| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
বেদনার নাম জপে কবি হয় পীর; কবিতাতো শোকভূক আলোর শরীর।

ম্যাকবেথ নাটকের একটি দৃশ্য
দিনটি ছিল ২০১৩ সালের ২৭ এপ্রিল। সন্ধ্যা ৭ টায় জাতীয় নাট্যশালায় ঢুকি, পদাতিক নাট্য সংসদের (টিএসসি) নয়া প্রযোজনা ‘ম্যাকবেথ’ দেখবো বলে। কী অবাক! ঠিক একবছর আগে একই দিনে একইক্ষণে আমি ছিলাম মঞ্চে সঞ্চরণশীল। ঢাকা থিয়েটারের ‘দ্য টেম্পেস্ট’র উদ্বোধনী মঞ্চায়ন হয় সেদিন। আর বছরের আবর্তনে সেই আমি দর্শকসারিতে। ‘কমন’ ছিলেন শুধু একজন, তিনি উইলিয়াম শেক্সপিয়র।
নাট্যশালার অভ্যন্তরে অন্ধকার, মূলমঞ্চে চোরা আলো আর তাতে আভাসিত হয়ে আছে একটি দাবার ছক। খাড়া, দ-ায়মান। দাবা খেলা যারা জানেন কিংবা বোঝেন, রাজা, মন্ত্রী, সেপাই ইত্যাদি রাজকীয় ঘুটি আর চালের বিষয়টি তাদের অজানা নয়। ফলে ‘ম্যাকবেথ’র কাহিনি কিংবা এ সম্পর্কিত কিছু না জানা একজন দর্শক অনায়াসে একটি রাজন্যবর্গকেন্দ্রিক নাট্য, এ পূর্বাভাস নিয়ে নিতে পারেন মুহূর্তেই। মজার বিয়য়, প্রথমে বুঝতে পারিনি ওই ছক প্রতিটি পৃথক বাক্স আর এই বাক্সকেন্দ্রিক জাদুই প্রকৃতঅর্থে এই প্রযোজনার প্রাণ।
দেশজ ঐতিহ্যের ধারায় ‘ম্যাকবেথ’ কে মঞ্চে উপস্থাপন করেননি তরুণ উদ্যমী নাট্যনির্দেশক সুদীপ চক্রবর্তী। তিনি পাশ্চাত্যের পরিবেশনা আঙ্গিকেই সাজিয়েছেন দৃশ্য পরম্পরা। তাতে ওই চারকোনা বাক্সগুলো কখনো রাজ দরবার, কখনো গহীন বনের পথ, কখনো প্রাসাদ, কখনো ক্ষমতালিপ্সার সিঁড়ি আবার কখনো ধাবমান বৃক্ষের অর্থে রূপান্তরিত হয়েছে। মঞ্চে সেটের এই চলমানতা এই বহুবিধ ব্যবহার স্মরণকালের কোনো প্রযোজনায় চোখে পড়েনি। পাশ্চত্যের প্রয়োগ কৌশলের মধ্যেও সেট পৃথক কোনো চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে ‘ম্যাকবেথ’ প্রযোজনা থেকে এই নান্দনিক অভিজ্ঞতাটুকু দর্শক নিয়ে নিতে পারবেন অনায়াসে।
ইতোপূর্বে যারা নাটকটির মঞ্চায়ন দেখেছিলেন তাদের কারো কারো কাছে অভিনয়ের খামতির কথা শুনেছিলাম। বসে ছিলাম সেই প্রস্তুতি নিয়ে। অথচ চোখে পড়েনি তেমন গুরুতর কোনো খামতি। বরং একদল তরুণ অভিনেতৃবৃন্দের প্রবল উদ্যমই তো প্রকাশ পেয়েছে প্রতিটি মুহূর্তে। প্রধানচরিত্র রূপায়নকারী শিমুলের দেহকাঠামোয় মানানসই ছিল বীর ম্যাকবেথ। প্রায় নবাগত হিসেবে সমগ্রজীবন বলার মতো একটি চরিত্রে তিনি উৎরেই তো গেছেন। লেডি ম্যাকবেথরূপী সায়কা উচ্চাকাক্সক্ষা আর কূটচালের প্রকাশে সাবলীল পারঙ্গমতাই তো দেখিয়েছেন। ব্যাংকো চরিত্ররূপায়নকারীর ভঙ্গিতে স্বাতন্ত্র্যের ঝলক আছে। এই তিন চরিত্রের বিপরীতে অপরাপর কোনো চরিত্র বিস্তার করেনি আধিপত্য। তবে সেটা অভিনেতৃদের ব্যর্থতা নয়, চরিত্রগুলোই খানিক ম্রিয়মান। অবশ্য সৈয়দ শামসুল হকের মাধুর্যমণ্ডিত ভাষায় অনূদিত এই নাটকের সংলাপ উচ্চারণে আরো একটু সতর্কতা প্রয়োজন। সেটি যেমন সংলাপের অন্তর্গত তাৎপর্যের ক্ষেত্রে সত্য ঠিক তেমনি শাব্দিক উচ্চারণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সবে যাত্রা শুরু করা ‘ম্যাকবেথ’ আগামীর মঞ্চায়নগুলোতে এই সামান্য ঘাটতি পূরণ করে নেবে বলে বিশ্বাস রাখি।
নাটকটিতে সঙ্গীত আর আলোর পরিমিত ব্যবহার লক্ষণীয়। কারণ ট্র্যাজেডি নাটকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মূল নাট্যক্রিয়াকে সঙ্গীত আর আলোর বিশেষ ব্যবহারে পর্যুদস্ত করে তোলার একটা প্রবণতা থাকে। এক্ষেত্রে সেটি ঘটেনি। ফলে দর্শকের পক্ষে মূল নাটকেই অধিকমাত্রায় মনোনিবেশ করা সম্ভব হয়। পোশাকে তেমন বাহুল্য চোখে পড়েনি বরং তা ছিল চরিত্রানুগ।
নির্দেশক সুদীপ নাট্য পরিকল্পনা ও নির্দেশনা প্রসঙ্গে এক স্থানে বলেছেন, ‘ম্যাকবেথ উপভোগের জন্য নির্মিত নয়’। বিনয়ী সুদীপের এই কথাটি সর্ব্বৈব সত্য নয়। ‘ট্র্যাজেডি’ মাত্রই আমরা ‘ক্যাথারসিস’র মুখোমুখি হই। সেও এক ধরনের উপভোগ বটে। নাট্য দর্শনে নিজের ভেতরে যে অনুতাপ আর হাহাকারের সৃষ্টি এবং পরক্ষণে তা থেকে পরিত্রাণের শিক্ষা সে তো উপভোগের নৌকো বেয়েই পাড়ি জমানো সুবর্ণতীরে।
আমাদের জাতীয় জীবনের দিকে তাকালে দেখতে পাই ক্ষমতালিপ্সার চোরাবালিতে এই দেশকে বারংবার ঠেলে দিয়েছি অন্ধকারে। চারপাশে নানা অপশক্তির আস্ফালন। সেই অপশক্তির প্রেতাত্মাদের প্ররোচনায় আমাদের বিবেক বিক্রি করে দিচ্ছি প্রতিনিয়ত। এই ঘোর তমসাচ্ছন্ন কালে পদাতিকের ‘ম্যাকবেথ’ খুব প্রাসঙ্গিক আর অর্থবহ প্রযোজনা। সেখানে পরাক্রমশালী বীরের বীরত্ব যেমন আছে, আছে ক্ষমতার মোহ এবং তার ক্ষয়, আছে নতুন আশাবাদ। আমরা সবিস্ময়ে দেখি বীর ম্যাকবেথ যেন বা বাংলাদেশেরই একটি মানবীয় রূপ, যে মহান আর কল্যাণময় হতে পারার বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছিল কিন্তু ভুল বিবেচনা আর সিদ্ধান্তের চোরাবালিতে ডুবে শুধু নিজেকেই শেষ করেনি, বিশাল স্বপ্নেরও মৃত্যু ঘটিয়েছে, যেমনটা ঘটে চলেছে বাংলাদেশে। তবে এরপরও সৈয়দ হকের ভাষায় ম্যাকবেথের জবানিতে এই সতর্কতাও জেনে রাখা ভাল-
‘আর যেন কেউ আর সেই ভণ্ড প্রতারকদের
বিশ্বাস করে না, যারা দুই অর্থে এক কথা বলে,
আমাদেরই আশভঙ্গ করে।’
‘ম্যাকবেথ’ প্রযোজনার নানামুখী স্রোতকে একসূতোয় গেঁথেছেন সুদীপ চক্রবর্তী। তরুণ এই নাট্যনির্দেশক উপহার দিয়ে চলেছেন একের পর এক নান্দনিক প্রযোজনা। তাঁর এই সামর্থ্য আরো বারবাড়ন্ত হোক। পদাতিকের ‘ম্যাকবেথ’ অর্জন করুক অন্ততপক্ষে শতরজনী মঞ্চে থাকার গৌরব।
©somewhere in net ltd.