| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সাখাওয়াত হোসেন বাবন
আমার পরিচয় একজন ব্লগার, আমি সাহসী, আমি নির্ভীক, আমি আপোষহীন । যা বিশ্বাস করি তাই লিখি তাই বলি ।
হাত ঘড়িতে রাত বারোটা বাজতে ১৫ মিনিট বাকি৷ আমি দাঁড়িয়ে আছি মতিঝিলে'র ২৭ তলা আইসিটি ভবনের ছাদের কার্নিশে।
ঠিক বারোটা বাজলে লাফ দিয়ে পড়বো নিচে৷ জীবনের রঙ্গ হয়ে যাবে সাঙ্গ।
এখনো ১৫ মিনিট সময় আছে হাতে ৷ কাল আমার জন্মদিন। মৃত্যুর জন্যও তাই এই দিনটাকেই বেছে নিয়েছি৷ যেদিনে জন্মা সে দিনে মৃত্যু। রেয়ার একটা বিষয় হবে।
আমি জানি আমার মৃত্যুতে পৃথিবীর কারো কিছু যাবে আসবে না। কারো মৃত্যুতেই অবশ্য কারো কিছু যায় আসে না। এটাই জগতের নিয়ম। বন্ধুবান্ধব আত্মীয় স্বজন তেমন কেউ নেই আমার৷ সহপাঠীরা হয়তো দু'চারদিন আফসোস করবে, স্মরণ করবে, তারপর যথারীতি সবাই ভুলে যাবে৷ তবে মার জন্য খুব খারাপ লাগছে। মায়ের কথা ভেবে হলেও আমার আত্মহত্যা করা উচিত নয়। কিন্তু আমি নিরুপমা।
মাথার উপর তারকাখচিত বিস্তীর্ণ আকাশ। পায়ের নিচে লাল, নীল বাতির আলোর চাদরে মোড়ানো রাতের শহর ঘুমে নিমগ্ন হয়ে আছে। দেখতে খুব ভালো লাগছে৷
আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি,সেখান থেকে শহরের বহুদূর পর্যন্ত দেখা যায়। দু'চোখ ভরে দেখে নিচ্ছি সব। কে জানে এসব হয়তো আর দেখতে পাবো না কোনদিন৷
মৃত্যুর আগে নাকি মানুষের নানা রকম অনুভূতি হয়। আমার কিন্তু সে রকম কিছুই হচ্ছে না। অন্য দিনগুলোর মতোই সবকিছু স্বাভাবিক লাগছে।
তবে বিরানি খেতে ইচ্ছে করছে খুব। নীলা আমাকে একবার পুরানো ঢাকার একটা দোকানে বিরানি খেতে নিয়ে গিয়েছিলো। অসাধারণ স্বাদ ছিল সেই বিরানির।
একটু একটু ক্ষুধাও পেয়েছে। এই মুহূর্তে সেই দোকানে গিয়ে গরম গরম বিরানি খেয়ে আসতে ইচ্ছে করছে। মৃত্যুর কর্মসূচি পরিবর্তন করলে কেমন হয়? বিরানি খেয়ে এসে ভরা পেটে না আত্মহত্যা করি। না, সেটা করা যাবে না।
বুঝতে পারছি না, বিরানি খাওয়ার ইচ্ছেটা হঠাৎ এমন তীব্র হচ্ছে কেন? এটাই কি তবে, মৃত্যুর লক্ষণ?
অনেক ঝক্কিঝামেলা করে বিল্ডিং এর সিকিউরিটি গার্ডকে নগদ দুশো টাকা ঘুষ দিয়ে উঁচু থেকে রাতের আকাশের ছবি তুলবো এই মিথ্যে কথা বলে তবেই ছাদে উঠতে পেরেছি।
সামান্য বিরানির লোভে নেমে গেলে আর উঠতে দেবে বলে মনে হয় না। তাই বিরানির চিন্তাটা মাথা থেকে বের করে দিলাম।
নিচের জনশূন্য রাস্তাগুলো নীরব,নিথর হয়ে আছে। দু একজন পথচারী ব্যাগ হাতে হেটে হেটে বাড়ি ফিরছে। বাস, প্রাইভেট কার, জিএনজির চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এখানে ওখানে দু একটা রিকশা দাঁড়িয়ে আছে।
দূরে ফ্লাই ওভারের উপর দিয়ে খুব দ্রুত গাড়ি আসছে যাচ্ছে৷
কনে কনে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে৷ দু হাতে শক্ত করে বাউন্ডারি দেয়াল ধরে সামনের দিকে ঝুঁকে লাফ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এখান থেকে লাফ দিলে কত দূরে গিয়ে পড়বো সে ধারনা নেই আমার। সরাসরি নিচে না পড়ে বাতাসের ধাক্কায় হয়তো কিছুটা দূরে গিয়ে পড়বো। দিনের বেলা একবার রেকি করে দেখেছি, সরাসরি নিচে গিয়ে পড়লে, পড়বো গাড়ির গ্যারাজের টিনের চালের উপর। কয়েক বছর আগে এখান থেকেই এক ব্যাংক কর্মকর্তা সাংসারিক নানা ঝামেলায় জড়িয়ে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলো।
আমার অবশ্য সেরকম কোন ঝামেলা নেই। আমার ঝামেলা অন্য খানে। জগতে ঝামেলা ছাড়া যেমন কিছু হয় না। তেমনি ঝামেলা ছাড়া কেউ আত্ম হত্যাও করে না।
কয়েক মাস যাবত এক দুরারোগ্য জেনিটিক সমস্যায় আক্রান্ত আমি।
এমন জেনেটিক সমস্যা একশো কোটিতেও একজনেরও হয় না। পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা সাতশো কোটি হলে সাতজন লোকও পাওয়া যাবে না যারা আমার মতো এমন জেনেটিক সমস্যায় ভুগছে।
চিকিৎসকেরা প্রথমে ভেবেছিলো, হাইপারট্রাইকোসিসের সমস্যা। এমন দাঁত ভাঙ্গা শব্দ জীবনে কোনদিন শুনিনি। পরে জেনেছি, এটি একটি জেনেটিক সমস্যা। এর কারণে শরীরের বিভিন্ন অংশ যেমন মুখ, পিঠ, হাত, বা পায়ে অস্বাভাবিক ভাবে চুল গজায়। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ অনেকটা বন মানুষের মতো দেখায়। পিজির বাঘা বাঘা চিকিৎসকেরা বোর্ড বসিয়ে দু'দুবার আমার পিঠে অপারেশন করেছে। কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়নি। উলটো যন্ত্রণা আরও বেড়েছে৷ পাখির ডানার মতো দুটো ডানা বের হয়ে এসেছে মেরুদণ্ডের দু পাশ দিয়ে৷
চিকিৎসা বিজ্ঞানে এ অসুখের কোন নাম নেই, কোন ব্যাখ্যা নেই,কোন চিকিৎসা নেই। পৃথিবীতে আমি ই একমাত্র ব্যক্তি যে কিনা এমন এক রোগে আক্রান্ত হয়েছি। যতদিন বেচে থাকবো ততদিন লোক চক্ষুর আড়ালে এভাবেই বেচে থাকতে হবে৷ তাই মৃত্যুই একমাত্র পথ।
জীবন শুরু করার আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে এ নিয়ে দু:খ থাকলেও তীব্র যন্ত্রণা, লোক লজ্জা আর ঘেন্না থেকে মুক্তির আশায় উদগ্রীব হয়ে আছি আমি। একটু পরেই সব শেষ হয়ে যাবে৷
হাত ঘড়ির দিকে তাকালাম। বারোটা বাজতে এখনো পাঁচ মিনিট বাকি। প্রস্তুতি নেওয়া দরকার৷ শক্ত করে দাঁড়িয়ে শরীর থেকে টি সার্ট খুলে ফেললাম। তারপর পিট বুকের মাঝামাঝি আড়া আড়ি শক্ত করে প্যাচিয়ে রাখা সুতির কাপড়টা খুলে ফেলে দিলাম নিচে। কাপড়টা খুলে ফেলায় পিঠে প্যাচিয়ে থাকা পাখা দুটো দুপাশে খুলে গেলো। রক্ত সঞ্চালন বেড়ে যাওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে শিরশির এক অনুভূতিতে পুরো শরীর কুচকে গেলো। হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলে এমন ই হয়।
হাওয়ায় ভেসে ভেসে কাপড়টা নিচের একটা ছাদের রেলিং গিয়ে পড়লো। সঙ্গে সঙ্গে একটা লোক ছাদের ফ্লাট থেকে বের হয়ে এসে কাপড়টা হাতে নিয়ে প্রথমে সেটা উল্টেপাল্টে দেখলো৷ তারপর কোথা থেকে সেটা এসে পড়ল তা দেখার জন্য মাথা তুলে উপড়ের তাকাল। এতো নিচ থেকে আমাকে তার দেখতে পাওয়ার কথা নয়। তারপরেও একটু পিছিয়ে উকি দিয়ে রইলাম। আমি কিন্তু তাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আর মনে মনে ভাবছি লাফ দেওয়ার পর আমার দেহটাও কি ওই ছাদে গিয়ে পড়বে? না, অতদূরে যাবার সম্ভাবনা নেই।
এরিমধ্যে আর একজন লোক এসে দাঁড়ালো লোকটার পাশে৷ তাকে হাতের কাপড়টা দেখিয়ে কিছু একটা বলার পর দুজনই তাকাল উপরের দিকে। আশে পাশে এ ব্লিডিংটাই সবচেয়ে উঁচু। তাই সহজেই সবার চোখ যায় এ বিল্ডিং দিকে। তারপরেও আমি বেশ সর্তক বইলাম৷
আগের চেয়ে দৃষ্টি শক্তি প্রখর হয়েছে আমার। অনেক দূরের জিনিষও এখন বেশ পরিষ্কার ও স্পষ্ট দেখিতে পাই। দৃষ্টি শক্তির সাথে সাথে শ্রবণ শক্তিও অনেকগুণ বেড়ে গেছে। চাইলে দূরে দাড়িয়েও আমি মানুষে হৃদস্পদন পর্যন্ত শুনতে পারি। এ জন্য অবশ্য মনের উপর প্রচণ্ড চাপ ফেলতে হয়। এ কথা নীলাকে ছাড়া অন্য কাউকে বলিনি। কথাটা শুনে নীলা হেসেই উড়িয়ে দেবার পর এ নিয়ে আর কোন কথা বলিনি।
চিকিৎসকেরা একে প্রকৃতির খেয়াল বললেও এতে আমি মোটেও অবাক হয়নি। ইতিমধ্যে নিজের যা করনীয় ঠিক করে নিয়েছি। ঈশ্বর তার বিচিত্র সব খেয়ালের পূরণ করতে আমাকে গিনিপিগ হিসাবে বেছে নিয়েছেন। যথেষ্ট হয়েছে আর না৷ ঈশ্বর তার কাজ করুক আমি আমার কাজ করি।
ঠাণ্ডা কন কন হাওয়া খুব জোড়ে বইতে শুরু করেছে। আকাশে মেঘের ঘনঘটা বেড়েছে। পিঠের পাখা দু'টোকে নাড়িয়ে লাফ দেওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। বাতাসের প্রতিকূলে দাড়াতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। এখান থেকে লাফ ঠিক হবে না। তাই দেয়াল টপকে ছাদ পাড় হয়ে অন্য পাশের কার্নিশে গিয়ে দাঁড়ালাম। হ্যাঁ এই জায়গাটা ঠিক আছে। পেছন থেকে বাতাস আসায় দাড়াতে একটু কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু লাফ দিতে অসুবিধা নাই। লাফ দিলেই অনেক দূরে দিয়ে পড়বো।
মনে মনে ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চেয়ে জীবনের শেষ প্রার্থনাটা সেরে নিলাম। চারপাশে চোখ বুলিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তারপর কার্নিশের একেবারে কিনারায় গুড় মুড়া রেখে দু হাত দুপাশে পাখির মতো মেলে দিয়ে বাড়ালাম। টিভিতে দেখেছি, যারা বিমান থেকে লাফ দেয় তারা হাত দুটোকে এভাবে করে রাখে। তাতে নাকি কিসব সুবিধা পাওয়া যায়। কথাটা মনে হতেই হাসি পেলো, আমি তো মরতেই চাই, সুবিধা দিয়ে আমার কি হবে?
পেছন থেকে আসা বাতাসের তোড় বেড়েছে৷ এখন দাড়াতে বেশ অসুবিধা হচ্ছে। একটু এদিক সেদিক হলেই লাফ দেওয়ার আগেই সোজা নিচে পরে যাবো। তীব্র উত্তেজনায় বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা হাপরের মতো লাফাচ্ছে ৷ বাতাসের শো শো শব্দ ছাপিয়ে নিজের হার্টবিট শুনতে পাচ্ছি।
জীবনের শেষ দীর্ঘশ্বাসটা ফেলে চোখ বন্ধ করে পানিতে লাফিয়ে পড়ার মতো মহাকালের অসীম শূন্যতায় নিজেকে সমাপন করার উদ্দেশ্যে ঝাপিয়ে পড়লাম।
প্রথমে কয়েক সেকেন্ড কিছু বুঝতে পারলাম না৷। তীক্ষ্ণ ঠান্ডা একটা অনুভুতি মুহুর্তে জাপ্টে ধরলো আমায়। তারপরেই তীব্র এক টানে দেহটা সোজা নিচে নেমে গিয়ে একটু যেনো থেমে গিয়ে কয়েকবার ওলটপালট খেলো। তারপর আবারো সোজা নিচের দিকে নামতে লাগলো। প্রচন্ড আতংক নিয়ে হাত পা ছুড়ে গতি রোধ করতে চাইলাম কিন্তু পারলাম না ৷ চরকির মতো ঘুরতে ঘুরতে চোখের সামনে সবকিছু ঘোলাটে হয়ে গেলো। কিছুই দেখত পাচ্ছি না। প্রচন্ড এক আঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিলাম ।
কয়েক মুর্হুত কিছুই ঘটলো না । কিন্তু তারপরেই ঘটলো অদ্ভুত এক ঘটনা। আমার পিঠের সেই বিশ্রী পাখা দুটো দু পাশে ছড়িয়ে গিয়ে দেহটাকে শূন্যের মাঝে একেবারে স্থির করে ফেললো। এ কি, এ কি করে সম্ভব। নিচে না পড়ে গিয়ে স্থির হয়ে গেলাম কেন? হায় খোদা! আমি বুঝি স্বপ্ন দেখছি। পায়ের নিচে রাস্তাঘাট, দালান কোঠা সব সব পরিস্কার দেখতে পাচ্ছি ৷ আর কিছুটা নেমে গেলেই আচড়ে পড়তাম। কিন্তু একেবারে শেষ মুহুর্তে যেনো অদৃশ্য কারো ইশারায় স্বকীয় হয়ে উঠেছে পিঠের পাখা দুটো।
এভাবে কয়েক সেকেন্ড কেটে গেলো। তারপর কিছু বুঝে উঠার আগেই দেহটা বার কয়েক পাক খেয়ে বাতাসের তীব্র ধাক্কায় পাখির মতো উঠে গেলো কয়েক শত ফুট উপড়ে। পরম ভয়, বিস্ময় ও আতংকে আমি স্থির হয়ে রইলাম।
চলবে ...........
প্রিয় পাঠক, পটভূমি (Background)
উপন্যাসের সময়কাল —
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পরবর্তী সময় যুদ্ধশেষে বিধ্বস্ত দেশ অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, মূল্যবোধের ভাঙন এই বাস্তবতার মধ্যে মানুষ নতুন করে জীবন গড়তে চায়, কিন্তু — যুদ্ধের ক্ষত রয়ে গেছে শহীদ পরিবার, যুদ্ধাহত মানুষ, বাস্তুচ্যুত নাগরিক ; আদর্শ বনাম বাস্তবতার দ্বন্দ্ব এই দ্বন্দ্বই প্রথম পর্বের মূল আবহ। " বিহঙ্গ একটি ভিন্ন প্রকৃতির উপন্যাস। ২য় পর্ব থেকে স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাস উঠে আসবে । ভালো লাগলে মন্তব্য করে জানাতে ভুলবেন না৷"
©somewhere in net ltd.
১|
০৭ ই জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৪
রাজীব নুর বলেছেন: পড়লাম।
ভালো লেগেছে।