| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
প্রিয় সুধি,
একটা ছোট প্রশ্ন ছিল।
আচ্ছা তার আগে বলো- এই যে আমি -তোমরা কি আমাকে চিনতে পেরেছো?
পারোনি?
পারবে না সে জানি।
নাম পরিচয়হীনাকে, কে আর মনে রেখেছে কবে?
আমার পরিচয়?
আমি বীরাঙ্গনা-আমি একাত্তরের জননী- আমি বাংলাদেশের জন্ম দাগ ।
আমার খোঁজ তোমরা পাওনি ।
আসলে গরজ করে খোঁজই নাওনি।
অভিমান জমে জমে একসময় আমি পাষাণ হয়েছি।
এরপর স্বেচ্ছা অন্তর্ধানে গিয়েছি।
দায়!
দায় আর কাকেই বা দেবো?
নিজেকে নিজে দায়ী করে এই অসম্মানের দায়ভার থেকে মুক্ত হতে-নিদারুণ তিক্ততা আর অপমানের অভিজ্ঞতা শেষে- এই অজ্ঞাতবাস!
জীবনের হিসাব সে বড় জটিল!
এ-যে কী বিভৎসকর পরিস্থিতি - আমি ছাড়া আর কে উপলব্ধি করবে?
ভুক্তভোগী ছাড়া কে বুঝবে-সামাজিক উৎপীড়ন, কটুক্তি কতটা ভয়াবহ ।
এখন আমি নাম পরিচয় -গোত্রহীন।
যদিও একটা সময় সবই ছিল।
নিজের একটি নাম -পরিবার -পরিজন- শুভাকাঙ্ক্ষী ।
এতোটা বছরে ধুলো জমে জমে ঢাকা পড়ে গেছে সব।
স্মৃতি তবু জেগে আছে।
শতবর্ষী পাহাড়ের মত।
আচমকা এক দমকা হাওয়া-
ভাষণ - আন্দোলন - মুক্তিকামী মানুষের মুক্তির মিছিল..
১৯৭১ এর রক্তাক্ত অধ্যায়ের পর....
আজ আমাদের মত মেয়েরা / মায়েরা কেমন আছে? কোথায় আছে? কি করছে ?
কে রেখেছে খোঁজ!
ইতিহাসের এক অনুচ্চারিত অধ্যায় আমি।
আমি বাংলাদেশের জন্ম দাগ!
যখন বুঝলাম কেউ দায় নেবে না- নেয়নি।
বুঝলাম কেউ আর ইতিহাস খুঁড়ে বেদনা জাগাবে না।
এই সমাজ সংসার সবক্ষেত্রেই নারীকে দুষতে সিদ্ধহস্ত যে!
হয়তো এ কারণেই যুদ্ধ ক্ষেত্রে যৌন নির্যাতন সম্পর্কে তদন্তে যাওয়ার বদলে বিষয়টিকেই নীরবতা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
এটাও ঠিক কোন কোন ক্ষেত্রে নারীর মানমর্যাদার কথা চিন্তা করে নষ্ট করে দেওয়া হয় দূর্ভাগা নারীদের নাম-ধাম, নথি-পত্র।
তারই ধারাবাহিকতায় জাতীয় অহম রক্ষার তাগিদে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি ইতিহাস থেকেও মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে সুকৌশলে ।
নইলে সংস্লিষ্ট দপ্তরে তাদের সম্পর্কিত নথিপত্র গায়েব হয়ে যায় কিংবা পুড়িয়ে ফেলা হয় কিভাবে? কেন?
ভাবতে অবাক লাগে।
নির্যাতিত বা শহীদ নারীদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ তো দূরের কথা একটা স্মারক পর্যন্ত নির্মিত হয়নি এদেশে।
কী অদ্ভুত নাহ!
আমি অবশ্য অবাক হইনি।
এ সমাজ তো এমনই - নতুন আর কি?
মনের গভীরে এরকম কত কত আক্ষেপ।
কিছু বলার নেই আর।
এরকম শত রকমের কষ্ট দুঃখ বয়ে বেড়াবার যাতনা থেকে মুক্তি পাবার মিথ্যা প্রচেষ্টায়
খোলস বদলে নিজেকে গুটিয়ে নিতে চেয়েছি ৷
ভুলতে চেয়েছি সব।
নিজেকে নিজে অস্বীকার করেছি প্রতিনিয়ত।
স্বযত্নে মুছে দিয়েছি তথাকথিত সব কলঙ্ক চিহ্ন।
তারপরেও বড় আক্ষেপে ভাবতে বাধ্য হই
এমনটা কি করে সম্ভব?
ভুলে গেলে চলবে না
সত্য সে যতই রূঢ় হোক
সেই সত্যকে অস্বীকার পরাজিত শক্তির আস্ফালন বাড়াতে সহায়তা করে।
"নারী যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ করবে, পুরুষের রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের বলি হবে কিন্তু কোনোভাবেই তথাকথিত 'অসতী' নারী পুরুষের পরিবারের সদস্য হওয়ার উপযুক্তা হতে পারবে না।
রাষ্ট্রীয়ভাবে তারা কোন স্বীকৃতি পাবে না। কী অমানবিক নিয়ম!
কেন?
কেন এই বৈষম্য?
এত কিছুর পর-
তীব্র অভিমানে ব্যথার দহনে
সযত্নে মুছতে চেয়েও
সত্যি কি সবটা মুছতে পেরেছি?
মোছা যায় সেই সব নির্মম, নৃশংস নির্যাতনের দিনগুলোর কথা।
বারবার দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরে আসে সেই সব।
প্রতিনিয়ত দ্বৈত স্বত্বার লড়াই এ আমার ব্যক্তিগত জীবন হয়েছে দূর্বিষহ।
ক্ষত চিহ্নগুলো শুকালেও
দাগগুলো তো লুকায়নি!
জানি এ লুকোবার নয়।
এতো বাংলাদেশ নামের দেশটির জন্মদাগ।
আজও-কেউ কিছু জানতে চাইলে এটা সেটা বলে পার করি।
কিছুটা স্বান্তনা দেই নিজেকে নিজে।
সময়ের প্রলেপ হয়তো বড় নিয়ামক
কিন্তু এটা তো সমাধান নয়।
আত্মগোপন এক ধরনের আত্মগ্লানি তৈরি করে।
অবশ্যই আমার কিছু দায়বদ্ধতা আছে।
আমি অস্বীকার করি না।
কিন্তু সমাজ সংসার মানুষের মন মানসিকতা...
অস্বীকার করি কোন সাহসে?
এই মাটি ওই আকাশ এই মেঠোপথ ফসলের ক্ষেত আমার/ আমাদের রক্তঋণে আবদ্ধ ।
দূর্বিষহ ভয়াবহ অত্যাচারের নিঃশব্দ সাক্ষী।
সেই মাটিতে দাড়িয়ে সেই খোলা আকাশের প্রান্ত সীমায়
সদম্ভে কুখ্যাত অনাচারীর নাতিপুতিরা এত গলা ডাঙর করে কিভাবে?
কোন সাহসে এত আস্ফালন তোদের?
কে দিয়েছে এত স্পর্ধা!
নির্লজ্জ বেহায়া বক ধার্মিকের উত্তরসূরী পাকি-বীজ।
ইতিহাস বদলাবি।
এতো দুঃসাহস?
ধিক্কার তোদের!!
লানত তোদের ওপর।
না আর লজ্জা নয়
না আর লাঞ্ছিত-বঞ্চিত হয়ে গুমরে কাঁদা নয়।
না আর অপমানিত-নিপীড়িত হয়ে অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়া নয়।
এবার খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসার সময়।
আমার কলঙ্কই আমারই গৌরব গাঁথা
এ-তো মিথ্যে নয় ।
তবে কেন ভয় লজ্জা দ্বিধা সংকোচ!
জনতার সংগ্রাম চলবে।
আবার লড়াই লড়বো
যে পাষণ্ড রাজাকার আর পাকিস্তানি হায়েনারা আমায় ১৯৭১ এ অন্ধকার গহ্বরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল আমার মায়ের কোল থেকে।
যে বেজন্মাদের দল আমায় তীব্র থেকে তীব্রতর মানসিক শারীরিক উৎপীড়ন করেছিল দিনের পর দিন।
লজ্জা তো পাওয়া উচিত তাদের।
আমার কিসের লজ্জা?
আমি সেই নতুন।
আমরা সেই চিরন্তন।
আমি বীরাঙ্গনা।
আমি স্বাধীন বাংলাদেশে জন্মদাগ।
আমি একাত্তরের জননী।
আমার ঠিকানা ধানমন্ডি ৩২।
আমার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
জীবনের এতটা সময় পরে এসে আমি উপলব্ধি করি
সেই সব দুঃসহ যন্ত্রণার দিনগুলোর জন্য
আমি বিন্দু মাত্র দায়ী নই।
তবে কেন মুখ লুকাবো?
আমি কেন? কিসের মোহে সত্য আড়াল করবো?
কেন? কোন উদ্দ্যেশে সমাজের প্রত্যাখান মেনে অতল অন্ধকারে হারিয়ে যাবো।
আরে মুখ লুকাবে তো ওরা
পাকি বর্বর এদেশীয় দোসর আলবদর- আলশামস - রাজাকারেরা।
নির্লজ্জ বেহায়ারা
তাদের দোসর তাদের বংশধরেরা।
এক্ষেত্রে অন্তত আমি আর মুখ লুকাবো না।
দিন তারিখ ঠিক মনে নেই তবে
দিনটা ঈদের দিন ছিল এটা স্পষ্ট মনে আছে ।
হিম ঝরা ফজরের ওয়াক্তে গ্রামে পাকিস্তানি মিলিটারির
ভারি ট্রাক ঢুকলো।
ঘরে ঘরে তল্লাশি আর আগুন ।
ঈদের জামাত হয়েছিল কি-না বলতে পারবো না
তবে ভয়ে আতঙ্কে যে যেদিকে পারে পালিয়েছিল এটা স্পষ্ট মনে আছে ।
আমরা দুজন
আমি আর মা কতক্ষণ চৌকি খাটের নিচে ছিলাম জানি না।
মায়ের ধুলায় এলার্জি ছিল ।
একটা সময় পর
দমকে দমকে কাশছিল অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে।
নিজেই নিজের মুখ চেপে ধরছিল পরক্ষণেই..
কিন্তু
কাশি তো কাশিই
অচিরেই ভারি বুটের আওয়াজ আমাদের ঘরের দরজায় এসে থামলো।
তারপর খানাতল্লাশি শেষে চৌকি খাটের নিচ থেকে চুলের মুঠি ধরে হিড়হিড় করে টেনে আনা হলো আমাদের --
মায়ের কি হয়েছিল জানি না
অনেক পরে শুনেছি সেই দিনের পরে তাকে আর কেউ কোথাও দেখেনি।
আর আমি?
আমার যখন জ্ঞান ফিরলো তখন আমি একটা খোলা জীপ গাড়িতে।
সর্বাঙ্গ ব্যথার আবহে
হঠাৎ শীত শীত অনুভব হলো
বোধ মনে হয় ফিরছিল
ঠিক তখনই অনুভব করলাম আমার শরীর অনাবৃত ।
আমি স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে অস্বস্তিতে উঠে বসবার চেষ্টা করতে -
সারা শরীরে তীব্র ব্যথার ঘোরে
গুঙিয়ে উঠতেই।
কয়েকটি লোভাতুর চোখ ঝুকে এলো সহসা।
কেউ একজন আমার শরীরে জ্বলন্ত সিগারেট ছুঁয়ে তীব্র উল্লাসে ফেটে পড়লো।
বিজাতীয় ভাষায় কুৎসিত উল্লাসের ফোয়ারা ছুটলো ।
কানে এখনও বাজে নরপিশাচদের সেই সব কটুক্তি
"ম্যায় ইস হারামজাদি কওম কি নাসাল বদল দুঙ্গা। ইয়ে মুঝে কীয়া সামাঝতি হ্যায়"... লে আও..
অমানবিক নির্যাতনের প্রহর আর শেষ হয় না।
এদিকে আমার জীবনী শক্তি নিস্তেজ হয়ে আসছিল ক্রমশ।
দিনের পর দিন ক্যাম্পের অস্বাস্থ্যকর ঘরে
মানব ইতিহাসে বিভৎস অত্যাচারে রক্তাক্ত মহাকাব্য লেখা হতে লাগলো..
তারপর একদিন স্বাধীনতা এলো ।
কিন্তু স্বাধীন দেশে মুক্তি আর এলো না।
একসময় নিজ বাড়ি থেকে বিতাড়িত হলাম
সমাজচ্যুত হয়েছিলাম অঘোষিত ফরমানে।
স্বাধীন দেশে আমার বেঁচে থাকার স্বাধীনতাটুকুও হারালাম।
আজও শুনি সেই খুনি অত্যাচারীদের আস্ফালন
উন্মত্ত চিৎকার।
আজও চলে নারীর প্রতি অবমাননা
দেশ দখলের পাঁয়তারায় -অশ্লীল ভাষা প্রয়োগের প্রতিযোগিতা।
শোন পাকি বীজ!
জেগেছে একাত্তরের জননী ।
ক্রমশ জাগবে সবাই এখনো যারা জীবিত...
এখনও যাদের শরীরে বয়ে চলেছে মহান বীর আর বীরাঙ্গনার রক্ত -তারা জাগবেই।
আবার গর্জে উঠবে হাতিয়ার।
আবার সেই ধ্বনি আকাশবাতাস বিদীর্ণ করে
জগত কাঁপাবে।
আবার স্বমহিমায় ফিরবে স্বদেশ।
আবার গগনবিদারী চিৎকারে প্রকম্পিত হবে স্বদেশ।
রক্তবীজের বংশধরেরা এবার নির্বংশ হবেই।
জয় বাংলা!!
জয় বঙ্গবন্ধু!!!
© রফিকুল ইসলাম ইসিয়াক
©somewhere in net ltd.