| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
স্ত্রী বাসা থেকে চলে যাওয়ার পর মানুষের মাথায় কী কী চিন্তা আসে আমি জানি না। কেউ হয়তো প্রথমে রাগ করে। কেউ ভেঙে পড়ে। কেউ সঙ্গে সঙ্গে আত্মীয়স্বজনকে ফোন করে। কেউ থানায় যায়। আমার মাথায় প্রথম যে কথাটা এসেছিল, সেটা ছিল অন্যরকম। আমি বসে বসে ভাবছিলাম, পাঁচ বছরের সংসারে নীলাকে আমি কোনোদিন নিজের পছন্দমতো কিছু খেতে দিইনি। শুনতে খুব তুচ্ছ একটা ব্যাপার মনেহয়,
রেস্টুরেন্টে গেলে আমি মেনু হাতে নিয়ে নিতাম। নীলা মেনুর দিকে তাকিয়ে থাকত। আমি বলতাম, তুমি এসব বুঝবা না, আমি অর্ডার দিচ্ছি।
তারপর নিজের জন্য বিরিয়ানি, কাবাব, কোল্ড ড্রিংকস। নীলার জন্য কোনো একটা হালকা খাবার। ভেজিটেবল, স্যুপ এসব অর্ডার করতাম যা আমার মনে হতো মেয়েদের খাওয়া উচিত। নীলা কোনোদিন আপত্তি করেনি। আমি ভেবেছিলাম, ওর খাবারের প্রতি আগ্রহ কম।
এখন মনে হচ্ছে, মানুষের আগ্রহ খাবার ব্যাপারে কমে যায় না। মানুষ একসময় বুঝে যায়, নিজের আগ্রহ প্রকাশ করে কোনো লাভ নেই।
বাসায় মাংস রান্না হলে ভালো টুকরোগুলো আমি নিজের প্লেটে তুলে নিতাম। মাছের ভালো অংশগুলোও। নীলা খেতো আমি বা আমাদের পরিবারের সবাই খেয়ে যা থাকত।হাড়, ঝোল, আলু, আমি কোনোদিন খেয়াল করিনি। খেয়াল করার প্রয়োজনও বোধ করিনি।
আমাদের টাকার অভাব ছিল না। ভালো চাকরি করতাম। শহরের ভালো এলাকায় ফ্ল্যাট ছিল। ব্যাংকে টাকা ছিল। বছরে দু-একবার ঘুরতেও যেতাম। শুধু নীলার ব্যাপারে আমার একটা অদ্ভুত হিসাব ছিল। আমি বিশ্বাস করতাম, স্ত্রীকে বেশি স্বাধীনতা দিলে সংসার নষ্ট হয়ে যায়।
এই বিশ্বাসটা কোথা থেকে এসেছিল আমি জানি না। সম্ভবত আমার বাবার কাছ থেকে। সম্ভবত সমাজ থেকে। অথবা হয়তো নিজের ভেতরে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার যে সহজাত ইচ্ছাটা ছিল, সেটাকেই আমি সংসার রক্ষার নাম দিয়েছিলাম।
বিয়ের কিছুদিন পর নীলা বলেছিল, একটা চাকরি করতে চায়। আমি হেসেছিলাম। আমার ইনকাম থাকতে তোমার চাকরি করার দরকার কী? ও বলেছিল, দরকারের জন্য না। নিজের ভালো লাগার জন্য, আমি বিরক্ত হয়েছিলাম। ভালো লাগার জন্য মানুষ চাকরি করে নাকি?
বলেছিলাম, সংসারটা আগে সামলাও। চাকরি করলে ঘরবাড়ি কে দেখবে? নীলা সেদিন একটু জেদ ধরেছিল। আমি এখনো স্পষ্ট মনে করতে পারি। ওর চোখদুটো শক্ত হয়ে গিয়েছিল। খুব শান্ত গলায় বলেছিল, আমি চাকরি করে সংসার সামলাতে পারবো। আমি রেগে গিয়েছিলাম।তারপর কষিয়ে দু গালে চড় দিয়েছিলাম। সেই শব্দটা এখনো মাঝে মাঝে আমার কানে আসে। দুইটা চড়ের শব্দ। তারপর অনেকদিন নীলা কোনো কথা বলেনি। এরপর আর চাকরির কথাও বলেনি।
আমি ভেবেছিলাম, বুঝে গেছে। মানুষ আসলে কী সহজে নিজের সুবিধামতো অন্যের নীরবতার ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে নেয়?
একদিন নীলা একটা শাড়ির ছবি দেখিয়ে বলেছিল, খুব সুন্দর না? আমি ফোন থেকে চোখ না তুলেই বলেছিলাম, সুন্দর তো। কিন্তু এসব কিনে কী হবে? তোমার আলমারি ভর্তি শাড়ি আছে। ও আর কিছু বলেনি।
পরের ঈদে আমি নিজের জন্য নতুন ফোন কিনেছিলাম। নীলা পুরোনো ফোনটাই ব্যবহার করেছিল। স্ক্রিনের একপাশ ফেটে গিয়েছিল।
আমি বলেছিলাম, এখনো তো চলে। ও বলেছিল, হ্যাঁ, চলে। নীলা খুব দ্রুত এই কথাটা শিখে গিয়েছিল।যা আছে, তা দিয়েই চলতে হবে।
মানুষকে কোনো কিছু থেকে বঞ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি সম্ভবত তাকে বোঝানো যে, তার যা আছে, সেটাই যথেষ্ট। বিয়ের প্রথম দিকে কোথাও যাওয়ার আগে নীলা আমাকে জিজ্ঞেস করত, এই শাড়িটা পরব? আমি বলতাম, যেটা ইচ্ছা আমার কণ্ঠে এমন একটা বিরক্তি থাকত যে, কিছুদিন পর ও আর জিজ্ঞেস করত না। নিজে নিজেই তৈরি হয়ে নিত। কোথাও ঘুরতে যাওয়ার কথা উঠলে বলতাম, পরে যাব।
ও বলত, আচ্ছা। সিনেমা দেখতে যেতে চাইলে বলতাম, এসব বাচ্চাদের কাজ তোমার কি সেই বয়স আছে? ও বলতো, আচ্ছা।
মায়ের বাড়ি কয়েকদিন থাকতে চাইলে বলতাম, একদম যাওয়া যাবে না। থাকা তো দূরের কথা। বাবা-মা, ভাই-বোনের নামে কিছু বলার সুযোগও দিতাম না। নীলা যদি কখনো তাদের সম্পর্কে কিছু বলতে যেত, আমার রাগ হতো। সেই রাগের সময় আমার হাতের কাছে যা থাকতো, সেটাই যথেষ্ট, কখনো কোমরের বেল্ট, কখনো ঝাড়ু, কখনো শুধু হাত।মানুষ রাগের সময় নিজের সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারে।আমি প্রতিবার নীলাকে মারার পর ভাবতাম, এবার ঠিক হয়েছে, এবার বুঝবে। কী বুঝবে? আজ এত বছর পর আমি সেই প্রশ্নের উত্তর জানি না।
নীলা শুধু বলতো, আচ্ছা। একসময় ওর মুখে শুধু একটা শব্দই থেকে গেল।
আচ্ছা।
আমি সেটাকেই শান্ত স্বভাব বলতাম। বন্ধুদের কাছে গর্ব করে বলতাম, আমার বউটা খুব ভালো। কোনো চাহিদা নেই। যা দিই, তাই নিয়ে খুশি। কেউ আমাকে কোনোদিন বলেনি, চাহিদা না থাকা আর চাহিদা প্রকাশ করতে না পারার মধ্যে পার্থক্য আছে। নীলা আমাকে ভালোবাসত না, এই কথা কেউ বলতে পারবে না। জ্বর হলে রাত জেগে মাথায় পানি দিয়েছে। অফিস থেকে ফিরতে দেরি হলে না খেয়ে বসে থেকেছে। আমার মা অসুস্থ হলে দিনের পর দিন হাসপাতালে থেকেছে। আমার পছন্দের খাবার রান্না করতে শিখেছে। আমার রাগ, আমার অভ্যাস, আমার অপছন্দ, সব মুখস্থ করে ফেলেছিল। শুধু একটা জিনিস আমি কোনোদিন জানতে চাইনি। নীলার কী ভালো লাগে?
এখন মনে হয়, একজন মানুষকে ভালোবাসার সবচেয়ে সহজ উপায় সম্ভবত তাকে এই প্রশ্নটা করা। তোমার কী ভালো লাগে? আমি পাঁচ বছরে প্রশ্নটা একবারও করিনি।
একদিন রাতে নীলা বলেছিল, তোমার সাথে একটু কথা ছিল। আমি ফোন থেকে চোখ না তুলেই বলেছিলাম, বলো, ও কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর বলেছিল, থাক। আমি বলেছিলাম, তাহলে ডাকলে কেন? নীলা হেসেছিল। বলেছিল, এমনিই। এখন বুঝি, ওই এমনিইর ভেতরে হয়তো একটা মানুষ ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছিল। গত এক বছর ধরে নীলা বদলে গিয়েছিল। আগের মতো আমার জন্য অপেক্ষা করত না।আমি অফিস থেকে ফিরলে খাবার গরম করে দিত। কিন্তু পাশে বসে থাকত না। ফোনে কারও সাথে কথা বলতো না। কোথাও যেতও না। আমি ভেবেছিলাম, সংসারে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আমি জানতাম না, মানুষ যখন কথা বলা বন্ধ করে দেয়, তখন সে অভ্যস্ত হয় না।
সে আশা করা বন্ধ করে দেয়।
সেদিন শুক্রবার ছিল। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি নীলা বারান্দায় বসে আছে, চুল বাঁধা। আমি বললাম, এত সকালে উঠছো কেন?
ও বলল, ঘুম ভেঙে গেছে। আমি বাথরুমে চলে গেলাম। এই ছিল আমার সাথে নীলার শেষ স্বাভাবিক কথা। দুপুরে খেতে বসে দেখি ও নেই।
প্রথমে ভাবলাম, পাশের বাসায় গেছে, বিকেল হয়ে গেল, ফোন বন্ধ, রাত হয়ে গেল, কোথাও নেই।আলমারি খুলে দেখি, ওর কয়েকটা জামা নেই, টেবিলের উপর একটা কাগজ। খুব ছোট করে লেখা। 'আমি চলে যাচ্ছি। আমাকে খুঁজো না। এবার আমি একটু নিজের মতো বাঁচতে চাই।'
প্রথমে আমার রাগ হয়েছিল, খুব রাগ। ভাবছিলাম, এত ভালো একটা সংসার ছেড়ে একটা মেয়ে যায় কীভাবে? এখন এই সময়ে এসে আমি বুঝি, মানুষের নিজের সম্পর্কে ধারণাটাই সম্ভবত সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা।আমি সত্যিই বিশ্বাস করতাম, আমি নীলাকে ভালো রেখেছি।
কারণ আমি ওকে খেতে দিয়েছি, পরতে দিয়েছি, থাকার জায়গা দিয়েছি। কিন্তু মানুষকে শুধু বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া আর ভালো রাখা সম্ভবত এক জিনিস না, তিনদিন পর নীলার ছোট বোন এলো, অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিল। তারপর বলল, ভাইয়া, একটা কথা বলব? আমি বললাম, বলো। ও বলল, আপু অনেকদিন ধরেই খুব কষ্টে ছিল।
আমি বিরক্ত হয়েছিলাম।
বললাম, কষ্ট? কীসের কষ্ট? আমি কি ওকে খেতে দিইনি? পরতে দিইনি? সংসার দিইনি? মেয়েটা অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে ছিল।
তারপর বলল, এইটাই তো সমস্যা ভাইয়া। আমি চুপ করে গেলাম।
ও বলল, আপনি ভাবেন আপনি আপুকে সবকিছু দিয়েছেন। একটু থেমে আবার বলল, কিন্তু তার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছেন। গায়ে হাত তুলেছেন। মারধর করেছেন। আপনার বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন দিয়ে অপমানজনক কথা শোনার পরিস্থিতিও করে দিয়েছেন।আর প্রতিবার তাদের পক্ষ নিয়ে আপুকে একা করেও দিয়েছেন।
সেদিন কথাগুলো শুনে আমি অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলাম। মানুষ নিজের অপরাধ সম্পর্কে অন্যের মুখ থেকে শুনতে পছন্দ করে না। কারণ নিজের কাছে আমরা সবসময় একটা ব্যাখ্যা তৈরি করে রাখি। আমি মারতাম, কারণ ও জেদ করতো।আমি নিষেধ করতাম, কারণ সংসারের ভালোর কথা ভাবতাম। আমি ওকে আমার পরিবারের বিরুদ্ধে যেতে দিতাম না, কারণ শৃঙ্খলা দরকার ছিল। প্রতিটা কাজের একটা কারণ ছিল। শুধু একটা জিনিসের কারণ ছিল না। আমি কোনোদিন ভাবিনি, নীলার জায়গায় আমি থাকলে কেমন লাগতো।
সেদিন দেখলাম ওর সবকিছু গোছানো। শাড়িগুলো ভাঁজ করা। ড্রেসিং টেবিলে চিরুনি ঠিক জায়গায়। একটা ড্রয়ারে কয়েকটা কাগজ পেলাম। কক্সবাজারের একটা ট্রাভেল ব্রোশিওর। দুই বছর আগের। একটা চাকরির বিজ্ঞাপন কেটে রাখা। একটা ছোট কাগজ।
সেখানে নীলার হাতের লেখায় লেখা, একদিন নিজের টাকায় একটা শাড়ি কিনব। আমি কাগজটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে ছিলাম।
পাঁচ বছরে আমি নীলাকে হাতে গোনা দুই তিনটে শাড়ি কিনে দিয়েছি। সেটাও ওর নিজের পছন্দে, নিজের ইচ্ছায় কিনে দেইনি, নিজের জন্য একটা শাড়ি কিনতে চেয়েছিল পাঁচ বছর ধরে! আশ্চর্য।এই সামান্য পার্থক্যটা আমি বুঝিনি।
রাতে আমার মা এসে বললেন, এত কষ্ট পাও কেন? বউ মানুষ, রাগ করে গেছে। কয়দিন পর ঠিকই ফিরে আসবে। আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, যদি না আসে? মা বললেন, এত ভালো সংসার ছেড়ে কোথায় যাবে? আমি উত্তর দিতে পারিনি। কারণ হঠাৎ আমার মনে হলো, আমি কোনোদিন নীলাকে জিজ্ঞেসই করিনি, এই সংসারটা ওর কাছে ভালো ছিল কিনা। পরের দিন অফিসে যেতে পারিনি। সারাদিন ঘরের মধ্যে বসে ছিলাম। বিকেলে হঠাৎ মনে পড়ল, বিয়ের দ্বিতীয় বছরে নীলা বলেছিল, চল না কোথাও ঘুরে আসি। আমি বলেছিলাম, টাকা কি গাছে ধরে? সেদিন আমার ব্যাংকে যথেষ্ট টাকা ছিল। আমি শুধু যেতে চাইনি। কিন্তু ওকে বলেছিলাম, সামর্থ্য নেই।
একদিন ও বলেছিল, একটা কোর্স করতে চায়। আমি বলেছিলাম, এসব করে কী হবে? একদিন বলেছিল, একটা ছোট্ট অ্যানিভার্সারির অনুষ্ঠান করতে চায়। আমি বলেছিলাম, এই বয়সে এসব আদিখ্যেতা বাদ দাও। আমি প্রতিবার ওর ইচ্ছাকে ছোট করেছি। এত ছোট করেছি যে, একসময় ও নিজেই বিশ্বাস করে ফেলেছিল, তার ইচ্ছাগুলো সত্যিই ছোট।আমার বন্ধুরা বলত, তোর বউটা খুব ভালো। কোনো ঝামেলা করে না। আমি গর্ব করে হাসতাম। আজ বুঝি, যে মানুষ ঝামেলা করে না, তার মানে এই না যে সে সুখী। অনেক সময় মানুষ ঝামেলা করে না, কারণ সে বুঝে যায় তার কথা শুনবে এমন কেউ নেই।
নীলা চলে যাওয়ার সাতদিন পর একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলো, ওপাশে নীলার গলা। আমি প্রথমে কিছু বলতে পারিনি। শুধু বললাম, কোথায় আছো? নীলা বলল, আছি কোথাও। আমি বললাম, ফিরে আসো। অনেকক্ষণ চুপ থেকে ও বলল, কেন?এই কেন এর উত্তর আমার কাছে ছিল না। আমি বললাম, আমি তোমাকে ভালোবাসি। ও খুব শান্ত গলায় বলল, তুমি আমাকে ভালোবাসতে। কিন্তু তুমি কোনোদিন আমাকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসোনি। আমি চুপ করে ছিলাম। ও বলল, তুমি তোমার এমন স্ত্রীকে ভালোবেসেছো। যে তোমার কথা শুনবে। তোমার সংসার করবে। তোমার পছন্দমতো চলবে। তোমার রাগ সহ্য করবে। আমি বললাম, আমি বদলে যাব। ওপাশে অনেকক্ষণ কোনো শব্দ ছিল না। তারপর নীলা বলল, বদলানোর জন্য আমি পাঁচ বছর ধরে অপেক্ষা করেছি। ফোনটা কেটে গেল। তবু আমি অনেকক্ষণ ফোনটা হাতে নিয়ে বসে ছিলাম।
এখন মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি সম্ভবত এই যে, আমরা পরিবর্তন করতে শিখি তখনই, যখন পরিবর্তনের জন্য যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, তারা আর আমাদের জীবনে থাকে না। পাঁচ বছর ধরে আমি ভাবতাম, সংসার মানে একজন মানুষকে নিজের কাছে রাখা। এখন বুঝি, নিজের কাছে রাখার নাম ভালোবাসা না। ভালোবাসা সম্ভবত কাউকে এমন একটা জায়গা দেওয়া, যেখানে সে ভয় ছাড়া বাঁচতে পারে। যে মানুষটাকে আমি বারবার বলেছি, তোমার যা দরকার আমি সব দেবো, তাকে কোনোদিন জিজ্ঞেস করিনি, তোমার আসলে কী দরকার?
সেদিন রাতে আমি একা ডাইনিং টেবিলে বসেছিলাম। দুইটা প্লেট বের করলাম, অভ্যাসবশত।
তারপর একটা প্লেট আবার তুলে রাখতে গিয়েও পারলাম না। নীলার প্লেটটাতে ভাত দিলাম। মাছের সবচেয়ে বড় টুকরোটা তুলে দিলাম।
জীবনে প্রথমবার। তারপর হঠাৎ মনে হলো, নীলা যদি আজ এখানে থাকত, তাহলেও হয়তো এই মাছটা ওর প্লেটে দিতে পারতাম না।
কারণ পাঁচ বছর ধরে আমি শুধু নীলাকে কম দিইনি, আমি তাকে কম পাওয়ার অভ্যাস করিয়েছি।আমি ওর কাছ থেকে ইচ্ছেগুলো কেড়ে নিয়েছি, তারপর বলেছি, দেখো, ওর কোনো চাহিদাই নেই। আমি ওকে কথা বলতে দিইনি, তারপর বলেছি, আমার স্ত্রী খুব শান্ত। আমি ওকে নিজের মতো করে বাঁচতে দিইনি, তারপর বলেছি, দেখো, সংসারে কত সুখে আছে ও। আমি ওকে মেরেছি। তারপর রাতে ওর হাতের রান্না খেয়েছি। ওর আত্মসম্মান ভেঙেছি। তারপর মানুষের সামনে বলেছি, আমার বউটা আমাকে খুব ভালোবাসে।
সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই পাঁচ বছর আমি একবারও নিজেকে খারাপ মানুষ ভাবিনি।
প্রতিবারই আমি একটা কারণ খুঁজে নিয়েছি।
সংসারের জন্য।
শাসনের জন্য।
ভালো রাখার জন্য।
ভালোবাসার জন্য।
এখন বুঝি, মানুষের ওপর অত্যাচার করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো অত্যাচারের একটা সুন্দর নাম দিয়ে দেওয়া। আমি নীলাকে ভালোবাসার নামে বন্দি করে রেখেছিলাম। শাসনের নামে ভয় দেখিয়েছিলাম। সংসারের নামে ওর পৃথিবীটা ছোট করে দিয়েছিলাম। তারপর একদিন যখন ও সত্যিই চলে গেল, আমি বসে বসে অবাক হলাম। ভাবলাম, এত ভালো একটা সংসার ছেড়ে একটা মেয়ে যায় কীভাবে?
আজ মনে হয়, সেই প্রশ্নটা করার অধিকারও আমার ছিল না। টেবিলের ওপাশে নীলার খালি চেয়ারটা পড়ে ছিল। মাছের টুকরোটা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল। আমি অনেকক্ষণ ওটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তারপর মনে হলো, নীলা যদি কোনোদিন ফিরে এসেও বলে, আমি আরেকবার চেষ্টা করতে চাই, তবু আমি হয়তো তাকে আগের পাঁচটা বছর ফিরিয়ে দিতে পারব না। ও যে চাকরিটা করতে চেয়েছিল, সেটা আর ফিরিয়ে দিতে পারব না। যে সিনেমা দেখতে চেয়েছিল, সেই দিনের মতো করে আর দেখা হবে না। যে বিবাহ বার্ষিকী আমি আদিখ্যেতা বলে নষ্ট করেছি, সেগুলো আর ফিরে আসবে না। যে রাতে ও আমার পাশে বসে কথা বলতে চেয়েছিল, সেই রাতগুলোও আর আসবে না।
আর যেদিন আমি ওকে মেরেছিলাম, সেদিনের সেই মেয়েটাকে আমি কোনোদিন গিয়ে বলতে পারব না, তুমি কোনো ভুল করোনি।
ক্ষমা চাওয়ারও একটা সময় থাকে।
ভালোবাসা দেওয়ারও একটা সময় থাকে।
মানুষকে জিজ্ঞেস করারও একটা সময় থাকে, তুমি কী চাও?
আমি সবসময় ভেবেছি সময় আছে। মানুষটা তো আমার কাছেই আছে। আজ বুঝি, মানুষ চলে যাওয়ার দিনই হঠাৎ করে হারিয়ে যায় না।
সে অনেক আগে থেকেই একটু একটু করে চলে যেতে থাকে। কখনো একটা না বলা কথার মধ্যে। কখনো একটা চাপা দীর্ঘশ্বাসে। কখনো আচ্ছা বলে মাথা নিচু করার মধ্যে। কখনো নিজের ইচ্ছেগুলোকে নিজের হাতেই মেরে ফেলার মধ্যে। নীলা যেদিন বাড়ি ছেড়েছে, সেদিন সে শুধু একটা দরজা পেরিয়ে যায়নি। সে আমার কাছ থেকে পাঁচ বছর আগেই চলে যেতে শুরু করেছিল।আমি শুধু খেয়াল করিনি।আজ টেবিলে বসে আমার সামনে একটা প্লেট, ভাত আছে, বড় মাছ আছে। মাছের সবচেয়ে ভালো টুকরোটাও আছে। শুধু যে মানুষটার জন্য এতদিন পর প্রথমবার সেটা তুলে রেখেছি, সে নেই।
আমি মাছের টুকরোটার দিকে তাকালাম। তারপর চোখ নামিয়ে নিলাম। কারণ হঠাৎ আমার মনে হলো, পাঁচ বছর আগে যদি আমি একদিন শুধু জিজ্ঞেস করতাম, নীলা, তুমি কী খেতে চাও? তাহলে হয়তো আজ আমাকে এই খালি প্লেটের সামনে বসে জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটার উত্তর খুঁজতে হতো না। মানুষটা আমার কাছে থাকতে থাকতে, আমি কেন তাকে মানুষ বলে দেখিনি?
(সমাপ্ত)
©somewhere in net ltd.