| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
পরদিন সকালে আমরা ব্রেকফাস্ট খেতে চলে গেলাম সকাল আটটার দিকে নিচে। বিশাল বড় জায়গা জুড়ে দেশি বিদেশি নানা রকম খাবারের আয়োজনে ভরপুর। কিছু খাবার তাতক্ষনিক রান্না করে দেয়া হচ্ছে। আমরা কয়েকজন মিলে খাওয়া দাওয়া শেষ করে ফেললাম। তখন আমাদের আরেক দল এসে জানাল, খাবারের নাকি আরেকটা জায়গা আছে । আমারা যে ভিলাতে আছি তাদের জন্য স্পেশাল আয়োজন সেখানে। সেখানে গিয়ে দেখা গেলো অনেক কিছু একই খাবার আছে। তবে অন্য জায়গার চেয়ে এখানে খাবারের আয়োজনে ভিন্নতা কম। স্পেশাল আছে নেহারি যা অন্য ক্যাফেটারিয়ায় ছিল না।
নেহারিটা বেশ ভালো ছিল। খাওয়া শেষ করার পরও অল্প একটু খেয়ে নিলাম।
সেদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সমুদ্রপাড়েই কাটিয়ে দিলাম, আমি আর বোন মিলে। তবে জলে নামার ইচ্ছা হলো না। এখানে প্রচুর মানুষ। বেশির ভাগ মানুষই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। পানিতে নেমেছেন খুব অল্প মানুষ।
সমুদ্রপাড়ে ঘোড়া নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে কিছু মানুষ। আর আছে কিছু গাড়ি। পুরো পরিবারের মানুষ এক সাথে গাড়িতে চড়ে হাওয়া খেয়ে আসছে কিছুটা দূর পর্যন্ত। একদল নামছে তো আরেক দল চড়ছে এই গাড়িতে আর ঘোড়াতে।
সাগরপাড়ে গিয়ে পানির কাছে না বসে থেকে গাড়ি, ঘোড়া চড়ে বেড়ানোর কি সুখ জানি না। আমার একদমই ভালোলাগে না । বরঞ্চ পানিতে সাঁতার কাটা বেশি মজাদার। এছাড়া বডি সার্ফিং, জেট স্কি করাটা মনে হয় ভালো যায়। এছাড়া বিভিন্ন দেশে স্কুবা ডাইভিং ও স্নরকেলিং ,উইন্ডসার্ফিং ও কাইট সার্ফিং করে মানুষ। নেহাত বিচ ভলিবল ও ফুটবল খেলে । বিদেশে সূর্যান্ত দেখতে দেখতে বারবিকিউ করে ডিনার সেরে নেয় অনেকে।
বাংলাদেশে হোটল গুলো বারবিকিউর, আয়োজন রাখে মানুষের জন্য। আর সৈকতে অনেক রকম খাবার দাবার বিক্রি হচ্ছে। মানুষ আরাম চেয়ারে ছাতার নিচে বসে সে সব খাচ্ছেন। চিপস, পানি খাচ্ছেন বোতলে। সাগরপাড়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেকবারই দেখলাম ঢেউ এসে যখন সৈকত ধূয়ে নিয়ে যাচ্ছে তখন পানির মধ্যে তেলের মতন কিছু ভেসে যাচ্ছে। তীর ঘেষে অনেক আবর্জনা পরে আছে। সে সবও মাঝে মাঝে জলের সাথে সমুদ্রের জলে চলে যাচ্ছে। পৃথিবীর আর কোন সাগর সৈকতে এমন আবর্জনা পরে থাকতে দেখিনি।
ঘোড়ায় চড়া মানুষ কমে গেলে ঘোড়াওয়ালারা খুবই বিরক্ত করতে শুরু করল, ঘোড়ায় চড়ার জন্য। সাথে আবার ক্যামেরাম্যান দারুণ ছবি তুলে দেয়ার জন্য সাধাসাধি করছিল। যদিও আমাদের সাথে ক্যামেরা এবং ফোন ছিল তা দেখার পরও তারা খুব ভালো ছবি তুলে দিবে এই বিজ্ঞাপন করতেই লাগল।
পানির মাঝে হাঁটাহাঁটি করতে করতে ঝিনুক খুঁজছিলাম কিন্তু এখানেও কোন ঝিনুক খুঁজে পেলাম না। হঠাৎ অল্প কিছু ছোট ঝিনুকের ভাঙ্গা অংশ ভেসে আসতে দেখলাম। খুব দ্রুত এই ঝিনুকের খোলস বালুর ভিতর ঢুকে যাচ্ছে। ভাঙ্গা ঝিনুকের মাঝে হঠাৎ করে বেশ বড়সর একটা মুক্তার মতন কিছু ঢেউয়ের সাথে ভেসে আসতে দেখলাম। বালুর ভিতরে ঢুকে যাচ্ছিল প্রায় তাড়াতাড়ি তুলে নিলাম এবং বেশ ভালো একটা মুক্তা আমি পেয়ে গেলাম। মনে হলো সাগর আমাকে একটা উপহার দিয়ে দিল নিজে থেকে। মন ভালো হয়ে গেলো সাগরের উপহার পেয়ে।
আমরা যখন সাগরপাড়ে কাটাচ্ছি বাচ্চারা সব গেছে তখন ওয়াটার রাইডে চড়তে। সকাল থেকে তাদের নাগরিক আনন্দ ছিল এই ওয়াটার পার্কের নানা রকম খেলা।
দুপুরের পরে সেদিন রিসোর্টের প্যাকেজে ছিল আমাদের টেকনাফ সীমান্তে নিয়ে যাওয়া।
তিনটার দিকে রিসিপশনে নেমে দেখলাম। বাস তৈরি তবে আরো কিছু মানুষের আসার অপেক্ষা। অবশেষে আমাদের টেকনাফ যাওয়ার সুযোগ আসল। যেখানে প্রথমেই চলে যেতে চেয়েছিলাম, শেষদিন সেখানে রওনা হললাম। পথে দুটো জায়গায় থামবে একটা ঝিনুক সৈকত, লাল কাঁকড়া দেখার সৈকত।
একপাশে পাহাড় এক দিকে সমুদ্র তীরে অনেক শাম্পান সার দিয়ে রাখা। একটু পর পরই এমন দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল। একদম গ্রামীন বাংলাদেশের প্রকৃত রূপ পাওয়া যাচ্ছিল। ডুবা জলাসয়ে মাছ ধরছে কিছু মানুষ। গরু ছাগল আপনমনে মাঠে চড়ছে। ছোট বাচ্চারা খেলাধূলা করছে। পাশেই পর্যটনের বিশাল আকর্ষনীয় সব সাজসজ্জা থাকলেও নিজস্ব রূপ নিয়ে কিছু জায়গা এখনও আপনরূপে মহিমান্বীত। জমিনের গাছগাছালী,পাহাডের সবুজ আর সমুদ্রের নীলের সাথে কোন কৃত্তিম সাজ প্রতিযোগীতায় জয়ী হতে পারবে না।
সবরং টুরিজম পার্ক যেখানে ইকো পার্ক বানানোর একটা পরিকল্পনা ছিল। সেখানে একটি ত্রিভূজের মধ্যে একটি ঘড়ি। ঘড়ির সময় আবার এগারোটায় থেমে গেছে। পর্যটকরা এখানেই ছবি তুলছে। রাস্তার অন্যপাশে কিছু দোকান। শুটকি বিক্রি হচ্ছে এখানে। খুচরো দোকনদার ডাব বিক্রি করছে। আমরা সবাই মিলে ডাব খেলাম। এটাই শেষ পয়েন্ট আমাদের নিয়ে আসার। অথচ আমি ভেবেছিলাম একদম নাফ নদীর তীর পর্যন্ত নিয়ে যাবে। সে আশা আর পূরণ হলো না। দূরে একটা ডাকবাংলো একা খোলা প্রান্তরে।
কিছু ঝাউগাছ লাগানো আছে। তার ভীতর দিয়ে হেঁটে গিয়ে পেলাম শাম্পানের সারি। যেটা মনে হলো এখানের জীবন যাপন সঠিক ভাবে তুলে ধরে। মাছ ধরতে যখন মাঝিরা যায় তাদের সাথে যদি যেতে পারতাম, দেখতে পেতাম তাদের মাছ ধরার কসরত এবং জীবনযাপনের কঠিন দিক এমন একটা ইচ্ছা মনে উঁকি দিল। কিন্তু মনে হলো সে ইচ্ছাপূরণ থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি এখন।
আসা যাওয়ার পথে হুড খোলা কিছু গাড়ি দেখলাম। এটাকে বলে চান্দের গাড়ি। অনেক লেখায় এবং ভিডিওতে এর নাম শুনেছিলাম। ইয়াং ছেলেমেয়েদের কাছে খুব আকর্ষণিয় এই চান্দের গাড়ি। আমার চড়া হলো না।
ফিরার পথে লাল কাঁকড়া এবং ঝিনুক সৈকতে থামা হলো । ঝিনুক বা লাল কাঁকড়ার সাথে দেখা হলো না । দেখা হলো কিছু ক্ষুদে ফটোগ্রাফারের সাথে এরা পাশ থেকে নড়ছেই না। আমাদের নিজেদের ছবি তুলতে দিবে না। ওরা ব্যাস্ত কাছে দাঁড়িয়ে থেকে ডিরেকশন দেওয়ায়। এটাই মনে হয় ওদের বাড়তি আয়ের একটা অংশ। কিন্তু ছবি তুলে দেওয়ার জন্য ওরা টাকা চায় না কিন্তু আপনার ছবি তুলে দিবেই, আপনারই মোবাইলে। অবশ্যই আপনি ছবি তুলার পর কিছু দিবেন তাদের তাই না।
লাল কাকঁড়া সৈকতে কোন লাল কাকঁড়া নেই। অথচ আমি যখন নব্বই সনে কক্সবাজার সৈকতে গিয়েছিলাম সেখানে অসংখ্য লাল কাঁকড়া দেখেছিলাম। কদিনের জন্য আমার ছেলের বন্ধু হয়ে গিয়েছিল লাল কাঁকড়া।
ও তো একটা কবিতাই বানিয়ে ফেলেছিল মুখে মুখে। যখন সে পড়া লেখাও শিখেনি।
"ওরে ভাই লাল কাঁকড়া মাথায় এন্টিনা তুলে কোথায় যাও চলে
আমি যেতে চাই তোমার সাথে তোমার ঘরে" অনেক লম্বা ছিল লেখাটি আমি লিখে নিয়েছিলাম ও যখন বলছিল বারেবারে। 
সন্ধ্যার খানিক পরে ফিরে এলাম আমরা ঘরে। রাতের খাবার খেতে গেলাম সেই স্পেশাল ব্রেকফাস্ট রেস্টুরেন্টে। সন্ধ্যার আয়োজন ছিল থাই খাবার। এত জঘন্য খাবার আর কখনো খাইনি।
মাঝ রাতে কেক কেটে আমার জন্মদিন পালন করা হলো। পরের দিন সকালে ব্রেকফাস্ট খাওয়ার আর ইচ্ছা হলো না রাতের সেই খাবরের পর। সকালে সাটলবাস এয়ারপোর্টে নামিয়ে দিল। ঘন্টা দেঢ় সময় আমাদের এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করতে হলো আমাদের বিমানের সময় হওয়া পর্যন্ত।
যাহোক ভালো ভাবে বাড়ি ফিরে আসলাম। ছেলেরা সেদিন গাড়ি ভাড়া করে ঘুরবে আশেপাশে নিজেদের মতন। ওদের ফিরার সময় বিকাল চারটা।
ওদের কাছে খবর পেলাম ওদের প্লেনে সমস্যা প্লেন ঠিক করা হচ্ছে। ঠিক করা প্লেনে ওরা আসবে মনটা কেমন করতে থাকল। রাত বাজে দশটা আমি তখন তৈরি হচ্ছি আমার লম্বা ফ্লাইটের জন্য। সাড়ে এগারোটায় আমি যখন ইন্টারন্যাশনাল টার্মিনালে ঢুকছি ওরা তখন ডমেস্টিক টার্মিনালে পৌঁছেছে ঢাকা। অবশেষে ভালো ভাবে ফিরে এসেছে প্লেনে উড়ার আগে এই খবরটা স্বস্থি দিল। প্লেনে উঠার পর আর জানার সুযোগ থাকত না ওরা ঠিক ভাবে ফিরেছে কিনা। আর অস্থির থাকতাম সারা সময়।
আর একটি ঘটনা না বললেই নয়। যখন সাগরপাড়ে ঘুরছিলাম সেখানে কোন গার্ড দেখিনি। বড় হোটেল সী পার্লেও কোন গার্ড ছিল না, খেলা ধূলার জায়গায়। শুধু একটা লাল পতাকা সারাক্ষণ উড়ছিল। তারমানে কখনোই সাগরে নামা যাবে না। অথচ জোয়ারের সময় যখন সাগরের পানিতে নামা যায় সে সময় সে পতাকাটা নামাতে হয়। এসব দেখা শোনার কোন মানুষ ছিল না। এছাড়াও সাগরের পানিতে মানুষের অসুবিধা হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য গার্ড থাকে।
আরেকটি রক্ত হীম করা খবর ছিল। বাচ্চারা যখন ওয়াটার পার্কে খেলা ধূলা করছিল। এক সময় কয়েকজন চলে আসে আর কয়েকজন যায় অন্য একটা খেলায়, যেখানে সাগরের ঢেউয়ের মতন ঢেউ আসে। ওরা যখন ঐ পুলের ভিতর ঢুকেছে। হঠাৎই একজন চিৎকার করে বলে নিচে কেউ একজন ডুবে আছে। দশ বারো বছরের একটি বাচ্চা পানির মধ্যে ডুবে আছে। ওদের ডাকাডাকিতে কয়েকজন এসে বাচ্চাটাকে তুলে। বাচ্চাটির মা বাবাও ছিল না কাছে। কিছুক্ষণ পরে তারা দৌড়ে আসে। বাচ্চাটিকে যখন পানি থেকে তোলা হয় সে তখন মৃত। একটি পরিবারের আনন্দভ্রমন মৃত বাচ্চা নিয়ে ফিরে যাওয়ার মধ্যে সমাপ্ত হয়।
এমন সুইমিং পুলে একজন গার্ড থাকবে না এটা কি ভাবা যায়। বিদেশের সুমিংপুলে চারপাশে চারজন গার্ড থাকে ব্যাস্ত পুল গুলোতে। কম ভিড়েও অন্তত দুজন থাকে। সেফটিকে প্রথম প্রায়রটি দেওয়া হয়।
অথচ খুবই অবাক করা বিষয় এমন বড় হোটেলের ব্যবস্থাপনায় এই সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পাত্তা দেওয়া হয় না।
এই দুঃখজনক ঘটনাটি জানার পর থেকে আনন্দ ভ্রমণের সাথে সাথে মনটা খারাপ হয়ে আছে। এসব খবর খুব যত্ন সহকারে নিরবে রাখা হয়। এমন ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও কি কোন গার্ডের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে খেলার জায়গা গুলোতে জানার ইচ্ছা রইল।
©somewhere in net ltd.