নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

ডক্টর এ.বি.এম. রেজাউল করিম ফকির, অধ্যাপক, জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগ \nআধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় e-mail: [email protected]

রেজাউল করিম ফকির

অধ্যাপক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

রেজাউল করিম ফকির › বিস্তারিত পোস্টঃ

বাঙ্গলাবর্তে বিভিন্ন কালপর্বে অনুষ্ঠিত আনুষ্ঠানিক শিল্পকলার নানাবিধ মাধ্যম

০৬ ই জানুয়ারি, ২০২৪ সকাল ৭:৪১

বাঙ্গলাবর্তে বিভিন্ন কালপর্বে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক বিষয়কে উপজীব্য করে নানা ধরণের মাধ্যমে লৌকিক পর্যায়ে ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালিত হয়ে এসেছে, যার বর্ণনা নিম্নে তুলে ধরা হলো:

১) গাঁথা ও গীত: শ্লোক, গান ও কাহিনীমূলক গীত। পূর্বকাল থেকে ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে নানা ধরণের গান ও গীত পরিবেশনের প্রচলন ছিলো, যেমন- সহজিয়া বৌদ্ধ ধর্ম ও নাথ ধর্ম ইত্যাদি ধর্মের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গীত গীতিকা।

২) পাঠ ও কথকতা: পাঠ ও কথকতা— এই উভয়ই হলো জনসমক্ষে পুরাণাদি পাঠ, ধর্ম বিষয়ক বক্তৃতা ও ব্যাখ্যানের মাধ্যম বিশেষ। পাঠের মাধ্যমে জনসমক্ষে পুরাণাদি ও অন্যান্য শাস্ত্র গ্রন্থ থেকে পাঠ করে বক্তৃতা ও ব্যাখ্যানের মাধ্যমে সাধারণ্যে ধর্মীয় বাণী প্রচার করার প্রথা বিশেষ। একইভাবে কথকতায়ও জনসমক্ষে পুরাণাদি ও শাস্ত্র গ্রন্থ পাঠ করা হয়। তবে কথকতার বিশেষত্ব হলো এই যে সাংস্কৃতিক-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই বিষয়বস্তুকে উপভোগ্য করে তোলা হয়। কথকতার উৎপত্তিস্থল মহারাষ্ট্র বলে ধরা হয়। কথকতায় গল্প, ইতিহাস ও কথাচ্ছলে শ্রোতৃবর্গের মনোরঞ্জনের মাধ্যমে শ্রোতাদেরকে ধর্মীয় উপদেশ প্ৰদান করা হয়। সঙ্গীত কথকতার এক প্ৰধান অনুষঙ্গ বিশেষ। এই ক্ষেত্রে কথক ব্যক্তি কাব্য বা পুরাণ থেকে যে সকল কবিতা ও বচন পাঠ করেন, সাথে সাথে কথকের পিছনে থেকে দোহারগণ তা আবৃত্তি করেন। বাঙ্গলাবর্তে প্রচলিত চণ্ডী পাঠ হলো এই পাঠের অন্তর্ভুক্ত। উল্লেখ্য যে দুর্গাপূজা ও কালীপূজা ইত্যাদি পূজাদিতে চণ্ডীপাঠ অবশ্য করণীয়। যেখানে শ্রী শ্রী চণ্ডী বা দেবীমাহাত্ম্যম্ বা দুর্গাসপ্তশতী ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করা হয়। চণ্ডী পাঠে শ্রী শ্রী চণ্ডী থেকে ৯দিন ব্যাপী ৭০০ শ্লোক ভক্তদের উদ্দেশ্যে পাঠ করা হয়। অর্থ্যাৎ নবরাত্রিতে এই পাঠ শেষ হয়।

৩) পাঁচালি: পাঁচালি লোকগীতির একটি ধারা। এতে গানের মাধ্যমে কোনও আখ্যান বর্ণনা করা হয়। এগুলো এক ধরণের গীতিনাট্য। পূর্বকালে পাঁচালির উপজীব্য বিষয় ছিলো লোকগীতি, ধর্ম ও মনসার গীত। এতে গান, বাজনা, ছড়া কাঁটা, গানের লড়াই ও নাচ এই পঞ্চাঙ্গের সমাবেশে ঘটে। পাঁচালিতে একজন প্রধান গায়ক নাটকীয় ভঙ্গিতে আবৃত্তি, ছড়া ও গীত দ্বারা মূল কাহিনী বিবৃত করেন। কালক্রমে পাঁচালির বিবর্তন ও প্রসারের ফলে মূল গায়কের সঙ্গে একাধিক গায়েনের সংযোগ ঘটেছে। তারা মৃদঙ্গ, ঢোল ও কাঁসি প্রভৃতি লোক বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে পাঁচালি পরিবেশন করেন। মধ্যযুগে রামায়ণ, মহাভারত ও মঙ্গলকাব্য প্রভৃতি আখ্যান কাব্যও পাঁচালির সুরে গাওয়া হতো। এমনকি অনেক পুথিও পাঁচালির সুরে পাঠ করা হতো। প্রাচীনকাল থেকে বাঙ্গলায় প্রচলিত পাঁচালিতে রূপান্তর ঘটে। আঠারো শতকের শেষদিকে পাঁচালি নতুন রূপ লাভ করে। তখন এতে আখ্যান, কবি গানের ছড়া কাটা, অঙ্গভঙ্গি ও অভিনয়ের সংমিশ্রণ ঘটে। উনিশ শতকে পাঁচালিতে সংযুক্ত হয় সংলাপ রীতি, যা মূল গায়েনের দ্বারাই অভিনীত হতো। এ সময় নতুন সংযোজন হিসেবে যুক্ত হয় একটি ‘সঙ’ চরিত্র। এ চরিত্রটি গান ও ছড়া আবৃত্তি বা নাচের সাহায্যে বিভিন্ন সামাজিক অসঙ্গতির অনুকরণের মাধ্যমে হাস্যরসের সৃষ্টি করা হতো।

৪)অষ্টক গান: অষ্টক গীত ও নৃত্য বাঙ্গলাবর্তের প্রাচীন লোকজ সংস্কৃতির একটি অন্যতম প্রধান ধারা। এটি সাধারণতঃ হিন্দু সমাজে চৈত্র সংক্রান্তির নানাবিধ আচার-অনুষ্ঠানের সময় পরিবেশিত হয়ে থাকে। অষ্টক গীত ও নৃত্য পরিবেশনার দুটি ধারা রয়েছে:
ক) একটি ধারা অনুযায়ী পাট নাচানির সময় পালা গানের সহায়ক হিসেবে গ্রামের ছোট ছেলে-মেয়েরা রাধা-কৃষ্ণ এবং সখি সেজে প্রেমের গান গায় এবং
খ) অন্য ধারা অনুযায়ী “চৈত্র-সংক্রান্তি”-এর দিন রাত্রে যাত্রা-পালার মাধ্যমে, যেখানে অভিনয়ের মাধ্যমে সংলাপ ও গানে কৃষ্ণ ও রাধার প্রেম-লীলার আখ্যান পরিবেশন করা হয়।

৫) পালাগান: পালাগান হলো কাহিনীমূলক লোকগীতি। অর্থাৎ কোনও একটি কাহিনীকে অবলম্বন করে কীর্তনের ঢঙে যে গান পরিবেশন করা হয়, তাই পালাগান। পাঁচালি (লোকগীতির একটি ধারা) ছন্দে রচিত দেবতার কথা বা ধর্মসংগীতও পালা নামে পরিচিত। মঙ্গলকাব্যের কাহিনীগুলো পালা আকারে পরিবেশন করা হতো ও এখনও হয়ে থাকে। দিনে পরিবেশিত কাহিনী দিবাপালা এবং রাতে পরিবেশিত কাহিনী নিশাপালা নামে অভিহিত। কোনও কোনও পালা মাসব্যাপী পরিবেশন করা হয়।

৬) তরজা ও কবিগান: তরজার প্রচলন হয় চৈতন্যদেবের সময় থেকে এবং পরবর্তী যুগে তা হয়ে যায় উত্তর-প্রত্যুত্তর ঢঙের ছড়াগান। এ থেকে আবার আসে কবিগান, যা দু'টি পক্ষের যুক্তিতর্কের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়। এরই চরম রূপ হচ্ছে খেউড়। পশ্চিমবঙ্গে নাগরিক সংস্কৃতির প্রভাবে পাঁচালি-কীর্তন ঢঙ বদলে আখড়াই ও পরে হাফ-আখড়াইতে পরিণত হয়।

৭) কীর্তন: কীর্তন হলো কোনও দেব-দেবীর নাম, গুণাবলী বা কীর্তি কাহিনী সম্বলিত গান। কিন্তু মূলত সুর-তাল সহযোগে কৃষ্ণের গুণকথনকে (যেমন-রাধাকৃষ্ণের পার্থিব লীলার বর্ণনা) কীর্তন নামে অভিহিত করা হয়। অন্যদিকে কৃষ্ণ ও গৌরাঙ্গ লীলা অবলম্বনে রচিত পালাসমূহ পালা কীর্তন নামে পরিচিত। প্রখ্যাত সংস্কৃত পন্ডিত জয়দেব রচিত গীতগবিন্দম হলো কীর্তন গানের প্রকৃত উৎস। এছাড়াও বড়ু চন্ডিদাস শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন ও বিদ্যাপতি প্রভৃতি কবিগণ প্রচুর কীর্তন গান রচনা করেন। পঞ্চদশ শতাব্দিতে শ্রীচৈতন্য ভক্তি সংগীতের এই ধারার প্রভূত উন্নতি সাধন করেন। তাঁর মাধ্যমে কীর্তন নারী, পুরুষ, শিক্ষিত ও অশিক্ষিত নির্বিশেষে সকলের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। কীর্তনের ভিন্নরূপ হলো কৃষ্ণধামালী। এটি এক ধরণের আদি রসাত্মক নাচ গান। এসব গানে দেহজ কামনা-বাসনা, মান-অভিমান, মিলন-বিরহ ইত্যাদি ব্যক্ত হয়। দীনেশচন্দ্র সেন (১৯২১: পৃষ্টা ৯৭২) থেকে বিবৃত আছে যে,
‘ধামালী দুই শ্রেণীর; এক শ্রেণীর নাম শুকুল, অপর শ্রেণীর নাম আসিল। এই আসিল এত অশ্লীল যে তাহা চাষীরা পৰ্যন্ত নিজের ঘরে গাহে না-স্ত্রীলোক ও শিশুদিগকে দূরে রাখিয়া তাহারা মাঠে যাইয়া গায়। কিন্তু শুকুল ধামালীতেও যে রুচি পাওয়া যায়-তাহাতে মধ্যে মধ্যে কাণে হাত দিতে হয়-চণ্ডীদাসের কৃষ্ণকীৰ্ত্তন এই কৃষ্ণ-ধামালীরই সংশোধিত সংস্করণ।’।

কৃষ্ণ-ধামালীর অন্যরূপ হচ্ছে আলকাপ গান, যাতে রাধাকৃষ্ণের আখ্যান অবলম্বনে লৌকিক গান পরিবেশন করা হয়। তাঁর কর্তৃক আরও বিবৃত আছে যে,
“প্রায় ১০০০ বৎসর যাবৎ এই সকল গান বাঙ্গলার পল্লীতে পল্লীতে গীত হইত। এই সকল গান এতটা অশ্লীল ও খারাপ যে মেয়েদের কাছে তাহার সকলগুলি গান করা চলিত না, সেই সকল গান গ্রামের বাহিরে যাইয়া ইতর লোকেরা গাহিত। এই গানের নাম ছিল ‘কৃষ্ণ-ধামালী’। ধামালী শব্দটি নানারূপে ব্যবহৃত হইত, ‘ডাম্বাডোল’, ‘ধুম্বল’ ও ‘ঝুমুর’—শব্দগুলি ঐ শব্দের ভিন্ন ভিন্ন রূপ। এখনও রংপুর অঞ্চলে ‘কৃষ্ণ-ধামালী’ চাষার গাহিয়া থাকে।”

৮) লৌকিক গীতি ও গান: বাঙ্গলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের আনাচে কানাচে বিভিন্ন ধারার লৌকিক গান প্রচলিত ছিলো এবং এখনও আছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ভাটিয়ালি গান, জারি গান, সারি গান, ভাওয়াইয়া গান, মুর্শিদি গান, মারফতি গান, কীর্তন গান, কবিগান, বৃষ্টির গান, মাঙনের গান, মাইজভান্ডারী গান, দেহতত্ত্ব গান, মালশি গান, থুবগান, উদাসিনী বা বারোমাসি গান, রাখালিগান, পালা গান, মেয়েলী গান, বিয়ের গীত ও বৌ বশ করা গান।

বিভিন্ন ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক উপাদানকে উপজীব্য করে পূজা বা অন্যান্য লোক উৎসবে যে আনুষ্ঠানিক শিল্পকলা উপভোগের জন্য এবং স্রষ্টা ও দেবতাদের তুষ্টির জন্য লৌকিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করা হতো, তা আবহমান বাংলায় বহুধা বিভক্ত অনার্য সমাজের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠির মধ্যে পারষ্পরিক মিথোষ্ক্রিয়ার পরিস্থিতি তৈরি করে। এই মিথোষ্ক্রিয়া বাঙ্গলাবর্তের জঙ্গলাকীর্ণ ও জলাকীর্ণ অঞ্চলে ইতস্তত: বিস্তৃত অনার্য সমাজে ভাষা-সংসর্গের অনুঘটক হিসাবে কাজ করে, যা অনার্য জনসমাজকে কালক্রমে ধাপে ধাপে বৃহত্তর ইন্দো-আর্য ভাষিক সমাজে আত্তীকরণের পথ উন্মুক্ত করে। তবে বাঙ্গলাবর্তের সমস্ত অঞ্চলে এই আত্তীকরণের প্রক্রিয়া সমভাবে ও যুগপৎভাবে অনুষ্ঠিত হয়নি।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.