| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
প্রবীর সিকদার। একজন আপোষহীন, নির্যাতিত কলম সৈনিক। সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো একজন শহীদ সন্তান।একাত্তরে পরিবারের ১৪ জন সদস্যকে হারিয়েছেন তিনি। ঠিক আছে, এক্ষেত্রে অনেকেই বলতে পারেন শহীদ সন্তান হলেই যে অপরাধ করতে পারে না এমনও তো না। জীবনের কোন এক বাঁকে এসে পথভ্রষ্ট হয়ে অপরাধ কর্মকান্ডে লিপ্ত হতেই পারে। দেশের আাইন অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে মামলাও হতে পারে। এবং বিচারও চলতে পারে। এগুলো খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো প্রবীর সিকদার সত্যিই কি পথভ্রষ্ট? না অপরাধকারী? দেশের সাংবিধানিক আদালত কর্তৃক মৃত্যুদন্ডের দন্ডপ্রাপ্ত চক্র যদি তাঁকে অপরাধী বলে তাহলে কার কথা বিশ্বাস করবেন? স্বাধীনতা বিরোধী কুচক্রী মহলের না একজন শহীদ সন্তানের? আমরা শহীদ সন্তানের কথাই বিশ্বাস করতে চাই। যারা বাচ্চু রাজাকার, 'নুলা রাজাকারদের' সহযোগী সাঈদী রাজাকারকে চাঁদে দেখতে পায় তাদের বিশ্বাসে ভিন্নতা থাকবে এটিই স্বাভাবিক।
যাহোক, মূল প্রসঙ্গে আসা যাক, শহীদ সন্তান প্রবীরকে কোন ধরনের গ্রপ্তারি পরোয়ানা ছাড়াই যে কায়দায় তুলে নিয়ে যাওয়া হলো এবং তারপর মামলা ঠুকে দেয়া আমাদের আশংকাকে বাড়িয়ে দিলো এবং প্রবীরের প্রতি বিশ্বাস আরো বেড়ে গেলো। আমরা ভাবতে বাধ্য হলাম ফেসবুক স্ট্যাটাসের কারনে প্রভাবশালী ঐ মহল তাঁকে হত্যার পরিকল্পনায় ব্যর্থ হয়ে নিপীড়নের পথ বেছে নিলেন। মড়িয়া হযে উঠলেন প্রবীরের কলমকে বন্ধ করে দিতে?
ধরুন, আগামীকাল রাজশাহীর ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী এক নেতার বিরুদ্ধে আমার জীবনের হুমকির কথা বলে নিরাপত্তা চেয়ে যেকােন একটি থানায় জিডি করতে যাবো! এই বলে যে আমার সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদনের কারনে ক্ষুব্ধ হয়ে ঐ নেতা বিভিন্নভাবে আমাকে হুমকি-ধামকি দিয়ে আসছেন। কিন্তু ঐ নেতা সরাসরি হুমকি দিচ্ছে না। আমি সহ আমার সহকর্মীরা আমরা সবাই বুঝতে পাচ্ছি সবই ঐ নেতার কারসাজি! কিন্তু আমাদের হাতে কোন সঠিক তথ্য-প্রমান নেই (পুলিশের ভাষায়)। পুলিশ আমাকে তাড়িয়ে দিলো। জিডি নিলো না। এতে করে আমার ভয় আরও বেড়ে গেলো! সাথে সাথে এটাও মনে হওয়া খুবই স্বাভাবিক যে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লেলিয়ে দিতে পারে আমার প্রাণনাশের উৎসবে! একটা লরির নিচে চাপা দিযে দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দিতে পারে! আমার এই আশংকা তো তখন অমূলক নয। এমতাবস্থায় তখন আমার পক্ষে জনতার আদালতে সাধারন ডায়েরী করা ছাড়া আর কিই বা করার থাকে বলুন।পৃথিবীর সব মানুষতো বটেই সব প্রাণীরই আত্নরক্ষার অধিকার রয়েছে। নিজের প্রাণ রক্ষার জন্য জনতার আদালতে নিরাপত্তা তো চাইতে পারি। অন্তত এই ভেবে যে, জনতা আমাকে রক্ষা করতে না পারলেও তাঁরা জানবে কারা আমার হন্তারক! আর প্রবীর সেটিই করেছেন।
যে কোন নাগরিকেরই তো আ্ইনী সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। আইনের চোখে তো যে কোন সাধারন নাগরিক বা প্রভাবশালী সবাই সমান। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ নং অনুচ্ছেদ তো তাই বলে। কিন্তু প্রবীর সিকদারের অভিযোগ আমলে না নিয়ে উল্টো তাঁর বিরুদ্ধে নিপীড়রনের খড়গ নামানো হলো। কেন? আইনের আশ্রয় লাভের সুযোগ না দিয়ে তাঁর 'মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হলো'। উল্টো বলা হলো প্রবীর মিথ্যা ও উস্কানিমূলক কথা বলে প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর ভাবমূর্তি ক্ষন্ন করেছে! তাঁর মানহানি হয়েছে। মানলাম, 'সম্পূর্ন মিথ্যা তথ্যে' ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে। আর যদি তথ্যটা সম্পূর্ন সত্য প্রমাণিত হয় তখন কি হবে? আসলে আগে তো সেটিই করার কথা ছিলো। আাইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকলে প্রবীরের অভিযোগের বিষয়টিই আগে মীমাংসা হত। আইন শৃংখলা বাহিনী নিরপেক্ষ তদন্ত করলে সাংবাদিক প্রবীরের অভিযোগের সত্যতা অবশ্যই মিলতো।
কিন্তু তা করা হয়েছে কি? না হয় নি। কেন করা হলো না? আইনও কি অসহায় প্রভাবশালীদের কাছে? শেষমেষ কি করা হলো? মামলা করা হলো তাঁর বিরুদ্ধে? তাও আবার আটক করে তারপর মামলা হলো! তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ধারা ৫৭ (২) এর অধীনে। 'বিতর্কিত' এই ধারার অধীনে মামলাটি করা হলো। যে ধারা নিয়ে অনেক আইনবিদই তীব্র সমালোচনা করেছিলেন এবং এও আশংকা প্রকাশ করেছিলেন যে এই আইন মানুষের মৌলিক মানবাধিকার ক্ষুন্ন করবে। আইনের ছাত্র হিসেবে এ্ই আইনের সমালোচনা করেছিলাম। লিখালিখিও করেছিলাম। এবং এও বলেছিলাম এই ধারা মানুষের বাক স্বাধীনতাকে হরণ করতে পারে। বাস্তবে হয়ত সেটিই দেখতে হচ্ছে।
এখন আরেকটি প্রসঙ্গে আসা যাক। মামলার বাদী একজন সরকারী আইনজীবী। বাদী মামলায় অভিযোগ করলেন যে, ফেসবুক পোস্ট-টির মাধ্যমে প্রবীর শিকদার ইচ্ছাকৃতভাবে ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন সম্পর্কে মিথ্যা ও অসত্য লেখা লিখে মন্ত্রীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন। উক্ত লেখাটি জনসমক্ষে প্রকাশের মাধ্যমে উসকানি প্রদান করে মানুষের কাছে মন্ত্রীকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য বিদ্বেষ ছড়িয়েছেন। এর ফলে মন্ত্রীর মানহানি ঘটেছে। যা একটি ফৌজদারি অপরাধ।
ঠিক আছে, মানলাম! উপরের সব যুক্তিই ভুলে গেলাম। 'প্রবীরই মিথ্যাচার করেছেন'। এজন্য তাঁর বিরুদ্ধে আইনী প্রক্রিয়া অনুসরন করা হবে। এখন তাঁর পছন্দের আইনজীবী নিয়োগ করে আত্নপক্ষ সমর্থনের পালা। বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ তাঁকে এই অধিকার দিয়েছেন। সে যত বড় অপরাধীই হোক না কেন? কিন্তু আশ্চর্য হলাম, যখন শুনলাম ফরিদপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের কোন আইনজীবীই তার পক্ষে আইনী লড়াই চালাতে চাচ্ছেন না! কি আশ্চর্য! এটা কেন? পৃথিবীর যত বড় অপরাধীই হোক না কেন সে যদি কোন আইনজীবীর কাছে আইনী লড়াইয়ের ব্যাপারে সহযোগিতা চান তাহলে সে যুক্তিসংগত কোন কারন ছাড়া আইনী সহায়তা দিতে বাধ্য। এটি ১৯৭২ সালের বার কাউন্সিল আদেশেও বলা আছে।কিন্তু অনেক চেষ্টার পরও প্রবীরের পক্ষে কোন্ আইনজীবী দাঁড়াতে রাজি হননি গতকাল সোমবার।
অজুহাত হিসেবে দাঁড় করেছেন আইনজীবী সমিতির কেউ যদি কারও বিরুদ্ধে মামলা করে তাহলে সমিতির অনুমতি ছাড়া কেউ বিবাদীর পক্ষে দাঁড়াতে পারবে না! কি আজব দেশ! যেখানে একজন স্বীকৃত যুদ্ধাপরাধীর পক্ষে আইনী লড়াই করতে শত শত আইনজীবী দাঁড়িয়ে যায় সেখানে একজন শহীদ সন্তানের পক্ষে কেউ দাঁড়াতে চান না! তাহলে কি এটিই ভাবতে বাধ্য হতে হয় না যে দেশটি এখনো স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির হাত খেকে মুক্তি পায় নি? তবে হ্যাঁ এই একটি মাত্র ঘটনাই সম্পূর্নরুপে নিরব স্বাক্ষ্য দিচ্ছে যে প্রবীরের প্রাণনাশের হুমকির যথেষ্ঠ সত্যতা রয়েছে।আবার অভিযোগ উঠছে কাউকে আদালতে যেতে দেওয়া হচ্ছে না পরিবারের কেউ গেলেও তাদের গ্রেফতারের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এটি আরও স্পষ্ট করে এক্কেবারে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে সাংবাদিক প্রবীরের জীবন বিরাট হুমকির মধ্যেই ছিলো।
সবচেয়ে বেশি অবাক হচ্ছি প্রভাবশালী দু-একটি গনমাধ্যমের ভূমিকা পর্যবেক্ষন করে। মামলার বাদীকে উপস্থাপনের ধরন, প্রবীরকে তুচ্ছ করার প্রয়াস এসব কিছু দেখে।আসলে প্রভাবশালীদের সাথে তো প্রভাবশালীদেরই বন্ধুত্ব হয়! এটা নিয়ে ভেবে মাথা খারাপ করে লাভ নেই।
তবে সবকিছু ছাপিয়ে বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষের কাছে একটি পরিষ্কার বার্তা পৌঁছে গেছে যে কেন প্রবীর শিকদারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে? প্রবীরের অপরাধ কি? তাঁর অপরাধ হলো তিনি নুলা রাজাকার ওরফে ধনকুবের মুসা বিন শমসেরের বিরুদ্ধে লিখেছেন। ২০০১ সালে ফরিদপুরে জনকণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি থাকা অবস্থায় প্রবীর সিকদারের ওপর যে নৃশংস হামলা হয়েছিল, যার জেরে তিনি এখনো পঙ্গু, সেই হামলার নেপথ্য নায়ক এই মূসা। একাত্তরে পাক হানাদার বাহিনীর সহচর রাজাকার মুসা ক’দিন আগে নিজেকে বঙ্গবন্ধুর সাথে তুলনা করেন। শহীদ পরিবারের সন্তান প্রবীর সিকদার এটা মেনে নেন নি? এটাই তাঁর অপরাধ। তাঁর অপরাধ হলো তিনি বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে কলম চালিয়েছেন। বাচ্চু রাজাকারের হত্যা-ধর্ষণের ধারাবাহিক প্রতিবেদন করেছেন। যার ফলে বাচ্চুর আজ মৃত্যুদন্ড হয়েছে। আর নুলা রাজাকারকে বাঁচাতে চেয়েছেন প্রভাবশালী মন্ত্রী মহোদয়! প্রবীর তাকে ছেড়েও কথা বলেন নি! এসবই প্রবিরের অপারাধ!এসব অপরাধের বিচারে প্রবীরের শাস্তি হোক আমরা যারা প্রগতিশীলতার কথা বলি, যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কথা বলি তারা বসে বসে দু-একটি নিন্দা বিবৃতি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করে দিবো?না প্রবীর সিকদারের নি:শর্ত মুক্তি এবং তাঁকে হয়রানির দরুন পর্যাপ্ত আইনী প্রতিকার দিতে হবে। নতুবা এর শেষ দেখতে হবে! হয় নুলা রাজাকারা থাকবে নয়তো শহীদ সন্তান প্রবীররা থাকবে!
সবশেষে আসি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার কাছে। আপনি তো গত দুই দিন আগে্ই আপনার দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করলেন যে আপনার পিতার দেখানো আদর্শ-মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করতে দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে যেকোন ত্যাগের জন্য প্রস্তুত আছেন। সম্ভবত, এখন এমনই একটি সময় এসেছে আপনার এমন ত্যাগের কিছু নজির স্থাপন করার! অাপনাকে এখনই আপনার আত্নীয় নুলা রাজাকার ও তাঁর দোষরদের ত্যাগ করতে হবে। নতুবা আরও অনেক সর্বনাশ হতে পারে। মাননীয প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনি আপনার সেই আত্নীয় নুলা রাজাকারের পক্ষে অবস্থান নিবেন না আপনার বাবার আদর্শে অনুপ্রাণিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-সমৃদ্ধ এক মজলুম কলম সৈনিকের পক্ষে? সিদ্ধান্ত আপনার! আপনার সিদ্ধান্ত জানার অপেক্ষায় রইলাম!
©somewhere in net ltd.