| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সাখাওয়াত হোসেন বাবন
আমার পরিচয় একজন ব্লগার, আমি সাহসী, আমি নির্ভীক, আমি আপোষহীন । যা বিশ্বাস করি তাই লিখি তাই বলি ।

রাত প্রায় দুটো বাজে । রতন মাস্টার ঘুমাতে পারছেন না । বারান্দায় পায়চারি করছেন । হাতে দৈনিক বাংলা নামের গত কালকের দৈনিক পত্রিকা । ইতিমধ্যে সেটা কয়েক বার পড়া হয়ে গিয়েছে । তারপরেও অভ্যাস বসত হাতে নিয়ে হাটছেন । দু'দু বার ঘুমাবার জন্য বিছানায় গিয়ে কিছুক্ষণ ঘুমাবার চেষ্টা করে কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে আবার বারান্দায় এসে পা চারি করছেন ।
বাড়ির সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে । বাড়ি বলতে তো মাত্র দু'টো ঘর আর এক চিলতে বারান্দা সমেত রান্না ঘর। বাড়ির সীমানা প্রাচীর ঘেষা সামনের অনেকটা অংশ ফাঁকা পড়ে আছে । টাকার অভাবে ঘর তোলা হয়নি । বউ মা ওখানে শাক'টা, মুলাটা চাষ করে । ছোট ছেলেকে বিয়ে করালে নতুন ঘর লাগবে । যে জন্য কিছু টাকাও জমানো আছে । তার স্ত্রী শাহানা ই জমিয়ে রেখেছিলো। সে টাকায় রতন বাবু আজো হাত দেননি ।
স্ত্রী কথা মনে হতেই বুক চিড়ে একটা দীর্ঘ শ্বাস বের হয়ে এলো । রতন মাস্টার ক্লান্ত চোখে তাকালেন রাতের আকাশের দিকে । এতোগুলো বছর পার করে এসে আজ নিজেকে খুব একাকি ও দূর্বল লাগছে । বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের মনোবলও বুঝি কমে যায় ।
এতবড় একটা যুদ্ধ গেলো । জীবন হাতে নিয়ে ছুটে বেড়িয়েছেন দেশের এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত । তখনো নিজেকে এতোটা অসহায় মনে হয়নি । আজ যেমনটি লাগছে । সবকিছু যেনো খুব দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে ।
সারা জীবন অভাব অনটনের সঙ্গে আপোষ করে জীবন কেটেছে । দু'দুটো ছেলে রেখে বলা নাই, কওয়া নাই, হুট করে একদিন বউটা মরে গেলো ।
মা হারা সন্তান দু'টোকে মানুষ করতে করতে পুরোটা জীবন কেটে গেলো । ছেলেদের মুখের দিকে তাকিয়ে নতুন করে বিয়ে থা করে সংসার করতে ইচ্ছে জাগেনি ।
মাস্টারি আর জমি থেকে যা আয় হয়েছে তাতেই তিনজনের সংসার চলে গেছে । বড় ছেলে লায়েক হবার পর বিয়ে করিয়ে যখন একটু থেতু হয়েছেন । তখনি আবার নতুন করে শুরু হয়েছে আরেক যন্ত্রনা ।
শেখ মুজিব পাকিস্তান থেকে লন্ডন হয়ে দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রীর পদে বসলেও দেশ সামলাতে পারছেন না । হুরহুর করে দ্রব্যমূল্য বেড়ে চলেছে। চারিদিকে অভাব, অনটন খুন,জখম লেগেই আছে । স্বাধীনতার সকল অর্জন মাঠে মারা যেতে বসেছে ৷ মুক্তিযোদ্ধারা নানা দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে । আমলারা আওয়ামীলীগের নেতাদের সাথে মিলে হরিলুট চালাচ্ছে । চারদিক থেকে বিপদ এসে যেনো সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশটার গলা চেপে ধরেছে ।
তার হাতের দৈনিক'টাতেও বড় বড় করে লেখা হয়েছে ,"দিন দুপুরে রমনা পার্কে ব্যবসায়ী খুন ।" তারপরেই ছোট করে সংবাদটি ছাপা হয়েছে, "সকালে রমনা পার্কে হাটতে এসে খুন হলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি জগলুল আলম। মৃত্যুর পর নিথর দেহে দীর্ঘক্ষণ পরে ছিলো পার্কের ওয়াকওয়েতে । দিনের আলোয় কিভাবে এমন একটি হত্যাকান্ড সংঘঠিত হলো সে ব্যাপারে নড়েচড়ে বসেছে মুজিব সরকার। মুজির সরকারের অনেক মন্ত্রী, আমলাদের সাথে শিল্পপতি জগলুল আলম সাহেবের ব্যবসায়ীক সর্ম্পক ছিলো বলে জানা গেছে। খুনিরা এখনো ধরা ছোয়ার বাইরে । তবে পুলিশের একটি দল মনে করছে, এটি বাম পন্থীদের কাজ । তবে মুজিব বাহিনীর ধারনা এটি সন্ত্রাসী মাও বাদীদের কাজ ।
শেখ মুজিব নিজে হত্যাকান্ডের তদন্তের ভার তুলে দিয়েছেন , বাকশালের একটি অংশের হাতে । খুব শীঘ্রই হয়তো খুনের কারণ জানা যাবে । অন্য একটি সূত্র বলছে,শেখ মুজিব খুনিদের ধরার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ২৪ ঘন্টা সময় বেধে দিয়েছেন।"
রতন বাবু এইসব খুন খারাবি সংবাদ শুনে অস্থির হয়ে পড়ছেন । তিনি ভেবে পান না দিন দুপুরে একটা মানুষ খুন হয় কি করে ? দেশ থেকে কি আইন শৃঙ্খলা একেবারে উঠে গেছে ? পাকিস্তান আমলেও তো এমন ছিলো না । তাহলে দেশ স্বাধীন করে লাভটা কি হলো । নিজেরাই যদি কামড়া কামড়ি করে মারা যাবি তাহলে স্বাধীনতার কি দরকার ছিলো ।
নানান এলোমেলে ভাবনার চাপে ভেতরটা তার সবসময় অস্থির অস্থির লাগে ।
তার উপর বদের হাড্ডি ছোট ছেলেটা তাকে জ্বালিয়ে মারলো । রাত দুটো পেড়িয়ে গেছে; অথচ এখনো হারামজাদা বাড়ি ফিরেনি । কাজ নাই, কর্ম নাই সারাদিন টো, টো করে ঘুরে বেড়ানো ছাড়া আর যেনো কিছুই করার নেই ।
ইদানিং আবার রাজনৈতির ভূত মাথায় চেপেছে । সেদিন রান্না ঘরে বউ মার সাথে রাজনীতি নিয়ে কি সব আলোচনা করছিলো । দেবর বউদির সে আলাপ রতন বাবু আড়াল থেকে শুনেছেন। তারপর থেকেই ভেতরে এ অস্থিরতা বাসা বেঁধেছে।
দিনকাল ভালো না । প্রতিদিনই কোথাও না, কোথাও বোমা ফুটছে ,মানুষ মরছে। বলা তো যায় না কখন কি হয়ে যায় । একটু সাবধানে থাকা দরকার।
এই তো সেদিন পুলিশ একদল বাম পন্থী ছাত্রকে পিটিয়ে আধমরা করে জেলে পুরে দিলো । কেউ এর কোন প্রতিবাদটুকু পর্যন্ত করলো না । যাকে ইচ্ছে মারছে, যাকে ইচ্ছে ধরছে জেলে পুড়ছে৷ রাজাকার,আলবদর আখ্যা দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলছে।
রতন বাবুর ধারনা তার ছোট ছেলে বাম দলে যোগ দিয়েছে । সিরাজ সিকদার নামের এক লোক এ পলের পান্ডা ।
হিম্মত আছে লোকটার। মুজিব'কে ও ছেড়ে কথা বলে না । বর্তমানে মুজিব যদি কাউকে ভয় করে থাকে, একমাত্র এই সিরাজ সিকদারকেই ভয় করে।
মুজিব সিরাজ সিকদারকে নত করার জন্য অনেক টোপ দেওয়া হয়েছে । কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি । যুদ্ধ শেষ হলেও সে একাই এখন ভারত ও পশ্চিমা আধ্যিপত্তবাদের বিরুদ্ধে আরেক যুদ্ধে শুরু করেছে ।
শোনা যায় চীন নাকি অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে বাম দলীকে সহায়তা করছে । এদিকে মাও বাদীরাও এখানে ওখানে চোরাগুপ্তা হামলা করছে৷ থানায় হামলা করে অস্ত্র কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে৷
চীন,রাশিয়া, ভারত এই তিন রাস্ট্রের চাপে মারা যাচ্ছে নিরিহ ছাত্র,জনতা।
সিরাজ সিকদারকে রতন বাবু একবার নিজ চোখে খুব কাজ থেকে দেখেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের আগে তার স্কুলে এসেছিলো লোকটা ছাত্রদের নিয়ে কি একটা সন্মেলন করতে ।
রোগাটে একহারা ছিপছিপে শরীর । লম্বায় প্রায় ছ ফুট। শ্যাম বর্ণ লম্বাটে মুখশ্রী আত্মবিশ্বাসে ভরপুর দুটো চোখ । মাথা ভর্তি ঘন কালো চুল নেমে এসেছে ঘার পর্যন্ত৷ দেখতে পোড় খাওয়া ফিল্মস্টারদের মতো লাগে৷
তবে কি অমায়িক কথা বার্তা ৷ যে লোকটার এতো নাম শুনেছেন তাকে সামনা সামনি দেখে খুব সাধারণ মনে হয়েছে রতন বাবুর কাছে।
শিক্ষিত মানুষ, অনর্গল ইংরেজি বলেন৷ কঠিন কঠিন সব কথাবার্তাও এতো সহজ ভাবে বলেন যে শুনলেই মনে সাহস জাগে।
রতন বাবুর ধারনা তার ছেলে এই সিরাজ সিকদারের দলে যোগ দিয়েছে । পাছে তার ধারনা সত্য হয়ে যায় সেই ভয়ে তিনি ছেলেকে এ কথা কখনো জিজ্ঞাসা করার সাহস পাননি । অনেক বার প্রশ্নটা তার গলা পর্যন্ত এসেও আটকে গেছে ।
এ জন্য অবশ্য তিনি নিজেও অনেকটা দায়ী। স্কুলে সিরাজ সিকদারকে দেখে, তার বক্তিতা শুনে তিনি নিজেই লোকটার একনিষ্ঠ ভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। বহুবার তিনি সে গল্প তিনি ছেলেদের সাথে করেছেন । ছেলেটা হয়তো তার সেই গল্প শুনতে শুনতেই তার ভক্ত হয়ে পড়েছে।
পড়বেই বা না কেন? লোকটা কেমন আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথা বলে। পশ্চিম পাকিস্তানের জুলুম, নির্যাতন, অন্যায় অত্যাচার এর বিরুদ্ধে, সে যা যা বলেছে তা অন্তর থেকেই বলেছে ।
তার বক্তিতা শুনে তার নিজের ই প্রতিবাদী হয়ে উঠতে ইচ্ছে করে । শুধু কি তাই, পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ এই সিরাজ সিকদার ই প্রথম শুরু করেছিলো ।
সাইফুল্লাহ আজমী নামের এক বিহারী মুসলিমকে দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকে বানিয়ে পাকিস্তানিদের মুখের উপর টানিয়ে দিয়েছিলেন সে পতাকা ।
স্বাধীনতার পর মুজিবের বিরুদ্ধে তার সরাসরি অবস্থান মুজিব সরকারের ভীত নড়িয়ে দিয়েছে । শেখ মুজিব বুঝে গেছেন সিরাজ সিকদারকে থামাতে না পারলে দেশ শাসন করা তার পক্ষে সহজ হবে না।
সেনাবাহিনী কিংবা পুলিশের উপর তার পুরোপুরি আস্থা নেই । তাই ভারতীয় বাহিনীর সহায়তায় নিজের নিরাপত্তার জন্য বাকশাল নামে আর এক প্যারা মিলিটারি বাহানী তৈরি করেছেন।
আগে থেকে আছে মুজিব বাহিনী। এই দুই বাহনীর অত্যাচারে দেশে টেকা দায় হয়ে পড়েছে ৷ এরা মুজিব ছাড়া অন্য কাউকে মানে না। যা ইচ্ছে তাই করে বেড়াচ্ছে ।শেখ মুজিব এসব দেখেও যেম্লনো না দেখার ভান করে আছেন।
রতন বাবুও মনে মনে চান সিরাজ শিকদারের বাহিনীর সাথে এই দুই বাহিনীর একবার দেখা হয়ে যাক। সিরাজ বাহিনী শায়েস্তা করুক এ দুই বাহিনীকে। বড্ড বাড় বেড়েছে ব্যাটাদের ।
এমন সময় হঠাৎ দরজায় শব্দ হতে রতন বাবুর ভাবনার তার কেটে যায় । তিনি চমকে উঠে দরজার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করেন , "কে; খোকা এলি ?"
রং চং উঠে যাওয়া কাঠের পাল্লার দরজা আস্তে আস্তে খুলে গেলো । ভেতরে প্রবেশ করে চব্বিশ পচিশ বয়সের এক যুবক। পড়নে তার জিন্সের প্যান্ট, নীল রঙ্গের জামা। মাথায় লম্ব চুল। কাধে ঝুলছে চটের ব্যাগ।
বাড়ির ভেতর ঢুকে যুবকটি বারান্দায় রতন বাবুকে বসে থাকতে দেখে বলে উঠে , "কে বাবা? এখনো ঘুমাওনি কেন ? রাত তো মেলা হয়েছে । যাও শুয়ে পড় গিয়ে।"
রতন বাবু কঠিন কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারেন না। স্ত্রী গত হবার পর থেকে তিনি ছেলেদের উপর রাগ করতে পারেন না।
ছেলের প্রশ্নের জবাব দেবার জন্য ভেতরে ভেতরে তিনি উত্তর খুজতে থাকেন কিন্তু
কি উত্তর দেবেন ভেবে পান না ।
ছেলের শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি প্রশ্ন করেন , "খেয়েছিস কিছু ?"
ছেলে হুম বলে ঘরে ঢুকে যায় । রতন বাবু যা বোঝার তা বুঝে নেন । হাতের পত্রিকাটি চেয়ারে রেখে তিনি রান্না ঘরে ঢুকে চুলা জ্বালান । তারপর দ্রুত ভাত ,ডাল তরকারী গরম করে মাদুর বিছিয়ে ছেলেকে খেতে ডাকেন।
দ্বিতীয়বার ডাকতে হয় না । হাত মুখ ধুয়ে এসে খেতে বসে রতন বাবুর আদরের ছোট ছেলে৷ তারপর ভাতের উপর ডাল ও তরকারী ঢেলে মেখে নিয়ে গো গ্রাসে গিলতে শুরু করে । পরম মমতায় রতন বাবু চেয়ে চেয়ে ছেলের খাওয়া দেখেন । ঠিক তখননি অজানা সংকায় তার বুকের ভেতরটা কেঁপে কেঁপে উঠে ।
চলবে ......
©somewhere in net ltd.