নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

ব্লগিং শুরু করি প্রথম আলো ব্লগে \"আমার কবিতা নামে\" আমি ব্লগিং করি মূলত নিজের ভেতরে জেগে উঠা ব্যর্থতা গুলোকে ঢেকে রাখার জন্য । দুনীতিবাজ, হারামখোর ও ধর্ম ব্যবসায়িদের অপছন্দ করি ।

সাখাওয়াত হোসেন বাবন

আমার পরিচয় একজন ব্লগার, আমি সাহসী, আমি নির্ভীক, আমি আপোষহীন । যা বিশ্বাস করি তাই লিখি তাই বলি ।

সাখাওয়াত হোসেন বাবন › বিস্তারিত পোস্টঃ

বিহঙ্গ -৪থ পর্ব (সমসাময়ীক কাল ও স্বাধীনতা যুদ্ধের পরবর্তী পটভূমিতে লেখা উপন্যাস)

১২ ই জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:০৮


চার

আজাহার, পুরান ঢাকার কায়েদ-ই-আজম কলেজ লাগোয়া একটি বন্ধ গলির মাঝামাঝি লাইট পোষ্টের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে, সিগারেট টানতে টানতে তাকিয়ে আছে মেইন রোডের দিকে ।

একটু পর ওখান দিয়ে একটা মিছিল যাবে। বাহাদুর শাহ্ পার্কের দক্ষিন পাশের খালি জায়গায় আওয়ামীলীগের স্থানীয় নেতা মজিদ সরর্দারের নেতৃত্বে বিকাল চারটার সময় একটা সমাবেশ হবে।

টাউন কমিটি বিলুপ্ত করে ঢাকা'কে পৌরসভায় রূপান্তরের পর মাজেদ সরর্দারদের মতো টাকা পয়সাওয়ালা অনেক নতুন নেতা গজিয়ে উঠেছে । পাটিফান্ডে বড় অংকের টাকা দিয়ে পদ ও পদবি দুটোই ভাগিয়ে নিচ্ছে৷

কেন্দ্রীয় নেতাদের দৃস্টি আকর্ষণের জন্য ঘন ঘন মিটিং মিছিল করে এসব নেতাদের নিজেদের উপস্থিতি জানান দেবার প্রবনতা ইদানীং খুব বেড়েছে।

শেখ মুজিব দেশের দ্বায়িত্ব গ্রহন করার পর থেকে মুজিব বাহিনী আরো শক্তি শালী হয়ে উঠেছে । তারা মুজিব ছাড়া অন্য কাউকে মানে না, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তোয়াক্কা করে না । শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ এবং সিরাজুল আলম খান এই চার যুবনেতার উদ্যোগে ১৯৭১ সালের মে যে আর্দশ নিয়ে মুজিব বাহিনী গঠিত হয়েছিলো। স্বাধীনতার পর বছর যেতে না যেতেই সে আর্দশের ছিটে ফোটাও অবশিষ্ট নেই। দেশের মানুষ এখন মুজিব বাহিনীর নাম সুনলে ভয় পায়। আড়ালে আবডালে তাদের সন্ত্রাসী বলে ডাকে ।

পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লাহ উঠতি বয়সী ছেলে ছোকড়াদের নিয়ে গড়ে উঠেছে মুজিব বাহিনীর ছোট ছোট গ্যাং । এরা খুব ই ভয়ংকর । শেখ সাহেবের ভাগ্নে মনি ও তার বন্ধু বান্ধদের ছাড়া আর কাউকে মানে না ।

মুজিব বাহিনীর এক নেতার ইশারায় মাজেদ সর্দার প্রথম বারের মতো জন সমাবেশের আয়োজন করেছে । এ নিয়েও এলাকায় বিস্তর গুন্জন চলছে । কেননা এই সমাবেশের খবর এলাকার অনেক পুরাতন নেতারাই জানে না । স্থানীয় রাজনীতি খবুই জটিল সমিকরণের উপর চলে৷ পুরাতন নেতাদের আওয়ামিলীগে গুরুত্ব থাকলেও বর্তমান মুজিব বাহিনীর জন্য মূল আওয়ামীলীগের কাছে তাদের গুরুত্ব কমে গেছে ।

যুদ্ধের আগেও যে মাজেদ সদরঘাটে কুলির কাজ করতো সেই মাজেদ এখন মুজিব বাহিনীর কল্যানে নেতা হবার দৌড়ে অনেকটা এগিয়ে গেছে ।

পাকিস্তান আমলে সদরঘাটে কুলিদের দু'টো গ্রুপ ছিলো । একটি বিহারিদের অন্যটা বাঙ্গালীদের । দেশে স্বাধীন হবার পর বিহারী গ্রুপটা চলে গেলে বাবুল সর্দারের গ্রুপের হাতে পুরো সদরঘাটের নিয়ন্ত্রন চলে আসে। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যে বাবুল সর্দার খুন হলে তার চেলা চামুন্ডারা ছোট ছোট আরো কয়েকটা গ্রুপে ভাগ হয়ে যে যেভাবে পারে ঘাট ও ঘাট সংলঘ্ন আশেপাশের দোকান পাটের দখল নেয় । এমন একটা দলের নেতৃত্বে চলে আসে মাজেদ সর্দার।

মাজেদ আগে থেকেই বাবুল সরর্দারের ডান হাত হিসাবে কাজ করতো । বাবুল সরর্দারের মৃত্যুর পর । মাজেদ নিকা করে বাবুল সর্দারের সুন্দরী বিধবা স্ত্রীকে। লোকে অবশ্য বলে , মাজেদের সাথে নাকি বাবুল সর্দারের ছোট স্ত্রীর আগে থেকেই পরকিয়া ছিলো । বাবুল সর্দার হত্যায় মাজেদের নাকি হাত ছিলো এমন কথাও শোনা যায়৷

বাবুল সর্দার খুন হবার পর মাজেদের ভাগ্য খুলে যায় । এরপর মাজেদকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয় নাই ।

বাবুল সর্দারের দেখানো পথ ধরে সে ঘাট নিয়ন্ত্রনের পাশাপাশি সূত্রাপুর ও মুরগী টোলায় কয়েকটা রিকশার গ্যারাজ খুলে বসে ।

কিছুদিন যেতে না যেতেই নিজের নামের সাথে সর্দার জুড়ে দেয় । যুদ্ধের পর অনেকের মতো মাজেদ ও বেশ টাকা পয়সার মালিক বনে গেছে । মাজেদ অবশ্য বেশ চালাক মানুষ ।

রিকশার গ্যারাজের পাশাপাশি সে মিটিং মিছিলে লোক সাপ্লাই দেওয়া ছিলো তার সাইড বিজনেস। যারা মাজেদ সর্দারের গ্যারাজে রিকশা চালায় তাদের বলাই আছে , ডাকলে মিটিং, মিছিলে যেতে হবে । সবার আগে দেশ ; দেশের আগে কিছু নাই।

মুখে দেশের কথা বললেও এসব সে করে নিজের নিরাপত্তার জন্য । বাবুল সর্দারের মতো সে মরতে চায় না । তাই নিজের নিরাপত্তা বাড়াতেই সে এখন রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ততা বাড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে । এবং অল্প দিনের মধ্যেই পুরান ঢাকার আতি পাতি নেতা থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নেতাসহ অনেকের কাছে মাজেদ সর্দার বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছে ।

মাজেদ সর্দার চিকন বুদ্ধির মানুষ । রীতিমতো তালিকা করো বয়স ভেদে রিকশা চালকেদের দুটো গ্রুপ তৈরি করেছে। বয়স্ক গ্রুপটির কাজ হচ্ছে, মিটিং এ যাওয়া অন্য গ্রুপটি যাদের বয়স কম তাদের কাজ শুধু মিছিলে যাওয়া।

বড় মিটিং থাকলে দুটো গ্রুপকে যেতে হয় । এতে মাথা পিছু তার ভালোই আয় থাকে । পরিচিতি পাওয়ার পর থেকে মাজেদ সর্দার এডভান্স ছাড়া কোথাও লোক পাঠায় না । কারণ মিটিং শেষ হবার সাথে সাথে আর কোন নেতাকে খুজে পাওয়া যায় না ।

তাই যাদের লোক দরকার তারা মাজেদ সর্রদারের গ্যারাজে এসে এডভান্স করে যায়। মিটিং মিছিলে লোক ভাড়া দিতে দিতে মাজেদ সর্দারের মনে ক্ষুদ্র ইচ্ছা জেগেছে সে নিজেও নেতা হবে , ইলেকশন করবে। এ ব্যাপারে শেখ মুজিবের খুব কাছের একজনের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়ে মাজেদ উঠে পরে লেগেছে ।

আজকের মিটিং এ মাজেদ সরর্দার'কে স্থানীয় লোকজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কথা আছে । তাই আজকের দিনটা মাজেদ সরদারের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ।

মিটিং বিকাল চারটায় হওয়ার কথা থাকলেও সকাল থেকে সুত্রাপুর, লক্ষ্মীবাজার, মুরগিটোলা, বাইনানা ঘর, কলতা বাজার, ছুরি টোলাসহ পুরো এলাকা জুড়ে মাইকিং ও মিছিল চলছে ।

গ্যারাজ থেকে আজ একটা রিকশা ও বের হয় নাই। সব রিকশা চালকেরা সবাই মিছিল নিয়ে ব্যস্ত।

রাজনীতি এতো সস্তা না । রাজনীতির রঙ্গ মঞ্চে যেমন মাজেদ সর্দার থাকে । তেমন তাদের প্রতিপক্ষরাও থাকে ।

কেউ ই নতুন কাউকে খুব সহজে জায়গা ছেড়ে দিতে চায় না । ঠিক তেমন একজনের নাম তোরাব আলী হাজি । সে কলতা বাজার এলাকার স্থানীয় বাসীন্দা । শেখ মুজিব যখন মুসলিম লীগে করতেন তখন থেকে সে রাজনীতি করে । আগে মাওলানা ভাসানীর ভক্ত থাকলেও এখন মুজিব ভক্ত ।

রাজনীতিতে কারো না কারো ভক্ত হতে হয়। যে যত বড় বক্ত সে ততো বড় নেতা । শেখ মুজিবও ভাসানির ভক্ত ছিলো বলেই বড় নেতা হতে পেরেছে ।

তোরাব আলীর মুজিবের মতো বড় নেতা হবার খায়েস না থাকলেও সে সংসদ সদস্য হিসাবে নির্বাচন করতে চায় ।

মসলিমলীগ ভেঙ্গে আওয়ামীলীগ হবার পর থেকে সে যথেষ্ট খেটেছে দলটির জন্য । পাকিস্তান আমলে ও এই এলাকায় তার প্রতিদন্ধী কেউ ছিলো না । এখন নতুন নতুন নেতা গজাইতাছে । তারা কাউরে মানতে চায় না । মুজিব বাহিনীর ছেলে ছোকরাদের হাত মাথায় থাকলেই রাতারাতি যে কেউ নেতা বনে যাচ্ছে ।

এ বছরের মধ্যেই দলে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে । বড় নেতারা কেউ কারো কথা শুনে না । কোন অনুরোধ রাখে না ।

সবাই চলে এক ৩২ নাম্বারের হুকুমে । নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন সাহেবেরা কোন ঠাসা হয়ে পড়েছেন।

তোরাব আলীর নিজেরও স্থানীয় নেতা হিসাবে মোটামুটি নাম ডাক আছে । সে নিজে এবার জাতীয় নির্বাচন করতে চায় ।

এক মাজেদ ছাড়া আশে পাশের সব এলাকার ছোট বড় নেতারা সরাসরি তার কাছে আসে । মাজেদ তারে নেতা মানে না। সে নেতা মানে মানে ধনী ভাইকে অর্থাৎ শেখ মুজিবের একসময় আশ্রয়দাতা ও সহচর হানিফ সাহেবকে । শেখ মুজিবের স্নেহ ধন্য হানিফ সাহেবের কথার উপর পুরান ঢাকায় আর কারো কোন কথা নাই ।

তোরাব আলী মাজেদের ব্যাপারটা নিয়া একবার ধনী ভাইয়ের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছে । সব শুনে ধনী ভাই বলেছেন , মাজেদ কাজের লোক । ওরে কাজে লাগাও । নিজেদের মধ্যে ঝগড়া, ফ্যাসাদ করে লাভ নাই ।

তোরাব আলী, লজ্জায় বলতে পারেন নাই যে, মাজেদ তারে নেতা ই মনে করে না । ধারে কাছেও আসে না ।

মুক্তি যুদ্ধের পর থেকে মাজেদ সরদারের এই হঠাৎ উত্থান তার রাজনৈতিক আকাশে কালো মেঘের সৃষ্টি করছে । দ্রুত কিছু একটা করতে না পারলে তার আর নেতা হওয়া হবে না।

তবে পথের কাটা কিভাবে দূর করতে হয় তা তোরাব আলী হাজির বেশ ভালো করে জানা আছে । যে জানে কখন কি করতে হয়।

প্রথমে ভয় দেখাও তাতে কাজ না হলে জানে শেষ করে দাও । ধনী ভাইকে দিয়ে কাজ হবে না বুঝার পর তোরাব আলী তলে তলে মুজিব বাহিনীর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করছে । মুজিবের পরে এখন দেশে আর কারো কথা চলে না । মুজিব বাহিনীর কথাই শেষ কথা। মুজিব বাহিনী যার কথা বলবে সেই নেতা হবে ।

আজ তোরাব আলীর যে লোক ভাড়া করেছে তার নাম আজাহারকে । আজাহার পুরান ঢাকার প্রথম বোমা বানাবার কারিগর। নেশা,ভান করে । টাকার জন্য সে পারে না এমন কোন কাজ নাই।

মাত্র পঞ্চাশ টাকার বিনিময়ে সে কাজটি নিয়েছে। এ কাজে তার চেয়ে এক্সপাট এ তল্লাটে আর কেউ নাই ।

আজাহারের কাজ হচ্ছে , মিছিলটা যখন লক্ষ্মীবাজারের মাঝামাঝি পৌছে যাবে তখন পেছন থেকে মিছিলের মাঝামাঝি একটা হাত বোমা ছুড়ে মেরে দেয়াল টপকে পালিয়ে যাওয়া । যে জন্যই সে এখন অপেক্ষা করছে।

হাতের K2 সিগারেট শেষ হতে না হতে আজাহার মিছিলের শব্দ শুনতে পায় । সঙ্গে সঙ্গে সে পায়ের কাছে রাখা কাপড়ের ব্যাগটা তুলে নিয়ে হাটতে থাকে গলির প্রবেশ মুখের দিকে ।

তারপর শরীর আড়াল করে দাড়ায় গলির মুখে । মিছিলের শব্দ শুনে লোকজন রাস্তার দু পাশে দাড়িয়ে গেছে । রিকশা চলা একপাশে চলে গেছে । মিছিলটা আসছে সূত্রাপুরের দিক থেকে ।

বেশি বড় মিছিল না জনা পঞ্চাশ লোক ফাকা ফাকা হয়ে স্লোগান দিতে দিতে যাচ্ছে ভিক্টোরিয়া পার্কের দিকে। মিছিলে দশ বারো বছরের কয়েকটা শিশুও আছে । তাদের কেউ ভাড়া করেনি। নিজেদের ইচ্ছাতেই মিছিলে যোগ দিয়েছে। মিছিলের সামনে মাজেদ সরদার হাসিমুখে হাত নেড়ে নেড়ে হাটছে ।

মিছিলটা আজহারকে অতিক্রম করে যাওয়ার সময় ই সে ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে জদ্দার কৌটায় লাল টেপ দিয়ে প্যাচানো বোমাটা বের করে আনে ।

তারপর স্লোগান দিতে দিতে মিছেলের পিছু পিছু কিছুটা হেটে গিয়ে পায়ের স্যান্ডেলের ফিতা খুলে গেছে এমন ভাব করে বসে পরে। মিছিলটা আর একটু এগিয়ে যেতেই যে , হাতের মুঠোয় থাকা বোমা ছুরে মারে ঠিক মিছিলের মাঝামাঝি । বিকট শব্দ করে বোমাটা ফুটতেই আশে পাশের সবাই কয়েক মুহুতের জন্য জমে যায় । কিছু বুঝে উঠার আগে ই আজাহার দ্বিতীয় বোমাটা ছুরে মেরেই গলির দিকে ছুট লাগায় । ছুটতে ছুটতে শুনতে পায় দ্বিতীয় বোমাটা আগেরটার চেয়েও বেশি বিকট শব্দে ফোটে ।

ছুটতে ছুটতে আজাহার নিজের কাজের জন্য নিজের তাড়িফ করে । এমন সময় ধর ধর শব্দ করে পেছনে থেকে কয়েকটা কন্ঠস্বর শোনা যায় । কিন্তু আজহারকে ধরতে পারে এমন সাধ্য কার । চোখের পলকে দেয়াল টপকে হাওয়া হয়ে যায়৷


চলবে...

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.