| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আহমাদনািসর
বুকে দারুন কষ্ট নিয়ে আমি এক অন্য মানুষ;ভালবাসা খুঁজি নাকো আজ আর।ভালবাসা হারিয়েছে সেই পথে... যেখানে সোনালী ধান ,রোদ্দুর মাঠ জুড়ে ভালবাসে প্রানের সবুজ..সোনা নেই ,প্রিয়া নেই.রাত নেই ,সুখ নেই, বুক নেই মুখ নেই ,কোল নেই ,হাত নেই ,,,,,,,,প্রিয়তমা নেই আর শ্রাবন রাত্রি নেই,শীতের সকাল নেই ,উনুনে আগুন নেই মান অভিমান নেই ... সেদিন যা ছিলনা ,যার জন্য তাকে পাওয়া হয়নি ্বাজ তার সবই আছে অনেক বেশি শুধু...কষ্ট নেই,নস্ট হওযার
“যখন ওরা প্রথমে কমিউনিস্টদের জন্য এসেছিলো, আমি কোন কথা বলিনি, কারণ আমি কমিউনিস্ট নই। তারপর যখন ওরা ট্রেড ইউনিয়নের লোকগুলোকে ধরে নিয়ে গেল, আমি নীরব ছিলাম, কারণ আমি শ্রমিক নই। তারপর ওরা যখন ফিরে এলো ইহুদিদের গ্যাস চেম্বারে ভরে মারতে, আমি তখনও চুপ করে ছিলাম, কারণ আমি ইহুদি নই। আবারও আসল ওরা ক্যাথলিকদের ধরে নিয়ে যেতে, আমি টু শব্দটিও উচ্চারণ করিনি, কারণ আমি ক্যাথলিক নই। শেষবার ওরা ফিরে এলো আমাকে ধরে নিয়ে যেতে, আমার পক্ষে কেউ কোন কথা বলল না, কারণ, কথা বলার মত তখন আর কেউ বেঁচে ছিল না।”
প্রখ্যাত জার্মান ধর্মতত্ত্ববিদ ও লুথেরান যাজক ফ্রিড্রিশ গুস্তাব এমিল মার্টিন নেমলারের বিখ্যাত এই উক্তির মতো প্রতিদিনই আমাদের কাউকে না কাউকে ‘ওরা’ ধরে নিয়ে যায়। আর হদিস মেলেনা। কারো হদিস মিললেও লাশ ভাসে শীতলক্ষ্যায়। রাস্তার ধারে। ব্রিজের কাছাকাছি। আমরা দেখি কিন্তু কথা বলি না। কারণ যাদেরকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তারা আমাদের কেউ না। দেশে “ওদের’ এই ধরে নিয়ে যাওয়া অনেক আগ থেকেই।
২০১০ সালের ২৫ জুন রাত ৯ টায় রাজধানীর ইন্দিরা রোড এলাকা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর সদস্যরা ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলমকে ধরে নিয়ে যায়। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল মধ্যরাতে হোটেল রুপসী বাংলা থেকে বের হওয়ার পর আর বাড়ি ফেরেননি বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী। এভাবে প্রতিদিনই বেড়ে চলছে বাড়ি না ফেরা মানুষের সংখ্যা। তালাশ মিলছেনা তদন্তেও।
সর্বশেষ গত ২৭ এপ্রিল প্রকাশ্য দিবালোকে নারায়নগঞ্জ থেকে অপহৃত হন সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম এবং তার চার সহযোগী। প্রায় একই সময়ে একই সড়ক থেকে গাড়িচালকসহ অপহৃত হন আইনজীবী চন্দন সরকার। ওই সাতজনও আর বাড়ি ফেরেননি। তাদেরকে ফিরতে দেওয়া হয়নি। তিন দিন পর তালাশ মিলেছে শীতলক্ষ্যায়।
নারায়ণগঞ্জে নিহত ওই প্যানেল মেয়রের হত্যার পেছনে স্থানীয় সাংসদ শামীম ওসমানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে শুরু থেকেই একটি মহল অভিযোগ করে আসছে। তবে নিহতের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম ৪ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে কাউন্সিলর নজরুল ইসলামকে র্যাব তুলে নিয়ে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ করেছেন। এর জন্য আরেক কাউন্সিলর নূর হোসেনসহ কয়েকজনের কাছ থেকে র্যাব ছয় কোটি টাকা নিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ শামীম ওসমানের উপস্থিতিতেই তিনি বলেন, ‘কাউন্সিলর নূর হোসেন ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন মিয়ার কাছ থেকে ছয় কোটি টাকা নিয়ে র্যাব আমার জামাতা নজরুলসহ সাতজনকে খুন করেছে। ২৭ মে দুপুরে যখন নজরুলকে দুটি গাড়িতে করে অপহরণ করা হয়, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন আমাদের জানিয়েছেন, দুটি মাইক্রোবাসে করে ওদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’ যেখানে ওই দিন সকাল থেকেই র্যাব-১১ লেখা একটি গাড়ি অবস্থান করছিল। শহীদুল বলেন, ‘ঘটনার পরপরই আমরা বিষয়টি এমপি শামীম ওসমানকে জানাই। শামীম ওসমান আমাকে সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজীতে র্যাব-১১-এর সিও তারেক সাঈদের সঙ্গে দেখা করতে বলেন। আমি সেখানে গেলে সিও আমাকে কয়েক ঘণ্টা আটকে রেখে নানা রকম জিজ্ঞাসাবাদ করেন।’
কাউন্সিলরের শ্যালক সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বিকেল পাঁচটা-সাড়ে পাঁচটা নাগাদ র্যাবে পৌঁছাই। কিন্তু আমাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়। রাত নয়টায় র্যাবের সিও আমাদের দেখা দেন। তিনি এ সময় আমাদের বলেন, শামীম ওসমানের সঙ্গে আপনাদের কি কোনো ঝামেলা আছে? আপনারা শামীম ওসমানের কাছে যান। এরপর আমরা রাতে শামীম ওসমানের সঙ্গে রাইফেল ক্লাবে দেখা করতে যাই। তিনি আমাদের সামনেই নানা জায়গায় ফোন করেন।’
এমনি করে সারাদেশ জুড়েই বাড়ি না ফেরা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। প্রতিদিনই কেউ না কেউ অপহৃত হচ্ছেন। এরপর খোঁজ মিলছেনা। অথবা মিললেও বিচারবহির্ভূত হত্যার পর লাশ হয়ে ফিরে আসছেন।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট ২৬৮ জনকে অপহরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৩ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। অপহরণের পর ছেড়ে দেওয়া হয় ২৪ জনকে। পরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয় ১৪ জনকে। কিন্তু ১৮৭ জনের এখন পর্যন্ত কোনো খোঁজই মেলেনি।
পুলিশের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ শাখা বলছে, দেশের অপরাধ পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে অপহরণ বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। ২০১১ সালে দেশে অপহরণ ছিল ৭৯২ জন, ২০১২ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৮৫০; আর ২০১৩ সালে হয়েছে ৮৭৯। ২০১৪ সালের তিন মাসেই অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ১৯৬টি।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) আইন ও জনসংযোগ শাখা থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত র্যাবের কাছে দুই হাজার ৬৪১ জনকে অপহরণের অভিযোগ আসে। এর মধ্যে এক হাজার ৮৭ জনকে র্যাব উদ্ধার করে।
এমন পরিস্থিতিতে দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি দৈনিকের ৪ এপ্রিলের শিরোনাম ছিল ‘জননিরাপত্তা ভেঙে পড়েছে’। দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির সভনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও দেশের এ অবস্থাকে মৃত্যুকূপের সঙ্গে তুলনা করেছেন। রোববার একজনসভায় তিনি বলেন, দেশ এখন মৃত্যু কূপ ও মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে।
গত ২৮ এপ্রিল এক আলোচনা সভায় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ‘গুম-অপহরণ সীমা অতিক্রম করেছে’ মন্তব্য করে বলেন, ‘সরকারের বাইরে আরেক সরকার থাকলে তো চলবে না। এখানে দুর্বলতা দেখানো যাবে না, আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। ক্রমাগত এ-জাতীয় অপহরণ ও গুম আইনের শাসনের দৃষ্টান্ত নয়। মানুষ আইনের কাছে যায় বিচারের আশায়। সেখান থেকে অপহরণ হলে আইনের শাসন বৃথা হয়ে যাবে।’ আওয়ামী লীগের এই জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ‘এই অপহরণের পর আইনের শাসনে বিশ্বাসী মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক “দেখি নাই”, “জানি না”, “বুঝি না” এগুলো বললে চলবে না। এটা কোনোভাবে আইনি শাসন নয়।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকার বলছে বাংলাদেশে গত চার মাসে ৮৭টি বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড এবং ১৯ জনকে গুমের ঘটনা ঘটেছে। আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর এসব মানুষদের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরিবারগুলোর দাবি, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই তাদের ধরে নিয়ে গেছে এবং এর পর থেকে তারা গুম হয়েছেন অথবা তাদের লাশ পাওয়া গেছে৷ যদিও আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা এই অভিযোগগুলো অস্বীকার করছেন৷ কিছু কিছু ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রথমে ধরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করলেও পরে আটক ব্যক্তিকে জনসমক্ষে হাজির করছে অথবা দূরবর্তী কোনো থানায় নিয়ে হস্তান্তর করছে৷
এরফলে, রাষ্ট্র-সরকার এবং তার বাহিনীগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত ও প্রমাণ জনগনের সামনে উপস্থাপন না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত জনগণের ভয়-আতঙ্ক কমবে না। গুজব ছড়াতে থাকবে যে, যাদের ওপরে রক্ষকের দায়িত্ব তারাই ভক্ষক সেজে বসে আছে কিনা? কারণ, সরকার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অনীহা দেখালে, ঘটনাকে অস্বীকার করলে, গোঁজামিল দিলে মানুষের মধ্যে কেবল রহস্য আর প্রশ্নের জন্ম হতে থাকবে। অপহরণ, গুম ও বিচার বহির্ভূত খুনের যে সংস্কৃতি গড়ে তোলা হচ্ছে, সেটি কি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে ঘটছে? রাষ্ট্র কি কার্যকর রয়েছে নাকি রাষ্ট্রকে ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য অন্ধকারের শক্তিরা এগুলি ঘটিয়ে চলেছে? যদি তাই হয় তাহলে এটি আমাদের নিরাপত্তার জন্য আরো ভীতিকর খবর হবে। এ সকল প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর রাষ্ট্র-সরকার দিতে না পারলে সকল দায়ভারই তাদের বহন করতে হবে।
আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর মাঝে আমরা প্রয়াত গায়ক সঞ্জীব চৌধুরীর গাওয়া সেই গানের চিত্র দেখতে চাইনা। যে গানে বলা হয়েছে, ‘‘ওরা বলে ওই গাড়িতে করে আমাদের জন্য খাদ্য ও পানীয় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে
খাদ্য ও পানীয়
কিন্তু বিশ্বাস করুন বন্ধুগণ
আমি জানি ওই গাড়িতে করে আমাদের জন্য কোনো খাদ্য ছিলনা
আমাদের জন্য কোনো পানীয় ছিলনা
তিনশটি লাশ, তিনশটি লাশ...ঠা-া হিম...
যাদের গুম করে ফেলা হবে।’’
অভিযোগ উঠেছে, অনেক অপহৃত বা নিখোঁজ ব্যক্তিকে অপহরণের পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে পাওয়া যাচ্ছে। অপহৃত লোকগুলো তাদের হেফাজতে কী করে আসছেন, সে বিষয়ে বাহিনীগুলোর পক্ষ থেকেও কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। সে কারণে কেউ নিখোঁজ হলেই প্রথমেই কোনো না কোনো বাহিনীর কাছে খোঁজ নিতে যাচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবার।
তবে কোনো ঘটনারই কিনারা হচ্ছে না, অপহরণকারীরা শনাক্তও হচ্ছে না। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে এসব ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।
অনেক ক্ষেত্রেই কোন ব্যক্তিকে আটক, গ্রেফতার ও হেফাজতে রাখা নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সংবিধান, ফৌজদারি কার্যবিধি ও পুলিশ আইন অমান্য করছে। এমনকি তোয়াক্কা করছে না উচ্চ আদালতের নির্দেশনারও। এই বেআইনি আটক ও হেফাজতের কারণে গুম এবং অপহরণ নিয়ে সমাজে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়েছে। বিভ্রান্তি রয়েছে সাদা পোশাকে এবং পরিচয়পত্রবিহীন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান নিয়েও। আইন অনুমোদন না করলেও অহরহ এ ধরনের অভিযান চলছে। এ কারণে খোদ পুলিশ সদর দফতর সাদা পোশাকে অভিযান পরিচালনা বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন।
কোন ব্যক্তি বা অভিযুক্তকে কিভাবে আটক, গ্রেফতার এবং হেফাজতে রাখতে হবে ফৌজদারি কার্যবিধি ও পুলিশ আইনে তার সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। সাধারণত আদালতের পরোয়ানা ছাড়া কোন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা যায় না। আদালতের পরোয়ানা ছাড়া ৫৪ ধারায়ই পুলিশকে গ্রেফতারের সীমিত ও সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কোন ব্যক্তি যদি আমলযোগ্য অপরাধ করেন অথবা ঘরভাঙ্গার সরঞ্জাম রয়েছে যার ওই সরঞ্জাম রাখার যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা নেই অথবা সরকার আদেশ দ্বারা কোন ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে ঘোষণা করে থাকেন অথবা পুলিশ অফিসারের কাজে বাধা দানকারী ব্যক্তি অথবা থানা, আদালত, কারাগার ও প্রতিরক্ষা বাহিনী থেকে পলায়নরত ব্যক্তিকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতারের সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে দেয়া হয়েছে।
কিন্তু নাগরিকদের গ্রেফতার এবং আটকের অনেক ক্ষেত্রেই ৫৪ ধারার বিধান অনুসরণ হচ্ছে না। ফৌজদারি কার্যবিধির ৬১ ধারায় নির্দেশনা রয়েছে কোন ব্যক্তিকে আটকের পর বিলম্ব না করে ম্যাজিস্ট্রেট এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে নিয়ে যেতে হবে। তবে ওই বিধির ৬২ ধারায় উল্লেখ রয়েছে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হাজিরের ক্ষেত্রে ২৪ ঘন্টার বেশি বিলম্ব করা যাবে না। বিষয়টি সংবিধানের ৩৩ (২) অনুচ্ছেদেও উল্লেখ রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘‘গ্রেফতারকৃত ও প্রহরায় আটক প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে গ্রেফতারের ২৪ ঘন্টার মধ্যে (গ্রেফতারের স্থান হতে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আনয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ব্যতিরেকে) হাজির করা হইবে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ব্যতীত তাহাকে তদতিরিক্তকাল প্রহরায় আটক রাখা যাইবে না।’’ ইদানিং দেখা যাচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আইন এবং সংবিধানের এসব নির্দেশনা তোয়াক্কা করছে না।
গত ২৮ এপ্রিল দুপুরে ভালুকা উপজেলা থেকে অপহৃত হয়েছিলেন দুই শিক্ষক কামাল হোসেন ও আবু বকর। তাদের অপহরণের খবর পরের দিন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়। কিন্তু দুই দিন পর জানা গেলো অপহরণ নয়, র্যাব তাদেরকে আটক করেছে। আটকের দুইদিন পর ম্যাজিস্ট্রেট বা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে হাজির না করে র্যাব গণমাধ্যম কর্মীদের সামনে তাদেরকে হাজির করে জানায়, এরা ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে তিন জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেয়ার সঙ্গে জড়িত।
একই দিন একই সময়ে আরো ৫ ব্যক্তিকে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করে র্যাব। এদের কেউ কেউ ২০ ও ২১ এপ্রিল অপহৃত হয়েছিলেন বলে সংবাদপত্রে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিলো। কিন্তু ১০ দিন তারা র্যাবের হেফাজতে ছিলেন। এই সময়ের মধ্যে তাদেরকে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়নি।
গত ২৮ এপ্রিল ধামরাই থেকে অপহৃত হন ব্যবসায়ী রেজাউল করিম। এই অপহরণের ঘটনায় তার স্ত্রী সাহেরা বেগম থানায় জিডি করেন। এতে উল্লেখ করা হয়, রেজাউলকে জয়পুরা বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে কয়েকজন তাকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। দু’দিন পর জানা গেলো রেজাউল অপহৃত হননি স্বয়ং ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, রেজাউল ডিবি কার্যালয়ে রয়েছেন। এই দুইদিন তাকে কোন আদালতে হাজির করা হয়নি। ডিবির হেফাজতে রাখার ব্যাপারেও আদালতের কোন নির্দেশনা নেই।
সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক মনে করেন, আটক, গ্রেফতার এবং হেফাজতে রাখা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে না হওয়ার কারণে গুম ও অপহরণ নিয়ে সমাজে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এসব আচরণের কারণে ভুক্তভোগীরা বুঝতেই পারছেন না প্রকৃতপক্ষে তারা কাদের দ্বারা অপহৃত হয়েছেন। যদিও সংবিধানের ৩৩ (১) অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, “গ্রেফতারকৃত কোন ব্যক্তিকে যথাসম্ভব শিঘ্র গ্রেফতারের কারণ জ্ঞাপন না করিয়া প্রহরায় আটক রাখা যাইবে না এবং উক্ত ব্যক্তিকে তাহার মনোনীত আইনজীবীর সহিত পরামর্শের ও তাহার দ্বারা আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার হইতে বঞ্চিত করা যাইবে না। শাহদীন মালিক বলেন, শুধু তাই নয়, উচ্চ আদালতের (রাষ্ট্র বনাম ব্লাষ্টের মামলায়) নির্দেশনা রয়েছে কোন ব্যক্তিকে আটক করা হলে টেলিফোনের মাধ্যমে অথবা লোক মারফত ওই ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের কাছে আটকের সংবাদ জানাতে হবে যাতে আত্মীয়স্বজন জানতে পারেন যে আটককৃত ব্যক্তি বৈধ কোন সংস্থার হাতে আটক রয়েছেন।
১৯৯৮ সালে ইন্ডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রুবেল হত্যাকা-কে কেন্দ্র করে ৫৪ ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিলো মানবাধিকার সংগঠন ব্লাষ্ট। বিচারপতি হামিদুল হকের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ ৫৪ ধারায় আটকের ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে কিছু নির্দেশনা দিয়েছিল। হাইকোর্ট ওই ঘটনা পর্যালোচনার পর নির্দেশ দিয়েছিলো কোন ব্যক্তিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোন সংস্থা কর্তৃক আটক করার আগে বাহিনীর পরিচয়পত্র প্রদর্শন এবং আটকের পর তার পরিবারের সদস্যদেরকে অবিলম্বে অবহিত করতে হবে। একইসঙ্গে আটকের কারণও জানাতে হবে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, র্যাব এবং ডিবির হাতে আটককৃত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের কাছে আটকের কারণ ও সংবাদ কোনটিই জানানো হয় না। এমনকি আটক অভিযান পরিচালনার তথ্য জেনারেল ডায়েরিতেও অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনের ৪৪ ধারা এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৪ ও ১৫৫ ধারা অনুযায়ী ২০০ পৃষ্ঠা যুক্ত রেজিষ্ট্রারে (যাকে পুলিশের দিনলিপি বলা হয়) থানার দায়িত্বগ্রহণ লওয়া, পাহারা বদল, দায়িত্বভাগ এবং কোন অভিযানে অফিসার এবং কনস্টেবলের থানা থেকে বের এবং ফেরত আসার সংবাদ লিপিবদ্ধ করতে হয়। শুধু তাই নয় কোন অফিসার কোথায় গেছেন তাদের নম্বর, পদবী উল্লেখ করে মোতায়েনপত্র দিতে হয়। আইন-শৃঙ্খলার অন্য বাহিনীর ক্ষেত্রেও নিজ নিজ সংস্থার ডায়েরি লিপিবদ্ধ করার বিধান রয়েছে। কিন্তু এসব বিধান যথাযথভাবে পালিত না হওয়ার কারণে অপরাধেও জড়িত হওয়ার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
মানবাধিকার আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া ‘আইনের শাসনের সঙ্গে গুম-খুনের সহবাস’ শীর্ষক এক নিবন্ধে বলেন, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গুম, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, হত্যা করে মাথাকাটা লাশ নির্জন এলাকায় ফেলে যাওয়া, বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার এসব নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাও সংগঠিত প্রতিবাদ নেই। খুব কম সংখ্যক কিছু ঘটনায় পুলিশের সক্রিয় ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে অপহৃত ব্যক্তি উদ্ধার পাচ্ছেন। কিন্তু অধিকাংশ ঘটনার কোনো সুরাহা হয় না। ফলে অপরাধীরা উৎসাহ পায়।
২৭ এপ্রিল সাতজন ব্যক্তি গুম হওয়ার পর থেকে, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারকে উদ্ধারের জন্যে মহামান্য হাইকোর্টে একটি ‘হ্যাবিয়াস কর্পাস’ রিট দাখিল করার কথা ভাবা হচ্ছিল। কিন্তু সমস্যা হচ্ছিল তাঁর ‘কাস্টডি’ নিশ্চিত করা নিয়ে। সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যদি ‘হ্যাবিয়াস কর্পাস’ রিট করতে হয়, তাহলে এটি নিশ্চিত করতে হবে যে, আটক ব্যক্তি কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক আছেন এবং ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় পার হয়েছে।
চন্দন সরকার কিংবা অপর ছয়জন, কারও ক্ষেত্রেই এটি নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছিল না। পুলিশ কিংবা র্যাব, কোনো বাহিনীই তাদের আটক করেছেন বলে স্বীকার করেননি। এ ক্ষেত্রে একমাত্র প্রতিকার ছিল সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ করা কিংবা তারা যদি ব্যবস্থা না নেন তবে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অপহৃতদের উদ্ধারের জন্যে মামলা করা।
যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধেই অভিযোগ থাকে তাহলে, এই বিদ্যমান আইনি ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে তা বলাই বাহুল্য। এছাড়াও আরেকটি সমস্যা হল, নিখোঁজদের পরিবারের কেউ দাবি করেননি যে, নিখোঁজদের ‘অপহরণ’ করা হয়েছে।
‘অপহরণ’ বাংলাদেশ দ-বিধিতে সংজ্ঞায়িত একটি অপরাধ, প্রমাণসাপেক্ষে যার শাস্তি নিরুপণ করা আছে। কিন্তু যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক আইনবহির্ভূতভাবে গ্রেফতারের অভিযোগ থাকে এবং তারা যদি সেটি স্বীকার না করে, তাহলে আইনের ফাঁকে পড়ে যাওয়ায় এর সুরাহা আর মেলে না।
তাছাড়া এ রকম ক্ষেত্রে, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে থানা কিংবা নিম্ন আদালতের দীর্ঘ প্রক্রিয়া সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মতো যথাযথ ও দ্রুত ব্যবস্থা কিনা তা-ও বিবেচনায় আনা জরুরি। কেননা মানুষের জন্যে আইন, আইনের জন্যে মানুষ নয়।
অব্যাহত সন্ত্রাসের কারণে দেশের সাধারণ মানুষ একসময় ক্রসফায়ারের মতো বেআইনি হত্যাকে নিরব সমর্থন দিয়েছে। এখন তার নেতিবাচক দিক সবাইকে ভোগ করতে হচ্ছে। আজকের এই অবস্থার জন্যে তাই কোনো বাহিনী বা সন্ত্রাসীরা দায়ী নয়, এর দায়ভার সকল নাগরিককেই নিতে হবে। সবার জন্যে সমান একটি আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে না পারার ব্যর্থতা, নিজের স্বার্থের উপরে উঠে অন্যায়কে অন্যায় বলার সৎসাহস না থাকার ব্যর্থতা, নিজের অধিকার বুঝে নিতে না পারার ব্যর্থতা সবই আজকের অবস্থার পেছনে দায়ী।
একটি জাতির সামগ্রিকভাবে এগিয়ে যেতে হলে আইনের শাসন কায়েম থাকা খুবই জরুরি।
সম্প্রতি প্রকাশিত ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা দ্য ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের চতুর্থ প্রতিবেদনে বলা হয়, দেওয়ানি বিচার ব্যবস্থায় কিছুটা অগ্রগতি হলেও আইনের শাসনের অন্যান্য সূচকে বাংলাদেশ পিছিয়ে গেছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম এম খালেকুজ্জামান মনে করেন, ‘আইনের শাসন’ এই ধারণার পেছনে যে অনুকল্পটি কাজ করে, তা হচ্ছে আইন সর্বদা ন্যায়ানুগ এবং তার প্রয়োগপদ্ধতি কার্যকর, স্বচ্ছ, সমতাভিত্তিক এবং জনকল্যাণে নিবেদিত। কোনো কায়েমী উদ্দেশ্য সাধনের জন্য আইন প্রণীত হয়নি। রাষ্ট্রের নাগরিকের যাবতীয় অধিকারের সুরক্ষণ নিশ্চিত করাই আইনের মূল উদ্দেশ্য। মানুষের অধিকারের স্বীকৃতি থাকতে হবে আইনে এবং সংবিধানে। সঙ্গে সঙ্গে এগুলো বলবত করারও আয়োজনও থাকা আবশ্যক। এ জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ বিচারিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে আইনের যথার্থ প্রয়োগ নিশ্চিত করা যায়। আর বিচারিক আদালতের মাধ্যমে আইনের আশ্রয় নেওয়ার অধিকার ও ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত হওয়া আইনের শাসনের অপরিহার্য অঙ্গ।########
©somewhere in net ltd.