নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সময় সীমাহীন

হুমায়রা হারুন

মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব শুধু প্রযুক্তিতে নয়, বরং মননের বিনিময়ে। ব্লগে যোগাযোগের মধ্যে সেই শ্রেষ্ঠত্বেরই প্রকাশ ঘটে। আপনি যখন লেখেন, মন্তব্য করেন, কিংবা অন্যের ভাবনা পড়েন — আপনি তখন মানব প্রজাতির মননে অংশ গ্রহন করেন।

হুমায়রা হারুন › বিস্তারিত পোস্টঃ

এখনি সময়

০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:২০



তোমাকে যেতে হবে।
এখনই।
চমকে তাকালো ঊর্জা সামনের দিকে। গভীর মনোযোগ দিয়ে কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল। গুরু গম্ভীর এ আদেশ যেন তার সকল মনোযোগ ছিন্ন করে দিয়েছে এক নিমিষে।
কিন্তু কাউকে তো দেখতে পাচ্ছে না আশেপাশে।
কার কন্ঠ?
ঘর ভর্তি মানুষ। বিশাল ড্রইং রুমে প্রচুর অতিথির সমাগম। তারই কোণায় টেবিল পাতা। খাবার সামগ্রী সাজানো থরে থরে। টেবিলের একপাশে ছোট্ট চেয়ারে বসে মাথা ঝুঁকে কাজ করছে ঊর্জা। কেইটরিং –এর কাজ নিয়েছে ।মাসখানেক হলো। আজ এই বাড়িতে অতিথি আপ্যায়নের দায়িত্ব। তার এই কাজ পেতে বেশ কষ্ট হলেও এই কয়েক মাসে বেশ সুনাম অর্জন করে ফেলেছে। ব্যবসা সুনাম অর্জনের সাথে সাথে বেশ ভালোই চলছে। হিসাব নিকাশের কাজগুলো আরেকবার দেখছিল সে স্ক্রিনে চোখ রেখে। এমন সময় এরকম ভাবে কেউ বলছে, ‘যেতে হবে।‘ বেশ আদেশের সুর যেন কন্ঠে। কিন্তু কে কথা বলছে? আর কোথায় বা তাকে যেতে হবে ?
স্ক্রিন থেকে মাথা তুলতেই অতিথিবৃন্দের মাঝে অরুণাভকে চোখে পড়লো। অনেকদিনের চেনা অরুণাভ, তার বন্ধু ঠিক বলা যায় না, আবার পরিচয়ের যে গভীরতা, তাতে দূরের বলে, পর মনে করে, ‘অবন্ধু’ ভাবনাটাও মেনে নেওয়া যায় না। আসলে অরুণাভ যে তার কি, সে জানে না। বন্ধুও নয়, প্রিয়তম তো নয়ই - কোন অধিকারে তা বলবে? ভালো লাগে যদিও তাকে খুব । কিন্তু সেও তো বসে আছে বেশ দূরে । কাছাকাছি কেউ বসেনি তার চারপাশে।
কার কন্ঠ এটি তাহলে?
কথাটা শোনার সাথে সাথেই শিরদাঁড়া বেয়ে যেমন বিদ্যুৎ খেলে যায়, তেমনি গ্রীবা আর স্কন্ধের মাঝ দিয়ে একটা বিদ্যুতের চমক অনুভব করল ঊর্জা। তাই ঘাড় তুলে তাকালো সামনে। কেউ নেই কোথাও।
কে বলল অমন করে?
ভাবতে ভাবতেই দেখলো, সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সৌম্য, শান্তরূপে একজন অতি দীর্ঘকায়া সুপুরুষ। দেখেই মনে হয় যেন কোন শান্তির দেবদূত। যেন সেইন্ট জার্মেইন। কে ইনি? হালকা হালকা ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে দেখা যায়, কি যায় না। অস্পষ্ট কুয়াশা কুয়াশা ভাব। কিন্তু জানালা বন্ধ এই ঘরে এই সন্ধ্যার সময় কুয়াশা আসবে কোথা থেকে?
ঊর্জা একটু সচেতন হলো এবার। কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারছে না। তাকিয়ে আছে স্থির। আর দূর থেকে অরুণাভ দেখছে, ঊর্জা যেন কারো সাথে কথা বলছে আপন মনে।
যাবে নাকি ঊর্জার কাছে আজ? কখনো তো কথা বলেনি। দেখা হয়েছে কতবার। আজ কি দুর্বলতার পাশ কেটে ঊর্জার সামনে যেয়ে দাঁড়াবে? জিজ্ঞাসা করবে, কেমন আছো তুমি ?
ভাবতেই জানি কেমন স্থির হয়ে আসে অরুণভের কন্ঠ। শরীর স্থির হয়ে আসে। আর ভাবতে পারে না কিছু। নিজেকে সচল করে রাখতে গিয়ে ঊর্জার কথা ভাবলেই তার কেন যে এমন হয়, সে বুঝে না। অথচ এই নিমন্ত্রণে এসে ঊর্জার দেখা পাবে, তা তার সাত কল্পনার বাইরে ছিল। ঊর্জা এখানে কেইটারার হিসেবে অনুষ্ঠান তদারকির কাজ করছে – ঠিক তার সামনে। ভাবতেই জানি কেমন লাগছে অরুণাভের। প্রাণ ভরে দেখছে অরুণাভ তাকে। আশেপাশে আরো অনেক অতিথিরা এসেছেন। বসে গল্প শুরু করছেন। কিন্তু কোনদিকে অরুণাভের খেয়াল নেই। খেয়াল নেই তা ঠিক না, আসলে আশপাশ তার আর আগ্রহের বিষয় মনে হচ্ছে না। সামনে যে ঊর্জা রয়েছে, তাকে দেখেই তার সবটুকু সময় যেন কেটে যাচ্ছে।
অনুষ্ঠান শুরুর সময় দেওয়া হয়েছে সন্ধ্যা সাতটা। চলবে রাত নয়টা পর্যন্ত। সাতটা বাজতে অতিথিরা এসে পড়তে শুরু করেছেন। ঊর্জা টেবিল সাজানো, খাবার আনা নেওয়ার তদারকির ভার নিয়েছে নিজেই। বিকেল চারটা থেকে কাজ শুরু করেছে ওরা। ব্যুফে সিস্টেমে, অতিথিদের ডাকলেই তারা এসে এসে খাবার নিয়ে যার যার মতো টেবিলে বসে যাবেন। সারাটা ঘর সাজানো হয়েছে সাদা রঙের থিম দিয়ে। এই ঘরটা যেন হালকা কুয়াশা ঘেরা লাগছে। তাই বোধহয় সাদা থিমের প্রভাবে সামনে তাকাতেই ঊর্জা, কুয়াশার প্রলপের মাঝে কোন একজনের দর্শন যেন লাভ করলো। কিন্তু আবারো প্রশ্ন তার মনে, কে ইনি?
এবার সেই কন্ঠস্বর। আদেশ নয়। কিন্তু ফেলে দেবার মতনও নয়। শুনতেই যেন হবে। ঊর্জা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে এবার ওনাকে। সেইন্ট জার্মেইন স্বয়ং যেন তার সামনে।
কিন্তু আসলে কি উনি? এরকম অ্যাঞ্জেলিক সুপুরুষদের ছবি তো আমরা হরহামেশা দেখি ইন্টারনেটে। আসলেই কি তারা দেখতে এত দ্যুতিময় হয়? জানেনা ঊর্জা।
কিন্তু সে বিমোহিত। মোহগ্রস্ত। তাকালো আবার। কন্ঠস্বর বলে উঠলো, ‘তোমার যাওয়ার সময় হয়েছে। তোমায় যেতে হবে।‘
ঊর্জা এবার একটু যেন সচেতনতা ফিরে পেয়েছে। তাই জিজ্ঞেস করল দেবদূতরূপী সেই জনাকে, ‘কোথায় যেতে হবে?’
কি মায়া ভরা চোখ তাঁর। কি তীক্ষ্ণ সেই দৃষ্টি। কি প্রচন্ড মমতার ছোঁয়া। বলে উঠলেন, ‘তোমার যাওয়ার সময় হয়েছে। আমি তোমায় নিতে এসেছি। এখনি যেতে হবে।‘
এবার ঊর্জার আর বুঝতে বাকি নেই। ইনি-ই ওর গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল। তার আর সময় নেই এই ডাইমেনশনে থাকার । তার যে যেতেই হবে। কিন্তু এই ঘর ভরা মানুষের মাঝে নিমন্ত্রণ চলাকালীন সময়ে? অনুষ্ঠানের কি হবে? সবাই যখন দেখবে ঘরের সেই বিশাল খাবার টেবিলের কোণায় মাথা নিচু করে একটি মেয়ে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছে। ( অজ্ঞান এজন্যই বলা, কারণ মৃত তো বলা যায় না হুট করে।) নাহ্ এই পরিবেশ তৈরি করতে চায় না ঊর্জা। অথচ দেবদূতের তৎক্ষণাত আদেশ পরিবর্তন করে আরেকটু সময় কি সে পাবে না ? এইখানে এই কাজটা না হোক। বাইরে কোথাও। অন্তত অরুণাভের সামনে নয়। অরুণাভ অনেকক্ষণ ধরেই দেখছে ঊর্জা স্ক্রিনের সামনের দিকে উপরে মাথা তুলে বিড়বিড় করে কারো সাথে কথা বলেই যাচ্ছে। কি হলো ঊর্জার আজ?
এবার অনুরোধের পালা। ঊর্জা বিনয়ের সাথে আবদার করে ফেলল সেন্ট জার্মেইনকে।
- ‘বাইরে যাই, এই ঘর ছেড়ে?’
- কোথায় যাবে?
- হাসপাতাল তো কাছাকাছি নেই। তবে রাস্তার ওপারে একটা ফার্মেসি আছে। ওখানে যাব। অনুষ্ঠানের হোস্টকে বলার সময় তো পাবো না। আমার গ্রুপকে জানিয়ে যাব, যে ফার্মেসি যাচ্ছি ওষুধ আনতে। শরীর ভালো লাগছে না, বলা মিথ্যে বলা হবে। আমি কি ফার্মেসি পর্যন্ত যেতে পারি? আর কয়েকটা মিনিট সময় দিন। আমি স্থান ত্যাগ করতে চাই। এই ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চাই। আমি অরুণাভ-র সামনে নিশ্চুপ প্রাণহীন হয়ে পড়ে থাকতে চাই না। ও আমাকে ওভাবে দেখুক, তা আমি চাই না।
সেইন্ট জার্মেইন কিছু বললেন না।
ঊর্জা উঠে দাঁড়ালো। উঁচু চেয়ারগুলোর পাশ দিয়ে হেঁটে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় পিছনে ফিরে তাকালো। অরুণাভকে আরেকবার দেখে নিল। সেই তীক্ষ্ণ ব্যক্তিত্ব, অপরূপ মুখশ্রী, মন ভোলানো হাসি আর দুষ্টুমি ভরা কালো চোখ। আর দেখা পাবে কিনা জানে না ঊর্জা।
এই দুনিয়া ছেড়ে ঊর্জা কোথায় যাবে তা তার জানা নেই। গন্তব্যহীন, ঠিকানা বিহীন যাত্রা। কিন্তু তার কাছে ঠিকানা না থাকলেও সেইন্ট জার্মেইন তা জানেন। তার দায়িত্বে, তার গাইডেন্সে ঊর্জার ‘এক্সিট’ হয়ে যাবে। এখন। ঠিক এখন।

রাত প্রায় আটটা। শীতের সময়য় অনেক রাত। ঊর্জা হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছে ফার্মেসির দরজায়। দরজার সামনে আরেকজন কেউ দাঁড়িয়ে আছেন। ঊর্জা তাকে চেনে না। তিনিও দীর্ঘকায়া সুদর্শন, সুপুরুষ। ঊর্জা হেঁটে ঢুকছে ফার্মেসির দরজা দিয়ে। কুয়াশা ঘেরা মেঠো পথ যেন সামনে । দুপাশে দুজন অ্যাঞ্জেল তার সাথে হেঁটে যাচ্ছেন। তাকে যে যেতেই হবে। এখনই সময়। আর একটুও পরে নয়। ঘন্টাখানিক আগেও নয়।
ঊর্জা চলছে। একাকী?
না।
সাথে দুজন গাইড আছেন।
অরুণাভ আজ আসবে বলে কেইটারিং –এর কাজটা সমাপ্ত করা পর্যন্ত সে ওখানে ছিল। হয়তোবা ভাগ্যেই লেখা ছিল। কাজ যখন শেষ হলো তখন ওর দায়িত্ব শেষ। যাবার সময় । অনুষ্ঠান থেকে নয়। এই দুনিয়াদারি থেকে।

ফার্মেসিতে কেইটারিং –এর কোন এক কর্মী প্রবেশ করার পথেই চেতনাহীন হয়ে পড়লে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে তাকে নেবার ব্যবস্থা করা হয়।
অনুষ্ঠান থেকে ঊর্জা কেন চলে গেল তা দেখবার প্রয়োজন তো অভ্যাগত অতিথিদের ছিল না। শুধু অরুণাভ তার সকল মনোযোগটুকু দিয়ে ওকে ঘরের বাইরে চলে যেতে দেখেছে। তাদের কেইটারিং এর কত কাজই না থাকে, বিশেষ করে হল –ঘরের পেছনের কিচেনে। কিন্তু সামনের দিকের দরজা দিয়ে ঊর্জা বের হয়েছে। যাবার বেলায় অরুণাভকে এক ঝলক দেখেছেও। শান্ত, স্থির ভঙ্গিতে ঊর্জা হলঘর প্রস্থান করেছে। সন্ধ্যে আটটার দিকে। এখন অনুষ্ঠান প্রায় শেষ। কিন্তু ঊর্জা এখনো তার ডেস্কে ফেরেনি। অরুণাভ চলে যাবে দশটার দিকে।
অনুষ্ঠান শেষ হলে আর কেনই-বা এই হলঘরে একা একা বসে থাকবে? কার জন্যই বা অপেক্ষা করবে ? ঊর্জা তো বাইরে গিয়েছে। সে তো এখানে নেই। আসবে কিনা জানেও না। কথা বলাই যে হয়নি কখনো, তার সাথে।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.