নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মৃত্তিকার উপর দেহের প্রতিষ্ঠা, দেহের ওপর মনের প্রতিষ্ঠা, আর সাহিত্য হলো সেই মনের বাঙ্ময় প্রকাশ। ~ ড. অসিত কুমার বন্দোপাধ্যায়। সূত্রঃ বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত।

ইসিয়াক

প্রকাশিত হয়েছে আমার প্রথম কাব্য গ্রন্থ “মেঘ ছুঁয়েছে মনের আকাশ” পাওয়া যাচ্ছে রকমারীতে। লিঙ্ক পেতে আমার ফেসবুক আই ডিতে আসতে পারেনhttps://www.facebook.com/profile.php?id=100027504906657

ইসিয়াক › বিস্তারিত পোস্টঃ

গল্পঃ কর্তব্য

০৪ ঠা আগস্ট, ২০২১ সকাল ১০:১৬



গল্পঃ সৎকার



(১)
রাত তিনটা বাজে। দেয়াল ঘড়ির ঢং ঢং আওয়াজটা থিতু হতেই শাহিদা বেগম আস্তে আস্তে বিছানা ত্যাগ করলেন। চৌকিটা বড্ড বেশি নড়বড়ে,উঠা নামা করতে গেলে এত বেশি ক্যাঁচকুচ আওয়াজ হয় যে, বেশ বিব্রত হতে হয়। আজকের পরে অবশ্য আর বিব্রত হতে হবে না।চৌকিই আর জুটবে কি না তার নেই ভরসা তবুও তিনি সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। অজানাই হবে তার ভবিতব্য। নিত্য অবহেলা, লাঞ্ছনা, গঞ্জনা থেকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতই ভালো। আপনজনের অবহেলা বড় বেশি পীড়াদায়ক।
এই বাড়িতে তাঁর আজ শেষ দিন একটু পরে মিলবে মুক্তি। আহ! শান্তি।

শাহিদা বেগম গুছিয়ে রাখা ছোট কাপড়ের পোটলাটা বুকে জড়িয়ে নিলেন। এই পোটলায় তেমন কোন মূল্যবান জিনিস নেই অবশ্য। থাকার মধ্যে আছে একমাত্র ছেলের ছোট বেলার কিছু স্মৃতি চিহ্ন আর মৃত স্বামীর দেওয়া ছোট্ট ছোট্ট কয়েকটি উপহার। সেই সাথে নিজের কিছু ব্যবহার্য পোশাক। তাও এমন দামী পোষাক নয়।খুবই সাধারণ।
এই বাড়ি এই সংসার থেকে নিঃশব্দে প্রস্থান করলেই কি সত্যি সত্যি কি মুক্তি মিলবে ?জীবন থেকে পালালে কি মুক্তির দেখা মেলে? হয়তো হ্যাঁ অথবা না,জানা নেই তাঁর।
নাহ এসব তিনি কি ভাবছেন! নিজেকে নিজে ধমকে উঠলেন। শাহিদা তুমি সিদ্ধান্তে অটল থাকো।কোন ক্রমে দূর্বল হওয়া চলবে না।তোমার গন্তব্য অন্যত্র। এখানে তুমি অপাঙ্‌ক্তেয়।
না, তিনি মাথায় অন্য কোন চিন্তাই আর আনবেন না। মন দূর্বল হলে সব তাল গোল পেঁকে যাবে।আসলে তিনি আর নিতে পারছেন না। এখান থেকে সরে যেতেই হবে। উপায়হীন ।এ মায়াডোর ছিন্ন করতেই হবে। অল্প বয়সে বিধবার, ভবিষত্যে সুখ স্বপ্নের আশা নিয়ে জাল বোনা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। ছেলে বড় হবে মানুষের মত মানুষ হবে, নিশ্চিত জীবন হবে।কত আশা!
সব গুড়ে বালি।

যার নসীব খারাপ হয় তার কপালে আর সুখ!
এতকাল যে জীবনের আশায় প্রতিনিয়ত তিনি নানা স্বপ্ন বুনে এসেছেন।ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ সেই জীবন থেকে পালিয়ে বাঁচতে চান তিনি।ক্ষোভ থেকে মনের ভিতর জটিল চিন্তার মনস্তাস্তিক দ্বন্দ্ব একদিনে তৈরি হয়নি।বহুদিনের অপমান ,লাঞ্ছনা,তিরস্কার, গঞ্জনা অবহেলা থেকে সৃষ্টি।এই কাঁকর জীবন তার আর ভালো লাগছে না।এবার আসবে মুক্তি। আর মাত্র কয়েক মিনিট।এই কথা ভাবতে ভাবতে শাহিদা বেগমের মনটা মুক্তির আনন্দে ফুরফুরে হয়ে উঠল।
যদিও সিদ্ধান্ত নিতে তার খুব কষ্ট হচ্ছে বার বার দ্ধিধা এসে ভর করছে। ভরা সংসার তাঁর ছেলে, ছেলের বৌ, নাতি। কিন্তু এদের মাঝে তিনি যেন থেকেও নেই।
নাহ! সব মায়াজাল, শহিদা বেগম সব দূর্বলতা ঝেঁটিয়ে বিদায় করে গা ঝাড়া দিয়ে উঠলেন।অপমান অবহেলা অনাচার এমন পর্যায়ে গেছে যে এখন আর খারাপ লাগলেও কিছু করার নেই। মন কাঁদলে নিজেকে শক্ত করতে হবে। তাকে যেতেই হবে।
নিজেই নিজেকে শোনালেন কিসের মায়া, কিসের দয়া! দুনিয়াটাই অদ্ভুত এক মরিচিকার খেলা।
সব ফাঁকি! সব ফাঁকি!! সব ফাঁকি!!!
দরজা খুলে ঘরের বাইরে বের হয়ে এলেন শাহিদা বেগম। দেরি করা মানে দূর্বল হয়ে পড়া।এখন থেকে নতুন করে পথ চলা শুরু করতে হবে যে। সামনে অনেক কাজ।
এই ঘরে দরজা খোলার সময় বিশ্রি শব্দ হয়। বিশেষ কৌশলে সেই শব্দকে আয়ত্ত্বে আনতে হয় তবুও একটু শব্দ হয়ে গেল। বের হয়ে এলেন তিনি সন্তপর্নে।দোতলা বাড়ির নীচতলার এক স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে তার বাস। বাকি ঘরগুলোয় আগে এক পরিবার বাস করতো।এখন গোডাউন হিসাবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।লোকজন কেউ থাকে না। নিচ তলাতে তিনি একমাত্র প্রাণী। ছেলে, ছেলের বৌ, নাতি দোতালায় থাকে।সেখানে তাঁর ঠাঁই নাই।যাওয়ার অনুমতি নেই।
গেটের তালা খুলতে উদ্যত হতেই শাহিদা বেগমের মনে হলো দোতালার সিঁড়িতে তিনি সন্দেহজনক পায়ের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছেন।
মনের ভুলও হতে পারে। কিন্তু... একটু ভেবে তিনি ভালো করে কান পাতলেন।
নাহ! সিড়ি ভাঙার আওয়াজই।এত রাতে সিঁড়ি বেয়ে উঠবে কে? নিচের গেটে তো তালা দেওয়া! তাহলে ?হঠাৎ মনে হলো চোর নয় তো! চিলেকোঠা দিয়ে পালাচ্ছে হয়তো! দেখতেই হয়।
তিনি কোলের মধ্যে রাখা পোটলাটাকে আস্তে করে নামিয়ে রেখে খালি পায়ে ধীরে ধীরে উপরে উঠে এলেন।উপরে এসে যা দেখলেন তাতে তাঁর শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা এক স্রোত বয়ে গেল।
একি!
একজন অচেনা একটি লোক ভারি একটা লেদার বয়ে নিয়ে চিলেকোঠার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। চিলেকোঠার দরজা হাট করে খোলা।
পরক্ষণেই শাহিদা বেগমের কর্তব্যবোধ উদয় হলো তিনি পেছন থেকে গিয়ে নিজের সর্ব শক্তি প্রয়োগ করে চোরকে জাপটে ধরলেন।শুরু হলো প্রবল বেগে ধ্বস্তাধস্তি। তাঁর দম বন্ধ হয়ে আসছে। নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ঠ হচ্ছে তবুও তিনি শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চোরকে ধরে রাখলেন আর বুদ্ধি করে জোরে চেঁচাতে লাগলেন।
- ওরে জামাল চোর আমাদের বাড়ি থেকে চুরি করে পালাচ্ছে।শিগগির আয়! শিগগির আয়!!...
গভীর রাতের সামান্য শব্দও বহুদুর পর্যন্ত যায় আর এতো চিল চিৎকার।
অচিরেই জামাল আর জামালের বউ রোজী বেরিয়ে এলো। জামাল প্রথমে বিরক্ত হলেও পরে তাঁর মাকে এমন অদ্ভুত অবস্থায় দেখে তাঁর নিজের রক্ত নেচে উঠলো।ততক্ষণে চোর প্রায় শাহিদা বেগমকে কব্জা করে ফেলেছে। এই পালায় সেই পালায় অবস্থা। জামাল ছুটে গিয়ে তাকে দমাদম কয় ঘুষি মেরে দিলো।
মুহুর্তে চোরের নাক মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এলো ,রোজী কোথেকে এক গাছা দড়ি আনতেই তিনজন মিলে চোরকে বেঁধে ফেলা হলো।
অবশেষে চোর চুরি যাওয়া মাল সমেত ধরা পড়লো। কিছুক্ষণের মধ্যে বোঝা গেল কত বড় একটা ক্ষতি হতে যাচ্ছিলো। রোজীর সব গয়না, নতুন জমি রেজিষ্ট্রেশন করার জন্য কয়েক লক্ষ টাকা রাখা ছিল গোপন ড্রয়ারে, সব গুছিয়ে নিয়ে চোর চিলেকোঠা দরজা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করছিল।কি ভয়ংকর!
জামাল তার মাকে অনেক ধন্যবাদ দিল।বলতে ভুলল না এ যাত্রায় কত বড় ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেল তাঁর জন্য ।
শাহিদা বেগমের ছোট নাতিও ততক্ষণে ঘুম থেকে জেগে উঠেছে চিল্লাচিল্লিতে।
তাঁর দাদীজান চোর ধরেছে।দাদীজানের জন্য তার গর্ববোধ হচ্ছে। বন্ধুদের সাথে কখন এই ঘটনা শেয়ার করতে পারবে এই চিন্তায় সে অস্থির হয়ে উঠলো।সেল ফোনে ছবি তুলতে লাগলো।
ছেলেও মাকে বারবার বাহবা দিল। আর বলল পুলিশের কাছে চুরি যাওয়া জিনিসের কথা যা বলার সে নিজে বলবে। শাহিদা বেগম যেন উল্টা পাল্টা কোন কথা না বলেন। টাকা পয়সা গয়নাগাটির কথা উল্লেখ্ করার দরকার নেই। কয়েকটা কাপড়চোপড় দিয়ে পুলিশের কাছে
চোরকে ধরিয়ে দিলেই হবে।

শাহিদা বেগমের আজ আর যাওয়া হলো না।

তিনি ঘরে ফিরে যেতে শুনতে পেলেন ছেলের বৌ রোজী এই রাতে কাকে যেন ফোন দিয়ে একটু আগের ঘটনাটার বিস্তারিত বর্ণনা দিচ্ছে।তার মধ্যে একটা কথা তাঁর একটু খট করে কানে বাজলো।
-আরে খাওয়ার কি কমতি আছে নাকি। সব খায়, রাক্ষস না। শক্তি হবে না আবার।বুড়ির গায়ে প্রচুর শক্তি। আমি তাই ভয়ে ভয়ে থাকি।..।
ভয়ে ভয়ে থাকি মানে কি?একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন তিনি, কিছুই করার নেই অবহেলা তাঁর জীবনের সঙ্গী। আজকের দিনটা একটু অন্য রকম হলে কি হতো। অন্তত একটা দিন.....
হাতটা মনে হয় মচকে গেছে। বেশ ব্যথা করছে। সরষের তেল দিয়ে মালিশ করলে মনে হয় ঠিক হয়ে যাবে। কোমরেও কিছুটা লেগেছে ,ব্যথা করছে।ক্লান্তিতে শাড়ির আঁচল দিয়ে শাহিদা বেগম মুখ মুছলেন।
ফজরের আযান দিচ্ছে।পুলিশে খবর দিয়েছে জামাল। শাহিদা বেগম নামাজ পড়ার উদ্দেশ্যে আবার তার নিজের ঘরে ফিরে এলেন।
নাহ আজও হলো না তার যাওয়া
আসলে চাইলেই কি সংসারের বাঁধন থেকে মুক্তি মেলে? কর্তব্য বোধ বারবার আরও এটে কষে তাকে বেঁধে ফেলে যে।
সমাপ্ত
© রফিকুল ইসলাম ইসিয়াক।


কিছু বানান ভুল থাকতে পারে পরে সময় করে ঠিক করে দেওয়া হবে। দয়া করে বিষয়টি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

মন্তব্য ১০ টি রেটিং +৪/-০

মন্তব্য (১০) মন্তব্য লিখুন

১| ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২১ সকাল ১০:৪৮

হাবিব বলেছেন: কবিতা লেখা ছেড়ে দিলেন নাকি?

০৪ ঠা আগস্ট, ২০২১ সকাল ১১:০৩

ইসিয়াক বলেছেন: কবিতা লিখি তবে কম। কোথাও পোস্ট দেওয়া হয় না। আজকাল গল্প লেখার চেষ্টা করছি।


শুভকামনা রইলো।

২| ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২১ সকাল ১১:২১

হাবিব বলেছেন: আপনি গল্প ভালোই লিখছেন। আমিও লিখতে চাই। কিভাবে লিখবো টিপস দেন।

০৪ ঠা আগস্ট, ২০২১ সকাল ১১:২৮

ইসিয়াক বলেছেন: নীল আকাশ ভাইয়ার গল্প লেখার উপরে একটা পোস্ট আছে একটু পরে দেখে লিঙ্কটা দিচ্ছি।

৩| ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২১ সকাল ১১:৩০

হাবিব বলেছেন: আমার সর্বশেষ পোষ্টের মন্তব্যে দিয়েন।

০৪ ঠা আগস্ট, ২০২১ সকাল ১১:৩২

ইসিয়াক বলেছেন: ঠিক আছে ভাইয়া।

৪| ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২১ সকাল ১১:৩১

রাজীব নুর বলেছেন: ভালো গল্প।
গল্পটা সুন্দর হয়েছে।

০৪ ঠা আগস্ট, ২০২১ সকাল ১১:৪০

ইসিয়াক বলেছেন:


ধন্যবাদ প্রিয় ব্লগার ।

শুভকামনা রইলো।

৫| ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২১ রাত ৯:৩৯

পদাতিক চৌধুরি বলেছেন: মায়ার জগতে অনাদরে অবহেলায় না থেকে অনির্দিষ্টের পথে পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করলেও হঠাৎ সামনে পড়া কর্তব্য ফেলতে পারলেন না। আবার সিদ্ধান্ত বদলে ফেললেন। আসলে জগৎটা যে মায়ার চাদরে মোড়া।চলে যাবো বললেই যে যাওয়া যায় না।গল্পের থিম ও বুনোট ভালো লেগেছে।

শুভেচ্ছা প্রিয় ইসিয়াক ভাইকে।

০৫ ই আগস্ট, ২০২১ দুপুর ২:১৯

ইসিয়াক বলেছেন: আবদুল আলিমের একটা গান আছে, আমার মায়ার ডোরে বাধা এ মন ফেলিয়ে চোখের জল। অন্যখানে চল রে ও মন অন্যখানে চল....সত্যি কি সব ছেড়ে ছুড়ে অন্যখানে যাওয়া যায়।

গল্প ভালো লাগলো জেনে অনুপ্রাণিত হলাম।
শুভ কামনা সতত।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.