| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আমি একটা বায়িং হাউসে চাকরি করতাম। তখন জীবনটা খুব সাধারণ ছিল। সকালবেলা অফিস, সারাদিন কাজের চাপ, সন্ধ্যায় বাসায় ফেরা। ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা ছিল না। বিয়ে নিয়ে তো আরও কম। আমার ধারণা ছিল, জীবনে যা হওয়ার তা নিজের সময়েই হবে। কাউকে খুঁজে বেড়ানোর প্রয়োজন নেই।
সেদিনও অন্য সব দিনের মতোই শুরু হয়েছিল।
আমাদের অফিসে কিছু সুতার স্যাম্পল এসেছিল। সেগুলো নিয়ে অন্য একটি কোম্পানিতে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ল। সাধারণত এসব কাজে অন্য কাউকে পাঠানো হতো, কিন্তু সেদিন কী কারণে যেন আমাকেই যেতে হলো।
আমি খুব সাধারণভাবেই গিয়েছিলাম।
ব্রাউন রঙের একটা সালোয়ার-কামিজ পরেছিলাম। কোনো বিশেষ সাজগোজ ছিল না। আমার গায়ের রং শ্যামলা, চেহারাও খুব সাধারণ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে কোনোদিন মনে হয়নি, আমাকে দেখে কেউ থমকে যাবে। বরং এতদিনে আমি নিজেকে বেশ ভালোভাবেই চিনে গিয়েছিলাম। কে আমাকে কী চোখে দেখে, কার দৃষ্টিতে কতটুকু আগ্রহ, এসব বোঝার বয়স আমার হয়ে গিয়েছিল।
সেই কারণেই মানুষটার চোখ আমাকে প্রথম দিন একটু অবাক করেছিল।
সে ছিল শ্রীলঙ্কান একজন বায়ার।
দেখতে অনেকটা আমাদের দেশের ছেলেদের মতোই। শ্যামবর্ণ গায়ের রং, শরীরে একটা উষ্ণতা, চুলের কাট, পোশাক-আশাক, সবকিছু মিলিয়ে খুব সাধারণ একজন মানুষ বলেই মনে হওয়ার কথা। অথচ তার চেহারার মধ্যে অদ্ভুত একটা মায়া ছিল।
আমি আজও ঠিক বলতে পারি না, মানুষটার মধ্যে সেই মায়া কোথা থেকে এসেছিল।
সম্ভবত মায়ের কাছ থেকে পাওয়া।
কিছু মানুষের মুখে এমন কিছু থাকে, যেটা সৌন্দর্যের সংজ্ঞায় পড়ে না। তবু তাকালে দ্বিতীয়বার তাকাতে ইচ্ছে করে। তার মুখেও তেমন কিছু ছিল।
আমি স্যাম্পলগুলো তার হাতে দিলাম। সে সেগুলো দেখছিল, কথা বলছিল, আবার মাঝেমধ্যে আমার দিকে তাকাচ্ছিল।
প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো আমার ভুল হচ্ছে। তারপর বুঝলাম, না। সে সত্যিই আমাকে দেখছে। অদ্ভুতভাবে দেখছে। মুগ্ধ হয়ে।
জীবনে এর আগে অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে। অনেক পুরুষের সঙ্গে কথা হয়েছে। কেউ হয়তো প্রশংসা করেছে, কেউ হয়তো আগ্রহ দেখিয়েছে। কিন্তু আমাকে এভাবে কেউ দেখেছে বলে আমার মনে পড়ে না।
যেন আমি কোনো সাধারণ মানুষ নই।
যেন আমার মুখের ভেতরে সে এমন কিছু দেখতে পাচ্ছে, যেটা আমি নিজেও কোনোদিন দেখতে পাইনি। কাজ শেষে সে স্যাম্পলগুলো রেখে বলেছিল, ম্যাডাম, প্রয়োজন হলে আপনাকে ফোন দেব। আমি মাথা নেড়ে চলে এসেছিলাম। সেদিনের ঘটনাটা খুব বেশি গুরুত্ব দিয়ে ভাবিনি। কিন্তু পরদিন সকালে আমার ফোনে একটি মেসেজ এলো। Good morning. আমি কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম তারপর উত্তর দিয়েছিলাম। সেখান থেকেই শুরু। প্রথমে খুব সাধারণ কথাবার্তা। কেমন আছি। অফিসে গিয়েছি কি না। খাওয়া হয়েছে কি না। আজ সারাদিন কেমন গেল।
মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ক খুব নিঃশব্দে তৈরি হয়। কোনো ঘোষণা থাকে না। কেউ বলে না, আজ থেকে আমাদের পরিচয় শুরু। অথচ একদিন হঠাৎ খেয়াল হয়, দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে একজন মানুষের মেসেজের অপেক্ষা করছি। আমাদের ক্ষেত্রেও সম্ভবত সেরকমই হয়েছিল। দিন গড়াচ্ছিল, কথা বাড়ছিল।
এক মাসের মাথায় আবার আমাদের সামনাসামনি দেখা হলো। সেদিন আমরা একসঙ্গে কফি খেয়েছিলাম। এখন ভাবলে মনে হয়, একটা কফির কাপের সঙ্গে মানুষের জীবনের কত বড় একটা গল্প জড়িয়ে যেতে পারে! সেদিন আমরা খুব সাধারণ কথাই বলেছিলাম। কাজের কথা, পরিবার, দেশ, শৈশব, পছন্দ-অপছন্দ। কিন্তু কথা শেষ হওয়ার পরও মনে হচ্ছিল, কিছু কথা বলা বাকি রয়ে গেছে। তারপর দেখা হতে থাকল। দিনগুলো ভালো কাটছিল। খুব দ্রুত নয়, খুব নাটকীয়ভাবেও নয়। বরং ধীরে ধীরে একজন মানুষ আরেকজন মানুষের জীবনের অভ্যাস হয়ে উঠছিল। একদিন সে আমাকে বলল, সে আমাকে ভালোবাসে। আমি খুব একটা অবাক হইনি। সম্ভবত তার আগেই বুঝে গিয়েছিলাম। কিন্তু ভালোবাসার কথা মুখে শুনলে মানুষের ভেতরে অন্যরকম একটা অনুভূতি হয়। যতই আগে থেকে জানা থাকুক, শব্দগুলো কানে পৌঁছানোর পর সম্পর্কের মন বদলে যায়।
তারপর একদিন সে বলল, তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না। আরেকদিন বলল, আমি তোমাকে খুব দ্রুত বিয়ে করতে চাই। আমি তখনও বিষয়টাকে এত সহজভাবে নিতে পারছিলাম না। কারণ আমাদের মাঝখানে শুধু দুজন মানুষের ভালোবাসা ছিল না। ছিল দুটি দেশ দুটি পরিবার। দুটি সংস্কৃতি। সবচেয়ে বড় কথা, দুটি ধর্ম। সে ছিল বৌদ্ধ। আমি মুসলমান।
আমি তাকে স্পষ্ট করেই বলেছিলাম, আমাদের সমাজে অন্য ধর্মের একজন ছেলেকে বিয়ে করা এত সহজ নয়। শুধু আমার চাইলেই হবে না। পরিবার আছে, আত্মীয়স্বজন আছে, সমাজ আছে। আমি হয়তো ভেবেছিলাম, এসব শুনে সে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাবে। কিন্তু সে যায়নি।
বরং একদিন সে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিল, যেটা আমাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। সে বৌদ্ধ ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করল। আমি তাকে বলেছিলাম, শুধু আমাকে পাওয়ার জন্য এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া কি ঠিক?
সে বলেছিল, আমি তোমাকে হারাতে চাই না।
মানুষ ভালোবাসার সময় কতটা আবেগ দিয়ে কথা বলে, আর বাস্তব জীবনে তার কতটা ধরে রাখতে পারে, সেটা নিয়ে আমার বরাবরই সন্দেহ ছিল। তবু মানুষটার চোখের দিকে তাকালে আমার সন্দেহগুলো দুর্বল হয়ে পড়ত। তারপর সে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের প্রস্তাব দিল।এবার শুরু হলো আসল যুদ্ধ। আমার পরিবার রাজি নয়। তাদের দোষও আমি দিতে পারি না। বাংলাদেশি একটা মেয়েকে শ্রীলঙ্কার একজন ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া, বিষয়টা তাদের কাছে সহজ ছিল না। দূরের দেশ, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন পারিবারিক পরিবেশ। মানুষটা ভালো কি না, সেটা জানার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সে আমাদের দেশের মানুষ নয়। পরিবারের সবাই আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করল। আমি নিজেও দ্বিধায় পড়ে গেলাম। ভালোবাসা আর পরিবার, এই দুটির মাঝখানে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব কঠিন। শেষ পর্যন্ত আমি তাকে না করে দিলাম। বললাম, পরিবার রাজি হচ্ছে না, আমি পারব না।
ভেবেছিলাম, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে। মানুষ কষ্ট পায়, তারপর ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যায়। কিন্তু সে অভ্যস্ত হতে পারেনি।
একদিন সে তার মোবাইল, ওয়ালেট, ঘড়ি আমার কাছে দিয়ে চলে গেল। বলল, সে আর বাঁচতে চায় না। রেললাইনে গিয়ে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছিল। প্রথমবার আমি ভেবেছিলাম, হয়তো আবেগের মাথায় করেছে। তারপর আবার,একদিন নয়, দুইদিন নয়। অসংখ্যবার।
প্রতিবারই আমি আতঙ্কে থাকতাম। মানুষকে ভালোবাসার চেয়েও ভয়ংকর একটা অনুভূতি আছে, সেটা হলো প্রিয় মানুষটিকে হারিয়ে ফেলার ভয়।
আমি তখন বুঝতে শুরু করলাম, সিদ্ধান্তটা শুধু আমার একার নয়। আমার সিদ্ধান্তের সঙ্গে আরেকটা মানুষের জীবনও জড়িয়ে গেছে। তবু আজ এত বছর পর দাঁড়িয়ে আমি একটা কথা বলতে পারি, কাউকে আত্মহত্যার ভয় দেখিয়ে ভালোবাসা আদায় করা কখনোই ভালোবাসার সুন্দর প্রকাশ নয়। তখন হয়তো আমরা দুজনেই খুব আবেগী ছিলাম। খুব অল্প বুঝতাম জীবন সম্পর্কে। ভালোবাসার কাছে জীবনকে ছোট করে দেখতাম। শেষ পর্যন্ত অনেক ঝড়ঝাপটার পর পরিবার রাজি হলো। আমাদের বিয়ে হলো। পরিবারের উপস্থিতিতেই। সেদিন হয়তো সবাই পুরোপুরি নিশ্চিন্ত ছিল না। কেউ কেউ ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দেহ করেছিল। কেউ মনে মনে ভেবেছিল, এই সম্পর্ক বেশিদিন টিকবে না।
কারণ মানুষের অভ্যাসই হলো অন্যের জীবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা। কিন্তু জীবন মাঝে মাঝে সব হিসাব ভুল প্রমাণ করে দেয়।
আজ আমাদের সংসারের বয়স বাইশ বছর।
একটা সম্পর্কের জন্য সংখ্যাটা খুব ছোট নয়। এই দীর্ঘ সময়ে কত ঝগড়া হয়েছে, কত অভিমান হয়েছে, কতবার মনে হয়েছে আর পারব না, কতবার আবার একে অপরের দিকে তাকিয়ে সব ভুলে গেছি, সেসবের হিসাব নেই। ভালোবাসা আসলে সারাজীবন একই রকম থাকে না।
প্রথমদিকে যে ভালোবাসায় প্রতিদিন “গুড মর্নিং” মেসেজের অপেক্ষা থাকে, পরে সেই ভালোবাসা বদলে যায়। সেখানে থাকে দায়িত্ব।
অভ্যাস। অসুস্থতার সময় পাশে বসে থাকা। ঝগড়ার পরেও খাবার তুলে দেওয়া। রাগ করে কথা না বললেও রাতে একই ঘরে ঘুমিয়ে পড়া।
ভালোবাসা সম্ভবত এভাবেই বড় হয়।
আমাদের একটি মেয়ে আছে। আজ সে শুধু আমাদের মেয়ে নয়, সে আমাদের গর্ব। খেলাধুলায় সে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। মাঝেমধ্যে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আমি ভাবি, মানুষের জীবনের কোনো গল্পই শুরুতে বোঝা যায় না শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। সেদিন যদি আমাকে সুতার স্যাম্পল নিয়ে ওই কোম্পানিতে যেতে না হতো? সেদিন যদি সে আমাকে দ্বিতীয়বার না তাকাত? পরদিন যদি সেই Good morning মেসেজটা না দিত? আমি যদি উত্তর না দিতাম? যদি এক মাস পর আমরা কফি খেতে না বসতাম? যদি সে আমাকে ভালোবাসার কথা না বলত? যদি পরিবার প্রথমবারেই রাজি হয়ে যেত, তাহলে হয়তো গল্পটা এত দীর্ঘ হতো না। আবার, যদি শেষ পর্যন্ত আমি রাজি না হতাম? তাহলে আজকের এই বাইশ বছরের সংসার থাকত না। আমাদের মেয়েটার জন্মই হতো না। তার বিশ্বজয়ের গল্পটাও থাকতো না।
জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলো কখনো কখনো খুব ছোট একটা মুহূর্ত থেকে শুরু হয়। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় গল্পটাও শুরু হয়েছিল একদিন, অফিসের কাজের জন্য হাতে কয়েকটা সুতার স্যাম্পল নিয়ে অন্য একটি কোম্পানিতে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। আমি সেদিন জানতাম না, একজন অপরিচিত মানুষ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আর আমি আরও জানতাম না, সেই তাকিয়ে থাকাটাই একদিন আমার জীবনের বাইশ বছরের দীর্ঘ একটি অধ্যায়ের শুরু হয়ে যাবে। এখন এত বছর পর সেই প্রথম দিনের কথা মনে হলে আমার হাসি পায়। ভাবি, মানুষকে সত্যিই কি প্রথম দেখাতেই চেনা যায়? সম্ভবত যায় না। তবে কোনো কোনো মানুষকে প্রথম দেখাতেই মনে হয়, এ মানুষটার সঙ্গে আমার জীবনের কোনো একটা গল্প লেখা আছে।
সেদিন আমি সেটা বুঝিনি।
এখন বুঝি।
কিছু মানুষ অনেক আগে থেকেই আমাদের জীবনের কোনো অদৃশ্য পাতায় লেখা থাকে। আমরা শুধু একদিন হঠাৎ গিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করি।
( সমাপ্ত )
২|
০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৪১
মোস্তফা সোহেল বলেছেন: গল্প ভাল লেগেছে্।
০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৪২
সামিয়া বলেছেন: ধন্যবাদ সোহেল , অনেকদিন পর দেখলাম,
৩|
০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:০৭
আলামিন১০৪ বলেছেন: অনেক সুন্দর লিখা- আপনার জীবনের কোন ঘটনা?
তিনি এখন কোথায় থাকেন? শ্রীলঙ্কা নাকি বাংলাদেশ?
০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১১
সামিয়া বলেছেন: এটা একটা আপুর মুখ থেকে শোনা তার জীবনের ঘটনা, তারা বাংলাদেশের সেটেল হয়েছে সুন্দর সংসার তাদের।
০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৩
সামিয়া বলেছেন: নিজের এরকম ইন্টারেস্টিং ঘটনা হলে তো ঢাকঢোল পিটিয়ে সবাইকে জানান দিতাম প্রত্যেক বছর
৪|
০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৮
সৈয়দ মোজাদ্দাদ আল হাসানাত বলেছেন: জীবনটা বড়ই অদ্ভুৎ। জীবনে আমরা কে কখন কি করবো তার নিয়ন্ত্রন আমাদের হাতে নাই।
©somewhere in net ltd.
১|
০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:২২
সামিয়া বলেছেন: বিঃ দ্রঃ গল্পটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা,