নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সরওয়ার নিজামী একাধারে লেখক, আইন গবেষক, আইনজীবী, সমাজকর্মী ও সংগঠক। প্রকাশিত বই: পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পর্কিত আইন, আইনের জীবন ও দর্শন, চলচ্চিত্রে আইন, কোলাহল শেষে, বিপ্লব দেখতে আসিনি, এসেছি বিপ্লবী হতে, শূন্যলতা, কিছু স্মৃতি, কিছু কথা, ধূসর মেঘের ওপারে।

সরওয়ার নিজামী

আইনজীবী, ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালত (০১৮১৫ ৮১৯২৩৯)

সরওয়ার নিজামী › বিস্তারিত পোস্টঃ

যানজট শুল্ক : বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট

০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:২৫

ভূমিকা
রাজধানী ঢাকার যানজট কমাতে ও ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে সম্প্রতি বিএনপি সরকার কিলোমিটারপ্রতি ৬.২৭ টাকা হারে 'যানজট শুল্ক' (কনজেশন চার্জ) আরোপের একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করেছে। এই মুহূর্তে এটি এখনো কোনো কার্যকর 'আইন' নয়, তবে এটি সরকারের একটি 'অনুমোদিত খসড়া পরিকল্পনা' যা ভবিষ্যতে সুনির্দিষ্ট বিধিমালার মাধ্যমে আইনি রূপ পাবে। সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (RSTP) এই সুপারিশ করা হলেও, নগরবাসীর জন্য নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন নিশ্চিত হওয়ার আগে এটি কার্যকর হচ্ছে না।

যানজট শুল্ক কী?
যানজট শুল্ক (Congestion Charge/Pricing) হলো—একটি নির্দিষ্ট এলাকার সড়কে যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ বা চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য গাড়ির মালিক বা চালকদের ওপর আরোপিত বিশেষ এক ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক মাশুল বা সারচার্জ।

বিএনপি সরকারের প্রস্তাবিত ‘যানজট শুল্ক’ খসড়াতে কী আছে?
• শুল্কের হার: ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল ও ট্রাকের জন্য কিলোমিটারপ্রতি ৬.২৭ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
• প্রযোজ্য এলাকা: সব সড়কে নয়, বরং যেসব রুটে মেট্রোরেল, বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (BRT) কিংবা উন্নত গণপরিবহন পরিষেবা চালু রয়েছে, কেবল সেসব রুটের নির্দিষ্ট করিডোরে এটি প্রযোজ্য হবে।
• বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া: আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এই শুল্ক আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে, যা তদারকি করবে বিআরটিএ এবং ডিটিসিএ।
• মূল উদ্দেশ্য: ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে রাস্তায় যানবাহনের চাপ কমানো এবং যাত্রীদের উন্নত গণপরিবহন ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা।

এটি মূলত ২০২৫-২০৪৪ মেয়াদের সংশোধিত বা হালনাগাদকৃত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (Updated Revised Strategic Transport Plan - URSTP)-এর একটি খসড়া নীতিমালায় স্বল্পমেয়াদি অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে। এটি কোনো সরাসরি আইন নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবহন মহাপরিকল্পনা। নীতিমালাটি চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়নের জন্য এটিকে আইনের আওতায় আনা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই শুল্কের আইনি তদারকি, আদায় ও পরিচালনার মূল দায়িত্বে থাকবে দুটি সংস্থা। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১২ অনুযায়ী ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থার যেকোনো বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত এই সংস্থার মাধ্যমে আসে। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ / ২০২৩ এর সাথে সমন্বয় করে বা নতুন বিধিমালার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় আরএফআইডি (RFID) প্রযুক্তিতে এই শুল্ক আদায়ের আইনি বৈধতা দেওয়া হতে পারে।

পৃথিবীর আর কোন শহরে যানজট শুল্ক কার্যকর আছে?
পৃথিবীর বেশ কয়েকটি উন্নত ও বড় শহরে যানজট কমাতে এবং বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে সফলভাবে ‘যানজট শুল্ক’ (কনজেশন চার্জ) চালু রয়েছে। এই শহরগুলো তাদের ট্রাফিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করছে। সিঙ্গাপুরই পৃথিবীর প্রথম শহর যা ১৯৭৫ সালে প্রথম এই শুল্ক ব্যবস্থা চালু করে। এছাড়া ২০০৩ সালে সেন্ট্রাল লন্ডনে এই শুল্ক কার্যকর করা হয়। সুইডেনের স্টকহোমে ২০০৬ সালে পরীক্ষামূলক এবং ২০০৭ সালে এটি স্থায়ীভাবে চালু হয়। সুইডেনের আরেক শহর গোটেনবার্গে চালু হয় ২০১৩ সালে। ইতালির মিলানে ২০০৮ সালে প্রথম দূষণ কমাতে এবং পরবর্তীতে ২০১২ সালে এটিকে নিয়মিত যানজট শুল্ক হিসেবে রূপ দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম শহর হিসেবে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনে এই শুল্ক ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এশিয়ার অত্যন্ত যানজটপূর্ণ শহর থাইল্যান্ডের ব্যাংকক এবং ভিয়েতনামের কিছু শহরেও এটি চালুর জোরালো পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা চলছে। মোদ্দাকথা, পৃথিবীর অনেক শহর এই ধরনের শুল্ক ধীরে ধীরে আরোপ করছে।

ঢাকার রাস্তায় এই শুল্ক কাদের ওপর আরোপিত হবে?
সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার (URSTP) খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, এই যানজট শুল্ক মূলত ব্যক্তিগত এবং বাণিজ্যিক পণ্যবাহী যানবাহনের ওপর আরোপিত হবে। রাস্তায় গাড়ির চাপ কমাতে এবং গণপরিবহন ব্যবহারে সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করাই এর মূল লক্ষ্য। সুনির্দিষ্টভাবে যে ৩ ধরনের যানবাহনের ওপর এই শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে, সেগুলো হলো: প্রাইভেট কার (ব্যক্তিগত গাড়ি), মোটরসাইকেল, ট্রাক (পণ্যবাহী যান)।

কারা এই শুল্কের বাইরে থাকবে?
খসড়া পরিকল্পনায় সব যানবাহনের তালিকা চূড়ান্ত না হলেও, যানজট শুল্কের মূল ধারণা (Global Standards) এবং ঢাকার প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সাধারণত গণপরিবহন, জরুরি সেবামূলক যান, পরিবেশবান্ধব ও বিকল্প যানের এই ধরনের শুল্কের বাইরে থাকবে। তাছাড়া, যানজট শুল্ক পুরো ঢাকার সব রাস্তায় একসাথে কার্যকর হবে না। কেবল সেইসব সড়কে এটি দিতে হবে, যেগুলোর সমান্তরালে মেট্রোরেল, বিআরটি (BRT), কিংবা উন্নত বাস সেবা চালু থাকবে।

যানজট শুল্ক কি কোনো বৈজ্ঞানিক সমাধান?
ঢাকার রাস্তায় স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ও এ আই ক্যামেরা প্রযুক্তি পুরোপুরি চালু না হলে যানজট শুল্ক নির্ধারণ ও আরোট জটিল হয়ে পড়তে পারে। এক্ষেত্রে এটি যানজট সমাধানে বড় কোনো বৈজ্ঞানিক সমাধান নিয়ে আসতে পারবে না।

নেতিবাচক প্রভাব
তবে যানজট শুল্ক আরোপিত হওয়ার পর ঢাকার রাস্তায় কিছু নেতিবাচক প্রভাবও পড়তে পারে। নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন নিশ্চিত না করে ঢাকার মতো মেগাসিটিতে 'যানজট শুল্ক' আরোপ করলে সমাজে বেশ কিছু বড় ধরনের বিরূপ ও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। রাইড শেয়ারিংয়ের ভাড়া বৃদ্ধি, পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, সামাজিক বৈষম্য ও ক্ষোভ তৈরি, গণপরিবহনে অতিরিক্ত উপচে পড়া ভিড় এবং ৪. পার্শ্ববর্তী বা বিকল্প সড়কে যানজট স্থানান্তর এর মতো ঘটনা ঘটতে পারে।


লেখক: সরওয়ার নিজামী
অ্যাডভোকেট, ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালত
ইনকাম ট্যাক্স প্র্যাকটিশনার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ঢাকা
ট্যাক্স, ভ্যাট এন্ড কাস্টমস ল’ কনসালট্যান্ট
চেম্বার: লেক্সলেইন চেম্বারস, ফ্ল্যাট নং- ২বি, প্রপার্টি প্যারাগন
১১৬ সেগুনবাগিচা, ঢাকা- ১০০০। মোবাইল- ০১৮১৫ ৮১৯২৩৯।




মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.