নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

ব্লগের স্বত্বাধিকারী সামিয়া

সামিয়া

Every breath is a blessing of Allah.

সামিয়া › বিস্তারিত পোস্টঃ

ছোট গল্পঃ মায়া

১২ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:২৩


মানুষের জীবনে এমন কিছু মানুষ থাকে যাদের সঙ্গে সম্পর্কের কোনো পরিচয় দেওয়া যায় না। তাদের সঙ্গে ভালোবাসা থাকে, অথচ তাকে ভালোবাসা বলা যায় না। শ্রদ্ধা থাকে, অথচ শুধু শ্রদ্ধা বললেও কম বলা হয়। সময় চলে যায়, মানুষ বুড়ো হয়, জীবন নিজের মতো করে সবাইকে আলাদা করে দেয়। তবুও কিছু মানুষ থেকে যায়। কোথাও একটা পুরোনো ঘ্রাণের মতো। কাছে নেই অথচ পুরোপুরি দূরেও নন।
আমার জীবনে এমন একজন মানুষ ছিলেন আবদুল কাদের স্যার।
আমাদের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক। শান্ত মানুষ, অদ্ভুত রকমের ধৈর্যশীল। ক্লাসে কেউ উত্তর ভুল করলে কেউ পড়া না পারলে অপমান করতেন না। বরং এমনভাবে বুঝিয়ে দিতেন, যেন ভুলটা ছাত্রের নয়, তাঁর নিজেরই দায়িত্ব। আমরা তখন সদ্য তরুণ। পরীক্ষার ফলাফল, চাকরি, প্রেম, ভবিষ্যৎ, টাকা-পয়সা এসব নিয়েই আমাদের মাথাব্যথা। স্যার মাঝে মধ্যে ক্লাসের মাঝখানে হঠাৎ বই বন্ধ করে বলতেন,
জীবনে খুব বড় কিছু হওয়ার চেয়ে কাছের মানুষদের নিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে একসাথে থাকতে পারাটাই সুখ। বড় হওয়া টাকা হওয়া খুব কঠিন কিছু না। ভালো থাকা কঠিন। তখন কথাগুলো শুনে মাথা নাড়তাম। ভাবতাম ভুল বলছে স্যার, টাকা থাকলে জীবনে আর কিছু লাগে নাকি।

বয়স বাড়ার পর স্যার কি বলতে চেয়েছেন বুঝেছি।‌ কিছু কথা মানুষকে বুঝতে হলে আগে বয়স বাড়তে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করার পর একে একে সবাই ছড়িয়ে গেল। কেউ বিদেশে গেল, কেউ চাকরি পেল, কেউ ব্যবসা শুরু করল। আমি নিজেও নিজের সংসার, কাজ আর ব্যস্ততায় ঢুকে গেলাম।

স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ অবশ্য পুরোপুরি ছিন্ন হয়নি। মাঝে মাঝে ফোন করতাম। কখনো দেখা করতে যেতাম। তারপর একসময় ফোন করাও কমে গেল। এটাই বোধহয় জীবনের সবচেয়ে স্বাভাবিক নিষ্ঠুরতা। মানুষ কাউকে ভুলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জেনে বুঝে নেয় না। শুধু অন্য কাজগুলোকে একটু একটু করে বেশি গুরুত্ব দিতে থাকে।

একদিন শুনলাম স্যার বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন এখন। বিয়ে শাদী করেনি আপনজন কেউ নেই কাজেই বৃদ্ধাশ্রম ছাড়া তার আর কোন অপশনও ছিল না, আমি প্রথম যেদিন তাঁকে সেখানে দেখতে গেলাম, তাঁকে দেখে আমার ভেতরটা কেমন জানি করে উঠেছিল। যে মানুষটাকে একসময় ক্লাসরুমে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে শত শত ছাত্রকে পড়াতে দেখেছি, সেই মানুষটা তখন জানালার পাশে বসে ছিলেন। শরীর শুকিয়ে গেছে। হাতে লাঠি। চোখের চশমাটা মোটা ভারী।
আমাকে দেখে বললেন,
- রাফি?
আমি হেসে বললাম,
-জি স্যার।
তিনি কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
- কবে মধ্যবয়সী পুরুষ হয়ে গেছিস যে?
আমি হেসে বলেছিলাম,
- আপনার ছাত্র ছিলাম, বয়স হলেও আজ ও আপনার ছাত্রই আছি।
স্যার হাসলেন।
সেদিন ফেরার সময় হঠাৎ মনে হলো, স্যার ভীষণ একা তাকে মাঝে মাঝে দেখতে যাওয়াটা আমার দায়িত্ব কর্তব্য ,
তাই কয়েকদিন পর আবার তাকে দেখতে গেলাম,
বললাম,
- স্যার, একদিন আমার বাসায় দুপুরে খাবেন?
স্যার শিশুর মতো হেসে বললেন,
- তোর স্ত্রী কিছু মনে করবে না তো?
আমি বললাম, একদম না স্যার সে আপনার গল্প অনেক শুনেছে, বরং আপনাকে দেখে খুশি হবে।
- বাসায় কে কে আছে তোর?
আমার স্ত্রী, মেয়ে, আর আমার মা, অনেক বছর আগে আমার বাবা মারা গিয়েছেন। এখন এদের নিয়েই আমার সংসার।

সেদিন দুপুরে বৃদ্ধাশ্রম থেকে স্যারকে নিয়ে আমার বাড়িতে ঢুকলাম।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ডাকলাম,
- কই সবাই? দেখো কাকে নিয়ে এসেছি।
ভেতর থেকে আমার স্ত্রী সন্তান বের হয়ে এলেন,
আমি বললাম, দেখো উনি হচ্ছে আমার কলেজের সেরা শিক্ষক।

আমার স্ত্রী সালাম দিয়ে ভেতরে নাস্তার জন্য চলে গেলেন, কিছুক্ষণ পর আমার মা নাস্তার ট্রে হাতে ঘর এলেন। তারপর থমকে গেলেন। আমি মায়ের মুখের দিকে তাকালাম। মায়ের হাত কাঁপছিল। ট্রের কাপগুলো ঠকঠক শব্দ করছিল। স্যারও যেন পাথর হয়ে গিয়েছিলেন।
অনেকক্ষণ কেউ কথা বলল না।‌তারপর স্যার খুব আস্তে বললেন,
- শিউলি... তুমি?
মায়ের ঠোঁট কেঁপে উঠল।
- আপনি? আমাকে চিনেছেন?
আমি সেদিন প্রথম বুঝলাম, আমার মা আর আমার শিক্ষক একে অপরকে আগে থেকেই চিনতেন, শুধু চিনতেন না। তাদের মধ্যে এমন কিছু ছিল, যার কথা আমি কখনো জানতাম না। মা ট্রেটা টেবিলের ওপর রাখলেন। আমি তখনও কিছু বুঝতে পারছিলাম না।
দুপুরের খাবারে আমি আর আমার স্ত্রী একাই প্রায় সব কথা বললাম। মা শুধু খাবার পরিবেশন করছিলেন। স্যার খুব ধীরে ধীরে খাচ্ছিলেন।
মাঝেমধ্যে আমি দুজনের দিকে তাকাচ্ছিলাম।‌ দুজনেই যেন নিজেদের খুব সাবধানে সামলে রাখছিলেন।
সেদিন বিদায়ের সময় মা হঠাৎ বললেন, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?"
স্যার বললেন, করো
মা একটু থেমে বললেন,
- আপনি... বিয়ে করেননি?
- না
- কেন?
স্যার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন,
- যাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলাম, তাকে তো পাইনি। আর অন্য কাউকে ঠকানোর সাহসও হয়নি। মা কথাটা শুনে মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
আমি দেখলাম, তাঁর চোখে পানি।
সেদিন প্রথমবার আমার নিজের মাকে অচেনা মনে হয়েছিল। একজন মা নন, একজন নারী, একজন তরুণী, যে কোনো একসময় কাউকে ভালোবেসেছিল।

স্যার চলে যাওয়ার পর আমি মাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা একে অপরকে চিনতে? মা কোনো উত্তর দিলেন না। অনেকক্ষণ পর আলমারি খুলে একটা পুরোনো খাম বের করলেন।‌ ভেতরে একটা ছবি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানের ছবি। সামনের সারিতে তরুণ কাদের স্যার।
আর তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে আমার মা। ছবির পেছনে স্যারের হাতের লেখা। শিউলি তুমি কোন চিন্তা করো না সব ঠিক হয়ে যাবে।
আমি ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। মা জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন,
- তারপর কিছুই ঠিক হয়নি। তোর নানা, কিছুতেই রাজি হলেন না, সমবয়সী ছিলাম, তার কোন পারিবারিক অর্থ সম্পদ ছিল না নিজেরও ক্যারিয়ার তখন হয়নি।
আমি কিছু বললাম না। মা নিজেই বলতে শুরু করলেন। নানার এক কথায় তাঁর বিয়ে হয়ে গিয়েছিল বাবার সাথে। তারা কেউ কাউকে কিছু বলতে পারেননি। দুজন দুজনের হাত ধরে পালিয়ে ও যায়নি, প্রতারণাও করেনি।‌ শুধু দুজনেই ভাগ্যকে মেনে নিয়েছিল।

সেদিন রাতে আমার ঘুম আসেনি। বারবার মনে হচ্ছিল, দুজন মানুষকে আলাদা করে দেওয়ার জন্য সবসময় কোনো ভিলেনের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো শুধু একটা ভুল সময়ই যথেষ্ট।

তারপর থেকে স্যারের কাছে যাওয়া আমার অভ্যাস হয়ে গেল। প্রতি শুক্রবার বিকেলে যেতাম। কখনো ফল নিয়ে, কখনো বই নিয়ে। কখনো কিছুই নিয়ে যেতাম না। শুধু পাশে বসে থাকতাম, উনি বিয়ে করলে নিশ্চয়ই আমার মতন ওনার ও একটা সন্তান থাকতো, মাও একসময় আমার সঙ্গে যেতে শুরু করলেন। প্রথম দিকে দুজনের কথাবার্তায় একটা অস্বস্তি ছিল। তারপর ধীরে ধীরে সেটা কেটে গেল।
তারা পুরোনো দিনের গল্প করতেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প। কিন্তু কখনো নিজেদের ভালোবাসার কথা বলতেন না। আমার মনে হতো, দুজনেই জানেন কোন কথাটা তুললে ভেতর থেকে অনেক পুরোনো কষ্ট বেরিয়ে আসবে। তাই সেই সব টপিক বন্ধ রাখতেন।

মাঝে মাঝে স্যার অনেক অসুস্থ হয়ে যেতেন তখন আমি মা দুজন মিলেই তাকে অনেক সেবা যত্ন করতাম। হাসপাতালে নিয়ে যেতাম দৌড়াদৌড়ি করতাম, আমার মনে হতো আমার বাবা বেঁচে থাকলেও তো আমি এমনটাই করতাম। আমার সেম ফিলিংই হতো স্যারের জন্য।

এক বিকেলে স্যার আমাকে বারান্দায় ডাকলেন আমাকে; বললেন,
- রাফি, একটা কথা রাখবি?
- বলুন স্যার।
স্যার একটু হেসে বললেন,
- আমি যদি আগে চলে যাই, শিউলিকে কাঁদতে দিস না।
আমি হেসে বলেছিলাম,
- আপনি এসব কী বলছেন? আপনার কিচ্ছু হবে না, আমি কথাটা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম।


দুই মাস পর ভোরবেলা ফোন এলো, স্যার মারা গেছেন, আমি আর মা একসঙ্গে বৃদ্ধাশ্রমে ছুটে গেলাম। মা স্যারের নিথর মুখের পাশে বসে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর শুধু একবার বললেন, একদম না বলে চলে গেলেন? এত অভিমান আপনার? তারপর আর কোনো কথা বলেননি।
জানাযা শেষ হওয়ার পর বৃদ্ধাশ্রমের ব্যবস্থাপক আমাকে একটা ছোট কাঠের বাক্স দিলেন।
বললেন,
- উনি আপনার মায়ের জন্য রেখে গেছেন।
বাড়ি ফিরে মা বাক্সটা খুললেন। ভেতরে একটা পুরোনো সোনার আংটি, আর একটা ভাঁজ করা চিঠি। মা চোখের জল মুছতে মুছতে কাঁপা হাতে চিঠিটা খুললেন। তাতে লেখা ছিল,
শিউলি,
আমরা কেউ কাউকে হারাইনি।
আমাদের শুধু একসঙ্গে জীবনযাপন হয়ে ওঠেনি। তবু তো শেষ জীবনে এসে একটুর জন্য হলেও দেখা হল, এটাই বা কম কি, তুমি ভালো থেকো। আমি সারাজীবন তোমাকে কোনো অভিযোগ করিনি, করবোও না। আংটিটা তোমার জন্য কিনেছিলাম সে সময় যে সময় তুমি আমার জীবন থেকে চিরতরে চলে গিয়েছিলে, ওটা তোমারই। জীবনের শেষ মুহূর্তে হলেও এটা দেবার সৌভাগ্য আমার হয়েছে এটাই আমার জীবনের পরম পাওয়া।
বিদায়।

মা চিঠিটা পড়লেন। তারপর অনেকক্ষণ কিছু বললেন না শুধু কাঁদলেন। হঠাৎ আমার মনে হলো, মানুষ আসলে সবসময় মানুষকে হারায় না।
কখনো কখনো সময় মানুষকে হারিয়ে দেয়।‌ কখনো বাবা-মায়ের একটা সিদ্ধান্ত। কখনো সমাজের ভয়। কখনো শুধু নিজের ভেতরের কাপুরুষতা। আর তারপর আমরা বাকি জীবন নিজেদের বোঝাই, যা হয়েছে, ভালোই হয়েছে। কিন্তু সত্যি কথা হলো,জীবনে সবকিছু ভালো হয় না।
কাদের স্যার আর আমার মা একসঙ্গে সংসার করতে পারেননি। একসঙ্গে বৃদ্ধও হতে পারেননি। একসঙ্গে কোনো সন্তানও বড় করেননি, তাদের কোনো দাম্পত্য স্মৃতি নেই। একই বালিশে মাথা রেখে কাটানো রাত নেই। তবুও এত বছর পরেও তাদের মধ্যে বেঁচে ছিল ভালোবাসা।
একটা অসমাপ্ত অপেক্ষা।

এই মধ্য বয়সে এসে বুঝেছি, ভালোবাসার সবচেয়ে দুঃখের পরিণতি বিচ্ছেদ নয়।‌ কিছু ভালোবাসা আছে, যেগুলো শেষ পর্যন্ত কোনো সম্পর্কের নামই থাকে না, শুধু মানুষের ভেতরে চুপচাপ বেঁচে থাকে। আর মানুষটা যখন মারা যায়, তখনও সঙ্গে সঙ্গে মরে না। কারও পুরোনো ডায়েরিতে থাকে। কারও আলমারিতে লুকানো চিঠিতে থাকে। কারও বুকের ভেতরে থাকে।

আমার মা স্যারের শেষ চিঠিটা আজও যত্ন করে রেখে দিয়েছেন।‌ মাঝে মাঝে তাঁকে দেখি চিঠিটা বের করে পড়তে, কিছু বলেন না।
শুধু চিঠিটা ভাঁজ করে আবার রেখে দেন। আমি এখন আর কিছু জিজ্ঞেস করি না। কারণ বুঝে গেছি, জীবনের কিছু গল্পের শেষ জানতে নেই। কিছু গল্প শুধু অনুভব করতে হয়। আর কিছু মানুষকে জীবনে পাওয়া যায় না। শুধু তাদের হারানোর পর বোঝা যায়,‌ তারা কতটা আপন ছিল।

কাদের স্যারকে আমি সারাজীবন আমার শিক্ষক বলেই জেনেছিলাম। এই বয়সে এসে বুঝলাম, তিনি শুধু আমার শিক্ষক ছিলেন না। তার জীবনে আমার মা ছিলেন সেই মানুষটি, যার জন্য একটা জীবন অপেক্ষা করেও কখনো কোনো অভিযোগ জন্মায়নি তার। সম্ভবত এটাই ভালোবাসার সবচেয়ে নীরব রূপ। যেখানে মানুষটি পাশে থাকে না, তবুও তার জন্য মনের ভেতর একটা জায়গা‌ সারাজীবন খালি পড়ে থাকে।

(সমাপ্ত)

মন্তব্য ১ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ১২ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:০৩

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: এটাই বোধহয় জীবনের সবচেয়ে স্বাভাবিক নিষ্ঠুরতা।
..................................................................................
ভালবাসার কান্নার কি রং আমি জানিনা ,
তবে পড়তে পড়তে আমার চোখ ভিজে গেল, হৃদয়ের
ভেতরে না পাওয়ার কান্নার বেদনা শুনতে পাচ্ছিলাম,
এই অনুভূতি ,এই অস্হিরতা শুধুমাত্র অল্পকিছু মানুষ অনুভব করতে পারে !!!

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.