নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সরওয়ার নিজামী একাধারে লেখক, আইন গবেষক, আইনজীবী, সমাজকর্মী ও সংগঠক। প্রকাশিত বই: পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পর্কিত আইন, আইনের জীবন ও দর্শন, চলচ্চিত্রে আইন, কোলাহল শেষে, বিপ্লব দেখতে আসিনি, এসেছি বিপ্লবী হতে, শূন্যলতা, কিছু স্মৃতি, কিছু কথা, ধূসর মেঘের ওপারে।

সরওয়ার নিজামী

আইনজীবী, ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালত (০১৮১৫ ৮১৯২৩৯)

সরওয়ার নিজামী › বিস্তারিত পোস্টঃ

অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইনের আদ্যোপান্ত ও বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই আইনের প্রয়োজনীয়তা আছে কি না?

২৮ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯

ভূমিকা
সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত অপচয় রোধ করতে অতীতে ১৯৮৪ সালের দ্য গেস্ট কন্ট্রোল অর্ডার (সংশোধিত ২০০৩) চালু ছিল। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে অতিরিক্ত জাঁকজমক অনুষ্ঠান, খাবারের অপচয় এবং অর্থ অপচয় রোধে এই আইনটি পুনরায় কার্যকর করার দাবি জানানো হয়েছে এবং ১০০ জনের বেশি অতিথি হলে জনপ্রতি করারোপের প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে। বিএনপি দলীয় সাংসদ মোঃ শাহাদাত হোসেন এর এমন প্রস্তাব আসলে কতটুকু যৌক্তিক, চলুন তা বিশ্লেষণ করি।

১৯৮৪ সালের আদেশের মূল বিধান কী ছিল?
১৯৮৪ সালের আইন অনুযায়ী, কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে ১০০ জনের বেশি অতিথিকে চাল বা গমের তৈরি খাবার পরিবেশন নিষিদ্ধ ছিল। এর বেশি অতিথি হলে সরকারি অনুমতি এবং প্রতি অতিরিক্ত অতিথির জন্য নির্দিষ্ট ফি প্রদান বাধ্যতামূলক ছিল। এছাড়া, খাদ্য পরিদর্শক বা পুলিশ কর্মকর্তাদের অনুষ্ঠানস্থলে তল্লাশির ক্ষমতা ছিল।

অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইনের জন্ম কোথা থেকে?
অতিথি নিয়ন্ত্রণের মতো আইনি বিধানের জন্ম মূলত ১৯৫৬ সালের The Control of Essential Commodities Act, 1956 নামক একটি আইন থেকে। এই আইনের ৩(১) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ১৯৮৪ সালের ৩ জুলাই তৎকালীন খাদ্য মন্ত্রণালয় একটি বিশেষ প্রজ্ঞাপন বা সরকারি আদেশ হিসেবে 'দ্য গেস্ট কন্ট্রোল অর্ডার, ১৯৮৪' (অতিথি নিয়ন্ত্রণ আদেশ) জারি করে।

১৯৫৬ সালের আইনটি উৎপত্তির মূল প্রেক্ষাপট কী ছিল?
১৯৫৬ সালের আইনটি ছিল মূলত দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং মজুদদারি রোধ করার জন্য। অন্যদিকে, ১৯৮৪ সালে দেশের সামগ্রিক খাদ্য পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং চাল-গমের মতো প্রধান খাদ্যশস্যের অপচয় রুখতে এই মূল আইনের অধীনে 'অতিথি নিয়ন্ত্রণ' সংক্রান্ত বিশেষ আদেশটি তৈরি করা হয়েছিল। যেহেতু এটি ১৯৫৬ সালের জরুরি পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় তৈরি, তাই এই আদেশের যেকোনো নিয়ম লঙ্ঘন করা উক্ত মূল আইনের অধীনেই একটি দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো।

১৯৫৬ সালের আইনের অধীনে কয়টি আদেশ প্রণীত হয়েছিল?
১৯৫৬ সালের 'দ্য কন্ট্রোল অব এসেনশিয়াল কমোডিটিজ অ্যাক্ট'-এর অধীনে সর্বপ্রথম ১৯৫৯ সালে অতিথি নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আদেশ (Guest Control Order) তৈরি করা হয়েছিল। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং খাদ্যশস্যের অপচয় রোধে এই মূল আইনের আওতায় বিভিন্ন সময়ে নতুন আদেশ জারি ও বাতিল করা হয়। এই ধারাবাহিকতায় তৈরি হওয়া প্রধান আদেশগুলো হলো:
• ১৯৫৯ সালে: সর্বপ্রথম এই আইনের অধীনে অতিথি নিয়ন্ত্রণ আদেশ জারি হয়।
• ১৯৬৫ সালে: তৎকালীন খাদ্য পরিস্থিতি বিবেচনা করে পুনরায় আদেশ জারি করা হয়।
• ১৯৭৮ সালে: দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকার নতুন করে আরেকটি আদেশ জারি করে।
• ১৯৮৪ সালে: পূর্বের ১৯৭৮ সালের আদেশটি বাতিল করে 'দ্য গেস্ট কন্ট্রোল অর্ডার, ১৯৮৪' জারি করা হয়, যা ২০০৩ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে পরিবর্তিত হলেও অদ্যাবধি বহাল আছে।

২০০৩ সালের আদেশে কী সংশোধনী এসেছে?
১৯৮৪ সালের মূল আদেশের পর ২০০৩ সালের ৯ অক্টোবর খাদ্য মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপনের (এস,আর,ও নং ২৯১-আইন/২০০৩) মাধ্যমে 'দ্য গেস্ট কন্ট্রোল অর্ডার, ১৯৮৪'-এ গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংশোধন ও পরিবর্তন আনে। মূল যে পার্থক্যগুলো তৈরি হয়েছিল, তা নিচে উল্লেখ করা হলো:

• ২০০৩ সালের সংশোধনীর সবচেয়ে বড় পার্থক্য ছিল ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোকে এই আদেশের আওতা থেকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া। নতুন নিয়ম অনুযায়ী মিলাদ মাহফিল, ইফতার পার্টি, কুলখানি, চেহলাম, ওরস, ধর্মসভা এবং শ্রাদ্ধের মতো অনুষ্ঠানগুলোতে অতিথির সংখ্যার কোনো বাধ্যবাধকতা বা অতিরিক্ত ফি দেওয়ার নিয়ম প্রযোজ্য ছিল না।

• ১৯৮৪ সালের আদেশে অনুষ্ঠানের ধরন নিয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা ছিল। ২০০৩ সালের সংশোধনীতে "Function" বা অনুষ্ঠানের একটি সুনির্দিষ্ট আইনি সংজ্ঞা যোগ করা হয়। এর মাধ্যমে স্পষ্ট করা হয় যে—যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠান, বিয়ে বা বিয়ে-সংক্রান্ত অনুষ্ঠানগুলোই কেবল এই অতিথি নিয়ন্ত্রণ আদেশের অন্তর্ভুক্ত হবে।

• ১৯৮৪ সালে যখন অতিথি নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত আইনটি জোরালো ছিল, তখন অনুমতি সাপেক্ষে ১০০ জনের বেশি প্রতি অতিরিক্ত অতিথির জন্য শুরুতে ১০ টাকা ফি দেওয়ার নিয়ম ছিল। পরবর্তী সময়ে এবং ২০০৩ সালের সংশোধনীর ধারাবাহিকতায় এই ফি বাড়িয়ে জনপ্রতি ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা সরকারি কোষাগারে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জমা দিতে হতো।

সংক্ষেপে, ১৯৮৪ সালের কঠোর আদেশে যেখানে সব ধরনের বড় জমায়েতেই কড়াকড়ি ছিল, সেখানে ২০০৩ সালের পরিবর্তনের মাধ্যমে সাধারণ সামাজিক ও বিয়ের অনুষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু করে ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোকে পুরোপুরি ছাড় দেওয়া হয়।

বর্তমান বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে অতিথি নিয়ন্ত্রণের মতো এমন বিদঘুটে আইনের প্রয়োজন আছে কি?
বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত বেশি, তবে এর মূল উদ্দেশ্য ও প্রয়োগ পদ্ধতিতে বড় ধরনের আধুনিকায়ন বা সংস্কার প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় ধরে নিষ্ক্রিয় থাকার পর, বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক মন্দার কারণে সাংসদ মোঃ শাহাদাত হোসেন এর প্রস্তাবের মাধ্যমে জাতীয় সংসদে আইনটি পুনরায় সচল করার জোরালো দাবি উঠেছে।

বর্তমানে এই আইনটি যে সকল কারণে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, তা নিচে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পয়েন্টে তুলে ধরা হলো:
১. খাদ্য অপচয় রোধ ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
বাংলাদেশের বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে, বিশেষ করে বিয়ে ও গায়ে হলুদে টন কে টন খাবার অপচয় হয়। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে খাদ্যশস্যের অপচয় কমানো একটি জাতীয় দায়িত্ব। অপচয় কমলে পরোক্ষভাবে তা বাজারের মূল্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

২. নতুন রাজস্ব আয়ের উৎস
বর্তমানে দেশের হাজার হাজার কমিউনিটি সেন্টার, কনভেনশন হল এবং অভিজাত হোটেলে প্রতিদিন শত শত অনুষ্ঠান হচ্ছে। ২০০৩ সালের বিধি অনুযায়ী ১৫০ জনের বেশি অতিথি হলে যে শুল্কারোপের বিধান রয়েছে তা তদারকির অভাবে সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। আইনটি কঠোরভাবে কার্যকর করলে সরকারের রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

৩. সামাজিক বৈষম্য ও কৃচ্ছ্রসাধন
সমাজে বর্তমানে বিয়ে বা উৎসবকে কেন্দ্র করে লাখ লাখ টাকা ওড়ানোর একটি আনুষ্ঠানিক ও প্রতিযোগিতামূলক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারক ও প্রধানমন্ত্রীদের পক্ষ থেকে বারবার 'মিতব্যয়িতা'বা কৃচ্ছ্রসাধনের যে আহ্বান জানানো হচ্ছে, এই আইনটি তার সঙ্গে সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ। এটি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে লোকলজ্জা বা সামাজিক চাপের মুখে পড়ে ঋণগ্রস্ত হওয়া থেকে রক্ষা করতে আইনি ঢাল হিসেবে কাজ করবে।

অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইনে কেমন সংস্কার আনা প্রয়োজন?
অতিথি নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত বর্তমান আইনি বিধানগুলোকে যুগের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত করতে কতিপয় সংস্কার আনা অত্যাবশ্যক।

এর মধ্যে প্রথমে থাকবে অতিথির যৌক্তিক সীমা ও স্তর নির্ধারণ। ২০০৩ সালের সংশোধীত আদেশে ১৫০ জনের সীমা বর্তমান শহুরে প্রেক্ষাপটে মানানসই নয়। এটি বাড়িয়ে ন্যূনতম ৩০০ থেকে ৪০০ জন করা উচিত। ৪০০ জন পর্যন্ত কোনো ফি থাকবে না। ৪০০ থেকে ৭০০ জনের জন্য জনপ্রতি ১০০ টাকা এবং ৭০০ জনের বেশি হলে জনপ্রতি ৫০০ টাকা ফি নির্ধারণ করা যেতে পারে। এতে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা রেহাই পাবে এবং ধনীদের অপচয় কমবে।

দ্বিতীয়ত, মেন্যু বা খাবারের পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা উচিত। অতিথির সংখ্যার চেয়ে খাবারের পদের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা বেশি কার্যকর হবে। যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে সর্বোচ্চ ৫টি পদ (যেমন: ৩টি মূল খাবার, ১টি সাইড ডিশ, ১টি ডেজার্ট/মিষ্টি এবং পানি) নির্দিষ্ট করে দেওয়া উচিত। বুফে বা উচ্ছিষ্ট খাবারের অপচয় রোধে ক্যাটারিং সার্ভিসগুলোর জন্য কঠোর নীতিমালা তৈরি করতে হবে।

তৃতীয়ত, খাবারের অপচয় ব্যবস্থাপনা (Food Waste Management) ঠিক করতে হবে। বড় অনুষ্ঠানে বেঁচে যাওয়া খাবার ফেলে দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। এই উদ্বৃত্ত খাবার কোনো স্বীকৃত চ্যারিটি বা ফুড ব্যাংকের মাধ্যমে দুস্থদের মাঝে বিতরণের আইনি বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। খাবার অপচয় বা নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে সংশ্লিষ্ট ক্যাটারিং ও ডেকোরেটর প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের বিধান রাখতে হবে।

সর্বশেষ, হয়রানিমুক্ত তদারকি ও জরিমানার বিধান যথোপযুক্তভাবে কাযকর করতে হবে। অনুষ্ঠানস্থলে পুলিশ বা পরিদর্শকদের ঝটিকা অভিযান ও তল্লাশির ক্ষমতা বাতিল করতে হবে, কারণ এতে সাধারণ পরিবারগুলো সামাজিকভাবে হেনস্থার শিকার হয়। অনুষ্ঠান শেষে ভেন্যুর বিল ও ভ্যাট রিটার্ন অডিট করে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে অর্থদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে।


লেখক: সরওয়ার নিজামী
অ্যাডভোকেট, ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালত
ইনকাম ট্যাক্স প্র্যাকটিশনার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ঢাকা
‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পর্কিত আইন’ বইসহ বিভিন্ন বইয়ের লেখক
ঠিকানা: লেক্সলেইন চেম্বারস, ফ্ল্যাট নং- ২বি, প্রপার্টি প্যারাগন (লেবেল ২)
১১৬ সেগুনবাগিচা, ঢাকা- ১০০০। মোবাইল- ০১৮১৫ ৮১৯২৩৯।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.