নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সরওয়ার নিজামী একাধারে লেখক, আইন গবেষক, আইনজীবী, সমাজকর্মী ও সংগঠক। প্রকাশিত বই: পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পর্কিত আইন, আইনের জীবন ও দর্শন, চলচ্চিত্রে আইন, কোলাহল শেষে, বিপ্লব দেখতে আসিনি, এসেছি বিপ্লবী হতে, শূন্যলতা, কিছু স্মৃতি, কিছু কথা, ধূসর মেঘের ওপারে।

সরওয়ার নিজামী

আইনজীবী, ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালত (০১৮১৫ ৮১৯২৩৯)

সরওয়ার নিজামী › বিস্তারিত পোস্টঃ

রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী, ডেভেলপার চুক্তি ভঙ্গ করলে বা আইনের লঙ্ঘন করলে ভূমির মালিক বা ফ্ল্যাট ক্রেতা কী ধরনের আইনগত পদক্ষেপ নিতে পারেন?

০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৫:১১

ভূমিকা
রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী, ডেভেলপার চুক্তি ভঙ্গ করলে বা আইনের লঙ্ঘন করলে ভূমির মালিক বা ফ্ল্যাট ক্রেতা ডেভেলপারের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও দেওয়ানি—উভয় ধরনের মামলা করতে পারেন।

কোন ক্ষেত্রে মামলা করা যায়?
রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী, কোনো ডেভেলপার কোম্পানির চুক্তিভঙ্গ, প্রতারণা বা অনিয়মের কারণে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট আইনি কারণে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা যায়। আইন অনুযায়ী কারণ ও দণ্ডগুলো নিচে বিস্তারিত উল্লেখ করা হলো:

১. নিবন্ধন ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা (ধারা ১৯)
সরকারি কোনো কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন ছাড়া রিয়েল এস্টেট ব্যবসা পরিচালনা করলে বা বিজ্ঞাপন দিলে ডেভেলপারের বিরুদ্ধে মামলা করা যায় রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (ধারা ১৯)। (শাস্তি: সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড) রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (ধারা ১৯)।

২. অনুমোদন ছাড়া প্রকল্পের কাজ শুরু করা (ধারা ২০)
রাজউক, সিডিএ বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া হাউজিং বা ফ্ল্যাট প্রকল্পের কাজ শুরু করলে কিংবা বিক্রি ও বিজ্ঞাপন প্রচার করলে মামলা করা যাবে রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (ধারা ২০)। (শাস্তি: সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা) রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (ধারা ২০)।

৩. ইউটিলিটি বা নাগরিক সেবা না দেওয়া (ধারা ২১)
ফ্ল্যাট বা প্লট হস্তান্তরের সময় চুক্তিতে প্রতিশ্রুত পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিত না করলে বা সেবা সংযোগে অবহেলা করলে মামলা করা যাবে রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (ধারা ২১)। (শাস্তি: অনূর্ধ্ব ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা অনাদায়ে ১ বছরের কারাদণ্ড) রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (ধারা ২১)।

৪. নোটিশ ছাড়া বরাদ্দ বাতিল বা স্থগিত করা (ধারা ২২)
ক্রেতা কিস্তি দিতে দেরি করলে আইন অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট সময় ও নোটিশ দেওয়া ছাড়া একতরফাভাবে প্লট বা ফ্ল্যাটের বরাদ্দ বাতিল করলে ডেভেলপারের বিরুদ্ধে মামলা করা যায় রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (ধারা ২২)। (শাস্তি: সর্বোচ্চ ১ বছরের কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা জরিমানা) রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (ধারা ২২)।

৫. ক্রেতার অজান্তে রিয়েল এস্টেট বন্ধক রাখা (ধারা ২৩)
ক্রেতার সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর তার অগোচরে বা সম্মতি ছাড়া সেই ফ্ল্যাট বা জমি ব্যাংক বা অন্য কোথাও বন্ধক (Mortgage) রাখলে মামলা হবে রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (ধারা ২৩)। (শাস্তি: ১ বছরের কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা জরিমানা) রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (ধারা ২৩)।

৬. চুক্তিবদ্ধ ফ্ল্যাট/প্লট অন্যত্র বিক্রয় বা পরিবর্তন (ধারা ২৪)
একজনের কাছে বিক্রির চুক্তি করে ক্রেতার অজ্ঞাতে অবৈধ লাভের উদ্দেশ্যে সেই ফ্ল্যাট বা প্লট অন্য কারো কাছে বিক্রি করলে ফৌজদারি মামলা করা যায় রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (ধারা ২৪)। (শাস্তি: সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা জরিমানা) রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (ধারা ২৪)।

৭. নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করা (ধারা ২৫)
চুক্তিতে যে ধরনের রড, সিমেন্ট বা ফিটিংস ব্যবহারের কথা ছিল, তা না করে অবৈধ লাভের উদ্দেশ্যে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করলে ক্রেতা মামলা করতে পারেন রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (ধারা ২৫)। (শাস্তি: সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা জরিমানা) রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (ধারা ২৫)।

৮. অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মাণ করা (ধারা ২৬)
কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত লে-আউট বা আর্কিটেকচারাল নকশা লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত তলা বা অননুমোদিত কাঠামো তৈরি করলে মামলা করা যাবে রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (ধারা ২৬)। (শাস্তি: সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা জরিমানা) রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (ধারা ২৬)।

৯. ভূমির মালিকের অংশ বুঝিয়ে না দেওয়া (ধারা ৩০)
জমির মালিকের সাথে যৌথ উন্নয়ন (Joint Venture) চুক্তি করার পর নির্ধারিত সময়ে মালিকের প্রাপ্য ফ্ল্যাট বা হিস্যা বুঝিয়ে না দিলে জমির মালিক মামলা করতে পারেন রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (ধারা ৩০)। (শাস্তি: সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা জরিমানা) রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (ধারা ৩০)।

বাধ্যতামূলক সালিশ
রিয়েল এস্টেট আইনের ৩৬ ধারা অনুযাযী এই অধীনে সরাসরি মামলা করার আগে সালিশ (Arbitration) বা আপসের চেষ্টা করা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক। রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ৩৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী বিরোধ নিষ্পত্তির বিস্তারিত আইনি প্রক্রিয়াটি নিচে তুলে ধরা হলো:

১. প্রাথমিক আপস বা সমঝোতা (Amicable Settlement)
ফ্ল্যাট হস্তান্তর, মূল্য, বা নকশা সংক্রান্ত যেকোনো বিরোধ তৈরি হলে ক্রেতা, ভূমির মালিক এবং ডেভেলপার—সব পক্ষকে প্রথমে নিজেদের মধ্যে বসে আপস বা সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করার চেষ্টা করতে হবে।

২. সালিশির নোটিশ (Arbitration Notice)
যদি কোনো এক পক্ষের অসহযোগিতার কারণে প্রাথমিক আপসের চেষ্টা ব্যর্থ হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ অপর পক্ষকে সালিস আইন, ২০০১ অনুযায়ী একটি আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাঠাবে। এই নোটিশে সালিশি ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিরোধ সমাধানের আহ্বান জানাতে হয়।

৩. ট্রাইব্যুনাল গঠন ও সময়সীমা
নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে উভয় পক্ষ যৌথভাবে একটি 'সালিশি ট্রাইব্যুনাল' গঠন করতে বাধ্য। এই ট্রাইব্যুনাল যে রায় বা সিদ্ধান্ত (Arbitral Award) দেবে, তা উভয় পক্ষের ওপর বাধ্যতামূলক হবে এবং এর বিরুদ্ধে সাধারণ আদালতে কোনো আপত্তি তোলা যাবে না।

৪. কখন আদালতে মামলা করা যাবে?
আপনি সরাসরি আদালতে যেতে পারবেন কেবল দুটি বিশেষ পরিস্থিতিতে:
• নোটিশ দেওয়ার পর অপর পক্ষ যদি ৩০ দিনের মধ্যে সালিশি ট্রাইব্যুনাল গঠনে ব্যর্থ হয় বা সহযোগিতা না করে।
• ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর যদি কোনো পক্ষ প্রাপ্ত রায় বা সিদ্ধান্ত অমান্য করে।

গুরুত্বপূর্ণ আইনি সতর্কতা: সালিশির নোটিশ পাঠানোর পর আইনগতভাবে ৩০ দিন পার হওয়ার আগে কোনো পক্ষই আদালতে ফৌজদারি বা দেওয়ানি মামলা দায়ের করতে পারবে না। এই প্রক্রিয়া না মেনে সরাসরি মামলা করলে আদালত তা খারিজ করে দিতে পারে।


লেখক: সরওয়ার নিজামী
অ্যাডভোকেট, ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালত
ইনকাম ট্যাক্স প্র্যাকটিশনার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ঢাকা
ট্যাক্স, ভ্যাট এন্ড কাস্টমস ল’ কনসালট্যান্ট
চেম্বার: লেক্সলেইন চেম্বারস, ফ্ল্যাট নং- ২বি, প্রপার্টি প্যারাগন
১১৬ সেগুনবাগিচা, ঢাকা- ১০০০। মোবাইল- ০১৮১৫ ৮১৯২৩৯।




মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.