নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সরওয়ার নিজামী একাধারে লেখক, আইন গবেষক, আইনজীবী, সমাজকর্মী ও সংগঠক। প্রকাশিত বই: পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পর্কিত আইন, আইনের জীবন ও দর্শন, চলচ্চিত্রে আইন, কোলাহল শেষে, বিপ্লব দেখতে আসিনি, এসেছি বিপ্লবী হতে, শূন্যলতা, কিছু স্মৃতি, কিছু কথা, ধূসর মেঘের ওপারে।

সরওয়ার নিজামী

আইনজীবী, ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালত (০১৮১৫ ৮১৯২৩৯)

সরওয়ার নিজামী › বিস্তারিত পোস্টঃ

আদালতে প্রকৃত আসামির পরিবর্তে অন্য কাউকে হাজির করা (প্রক্সি দেওয়া) এবং সাম্প্রতিক চেক ডিজঅনার মামলায় ঘটে যাওয়া প্রক্সির আইনগত দিক বিশ্লেষণ

২৮ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫১

ভূমিকা
আদালতে প্রকৃত আসামির পরিবর্তে অন্য কাউকে হাজির করা (প্রক্সি দেওয়া) একটি অত্যন্ত গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। এটি মূলত প্রতারণা (Fraud), জালিয়াতি (Forgery) এবং আদালত অবমাননা (Contempt of Court)-এর সমতুল্য বলে বিবেচিত।

সাম্প্রতিক চেক ডিজঅনার মামলায় প্রক্সির প্রকৃত ঘটনার আদ্যোপান্ত
বাংলাদেশে আদালতে প্রক্সি দেওয়ার ঘটনা মাঝেমাঝে শোনা যায়। অতীতে দেশের বিভিন্ন জেলা আদালতে চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা বা মাদক মামলায় মূল অপরাধীকে আড়াল করতে টাকার বিনিময়ে গরিব বা অসহায় মানুষকে "বদলি আসামি" বা প্রক্সি হিসেবে জেলে পাঠানোর নজির দেখা গেছে। সাম্প্রতিক চেক ডিজঅনার মামলায় প্রক্সির ঘটনা তার একটি। গত ২৫ জুন ২০২৬ ইং তারিখে ঘটনাটি ঘটেছে ঢাকার একটি আদালতে।

ঘটনার বিবরণ: ঢাকার চতুর্থ যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ তানিয়া সুলতানা লিপির আদালতে ২৯ লাখ টাকার একটি চেক ডিজঅনার মামলায় আসল আসামি নাসরিন সিকদার-এর পরিবর্তে মনোয়ারা বেগম (৫০) নামের এক নারী আত্মসমর্পণ করে জামিন নিতে আসেন।

ধরা পড়ার কারণ: শুনানির সময় কাঠগড়ায় দাঁড়ানো নারীকে দেখে বিচারকের সন্দেহ হয়। পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে যে তিনি আসল আসামি নন। আটক হওয়া মনোয়ারা বেগম মূলত জজ কোর্ট এলাকার বিভিন্ন আইনজীবীর চেম্বারে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেন।

আইনজীবীর ভূমিকা ও জালিয়াতি: মামলার এজাহার অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট আইনজীবী অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে ওই পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে আসামি সাজিয়ে আদালতে হাজির করেছিলেন এবং ওকালতনামায় ভুয়া নাম লিখে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছিলেন। ঘটনা ফাঁসের পর সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা তড়িঘড়ি করে এজলাস থেকে পালিয়ে যান।

আইনি পদক্ষেপ: এই ঘটনায় আদালতের বেঞ্চ সহকারী বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় আসল আসামি, প্রক্সি দেওয়া নারী এবং সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর বিরুদ্ধে ছদ্মবেশ ধারণ, প্রতারণা ও জাল-জালিয়াতির অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। ইতোমধ্যে প্রক্সি দেওয়া নারী মনোয়ারা বেগমকে আদালত ২ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন।

প্রক্সির ঘটনায় কী ধরনের মামলা দায়ের হয়েছে?
বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার খবর অনুযায়ী, সাম্প্রতিক প্রক্সির ঘটনায় দণ্ডবিধির (Penal Code) ২০৫, ৪১৯, ৪৬৭, ৪৬৮ এবং ৩৪ ধারায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। ঢাকার চতুর্থ যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালতের নির্দেশে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৭৬ ধারার বিধান অনুসরণ করে কোতোয়ালি থানায় মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়।

মামলায় উল্লেখিত ধারাগুলোর আইনি ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো:
• ধারা ২০৫ (মিথ্যা পরিচয় ধারণ করে জালিয়াতি): বিচারিক বা আইনি কার্যক্রমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অন্য কোনো ব্যক্তির ছদ্মবেশ বা মিথ্যা পরিচয় ধারণ করার অপরাধে এই ধারা প্রয়োগ করা হয়
• ধারা ৪১৯ (ছদ্মবেশে প্রতারণা): নিজের আসল পরিচয় লুকিয়ে অন্য কোনো ব্যক্তির রূপ ধারণ করে কারো সাথে প্রতারণা করার দণ্ড এই ধারায় উল্লেখ রয়েছে।
• ধারা ৪৬৭ (মূল্যবান জামানত বা দলিল জালিয়াতি): ওকালতনামা বা আদালতের নথিপত্রে ভুয়া স্বাক্ষর বা জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়ার কারণে এই গুরুতর ধারাটি যুক্ত করা হয়েছে।
• ধারা ৪৬৮ (প্রতারণার উদ্দেশ্যে জালিয়াতি): আদালতকে বিভ্রান্ত করতে এবং বেআইনিভাবে সুবিধা (যেমন জামিন) পাওয়ার উদ্দেশ্যে নথিপত্র জাল করার অপরাধে এই ধারা দেওয়া হয়।
• ধারা ৩৪ (সাধারণ অভিপ্রায় বা যোগসাজশ): একাধিক ব্যক্তি যখন পূর্বপরিকল্পিতভাবে বা একই উদ্দেশ্যে কোনো অপরাধমূলক কাজ একত্রে সম্পন্ন করে, তখন তাদের সবার বিরুদ্ধে এই ধারা প্রযোজ্য হয়।

আইন অনুযায়ী এই ধরনের অপরাধ প্রমাণিত হলে কী শাস্তি হতে পারে?
এই মামলায় দায়ের করা দণ্ডবিধির (Penal Code) বিভিন্ন ধারায় আসামিদের অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হতে পারে। যেহেতু এটি একটি জাল-জালিয়াতি ও প্রতারণার মামলা, তাই ধারা অনুযায়ী শাস্তির মাত্রা ভিন্ন হয়। এই মামলায় পলাতক আইনজীবীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি আদালত এবং আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও সংশ্লিষ্ট বার অ্যাসোসিয়েশন (ঢাকা বার) অত্যন্ত কঠোর শাস্তিমূলক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে পারে।

লেখক: সরওয়ার নিজামী
অ্যাডভোকেট, ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালত
ইনকাম ট্যাক্স প্র্যাকটিশনার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ঢাকা
চেম্বার: লেক্সলেইন চেম্বারস, ফ্ল্যাট নং- ২বি, প্রপার্টি প্যারাগন
১১৬ সেগুনবাগিচা, ঢাকা- ১০০০। মোবাইল- ০১৮১৫ ৮১৯২৩৯।


মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.