নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সৌরভ দাস ১৯৯৫

বামপন্থী রাজনীতি করি, সমাজতন্ত্র ছাড়া কোন সমাজ শান্তি পাবে না। এটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। আর ভালবাসি সাহিত্য। অনেক অনেক। লেখালেখি না করে থাকতে পারি না। নিজেকে মূর্খ মনে হয়।

সৌরভ দাস ১৯৯৫ › বিস্তারিত পোস্টঃ

ঈশা খাঁ এবং বারো ভূঁইয়াদের ঐক্যের নেপথ্যে

১৮ ই অক্টোবর, ২০১৭ বিকাল ৪:০১


“বারো ভূঁইয়া” শব্দটি একটি ঐক্যের নাম। এ ঐক্য জনগণের কোন ঐক্য নয়। সরাসরি সামন্ত রাজাদের মধ্যেকার ঐক্য। এই ঐক্যই বাংলায় মোগল সাম্রাজ্যের কম্পন থামিয়ে দিয়েছিল। এটি মোগল আমলের একটি বিরল ঘটনা। এরকম দৃঢ় ঐক্য নিয়ে মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সুদীর্ঘ সময় টিকে থাকার ঘটনা কেবল মাত্র বাংলায়ই ঘটেছিলো। মোগল আমলে এমনটি আর কোথাও দেখা যায় নি। ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৬১১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত টানা ৩৫ বছর বারো ভূঁইয়ারা এককভাবে এ অঞ্চল শাসন করেছিলেন। এই ঐক্যের কারণে জনগণের যে খুব একটা লাভ কিংবা ক্ষতি হয়েছিল বিষয়টা সেরকম ছিলো না। বারো ভূঁইয়ারা এখানকার জনগণকে শোষণ করেই টিকে ছিলেন। জনগণকে তখন বাধ্যতামূলক ট্যাক্স দিতে হত। ট্যাক্স না দিলে নির্যাতন এক সাধারণ বিষয় ছিলো। মোগলরা আসলে এটাই করতো। কিন্তু পার্থক্যটা অন্য জায়গায়। নিজ নিজ সিংহাসন রক্ষার্থে কম বেশি বারো জন সামন্ত রাজা তখন ক্ষমতার প্রশ্নে একাট্টা হয়েছিলেন। তবে ভূঁইয়াদের সংখ্যা ঠিক বারো ছিলো না। কখনো সংখ্যাটি বারো থেকে উপরে উঠেছে কখনো নিচে নেমেছে। এ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যেও প্রশ্ন রয়েছে। তবে একদল সামন্ত রাজা তখন মোগলদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন এ সত্যটিকেই আমাদের গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি পর্যালোচনা করতে হবে। স্বভাবতই প্রশ্ন রয়ে যায় বারো ভূঁইয়ারা এমন বিদ্রোহ করলেন কেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের শুরু করতে হবে ঈশা খাঁ থেকে। বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে প্রধান নেতৃত্বের নাম ছিলো ঈশা খাঁ। ঈশা খাঁর জন্ম ছিলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল পরগণায়। কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার এক রাজাকে সিংহাসনচ্যুত করে ঈশা খাঁ তার জমিদারি শুরু করেন। শুরু হয় ঈশা খাঁ’র প্রতাপশালী শাসন। মূলত ঈশা খাঁর নেতৃত্বেই অন্যান্য জমিদাররা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তখন মোগল সাম্রাজ্যের বিপরীতে অবস্থান নেন। তাদের এই ঐক্যই ইতিহাসে “বারো ভূঁইয়া” নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কিন্তু কী ই বা দরকার ছিলো এত কট্টোর মোগল বিরোধীতার? ঈশা খাঁ’রা চাইলে তো মোগলদের বশ্যতা স্বীকার করে বেশ থাকতে পারতেন। বেশনিরাপদ থাকতে পারতেন তারা। কিন্তু বিদ্রোহের দরকার ছিলো বটে! কারণ ঈশা খাঁর বাবাকে মোগল বিরোধিতার জন্য হত্যা করা হয়েছিলো। খোদ মোগলরাই তারা বাবাকে হত্যা করে। শের শাহের মৃত্যুর পর যখন ইসলাম শাহ দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেন তখন ঈশা খাঁ’র বাবা সুলেমান খাঁ দিল্লীর বশতা স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানান। এর ফলাফল স্বরূপ সুলেমান খাঁ কে নিজ জীবন দিতে হয় এবং ঈশা খাঁ কে তখন বিক্রি করে দেয়া হয়েছিল এক বণিকের কাছে। পুরো ঘটনাটি মোগল চক্রান্ত অনুসারে সম্পন্ন করা হয়েছিল। ঈশা খাঁ সেই অতীত সারাটি জীবন মনে রেখেছিলেন। মূলত এখানেই রচিত হয় ঈশা খাঁ’র কট্টোর মোগল বিরোধিতার প্রেক্ষাপট। বড় হয়ে এই ঈশা খাঁ হয়ে ওঠেন দোর্দ্দন্ড প্রতাপশালী।
মোগল সম্রাটদের এক বড় চিস্তার কারণ হয়ে দাঁড়ান ঈশা খাঁর নেতৃত্বাধীন এই বারো ভূঁইয়ারা। বারো ভূঁইয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ন হয়েও মোগল সম্রাটদের ব্যর্থ হয়ে ফিরে যেতে হয়। আকবরের মতো দিগ্বীজয়ী সম্রাট এই বারো ভূঁইয়াদের শায়েস্তা করতে ব্যর্থ হন। শেষ মেষ এই বারো ভূঁইয়াদের সাথে খোদ আকবরকে মীমাংসার টেবিলে বসতে হয়েছিল। মীমাংসার টেবিলে বসে আকবর তার বন্দী সৈন্যদের মুক্ত করে নিয়ে যান ঠিকই কিন্তু বারো ভূঁইয়াদের মন থেকে মোগল বিরোধিতা বিন্দুমাত্র দূর করতে পারেন নি। ঈশা খাঁর মৃত্যুর পর তার ছেলে মুসা খাঁ সিংহাসনে বসলেও ঠিক থাকে বারো ভূঁইয়াদের ঐক্য। এখন প্রশ্ন হলো বারো ভূঁইয়ারা কিভাবে এরকমটি করতে পারলেন? তৎকালীন বাংলার উপর এই ঐক্যের প্রভাবটাই বা কি ছিলো?

এটি নিঃসন্দেহে স্বীকার করতে হবে যে বারো ভূঁইয়াদের সাহসই ছিলো তাদের শক্তির অন্যতম উৎস। তারা সামরিক দিক বিবেচনায় সব দিয়েই মোগল সাম্রাজ্যের তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিলেন। কিন্তু জীবন দিয়ে হলেও তারা নিজ সিংহাসনের জন্য লড়াই করবেন, মোগল আগ্রাসন কোন ভাবেই বরদাস্ত করবেন না- এ প্রশ্নেই মূলত তারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। অন্য দিকে এখানে একটা অর্থনৈতিক প্রশ্নও জড়িত ছিলো। নিজ অঞ্চলে আদায়কৃত রাজস্বের পুরোটাই তখন বারো ভূঁইয়ারা ভোগ করতে পারতেন। কিন্তু মোগল বশ্যতা স্বীকার করে নিলে তাদের এ পরিমাণটি অনেক কমে যেত। এ অর্থনৈতিক হিসেবটি ঈশা খাঁ ছাড়াও অন্যান্য ভূঁইয়াদের মধ্যে খুব কাজ করেছিলো। অন্যদিকে বারো ভূঁইয়াদের সাথে বিচ্ছিন্ন কিছু যুদ্ধে হেরে যাওয়ার পর মোগল সম্রাটদেরও বোধোদয় হয় যে, বাংলা ভূখন্ডটি দখল করতে হলে তাদের বেশ কাঠ খড় পোড়াতে হবে। ফলে যুদ্ধে না গিয়ে মানিয়ে নেয়াটাকেই তারা শ্রেয় মনে করলেন।
দ্বিতীয়ত এই ঐক্য বাংলা ভূখন্ডের সংস্কৃতির উপর বেশ প্রভাব রেখেছিল। ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের সংস্কৃতিতে মোগল সংস্কৃতি যে প্রভাব বিস্তার করেছিলো বাংলায় তা পারে নি। বাংলা সংস্কৃতি তার স্বীয় মহিমায় তখন টিকে ছিলো। ঐ সময় মোগল শাসিত ভারতবর্ষের স্থাপত্যকলা, ভাষা, সংগীত, খাবার দাবারে ব্যাপক মোগলীয় প্রভাব পড়েছিল। বাংলার ক্ষেত্রে কিস্তু তেমনটি ঘটে নি। বাংলা তার অনেক স্বাতন্ত্র ধরে রাখতে পেরেছিল। এখনো আমরা ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের সাথে তুলনা করলে বিষয়টি সত্যতা দেখতে পাই।
তবে “বারো ভূঁইয়া” দের এক পর্যায়ে এসে মোগলদের কাছে পরাজিত হতে হয়। তখন অবশ্য মোগল সাম্রাজ্যও পতনের দিকে এগুচ্ছিলো ধীরে ধীরে। ১৬১১ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে বাংলা মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। তখন বারো ভূঁইয়াদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ঈশা খাঁর ছেলে মুসা খাঁ। এ সময় বারো ভূঁইয়াদের ঐক্যেও খানিক ফাটল দেখা দিয়েছিল। তখন সম্রাট জাহাঙ্গীরের নিয়োগ দেয়া বাংলার সুবেদার ইসলাম খান চিশতী’র নিকট মুসা খাঁ কে প্রাণ দিতে হয়। এর মধ্য দিয়ে বাংলায় “বারো ভূঁইয়া”দের শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে।
এখানে উল্লেখ্য, বাংলায় “বারো ভূঁইয়া”দের পতনের প্রাক্কালেই ১৬১০ সালে ইসলাম খান চিশতী ঢাকাকে বাংলার রাজধানী করেন। এর আগে বাংলার রাজধানী ছিলো বিহারের রাজমহলে। ইসলাম খান চিশতীর হাত ধরেই ঢাকা প্রথম বাংলার রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে।
সর্বোপরি বাংলার সাহসী এক জন সামন্ত রাজা হিসেবে ঈশা খাঁ সহ অন্যান্য বারো ভূঁইয়ারা এখনো ইতিহাসের পাতা জ্বলজ্বল করে রয়েছেন।

লেখক
সৌরভ দাস
শিক্ষার্থী
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

মন্তব্য ৬ টি রেটিং +২/-০

মন্তব্য (৬) মন্তব্য লিখুন

১| ১৮ ই অক্টোবর, ২০১৭ বিকাল ৪:৫০

সত্যপথিক শাইয়্যান বলেছেন: ভালো লিখেছেন।

যদিও লেখাটা শুধুই সমালোচনায় পরিপূর্ণ যাতে সাম্প্রদায়িকতার আঁচ পাওয়া যায়।

বারো ভুঁইয়াদের শাসনের ভালো দিক্টাও আলোচনা করা প্রয়োজন যে কোন ইতিহাস লিখিয়েদের।

আর রেফারেন্স দিলে ভালো হতো।

১৮ ই অক্টোবর, ২০১৭ বিকাল ৫:৩১

সৌরভ দাস ১৯৯৫ বলেছেন: সাম্প্রদায়িকতার আঁচ কি পেলেন?

২| ১৮ ই অক্টোবর, ২০১৭ বিকাল ৫:০৯

প্রামানিক বলেছেন: বারো ভুঁইয়াদের সম্পর্কে ভালোই লিখেছেন। ধন্যবাদ আপনাকে।

৩| ১৮ ই অক্টোবর, ২০১৭ বিকাল ৫:১৬

চাঁদগাজী বলেছেন:


জমিদারদের মাঝে ঐক্য, রাজাদের মাঝে ঐক্য, জামাত-বিএনপি'র ঐক্য, জাপা-আওয়ামী ঐক্য
বনাম
১৯৭১ সালে জনতার ঐক্য

কোনটা আসল ঐক্য?

৪| ১৮ ই অক্টোবর, ২০১৭ বিকাল ৫:৫৪

খাঁজা বাবা বলেছেন: ভাল লিখেছেন

৫| ১৮ ই অক্টোবর, ২০১৭ সন্ধ্যা ৬:০৮

অনন্য দায়িত্বশীল আমি বলেছেন: সব ঐক্যই স্বার্থসীদ্ধির ঐক্য।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.