পেয়েছেন। তাঁর প্রতি মানুষের অনুরাগ কত স্বতঃস্ফূর্ত্ত।
শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন-- একদল মানুষ জন্মে ভগবৎ-নেশা নিয়ে, তারা আর কিছু চায় না, অন্য কিছুতে ভোলে না। তারা জ'ন্মে অবধি কী যেন খোঁজে। তা' না পাওয়া পর্য্যন্ত শান্তি পায় না, স্বস্তি পায় না। তাঁকে চাই-ই। এমনতর মানুষ ইষ্টসান্নিধ্য পেলে তাঁকে আর কিছুতেই ছাড়ে না। তাঁর সেবায় লেগে যায়। ধরল তো ধরল, ইহ-পরকালের জন্য তাঁর কেনা গোলাম হ'য়ে যায়। দুঃখ-কষ্টের তোয়াক্কা করে না। কোন ব্যক্তিগত লাভের প্রত্যাশা রাখে না। তাঁর মুখে হাসি ফোটানই একমাত্র কাজ। তারা কারও কওয়ার অপেক্ষা রাখে না। এ করা ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারে না।
আগে মন না আগে বস্ত?
শ্রীশ্রীঠাকুর-- আগে শক্তি। শক্তি যখন পদার্থে পরিণত হয় তার একটা অংশ চেতনার রূপ নেয়। যাতে বস্ত বলছি তা' কিন্তু চেতনাকে বাদ দিয়ে নয়। চিৎ-রূপ বস্তর উপর অন্য বস্ত যখন তরঙ্গ তোলে তাকে কই মন, সে সাড়া দিতেও পারে, নিতেও পারে। আমি বুঝি বস্ত সচ্চিদানন্দকে বাদ দিয়ে নয়। বস্তরপিছনে যে শক্তি এবং শক্তির রূপান্তর যে বস্ত তার mathematical equation (গাণিতিক সমীকরণ) করতে গিয়ে বৈজ্ঞানিকরা নাকি বলেছেন- E=mc^2; যাকেই বস্ত কও তাই-ই অন্যভাবে শক্তি ও চিৎ, আবার যাকেই শক্তি ও চিৎ বল তা' সূক্ষ্ম বস্ত ছাড়া আর কিছু নয়কো। নাম নিয়ে ঝকাঝকি ক'রে লাভ নেই। সৎ, চিৎ ও আনন্দ ওতোপ্রোতভাবে নিবদ্ধ হ'য়ে আছে এটা আমি স্বচক্ষে দেখেছি। আমার নির্দ্দেশমত যদি কেউ গবেষণা করে তবে তা' প্রদর্শন করা অসম্ভব ব'লে মনে হয় না। তবে এটা যেভাবে যেখানে যতটুকু থাকবার সেখানে সেইভাবে ততটুকুই আছে, বোঝার মন থাকলেই বোঝা যায়।
শ্রীশ্রীঠাকুরের সমাধি-জীবনের কথা উঠল।
শ্রীশ্রীঠাকুর রহস্যচ্ছলে বললেন--অনেক চেষ্টা ক'রে আমাকে ঐ অবস্থা রুদ্ধ করে রাখতে হয়েছে। যখন দেখলাম- আমাকে দেখাদেখি অনেকের ঐরকম ভাব হচ্ছে এবং ভাব হয়ে আবার মেয়েলোকের দিকে ভিড়ছে, তখন ভাবলাম-এইটেকে আশ্রয় করে তো শয়তান ঢুকছে মানুষের ভিতর, তখন অনেক কসরত ক'রে সে অবস্থা বন্ধ করলাম।
কিরণদা-- স্ফূর্ত্তির দরুণ নাকি জলে খুঁটো পুঁতে ডুবে থাকতেন !
শ্রীশ্রীঠাকুর-- আগে এত স্ফূর্ত্তি হতো যে, মনে হতো আর একটু স্ফূর্ত্তি যদি বাড়ে, স্ফূর্ত্তির ঠেলায় হয়ত ম'রে যাব। তাই পদ্মার মধ্যে খুঁটো গেড়ে তাই ধ'রে ডুব মেরে প'ড়ে থাকতাম। ভাবতাম চারিদিকে দেখে-শুনে বোধহয় স্ফূর্তি বাড়ে, তাই ডুব মেরে থেকে নিজেকে কষ্টের মধ্যে ফেলতাম-তাতে যদি আনন্দ একটু কমে। তবু গুড়গুড় করে ভিতর থেকে আনন্দের উচ্ছ্বাস জাগত, কিছুতেই ঠেকান যেত না। আর, তখন চলাফেরা ও কাজকর্ম্মের গতি দুরন্ত বেগে বেড়ে যেত। স্টীমারের হুইসেল শুনে শালগেড়ে থেকে রওনা হয়ে চার মাইল দূরে বাজিতপুরঘাটে পৌঁছে দেখি-স্টীমার লেগে কেবল সিঁড়ি ফেলছে। দলকে দল এইভাবে হাঁটতাম, কেবল আমি একলা নয়। আমার সঙ্গে যারা থাকত তারাও যেন আনন্দ-মাতাল হ'য়ে থাকত।
শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন-- একটা আছে আত্মপ্রসাদ, আর একটা আত্মাভিমান। প্রথমটার মধ্যে আছে একটা সাত্ত্বিক উপভোগ, আর দ্বিতীয়টার মধ্যে আছে আত্মপ্রতিষ্ঠার বুদ্ধি- আমার বিদ্যা, টাকা-পয়সা, গুণগরিমা ইত্যাদিকে মানুষ পূজা করুক-মানুষ আমাকে খাতির করুক, মান্য করুক-এমনতর একটা দাবীর ভাগ। জোর ক'রেই যেন তেমনটা আদায় করতে চাই। আর, মানুষের কাছ থেকে অমনটা না পেলে ক্ষুব্ধ ও রুষ্ট হ'য়ে থাকি। এমনকি কখনও-কখনও এটা এমন কুৎসিত রূপ নেয় যে, আমরা মানুষকে খামখা বেকায়দায় ফেলে তাকে নতিস্বীকারে বাধ্য করি। এইভাবে যে-মানুষটা নতিস্বীকারে বাধ্য হয়, তার সত্তা কিন্তু আমাদের প্রতি আক্রুষ্ট হ'য়ে থাকে। এইভাবে আমরা অযথা বহু শত্রু সৃষ্টি ক'রে তুলি। সুযোগ পেলে তারা আমাদের উপর শোধ তুলতে কসুর করে না- তা' আমরা যতই দয়া-দাক্ষিণ্য দেখাই না কেন। ভক্তির ভাব ছাড়া আমাদের অহমিকা ঠিক-ঠিক সুস্থ ও শান্ত হয় না। ভক্তের প্রার্থনা হল-
"আমার মাথা নত করে দাও হে / তোমার চরণ ধূলার তলে। / সকল অহঙ্কার হে আমার / ডুবাও চোখের জলে।।''
স্বস্ত্যয়নী জিনিসটা কী?
এ ব্রতের মূল কথা হ'লো যুগপৎ এই পাঁচটি নীতি পালন করতে হবে-
(১) শরীরকে ইষ্টপূজার যন্ত্র বিবেচনা ক'রে সুস্থ ও সহনপটু ক'রে তুলতে হবে।
(২) মনের কোণে যখনই যে-কোন প্রবৃত্তি উঁকি মারুক না কেন, তাকে ইষ্টস্বার্থ ও ইষ্টপ্রতিষ্ঠার অনুকূলে নিয়ন্ত্রিত করতে হবে।
(৩) যে-কাজে যখনই যা' ভাল ব'লে মনে হবে, তা' কাজে ফুটিয়ে তুলতে হবে।
(৪) পারিপার্শ্বিকের বাঁচা-বাড়াকে নিজেরই বাঁচা-বাড়ার স্বার্থজ্ঞানে তাদের যাজনসেবায় ইষ্টে আকৃষ্ট ও যুক্ত ক'রে উন্নত-চলৎশীল ক'রে তুলতে হবে।
(৫) আর, চাই নিজের কর্ম্মশক্তি, উদ্ভাবনীবুদ্ধি ও অর্জ্জনপটুতাকে বাড়িয়ে তুলে নিত্য বিধিমাফিক অর্ঘ্য-নিবেদন।
যজন-যাজন-ইষ্টভৃতি
কথাপ্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন-- তিনটি জিনিস আমাদের বিশেষভাবে করণীয়। প্রথম হ'ল যজন অর্থাৎ নাম-ধ্যান, পূজাপাঠ, আত্মবিচার-আত্মবিশ্লেষণ ইত্যাদির ভিতর-দিয়ে নিজের মনোজগৎকে ইষ্টের ছন্দানুবর্ত্তী ক'রে তোলা।
দ্বিতীয়টি হ'ল যাজন। অর্থাৎ পরিবেশকে ইষ্টের ভাবে ভাবিত ক'রে তাঁতে যুক্ত ক'রে তোলা। পরিবেশকে বাদ দিয়ে আমরা কেউ একলা বাঁচতে পারি না। তাই পরিবেশকে গ'ড়ে তোলার জন্য সক্রিয় প্রচেষ্টা চাই-ই। যাজন তাই আমাদের নিত্য করণীয়। আমাদের প্রত্যেককেই Fisher of man (মানুষ ধরার জেলে) হওয়া লাগবে।
আর, চাই ইষ্টের ভরণ ও পোষণ। এর ভিতর-দিয়ে তাঁর উপর টান গজায় এবং সেই টান আমাদের জীবনের নিয়ামক হ'য়ে ওঠে। এর কোনটা বাদ দিলে চলবে না। 

২|
২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ বিকাল ৫:৫১
বিজন রয় বলেছেন: ব্লগে স্বাগতম।
শুভেচ্ছা।
©somewhere in net ltd.
১|
২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ বিকাল ৫:৪৭
সনেট কবি বলেছেন: কিছুটা পড়লাম।